পরিবারে কারও আলঝেইমার থাকলে স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে—এই রোগ কি আমিও বংশগতভাবে বহন করছি? বিশেষ করে বাবা বা ঘনিষ্ঠ কোনো আত্মীয়ের আলঝেইমার থাকলে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে। কিন্তু আলঝেইমার কি সত্যিই শুধু জিনে লেখা থাকে?
আলঝেইমার রোগের সঙ্গে জেনেটিক্সের সম্পর্ক রয়েছে—এ কথা সত্য। তবে শুধু পরিবারে কারও এই রোগ আছে বলেই পরবর্তী প্রজন্মেরও আলঝেইমার হবে, এমনটা বলা যায় না। কারণ এই রোগের ঝুঁকি নির্ধারণে জিনের পাশাপাশি বয়স, হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির স্বাস্থ্য, জীবনযাপন, পরিবেশ এবং অন্যান্য জৈবিক বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, আলঝেইমার রোগ ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে সাধারণ ধরন। ডিমেনশিয়ার মোট ঘটনার প্রায় ৬০–৭০ শতাংশের সঙ্গে এটি সম্পর্কিত। বয়স বাড়ার সঙ্গে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়ে, তবে এটি স্বাভাবিক বার্ধক্যের অনিবার্য অংশ নয়।
জিনে কি আলঝেইমার লেখা থাকে?
আলঝেইমারের ক্ষেত্রে জেনেটিক ভূমিকা বোঝার জন্য প্রথমেই দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন—ঝুঁকি বাড়ায় এমন জিন এবং সরাসরি রোগের কারণ হতে পারে এমন জিনগত পরিবর্তন।
বিরল কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তন সরাসরি আলঝেইমারের কারণ হতে পারে। সাধারণত এগুলো অপেক্ষাকৃত কম বয়সে শুরু হওয়া পারিবারিক আলঝেইমারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
অন্যদিকে, বেশি দেখা যায় দেরিতে শুরু হওয়া আলঝেইমার। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে পরিচিত জেনেটিক ঝুঁকি-উপাদান হলো APOE জিনের APOE ε4 ভ্যারিয়েন্ট। এটি আলঝেইমারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে এই ভ্যারিয়েন্ট থাকা মানেই একজন ব্যক্তির নিশ্চিতভাবে আলঝেইমার হবে—এমন নয়।
অর্থাৎ, কোনো জিনকে একা আলঝেইমারের ‘ভবিষ্যৎ নির্ধারক’ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং এটি সামগ্রিক ঝুঁকির একটি অংশ।
বাবা-মায়ের থাকলে সন্তানের ঝুঁকি কি বাড়ে?
হ্যাঁ, বাড়তে পারে। বিশেষ করে বাবা-মা বা ভাই-বোনের মতো প্রথম-স্তরের আত্মীয়ের আলঝেইমার থাকলে ব্যক্তির ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি হতে পারে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পারিবারিক ইতিহাস মানেই শুধু জেনেটিক উত্তরাধিকার নয়। একই পরিবারের সদস্যদের খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা, ধূমপান, ঘুমের অভ্যাস, হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য বা অন্যান্য জীবনযাপনগত বিষয়ও অনেক সময় একই রকম হয়। ফলে পরিবারের মধ্যে রোগের প্রবণতা দেখলেই তার পুরোটা জিনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
পুরুষদের ক্ষেত্রে কি আলাদা কোনো ঝুঁকি আছে?
আলঝেইমার শুধু পুরুষের বা শুধু নারীর বংশগত রোগ নয়। নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই জেনেটিক ও অন্যান্য ঝুঁকি থাকতে পারে।
তাই পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্য—যেমন বাবা, ভাই বা দাদা—আলঝেইমারে আক্রান্ত হলে সেটিকে পারিবারিক ইতিহাসের অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। একইভাবে পরিবারের নারী সদস্যদের আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাসও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কারও পরিবারে রোগটি ছিল বলে তিনি ভবিষ্যতে অবশ্যই আক্রান্ত হবেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ নেই।
কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ জরুরি?
পরিবারে একাধিক সদস্যের আলঝেইমার থাকলে, অথবা পরিবারের কারও অস্বাভাবিক কম বয়সে রোগটির উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি একটু বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা যেতে পারে।
এ ধরনের ক্ষেত্রে নিউরোলজিস্ট, জেরিয়াট্রিশিয়ান বা জেনেটিক কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলা উপকারী হতে পারে। চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনার সময় পরিবারের সদস্যরা কত বছর বয়সে আক্রান্ত হয়েছিলেন, কতজন আক্রান্ত হয়েছেন এবং তাঁদের অন্য কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি ছিল কি না—এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
শুধু উদ্বেগ থেকে নিজের জেনেটিক পরীক্ষা করিয়ে ফেলার পরিবর্তে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই ভালো। কারণ কোনো জেনেটিক ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হলেও তার অর্থ সঠিকভাবে বোঝার জন্য চিকিৎসা ও জেনেটিক কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
জিনের বাইরে আরও অনেক কিছু
আলঝেইমারের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ। ডব্লিউএইচও শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা, তামাকজাত পণ্য এড়িয়ে চলা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়।
পাশাপাশি সামাজিক ও মানসিকভাবে সক্রিয় থাকা, শ্রবণশক্তির সমস্যা থাকলে তার সমাধান করা এবং বায়ুদূষণের সংস্পর্শ কমানোর মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পরিবর্তনযোগ্য বিভিন্ন কারণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই পরিবারে আলঝেইমারের ইতিহাস থাকলে আতঙ্কিত হওয়ার বদলে নিজের সামগ্রিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে কি আলঝেইমার এড়ানো সম্ভব?
শুধু জীবনযাপন পরিবর্তন করলেই আলঝেইমার হবে না—এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার কোনো জেনেটিক ঝুঁকি থাকলেই রোগটি নিশ্চিত—এ কথাও সত্য নয়।
বিষয়টি বরং এমন—জিন আপনার ঝুঁকির একটি অংশ নির্ধারণ করতে পারে, কিন্তু পুরো গল্পটি জিন একা লেখে না।
তাই পরিবারে আলঝেইমার থাকলে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে পারিবারিক ইতিহাস জানা, প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া এবং হৃদযন্ত্র ও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ আলঝেইমার নিয়ে সচেতনতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি হয়তো এখানেই—বংশগত ঝুঁকি জানা মানে ভবিষ্যৎ জেনে যাওয়া নয়; বরং নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি আরও সচেতন হওয়ার একটি সুযোগ।
সূত্র: এনডিটিভি