সংসারের সব খরচ চালিয়েও একজন পুরুষ কেন নিজেকে ব্যর্থ মনে করেন?

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: এআই/রোদসী
ছবি: এআই/রোদসী

রাত সাড়ে দশটা। ডাইনিং টেবিলে বসে মোবাইলের ব্যাংক অ্যাপ খুলেছেন একজন পুরুষ। মাসের শুরুতে পাওয়া বেতনের হিসাব মিলিয়ে দেখছেন। বাড়িভাড়া দেওয়া হয়েছে, বাজার হয়েছে, সন্তানের স্কুলের বেতন জমা পড়েছে, মায়ের ওষুধও কেনা হয়েছে। সামনে আরও কয়েকটি বিল। মাস শেষ হতে এখনো কয়েক দিন বাকি, কিন্তু হাতে থাকা টাকায় সব প্রয়োজন মেটানো যাবে কি না, বুঝতে পারছেন না।


পাশের ঘরে সন্তান হাসছে। স্ত্রী হয়তো পরের মাসের বাজারের তালিকা করছেন। পরিবারের সবাই জানেন, মানুষটি আছেন; প্রয়োজন হলে তিনি কোনো একটা ব্যবস্থা করবেন।


কিন্তু এই নিশ্চিন্ততার আড়ালে তাঁর নিজের মনে কী চলছে, তা কি কেউ জানেন?


তাঁরও ইচ্ছে করে পছন্দের শার্টটি কিনতে, বন্ধুদের সঙ্গে একটু সময় কাটাতে কিংবা অনেক দিন ধরে ভাবতে থাকা কাজটি শুরু করতে। কিন্তু প্রতিবারই নিজের ইচ্ছার আগে এসে দাঁড়ায় সংসারের প্রয়োজন। তিনি নিজেকে বোঝান, আরেকটু অপেক্ষা করি। পরিস্থিতি ভালো হলে নিজের কথাও ভাবব।


এই অপেক্ষা করতে করতে কখনো কখনো তাঁর মনে হয়, সংসার চালাতে পারছেন ঠিকই, কিন্তু নিজের জীবনটাকে যেন কোথাও এগিয়ে নিতে পারছেন না।


সংসারের সব খরচ চালিয়েও একজন পুরুষ কেন নিজেকে ব্যর্থ মনে করেন? এর উত্তর শুধু তাঁর আয়ের অঙ্কে নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক প্রত্যাশা, অপূর্ণ স্বপ্ন, আত্মসম্মান এবং পরিবারের ভেতরে নিজের অবস্থান নিয়ে নানা অনুভূতি।


উপার্জনই কি পুরুষের সাফল্যের একমাত্র পরিচয়?


আমাদের সমাজে অনেক ছেলেকে ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়, বড় হয়ে তাঁকে পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে। উপার্জন করতে হবে, সংসার চালাতে হবে, বিপদে সবার পাশে দাঁড়াতে হবে। পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যেন তাঁর প্রধান পরিচয়।


এই শিক্ষা দায়িত্বশীল হতে সাহায্য করে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন উপার্জনই একজন পুরুষের যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি হয়ে ওঠে।


তিনি নিয়মিত কাজ করছেন, সৎভাবে উপার্জন করছেন, পরিবারের প্রয়োজন মেটাচ্ছেন। তবু নিজের জন্য বাড়ি কিনতে না পারলে, সন্তানকে পছন্দের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াতে না পারলে কিংবা পরিবারকে প্রত্যাশামতো স্বাচ্ছন্দ্য দিতে না পারলে তাঁর মনে হতে পারে, তিনি যথেষ্ট নন।


অথচ পরিবারের প্রয়োজন পূরণ করা আর পরিবারের সব ইচ্ছা পূরণ করা এক বিষয় নয়। সীমিত আয়ে অগ্রাধিকার ঠিক করতে হয়। সব চাহিদা পূরণ করতে না পারা মানেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়া নয়। কিন্তু সমাজের প্রত্যাশা ও নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার চাপে অনেক পুরুষ এই সত্যটি মেনে নিতে পারেন না।


সংসার চলে, কিন্তু নিজের স্বপ্নগুলো থেমে যায়


সংসারের দায়িত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক পুরুষ নিজের স্বপ্নগুলো পিছিয়ে দেন। কারও ব্যবসা করার ইচ্ছা ছিল, কেউ নতুন দক্ষতা শিখতে চেয়েছিলেন, কেউবা নিজের পছন্দের কাজে সময় দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সন্তানের পড়াশোনা, পরিবারের চিকিৎসা, বাড়িভাড়া আর দৈনন্দিন খরচের ভিড়ে এসব পরিকল্পনা আর অগ্রাধিকার পায় না।


প্রথমে তাঁরা ভাবেন, পরিস্থিতি একটু ভালো হলে শুরু করবেন। এরপর আসে নতুন কোনো দায়িত্ব। একসময় দেখেন, অন্যদের প্রয়োজন মেটাতে মেটাতে নিজের জন্য রাখা সময়টুকুই হারিয়ে গেছে।


তাঁর কষ্ট শুধু নিজের পছন্দের জিনিস কিনতে না পারা নয়। আরও গভীরে হয়তো একটি প্রশ্ন তাঁকে তাড়া করে—জীবনে যে মানুষটি হতে চেয়েছিলাম, সেই মানুষটি কি আর হতে পারব?


