সম্পর্ক ভেঙে গেলেও কী দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬

সম্পর্ক ভেঙে গেলেও কী দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?

কো-প্যারেন্টিং মানে শুধু আলাদা হয়ে যাওয়া দুইজন মানুষের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া নয়,বরং সন্তানের মানসিক সুস্থতা, নিরাপত্তা আর ভালোবাসাকে অক্ষুণ্ণ রাখার এক পরিণত প্রতিশ্রুতি।সম্পর্কের দূরত্ব যতই বাড়ুক,সন্তানের চোখে বাবা-মা দুজনই ভরসার আশ্রয়।এই জায়গাটা অটুট রাখাই আসল প্যারেন্টিং।


আলাদা থেকেও যদি সম্মান,যোগাযোগ আর দায়িত্ববোধ ঠিক থাকে, তবে ভাঙা সম্পর্ক থেকেও গড়ে উঠতে পারে একটি সুস্থ, স্থিতিশীল শৈশব।


সিংগেল  প্যারেন্টিং এর সমস্যা গুলো কি?


সিঙ্গেল প্যারেন্টিং খুবই সাহসের কাজ।কিন্তু এটা সহজ নয়।একজন বাবা বা মা একা সব দায়িত্ব সামলাতে গেলে অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। সাধারণ কিছু সমস্যাগুলো হলো:


আর্থিক চাপ: একজনের আয়ে পুরো পরিবারের খরচ চালানো অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসা।সব কিছুতেই চাপ বাড়ে।


সময়ের অভাব: সন্তানের জন্য মানসম্মত সময় দেওয়া, স্কুল দেখা, আবেগগতভাবে পাশে থাকা।সব একা মানুষটার জন্য সবসময় সম্ভব হয় না।


মানসিক চাপ ও ক্লান্তি: সব দায়িত্ব একা নিতে গিয়ে অনেক সিঙ্গেল প্যারেন্টই মানসিকভাবে ক্লান্ত,চাপগ্রস্ত বা একাকিত্বে ভোগেন।


সন্তানের আবেগগত শূন্যতা: বাবা বা মায়ের একজন না থাকায় অনেক সময় সন্তান নিরাপত্তাহীনতা,রাগ বা দুঃখ অনুভব করতে পারে।


শৃঙ্খলা ও সিদ্ধান্তে দ্বন্দ্বের অভাব: দুইজন প্যারেন্ট থাকলে সিদ্ধান্ত ভাগ হয়, কিন্তু একজন থাকলে সব সিদ্ধান্ত একা নিতে গিয়ে চাপ বাড়ে।এবং কখনো কখনো ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।


সামাজিক চাপ ও বিচার: সমাজের কিছু মানুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বা মন্তব্য সিঙ্গেল প্যারেন্ট ও সন্তানের জন্য কষ্টদায়ক হতে পারে।


তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো,সিঙ্গেল প্যারেন্টিং মানেই ব্যর্থতা নয়। ভালো পরিকল্পনা, ভালো সাপোর্ট সিস্টেম আর সন্তানের সাথে খোলামেলা সম্পর্ক থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই খুব সুন্দরভাবে সন্তান বড় করা সম্ভব।



কো প্যারেন্টিং কিভাবে করবো: কো-প্যারেন্টিং ভালোভাবে করা মানে হলো সম্পর্ক ভেঙে গেলেও সন্তানের জন্য একটা টিম হিসেবে কাজ করা।এখানে ইগো নয়, সন্তানের মঙ্গলটাই সবচেয়ে বড় ফোকাস।


কো-প্যারেন্টিং কিভাবে করবেন।কিছু সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উপায়:


সন্তানের জন্য আলাদা সম্পর্ক, আলাদা ইগো: আপনার ব্যক্তিগত সমস্যা আলাদা রাখুন। সন্তানের সামনে ঝগড়া, অভিযোগ বা দোষারোপ একদম না।


পরিষ্কার যোগাযোগ রাখুন: কে কখন কী দায়িত্ব নেবে স্কুল,খরচ, চিকিৎসা এসব বিষয়ে পরিষ্কার আলোচনা করুন। চাইলে লিখিত রুটিনও করতে পারেন।


