বলা হয়, ‘হোম ইজ হোয়ার ইউর হার্ট ইজ”। সারদিনের কর্মব্যস্ততার পর ঘরই হলো প্রশান্তির জায়গা। আর এই প্রশান্তির জায়গাকে কিছুটা শিল্পবোধ ও কৌশলের মিশেলে করে তুলতে পারি আরো নান্দনিক।
ঘরের চেহারা বদলাতে সব সময় নতুন আসবাব, দামি
লাইট কিংবা রংয়ের পেছনে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করতে হয় না। কখনো কখনো শুধু একটি দেয়ালই
হয়ে উঠতে পারে পুরো ঘরের নতুন পরিচয়। সাদা-সাদামাটা দেয়ালের জায়গায় ফুলেল নকশা, প্রকৃতির
দৃশ্য, জ্যামিতিক প্যাটার্ন কিংবা টেক্সচার—ওয়ালপেপার বদলে দিতে পারে ঘরের আবহ, অনেকটা
নতুন সাজে ঘরকে নতুন করে আবিষ্কার করার মতো।
বছরের পর বছর দেয়ালে রঙ করা কম ঝক্কির ব্যাপার
নয়। চাইলেই হুট করে রঙ পরিবর্তন করা সম্ভব হয়ে উঠেনা। এটা অনেক সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুলও
বটে। আঠালো এই ভিনাইল স্টিকারগুলো একটি সাধারন
দেয়ালে বৈচিত্র্য যোগের মাধম্যে নিজের ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তোলা যায়
আর এই কারণেই ওয়ালপেপার এখন আর ‘পুরোনো দিনের
সাজসজ্জা’ নয়। বরং ২০২৬-এর
ইন্টেরিয়র ট্রেন্ডে এটি আবার বেশ শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক ডিজাইন ম্যাগাজিনগুলোতে
এ বছর ওয়ালপেপারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিত্ব, রং, প্যাটার্ন, কারুকাজ ও টেক্সচারের ব্যবহার
বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
অ্যাপ্লিকেশন এবং উপাদান ভিত্তিতে এর কিছু
ধরন রয়েছে-
-অ্যাপ্লিকেশনের ক্ষেত্রে, কিছু ওয়ালপেপার
আছে যেগুলো দেয়ালে লাগানোর সময় পেছনে পেস্ট এড করতে হয়। অনেক ঝামেলার মনে হলেও কার্যতে
এটি অনেক দীর্ঘমেয়াদি রেজাল্ট দেয়। আরেকধরনের আছে পিল এন্ড স্টিক। স্টিকারের মতই শুধু
খুলে নিয়েই সরাসরি লাগিয়ে দেয়া যায়।
-ম্যাটারিয়েল বা উপাদানের ক্ষেত্রে আছে কিছু
ধরন। যেমন ভিনাইল; যা সচরাচর বেশি দেখতে পাওয়া যায়। কাগজের ওয়ালপেপার আছে যেগুলোতে
রঙগুলো সুন্দরভাবে ফুটে থাকে। তবে এর বড় অসুবিধা হল এটি অনেক সূক্ষ থাকে বিধায় ছিঁড়ে
যাবার সম্ভাবনা থাকে। হাই-কোয়ালিটি সম্পন্ন ফ্যাব্রিক ওয়ালপেপারগুলো লাগানোর ক্ষেত্রে
অধিক সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। এটি যেহেতু প্রি-পেস্ট নয় তাই এপ্লাই করার সময় ভেতরে
যাতে বুদবুদের সৃষ্টি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়।
শুধু একটি দেয়াল কেন?