নিজের স্বপ্ন পূরণ না হওয়ার হতাশা তখন বর্তমান অর্জনগুলোকেও ম্লান করে দিতে পারে। অথচ পরিবারের জন্য নিজের কিছু ইচ্ছা পিছিয়ে দেওয়া আর জীবনে ব্যর্থ হওয়া এক কথা নয়।


অন্যের সাফল্যের সঙ্গে নিজের তুলনা


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুর নতুন গাড়ি, পরিচিত কারও বিদেশভ্রমণ কিংবা সমবয়সী কারও ব্যবসায়িক সাফল্য চোখে পড়ে। তখন মনে হতে পারে, সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, শুধু তিনি পিছিয়ে আছেন।


কিন্তু অন্যের আয়, ঋণ, পারিবারিক সহায়তা কিংবা ব্যক্তিগত ত্যাগের পুরো হিসাব তো জানা নেই। তুলনাটি তাই অনেক সময় অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।


তবু মনে প্রশ্ন জাগে—একই বয়সে অন্যরা এত কিছু অর্জন করল, আমি কেন পারলাম না?


এই তুলনা নিজের পরিশ্রমের মূল্য ভুলিয়ে দিতে পারে। পরিবারের জন্য যে স্থিতিশীলতা তৈরি করেছেন, কঠিন সময়ে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, নিয়মিত যে দায়িত্ব পালন করছেন—এসব আর তাঁর চোখে সাফল্য বলে মনে হয় না। যা অর্জন করতে পারেননি, সেটাই হয়ে ওঠে নিজের মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি।


স্ত্রীর দৃষ্টিতে সংসারের হিসাবটা কেমন?


যে পুরুষটি মাসের শেষে টাকার হিসাব মেলাতে বসেন, তাঁর স্ত্রীও হয়তো একই সংসারের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। সন্তানের পড়াশোনার খরচ বাড়ছে, সঞ্চয় হচ্ছে না, হঠাৎ কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা কীভাবে হবে—এসব প্রশ্ন তাঁকেও ভাবাতে পারে।


এর পাশাপাশি অনেক নারী ঘরের কাজ, সন্তানের যত্ন, পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের দেখাশোনা এবং দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনার বড় অংশ সামলান। এই শ্রমের জন্য সরাসরি বেতন পাওয়া যায় না, অথচ সংসার সচল রাখতে এর গুরুত্ব অপরিসীম।


তাই একজন পুরুষের আর্থিক চাপ যেমন বাস্তব, তেমনি স্ত্রীর নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও বাস্তব।


স্ত্রী যখন খরচের কথা তোলেন, স্বামীর মনে হতে পারে, তাঁর এত পরিশ্রমের মূল্য দেওয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে স্ত্রী হয়তো ভাবছেন, ভবিষ্যতের কথা না বললে সংসারের প্রয়োজনগুলো কীভাবে সামলানো যাবে? একজন স্বীকৃতি চান, অন্যজন নিশ্চয়তা চান। দুজনের চাওয়াই যুক্তিসংগত, কিন্তু কথা বলার অভাবে তা অভিযোগে পরিণত হতে পারে।


এখানে কাউকে দোষী করার প্রয়োজন নেই। বরং বুঝতে হবে, দুজনেই হয়তো একই সমস্যার সমাধান খুঁজছেন, শুধু তাঁদের উদ্বেগের ভাষা আলাদা।


সব সংসারের বাস্তবতা অবশ্য এক নয়। কোথাও স্বামী একাই উপার্জন করেন, কোথাও স্ত্রীও অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন। তাই ন্যায্যতার হিসাব করতে হলে কে কত টাকা আয় করেন, তার পাশাপাশি কে কত সময়, শ্রম ও মানসিক শক্তি দিচ্ছেন, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।


পরিবারের ভরসা হয়েও কেন একা লাগে?


অনেক পুরুষ নিজের দুশ্চিন্তার কথা প্রকাশ করতে পারেন না। তাঁরা ভাবেন, পরিবারের মানুষকে চিন্তিত করবেন, কিংবা তাঁদের চোখে দুর্বল হয়ে পড়বেন। তাই বাইরে থেকে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেন, অথচ ভেতরে ভেতরে চাপ জমতে থাকে।


এই নীরবতা স্ত্রীর জন্যও বিভ্রান্তিকর হতে পারে। তিনি হয়তো বুঝতে পারেন না, স্বামী কেন চুপচাপ হয়ে যাচ্ছেন, কেন খরচের প্রসঙ্গ উঠলেই বিরক্ত হচ্ছেন কিংবা কেন ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় অংশ নিতে চাইছেন না।


স্বামী উদ্বেগ গোপন রাখেন, স্ত্রী উত্তর না পেয়ে আরও উদ্বিগ্ন হন। এভাবেই একই সংসারে থেকেও দুজনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।


অথচ নিজের চাপের কথা বলা দায়িত্বহীনতা নয়। যে মানুষটি সবার ভরসা হয়ে থাকতে চান, তাঁরও অন্য কারও ওপর ভরসা করার প্রয়োজন আছে। সম্পর্কের মধ্যে এমন একটি জায়গা থাকা দরকার, যেখানে দুজনেই বিচারিত হওয়ার ভয় ছাড়াই নিজেদের দুশ্চিন্তা প্রকাশ করতে পারেন।


সমাধান কি শুধু আয় বাড়ানো?