নিয়মিত আপডেট শেয়ার করুন।সন্তানের পড়াশোনা, স্বাস্থ্য, আচরণ।এসব বিষয়ে একে অপরকে জানানো জরুরি। এতে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়।


সন্তানকে মাঝখানে টানবেন না: বাবা খারাপ বা মা কিছু করে না। এ ধরনের কথা সন্তানের মানসিক ক্ষতি করে। সন্তানকে কখনোই মেসেঞ্জার বানাবেন না।


একই রকম নিয়ম বজায় রাখার চেষ্টা করুন: দুই ঘরে খুব আলাদা নিয়ম থাকলে সন্তান বিভ্রান্ত হয়। যতটা সম্ভব ডিসিপ্লিন ও রুটিন মিলিয়ে রাখুন।


সম্মান বজায় রাখুন: সম্পর্ক শেষ হলেও সম্মান শেষ হওয়া উচিত না। কথা বলার ভাষা শান্ত ও পেশাদার রাখুন।


সন্তানের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন।সে কেমন অনুভব করছে।দুঃখ, রাগ, বিভ্রান্তি এসব শুনুন এবং স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করুন।


কো-প্যারেন্টিং নিখুঁত হওয়া জরুরি নয়, কিন্তু সচেতন হওয়া জরুরি। সন্তানের জন্য যদি দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ শান্তভাবে দায়িত্ব ভাগ করতে পারে, তাহলে ভাঙা সম্পর্ক থেকেও একটা সুন্দর শৈশব গড়ে উঠতে পারে।


আলাদা থেকেও ভালো প্যারেন্টিং করতে চাইলে কিছু বাস্তব ও কার্যকর সমাধান মেনে চলা খুব জরুরি। এতে সমস্যা অনেকটাই কমে যায় এবং সন্তানও মানসিকভাবে নিরাপদ থাকে।


সন্তানের জন্য কমন লক্ষ্য ঠিক করুন।আপনার সম্পর্ক আলাদা, কিন্তু লক্ষ্য এক সন্তানের ভালো ভবিষ্যৎ। এই জায়গাটাকে সবসময় প্রাধান্য দিন।


পরিষ্কার রুটিন তৈরি করুন।কে কখন সন্তান দেখাশোনা করবে, খরচ কে দেবে, স্কুল/ডাক্তার এসব নির্দিষ্ট করে নিন। অস্পষ্টতা থাকলে সমস্যা বাড়ে।


শান্ত ও সম্মানজনক যোগাযোগ বজায় রাখুন: ইমোশনাল বা রাগের ভাষা বাদ দিয়ে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক, প্রাপ্তবয়স্কভাবে কথা বলুন।


সন্তানকে কখনো মাঝখানে আনবেন না।সন্তানকে বার্তাবাহক বানানো বা একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা।এটা সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে।


একই ধরনের নিয়ম রাখার চেষ্টা করুন।খাওয়া, পড়াশোনা, ঘুম, ডিসিপ্লিন দুই ঘরে যতটা সম্ভব মিলিয়ে চললে সন্তান কনফিউজ হয় না।


ব্যক্তিগত ইগো আলাদা রাখুন।পুরনো রাগ বা অভিযোগ প্যারেন্টিংয়ে ঢুকতে দেবেন না। এটা সন্তানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।


সন্তানের অনুভূতি শুনুন: সে কেমন অনুভব করছে, কী ভয় পাচ্ছে।এসব মনোযোগ দিয়ে শুনুন এবং তাকে নিরাপত্তা দিন।



আলাদা থাকা সমস্যা তৈরি করতে পারে, কিন্তু সচেতনতা আর সহযোগিতা থাকলে সেই সমস্যাই নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।সন্তানের জন্য যদি দুইজন মানুষ দায়িত্বশীলভাবে একসাথে কাজ করেন, তাহলে ভাঙা সম্পর্ক থেকেও একটি সুন্দর, নিরাপদ শৈশব তৈরি করা সম্ভব।



লেখা- ইশরাত জাহান ইনা 

sidebar ad