২০২০-এর দশকের মাঝামাঝি এবং বিশেষ করে ২০২৬
সালের ইন্টেরিয়র ডিজাইনে ঘরের যেকোনো একটি দেয়ালকে ওয়ালপেপার দিয়ে সাজানোর প্রবণতা
ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সব দেয়ালে ওয়ালপেপার না লাগিয়ে কেবল একটি দেয়ালকে ঘরের ভিজ্যুয়াল
ফোকাল পয়েন্ট বানিয়ে এটি ব্যবহার করার পেছনে মূলত নান্দনিক ভারসাম্য, মনস্তাত্ত্বিক
স্বস্তি এবং বাস্তবসম্মত কিছু কারণ রয়েছে।
যেকোনো একটি দেয়ালে (যেমন- বসার ঘরের সোফার
পেছনের দেয়াল বা বেডরুমের খাটের পেছনের দেয়াল) এটি ব্যবহার করলে তা ঘরের প্রধান আকর্ষণ
কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে এবং বাকি দেয়ালগুলো ঘরের পরিবেশকে শান্ত রাখে।
সব দেয়ালে যদি ভারী বা বড় ডিজাইন ব্যবহার
করা হয়, তবে চোখ কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় স্থির হতে পারে না এবং পুরো ঘরটি হিজিবিজি বা
শ্বাসরুদ্ধকর মনে হতে পারে।
দেয়াল যখন হয়ে ওঠে প্রকৃতির ক্যানভাস-
ফুলেল নকশা থেকে প্রকৃতির গল্প বলা ওয়ালপেপার
আপনার ঘরকে এক টুকরো জীবন্ত প্রকৃতিতে রূপান্তর করতে পারে। এই ধরনের ওয়ালপেপারগুলো
কেবল দেয়াল সাজায় না, বরং প্রতিটি নকশার ভাঁজে ভাঁজে প্রকৃতির একটি সুন্দর শান্ত আবহ
বা গল্প ফুটিয়ে তোলে।
বড় বড় পাতা, লতাগুল্ম এবং তার সাথে বুনো
ফুল ও বিভিন্ন পাখির জলছাপ দেয়া বোটানিক্যাল স্টোরি বা ভিনটেজ জঙ্গল এর নকশাগুলো দেখলে
মনে হবে পুরো একটা বনের গল্প দেয়ালে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বসার ঘর কিংবা স্টাডি রুমের
মূল দেয়ালে এই ধরনের ডিজাইন ভালো মানাবে।
আর একটু এক্সসেপশনাল কিছু করতে চাইলে বেছে
নেওয়া যায় ম্যুরাল ধাঁচের, যেখানে ওয়ালপেপার দেখতে অনেকটা দেয়ালে আঁকা বিশাল ছবির মতো।
আন্তর্জাতিক ডিজাইন ট্রেন্ডে এই ধরনের ম্যুরাল এখন বিশেষভাবে আলোচিত।
জ্যামিতিক নকশা—আধুনিক ঘরের জন্য: যারা ফুলেল বা প্রকৃতিনির্ভর নকশা পছন্দ
করেন না, তাদের জন্য জিওমেট্রিক প্যাটার্ন হতে পারে ভালো বিকল্প। এগুলো আধুনিক আসবাবের
সঙ্গে সহজেই মানিয়ে যায়।
মডার্ন ও মিনিমালিস্ট নকশা পছন্দ করলে হালকা
বা এক রঙের ব্যাকগ্রাউন্ডের উপর সোনালী, কালো বা সাদা রঙে সূক্ষ্ম রেখার কাজ মানানসই
হবে। কিংবা কালো এবং সাদা রঙের ছোট-বড় ত্রিভুজ, বৃত্ত বা চতুর্ভুজের কম্বিনেশন, যা
ছিমছাম পছন্দকারীদের প্রথম পছন্দ।
আবার, দেয়ালে ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) লুক এনে দিতে থ্রিডি ওয়ালপেপার বেছে নেয়া যেতে পারে। আর ষাটের দশকের ক্লাসিক ভাইব আনতে চাইলে রেট্রো এবং আর্ট ডেকো হতে পারে সঠিক চয়েস।
তবে ছোট ঘরে খুব বড় ও ঘন জিওমেট্রিক প্যাটার্ন ব্যবহার না করাই
ভালো। বরং ছোট বা মাঝারি প্যাটার্ন এবং তুলনামূলক হালকা রং ঘরকে বেশি পরিপাটি দেখাতে
পারে।
শুধু নকশা নয়, টেক্সচারও গুরুত্বপূর্ণ: ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো টেক্সচারের
প্রতি গুরুত্ব। মানুষ এখন দেখার চেয়ে অনুভব করতে চায় বেশি। টেক্সচারড ওয়ালপেপার দেয়ালে
এমন একটি গভীরতা তৈরি করতে পারে, যা সাধারণ রঙে পাওয়া কঠিন।
প্রাকৃতিক টেক্সচার যেমন লিনেন, সিসাল, গ্রাসক্লথ,
কর্ক—এই উপকরণ দেয়ালে
গভীরতা ও উষ্ণতা যোগ করে।
ট্রম্প ল'ইল যেমন প্লাস্টার, পাথর বা কাঠের
মতো দেখতে ওয়ালপেপার—নির্মাণ কাজ ছাড়াই ঘরকে এক গ্র্যান্ড লুক দেয়।
আরেকটি হচ্ছে এমবসড ওয়ালপেপার; প্যাটার্ন
খোদাই করা সার্ফেস, যা ঘরকে আরও আনুষ্ঠানিক ও ডাইমেনশনাল করে তোলে।
কোথায় কেমন ওয়ালপেপার বেছে নিবেন?
