একজন মা কী অজান্তেই পরিবারের অশান্তির কারণ হতে পারেন?

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬

একজন মা কী অজান্তেই পরিবারের অশান্তির কারণ হতে পারেন?

একজন মা অজান্তেই কীভাবে পরিবারের অশান্তির কারণ হতে পারেন? এও কি সম্ভব? হ্যাঁ সম্ভব। আত্মসমালোচনা ও সচেতন মাতৃত্বের গল্প সবাই শুনি। যে ভিত্তিতে গড়ে ওঠে ভালোবাসা, সম্মান, ধৈর্য এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধের ওপর। এই ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে মা যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তেমনি বাবা-ও সমানভাবে দায়িত্বশীল। 


এককভাবে মাকে দায়ী করা যেমন ঠিক নয়

তাই পরিবারের কোনো সমস্যার জন্য এককভাবে মাকে দায়ী করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি নিজের ভূমিকা নিয়েও একজন মায়ের সচেতন থাকা খুবি জরুরি।  মা সন্তানের প্রথম শিক্ষক। তাঁর কথা, আচরণ, মূল্যবোধ এবং জীবনযাপন সন্তানের মনোজগতে গভীর ছাপ ফেলে। এটা যেমন সত্য। তেমনি ছোট ছোট কিছু অভ্যাস, যা অনেক সময় অজান্তেই ঘটে, ভবিষ্যতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।


সন্তান কী চায় বুঝতে হবে

সন্তানের আবেগকে গুরুত্ব না দোয়া। শুধু খাবার, পোশাক বা পড়াশোনার ব্যবস্থা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সন্তান চায় মায়ের সময়, মনোযোগ, স্নেহ আর নিরাপত্তা।  যখন সে নিজেকে  অবহেলিত মনে করে, তখন তার ভেতরে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়, যা পরে ভুল জায়গায় ভালোবাসা খোঁজার কারণ হতে পারে।


সন্তানের সামনে বাবাকে ছোট করা যাবে না

সব সিদ্ধান্ত একজন মা এক নিজের হাতে রাখবেন না। এটা এক প্রকার জুলুম। সন্তানের প্রতিটি বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে অনেক সময় তার নিজের চিন্তা করার ক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস কমে যায়। শাসনের পাশাপাশি তাকে মত প্রকাশের সুযোগ দেওয়াও খুবি জরুরি। সন্তানের সামনে বাবাকে ছোট করা যাবে না। একদমই না।স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতের অমিল থাকতেই পারে। কিন্তু সেই বিরোধ যদি সন্তানের সামনে প্রকাশ পায়, তাহলে তার মনে বাবা-মা দুজনের প্রতিই নেতিবাচক ধারণা জন্মাতে পারে। পরিবারে পারস্পরিক সম্মান সন্তানের মানসিক নিরাপত্তার জন্য খুবই খারাপ প্রভাব ফেলবে।


কোমল ভাষায় কথা বলুন

দাম্পত্য সম্পর্ককে অবহেলা করা- সন্তানের যত্ন নিতে গিয়ে অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের প্রতি যত্ন কমে যায়। অথচ সুখী দাম্পত্যই একটি নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশের ভিত্তি। যে ঘরে প্রতিনিয়ত ধমক, চিৎকার বা অপমান থাকে, সেখানে শিশুরা ভয়, অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপে বেড়ে ওঠে। কোমল ভাষা অনেক সময় কঠোর শাসনের চেয়েও বেশি কার্যকর।


আরও যা যা করবেন না

সন্তানদের মধ্যে পক্ষপাত করা। কখনোই উচিত নয়। একজনকে বেশি আরেকজনকে কম গুরুত্ব দিলে ভাইবোনের সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হয়। ন্যায়সঙ্গত আচরণ প্রতিটি সন্তানের অধিকার। অন্যের সঙ্গে তুলনা করা- ওকে দেখো, কত ভালো। এ ধরনের তুলনা সন্তানের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়। তুলনা নয়, তার নিজের অগ্রগতিকে স্বীকৃতি দিন।


প্রযুক্তিকে অভিভাবকের বিকল্প বানিয়ে ফেলা- মোবাইল বা টেলিভিশন কিছু সময়ের জন্য সহায়ক হতে পারে, কিন্তু কখনোই মায়ের সঙ্গ, গল্প, শিক্ষা ও ভালোবাসার বিকল্প নয়।


নিজের ভুল স্বীকার করতে না চাওয়া।মা-ও একজন মানুষ, তাঁরও ভুল হতে পারে। ভুল বুঝতে পারা এবং প্রয়োজনে আমি দুঃখিত বলা সন্তানকে বিনয় ও সততার শিক্ষা দেয়।


নিজের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক চর্চাকে অবহেলা করা- সন্তান উপদেশের চেয়ে উদাহরণ থেকে বেশি শেখে। তাই একজন মা যদি নিয়মিত ইবাদত, সততা, দয়া, ধৈর্য ও সুন্দর চরিত্রের চর্চা করেন, তাহলে সেই প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই সন্তানের জীবনেও পড়বে।


আমার এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো মাকে দোষারোপ করা নয়। বরং মনে করিয়ে দেওয়া আমরা সবাই ভুল করি, কিন্তু সচেতনতা ও আত্মসমালোচনার মাধ্যমেই নিজেদের আরও ভালো মানুষ এবং আরও ভালো অভিভাবক হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। একজন ভালো মা নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা করেন না। তিনি প্রতিদিন নিজেকে একটু একটু করে উন্নত করার চেষ্টা করেন। আর সেই চেষ্টাই একটি সুন্দর পরিবার, সুস্থ সমাজ এবং মূল্যবোধসম্পন্ন আগামী প্রজন্ম গড়ার সবচেয়ে বড় শক্তি।


লেখা- ইশরাত জাহান ইনা

sidebar ad