ইট-কাঠ-পাথর দিয়ে ঘেরা ঘরকে মনের মত করে সাজাতে আমাদের কত প্রানান্তকর চেষ্টা। একটু ভিন্ন আঙ্গিকে, ভিন্ন লুক দিতে অনেক কিছুরই এক্সপেরিমেন্ট চলে। কখনো মিনিমাল, কখনো আধুনিক, আবার কখনো পুরোনো দিনের আসবাব ও নতুন জিনিসের মেলবন্ধন চলে। তবে সিম্পল কিন্তু সফিস্টিকেটেড, আর একই সঙ্গে উষ্ণ ও ব্যক্তিত্বপূর্ণ একটি আবহ তৈরি করতে বোহেমিয়ান স্টাইল বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
তবে আজকের বোহেমিয়ান আর আগের সেই চেনা বোহো নয়। ম্যাক্রেম, পাম্পাস গ্রাস
আর একগুচ্ছ গাছ দিয়ে ঘর ভরিয়ে তোলাই এখন আর বোহেমিয়ান সাজের একমাত্র পরিচয় নয়। বরং
ন্যাচারাল টেক্সচার, হাতে তৈরি জিনিস, ভিন্টেজ জিনিসপাতি, উষ্ণ রং এবং নিজের পছন্দের
জিনিসের স্বতঃস্ফূর্ত মেলবন্ধনই হয়ে উঠছে আধুনিক বোহো ডেকোর- এর মূল আকর্ষণ।
বোহেমিয়ান শব্দটির শুরু কোথায়?
ইন্টেরিয়র ডিজাইনে বোহেমিয়ান স্টাইলের শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় ১৯ শতকে ফ্রান্সে।
সে সময় প্যারিসে শিল্পী, লেখক, অভিনয়শিল্পী ও অন্যান্য সৃজনশীল মানুষের একটি জীবনধারা
জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যারা প্রচলিত সামাজিক রীতি ও বস্তুগত সাফল্যের চেয়ে স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা
ও নিজস্ব জীবনযাপনকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তাদের জীবনযাত্রার সাথে আমরা যে অর্থে বোহেমিয়ান
শব্দটি ব্যবহার করি তার কোন মিল না থাকলেও, ঘরের সাজসজ্জায় প্রচলিত নিয়ম না মেনে পুরোপুরি
মুক্ত, খেয়ালখুশি ধারনা গ্রহন করার কারনেই এর নাম এমন দেয়া হয়েছে।
আরোও পড়ুন: একজন শিক্ষার্থীর ঘর কেমন হওয়া উচিত
এখানে নির্দিষ্ট কোন প্যাটার্ন, টেক্সচার বা রঙ মেনে চলার বাধ্যবাধকতা
নেই। নেই আধুনিক বা মিনিমালিস্ট সজ্জার মতো কঠিন কোনো নিয়ম। এর নান্দনিকতার মূলেই রয়েছে ব্যক্তিগত পছন্দ, স্বাচ্ছন্দ্য,
স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতা।
তাহলে অন্দর সজ্জায় কীভাবে আনা যায় এই বোহো ভাইব?