শোবার ঘরে বিছানার মাথার পেছনের দেয়ালটি
ওয়ালপেপারের জন্য সবচেয়ে স্বাভাবিক জায়গাগুলোর একটি। এখানে খুব উজ্জ্বল নকশার বদলে
শান্তি ও স্বস্তি আনে এমন হালকা রঙের এবং ছিমছাম নকশার ওয়ালপেপার নির্বাচন করা উচিত।
উজ্জ্বল বা গাঢ় রঙ এড়িয়ে নীল, সবুজ, হালকা
ধূসর, বেজ কিংবা চাপা সাদা রঙের ওয়ালপেপার শোবার ঘরের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। ছোট ও সুন্দর ফ্লোরাল বা ফুলেল নকশার ওয়ালপেপার
কিংবা হালকা টেক্সচার বা অ্যাবস্ট্রাক্ট এমবসড ওয়ালপেপার ঘরে একটা স্নিগ্ধ ও আভিজাত্যের
ভাব নিয়ে আসে।
ড্রয়িংরুমে একটু সাহসী পদক্ষেপ নেয়া যায়।
সোফার পেছনের দেয়াল কিংবা টিভি ইউনিটের আশপাশ অ্যাকসেন্ট ওয়াল হিসেবে হাইলাইট করাই
এখনকার মূল ট্রেন্ড।তবে টিভির পেছনে খুব ভারী বা হিজিবিজি নকশা
ব্যবহার করলে পর্দায় চোখে চাপ পড়তে পারে। তাই সেখানে সূক্ষ্ম টেক্সচার, স্ট্রাইপযুক্ত
মার্বেল প্যাটার্নের ওয়ালপেপার কিংবা হালকা জ্যামিতিক প্যাটার্ন বেশি কার্যকর।
ছোট ঘরে ওয়ালপেপার কি মানাবে?
অবশ্যই। বরং সঠিক ওয়ালপেপার বাছাই করে নিতে পারলে
বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে। তবে ছোট ঘর মানেই যে শুধু সাদা ওয়ালপেপার এমন কোনো বাধ্যতামূলক
নিয়ম নেই। যে স্থানটিতে সাজাতে চান তার সঠিক ডাইমেনশান অনুযায়ী ওয়ালপেপারটি বাছাই করা
দরকার। এছাড়াও আলো, সিলিংয়ের উচ্চতা, আসবাব এবং জানালার অবস্থান বিবেচনা করতে হবে।
ছোট ঘরে বড় বড় বড় নকশার বদলে ছোট ও হালকা
প্রিন্টের ওয়ালপেপার ব্যবহার করা ভালো। এছাড়াও,
রুমের থিম বা স্টাইল অনুযায়ী নির্বাচন করা যায়। বাচ্চাদের ঘরে যদি জঙ্গল থিমের আদলে
সাজাতে চান তাহলে এনিম্যাল বা গাছ দেয়া স্টিকার বাছে নেয়া যেতে পারে। আবার যদি তাদের
প্রিয় কোন কার্টুনের চরিত্র থাকে তবে সে আদলেও সাজানো যায়।
হালকা রঙের কোনো থ্রিডি বা ল্যান্ডস্কেপ
ওয়ালপেপার ঘরের দেওয়ালে এক ধরণের ভ্রম বা গভীরতা তৈরি করে, যা ঘরকে বড় দেখায়।
ভাড়ার বাসায়ও কি সম্ভব?
অবশ্যই সম্ভব। এখানেই আসবে সেলফ-অ্যাটাচিভ
বা পিল-অ্যান্ড-স্টিক ওয়ালপেপার এর প্রসঙ্গ। স্থায়ী পরিবর্তন করতে না চাইলে এ ধরনের
ওয়ালপেপার তুলনামূলক সুবিধাজনক হতে পারে। তবে এপ্ল্যাই করার আগে দেওয়ালের পেইন্ট-এর
ধরন ও ওয়ালপেপার -এর আঠালো অংশটি আগে যাচাই করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আর্দ্রতাঃ বাংলাদেশের দীর্ঘ গরম ও আর্দ্র মৌসুম এর
ওপর প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত আর্দ্রতায় ভুলভাবে লাগানো ওয়ালপেপারে বাবল তৈরি করা, উঠে
যাওয়া বা ছত্রাকের সমস্যা হতে পারে। তাই ওয়ালপেপার কেনার আগে দেখতে হবে—
দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে ভাব আছে কি না, দেয়াল
মসৃণ কি না, জায়গাটি কতটা আর্দ্র, ওয়ালপেপারটি কতটা পানি প্রতিরোধী, আঠালো অংশটি উপযুক্ত
কি না। অর্থাৎ, শুধু সুন্দর ডিজাইন দেখেই সিদ্ধান্ত নয়, সব কিছু বিবেচনা করেই কেনা
উচিত।
২০২৬ সালের ওয়ালপেপার ট্রেন্ড মানে ভাইরাল
প্যাটার্নের পিছনে ছোটা নয়—বরং আপনার ঘরের গল্প বলার সুযোগ। উষ্ণ রং,
টেক্সচার, স্তরায়িত প্যাটার্ন আর সচেতন ডিজাইনের মাধ্যমে একটি সাধারণ ঘরও হয়ে উঠতে
পারে ব্যক্তিগত ও টাইমলেস। তাই পরের বার বাসা সাজানোর সময় ভাবুন—আপনার দেয়াল কী
বলতে চায়?
ঢাকা/টিএ