আত্মহত্যা প্রতিরোধ: নারীর জন্য চাই সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আত্মহত্যা প্রতিরোধ: নারীর জন্য চাই সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা

সায়মা রহমান তুলি, নীতি বিশ্লেষক ও গবেষক


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য, আত্মহত্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা এবং প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে ৭ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যায় মারা যায়। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আত্মহত্যা শুধু ব্যক্তিগত বেদনার বিষয় নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রেরও দায়িত্বের বিষয়।


বাংলাদেশে নারীর মানসিক সুস্থতা ও আত্মহত্যার ঝুঁকি নিয়ে আমার গবেষণায় আমি ঢাকা ও যশোর জেলার বাস্তবতা তুলনা করেছি। গবেষণার মূল প্রশ্ন ছিল কোন সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ নারীর মানসিক সুস্থতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং সেই সংকট কীভাবে আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে? একই সঙ্গে আমি দেখতে চেয়েছি, বিদ্যমান নীতি ও সেবা নারীদের কাছে কতটা সহজলভ্য এবং কার্যকর।


গবেষণার প্রাথমিক উপাত্তে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী ও আত্মহত্যার প্রচেষ্টার অভিজ্ঞতা থাকা নারীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি দপ্তর, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, এনজিও, থানা, জেলা প্রশাসন, সংবাদমাধ্যম ও গবেষণার বিভিন্ন গৌণ উৎস পর্যালোচনা করা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আত্মহত্যার পেছনে একক কোনো কারণ কাজ করে না। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, একাকিত্ব, সম্পর্কের সংকট, পারিবারিক সহিংসতা, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা, দারিদ্র্য, সামাজিক চাপ, কলঙ্ক এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমিত প্রবেশাধিকার পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।


ঢাকার নারীদের ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাজীবনের চাপ, সম্পর্কের অস্থিরতা, সামাজিক তুলনা, অনলাইন হয়রানি এবং একাকিত্ব বেশি দৃশ্যমান। এখানে সেবা তুলনামূলকভাবে পাওয়া গেলেও ব্যয়, সামাজিক কলঙ্ক, গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ এবং সাহায্য নেওয়ার মানসিক বাধা অনেককে পেশাদার সহায়তা থেকে দূরে রাখে। অন্যদিকে যশোরের নারীদের ক্ষেত্রে দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা, পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুক, বাল্যবিবাহ, চলাচলের সীমাবদ্ধতা এবং স্থানীয় সেবার ঘাটতি ঝুঁকিকে আরও জটিল করে তোলে। দুই অঞ্চলের অভিজ্ঞতার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় অভিন্ন—একাকিত্ব ও সামাজিক কলঙ্ক সংকটকে গভীর করে এবং সময়মতো সহায়তা পাওয়ার সুযোগ কমিয়ে দেয়।


বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে অনেকেই সেবা নিতে চান না। অনেকে জানেই না কোথায় সেবা নেওয়া যাবে।


বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নীতি ও পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি ২০২২ এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২০-২০৩০-এ আত্মহত্যা প্রতিরোধের বিষয় অন্তর্ভুক্ত আছে।


কিন্তু গবেষণায় নীতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে একটি বড় ব্যবধান দেখা গেছে। পর্যাপ্ত বাজেট, প্রশিক্ষিত জনবল, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সংকটসেবা, নির্ভরযোগ্য উপাত্ত, সমন্বিত পরিবীক্ষণ এবং গ্রামীণ নারীদের কাছে সেবার তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়েছে।


এই বাস্তবতার আলোকে আমার গবেষণার প্রেক্ষিতে প্রস্তাবনা: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা এবং উপজেলা/থানা পর্যায়ে এর সেবা সম্প্রসারণ। এর সঙ্গে ২৪/৭ লিঙ্গ-সংবেদনশীল হেল্পলাইন, ওয়াক-ইন সংকটকেন্দ্র, নারী কাউন্সেলর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসচেতনতা, সাশ্রয়ী সেবা এবং গণমাধ্যমে কলঙ্ক কমানোর উদ্যোগ যুক্ত করা প্রয়োজন।


আত্মহত্যা প্রতিরোধে আমাদের প্রথম পরিবর্তনটি হতে পারে ভাষায় ও আচরণে। সংকটে থাকা একজন মানুষকে দুর্বল, ব্যর্থ বা দোষী হিসেবে না দেখে তাকে সহায়তা পাওয়ার অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। পরিবারকে শুনতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করতে হবে, গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল হতে হবে এবং রাষ্ট্রকে সহজলভ্য ও নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।


বিশেষ করে নারীর ক্ষেত্রে আত্মহত্যা প্রতিরোধকে শুধুমাত্র মানসিক স্বাস্থ্য নয়, নারী নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায় ও ক্ষমতায়নের প্রশ্ন হিসেবেও দেখতে হবে। মানসিক সুস্থতা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের মর্যাদা, উৎপাদনশীলতা এবং একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি।


আজকের দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক নীরবতা নয়, কথা বলব; দোষারোপ নয়, শুনব; বিচ্ছিন্নতা নয়, পাশে দাঁড়াব। কারণ প্রতিটি জীবন মূল্যবান, আর প্রতিরোধ সম্ভব।

sidebar ad