বেতের চেয়ার-
একটি চমৎকার বেতের ডিম্বাকৃতির চেয়ার ঘরে এক কোজি লুক এনে দেয়। বই পড়া
কিংবা অলস বিকেল কাটানোর জন্য এমন একটি চেয়ার যেমন আরামদায়ক, তেমনি ঘরের সৌন্দর্যও
বাড়ায়। চেয়ারের চারপাশে স্ট্রিং লাইট লাগিয়ে দিলে আরো কুল ও স্ট্যারি-নাইট ইফেক্ট যোগ
করবে।
ন্যাচারাল টেক্সচার- এর ছোঁয়া-
আধুনিক বোহো ডেকোর- এ বেত, বাঁশ, কাঠ, জুট এর মতো প্রাকৃতিক উপাদানের ব্যবহার
বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো ঘরে এনে দেয় উষ্ণতা ও স্বাভাবিক সৌন্দর্য। তাই চকচকে কৃত্রিম
উপকরণের বদলে একটি বেতের ঝুড়ি, কাঠের টুল কিংবা হাতে বোনা রাগ ও হতে পারে ঘরের আকর্ষণীয়
ডেকোর।
ঝুলন্ত বেতের ঝুড়ি-
চামড়ার হাতল সহ সুন্দর ঝুলন্ত ঝুড়ি যা মাল্টিটাস্কিং সজ্জা হিসেবে চমৎকার।
এগুলো কাগজপত্র রাখতে, অর্গানাইজার হিসেবে অথবা ছোট গাছের প্ল্যান্টার হিসেবে ব্যবহার
করা যেতে পারে।
ম্যাক্রেমে দেয়ালে নতুন গল্প-
বোহেমিয়ান সজ্জায় ম্যাক্রমের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। সোফা, বিছানা
বা ঘরের খালি জায়গায় একটি সুন্দর ম্যাক্রমের ওয়াল হ্যাংগিং নতুন লুক সংযোজন করতে পারে।
তবে আধুনিক বোহো লুকের ক্ষেত্রে দেয়ালজুড়ে অনেকগুলো ম্যাক্রেম না দিয়ে একটি স্ট্যাটমেন্ট
পিস ব্যবহার করলেই অনেক সময় বেশি সফিস্টিকেটেড দেখায়।
ঘরে থাকুক সবুজের আধিক্য-
বোহেমিয়ান সজ্জায় ঘরের ভেতর গাছের আধিক্য বেশ দেখতে পাওয়া যায়। বড় গাছের
পাশাপাশি ছোট ছোট গাছও রাখা যায়। ডেকোরের জন্য সুন্দর সুন্দর বেতের প্ল্যান্টার ব্যবহার
করা হয়। বিভিন্ন উচ্চতা ও আকারের প্ল্যান্টার একসঙ্গে রাখলে ঘরে তৈরি হবে সুন্দর লেয়ার্ড
লুক।
বড় গাছ রাখার জায়গা না থাকলে ছোট ছোট কাচের জারে গাছের কাটিং রেখে বানিয়ে ফেলতে পারেন একটি হ্যাংগিং প্রোপাগ্যাশন সাইড। দেয়ালের খালি অংশটিও এতে হয়ে উঠবে সবুজ ও এস্থেটিক।
পাম্পাস গ্রাসের নরম সৌন্দর্য-
ঘরকে একটি আধুনিক অথচ বোহেমিয়ান লুক এনে দেয় ফক্স পাম্পাস গ্রাস। এই চমৎকার
ডালপালাগুলো ঘরের যে কোন স্থানকে উন্নত করার একটি সহজ উপায়। তবে অতিরিক্ত না করে একটি
লম্বা, সাদামাটা ফুলদানিতে কয়েকটি রাখলেই যথেষ্ট।
এটি আপন সৌন্দর্যে শোভিত হবে।
ঝাড়বাতিতে বেতের মায়া-
চকচকে ক্রিস্টালের ঝাড়বাতির পরিবর্তে হাতে বোনা বেতের হাংগিং ল্যাম্প যা
নিখুঁত বোহেমিয়ান ঝাড়বাতির ইফেক্ট তৈরি করবে। এর নরম আলো ঘরে তৈরি করবে উষ্ণ ও আরামদায়ক
পরিবেশ। এটি ডাইনিং টেবিল বা শোবার ঘরে এড করা যেতে পারে।
ঝুলন্ত শেলফে সাজুক ছোটখাটো জিনিস-
বাথরুম, বেডরুম বা রান্নাঘরের সাজসজ্জার জন্য একটি ম্যাক্রেম ঝুলন্ত শেলফ
এড করা যেতে পারে। ছোট গাছ, পারফিউম, ক্যান্ডেল কিংবা অন্যান্য ডেকোর জিনিসপত্র রাখা যায় এতে। এই সুন্দর শেলফটি প্রমান করে যে ঘরের