আয় বাড়ানোর চেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সব সমস্যার সমাধান শুধু বেশি টাকা উপার্জন নয়। প্রথমত, নিজের সাফল্যের সংজ্ঞা নতুন করে ভাবতে হবে। সততার সঙ্গে উপার্জন করা, পরিবারের পাশে থাকা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও দায়িত্ব পালন করাও সাফল্যের অংশ।


দ্বিতীয়ত, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আয়, ব্যয়, ঋণ, সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। কোন খরচ জরুরি, কোনটি পরে করা যায় এবং কোথায় সাশ্রয় সম্ভব—সেই সিদ্ধান্ত দুজনে মিলে নিলে আর্থিক চাপ একার বোঝা হয়ে থাকে না।


তৃতীয়ত, সংসারের দায়িত্বের ন্যায্য বণ্টন জরুরি। উপার্জনের পাশাপাশি ঘরের কাজ, সন্তানের যত্ন ও পরিবারের অন্যান্য দায়িত্বেও দুজনের অবদানকে গুরুত্ব দিতে হবে। একজনের শ্রমকে স্বাভাবিক ধরে নিয়ে অন্যজনের শ্রমকে বড় করে দেখলে অসন্তোষ জমতে পারে।


আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, দুজনেরই নিজের জন্য কিছু সময় ও সুযোগ থাকা। নিজের আগ্রহ, বন্ধুত্ব, বিশ্রাম কিংবা নতুন কিছু শেখার ইচ্ছা ধরে রাখা দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নয়; বরং ভালো থাকার অংশ।


হতাশা দীর্ঘদিন ধরে থাকলে, ঘুম ও দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেললে কিংবা নিজেকে মূল্যহীন মনে হওয়ার অনুভূতি বাড়লে বিশ্বস্ত মানুষের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়াও প্রয়োজন হতে পারে।


সংসার একার নয়, সহযাত্রার নাম


রাতের সেই মানুষটি হয়তো পরদিনও যথাসময়ে কাজে যাবেন, পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করবেন। তাঁর স্ত্রীও হয়তো ঘরের কাজ, সন্তানের প্রয়োজন আর ভবিষ্যতের হিসাব নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন। দুজনেই চেষ্টা করছেন, দুজনেরই ক্লান্তি আছে, দুজনেরই কিছু না-পাওয়ার গল্প আছে।


কিন্তু তাঁরা যদি শুধু নিজেদের কষ্টটুকু দেখেন, অন্যজনের কষ্টটি না দেখেন, তাহলে একই সংসারে থেকেও একা হয়ে পড়তে পারেন।


একজন পুরুষের আত্মসম্মান শুধু তাঁর আয়ের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। একইভাবে একজন নারীর অবদানও শুধু তাঁর উপার্জন দিয়ে বিচার করা যায় না। সম্পর্কের শক্তি তৈরি হয় যখন অর্থনৈতিক দায়িত্ব, ঘরের শ্রম, যত্ন, স্বীকৃতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দুজনেরই মর্যাদা থাকে।


তাই প্রশ্নটি শুধু এই নয়—একজন পুরুষ সংসারের সব খরচ চালিয়েও কেন নিজেকে ব্যর্থ মনে করেন? প্রশ্নটি আরও বড়: একটি পরিবার কীভাবে এমন আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে, যেখানে কাউকে নিজের কষ্ট লুকিয়ে শক্ত থাকার অভিনয় করতে হয় না?


সম্ভবত উত্তরটি আছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, খোলামেলা কথোপকথন এবং দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার মধ্যে। যেখানে স্বামী বলতে পারেন, ‘আমি চাপে আছি’; স্ত্রী বলতে পারেন, ‘আমিও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত’। যেখানে দুজনেই বুঝতে পারেন, সমস্যা তাঁদের একে অন্যের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর জন্য নয়, বরং একসঙ্গে সমাধান খোঁজার জন্য।


কারণ সংসার শুধু খরচ মেটানোর জায়গা নয়; এটি এমন একটি আশ্রয় হওয়ার কথা, যেখানে মানুষ ক্লান্ত হলে বিশ্রাম পায়, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় পেলে পাশে একজন সঙ্গীকে খুঁজে পায়।


সহযাত্রার অর্থই হলো—জীবনের বোঝা একজন একা বহন করবেন না; দুজনেই একে অন্যের পাশে দাঁড়াবেন।


sidebar ad