প্রতিটি ইঞ্চিতে একটি বোহো থিম থাকতে পারে যদি আপনি চান।
রঙে থাকুক স্বাধীনতা-
বোহেমিয়ান সাজের সৌন্দর্যই হলো এখানে রঙের ক্ষেত্রে খুব বেশি বাঁধাধরা
নিয়ম নেই। তবে আধুনিক বোহো লুক- এ টেরাকোটা, কালচে খয়েরী , মাস্টার্ড, অলিভ, বেইজ,
ব্রাউন- এর মতো প্রাকৃতিক রঙ- এর সঙ্গে হাল্কা গোলাপি, গাঢ় নীল কিংবা অন্য কোনো হাইলাইট
কালার মিশিয়ে নেওয়া যায়।
কাউচ, বিছানা কিংবা চেয়ার- এ কালারফুল মখমলের কুশন কভার ব্যবহার করলে ঘরে
যোগ হবে ভিন্ন এক গভীরতা। তবে সবকিছু একই রকম
না রেখে ভিন্ন প্যাটার্ন ও রং- এর কয়েকটি কুশন একসঙ্গে রাখলে দৃষ্টিনন্দন রুপ দিবে।
ঘরের ভেতরেই ছোট্ট হ্যামক কর্নার-
ম্যাক্রমের ব্যবহার বোহো সজ্জায় যে কেমন ব্যবহার হয় তা তো আমরা জানি। একটি মজবুত ম্যাক্রেম হ্যামক সুইং
চেয়ার যা ঘরের ভেতর কিংবা বারান্দায় ঝুলিয়ে তৈরি করা যায় ছোট্ট রিলাক্স এর কর্নার।
পাশে একটি ফ্লোর ল্যাম্প, কয়েকটি গাছ আর পছন্দের বই—ব্যস! এর চাইতে ভালো অপশন আর কিছু
হতে পারে বলে মনে হয়না।
বোহো হোক একটু দেশি-
আমাদের নিজেদের ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প ও প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়েই তৈরি করা
যায় দারুণ একটি বাংলা বোহো লুক। বেতের ঝুড়ি, শীতলপাটি, মাটির পাত্র, নকশিকাঁথা কিংবা
হাতে বোনা তাঁতের কাপড়—সামান্য সৃজনশীলতায় এসবকেই ঘরের আধুনিক সাজের অংশ করে নেওয়া যায়।
আরোও পড়ুন: মনের প্রশান্তি দেবে ভার্টিক্যাল গার্ডেন
সোফার ওপর নকশিকাঁথার কভার, মেঝেতে শীতলপাটি, টেবিলের এক কোণে মাটির ফুলদানি
কিংবা দেয়ালে কোনো ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প-এমন ছোট ছোট সংযোজনেই ঘরে আসতে পারে উষ্ণ
এবং একেবারে নিজস্ব একটি আবহ। এমনকি পুরোনো শাড়ি দিয়েও বানানো যেতে পারে কুশন কভার,
টেবিল রানার কিংবা ওয়াল হ্যাংগিং।
গ্লোবাল ট্রেন্ড- কে হুবহু অনুসরণ না করে, তাকে নিজের মতো করে নেওয়াই হতে
পারে বাংলা বোহো'র সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
Boho-মানেই কিন্তু অগোছালো নয়-
বোহেমিয়ান সাজের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য তার স্বাধীনতায়, নিয়ম না মানার রীতিতে।
কিন্তু তাই বলে তা কিন্তু অগোছালো নয়। বরং আধুনিক বোহো ডেকোর- এ প্রতিটি জিনিসের মধ্যে
একটা ভিজ্যুয়াল ব্যালান্স থাকা জরুরি।
প্রিয় কোনো পুরোনো চেয়ার, ভ্রমণ থেকে আনা একটি স্যুভেনির, মায়ের পুরোনো
শাড়ির কাপড় দিয়ে বানানো কুশন, হাতে তৈরি মাটির পাত্র কিংবা স্থানীয় কারুশিল্পের কোনো
অংশ—এমন ব্যক্তিগত জিনিসই
বোহো ঘরকে সত্যিকারের নিজের করে তোলে। কারণ বোহেমিয়ান ডেকোর- এর মূল কথাই হলো, ঘর শুধু
সুন্দর দেখাবে না, ঘরটা যেন নিজের গল্পও বলে।
ঢাকা/টিএ