`ফিনিক্স' পৌরাণিক সেই পাখি, যে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও শেষ হয়ে যায় না। ছাইচাপা থেকেই আবার জন্ম নেয়, নতুন ডানা মেলে উড়ে যায়। তাই ফিনিক্স শুধু একটি পৌরাণিক পাখির নাম নয়; এটি হয়ে উঠেছে ধ্বংসের পর পুনর্জন্ম, অন্ধকারের পর আলো আর প্রতিকূলতার ভেতর থেকে নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর প্রতীক।
কখনো কখনো মানুষের জীবনেও এমন সময় আসে, যখন চারপাশের পৃথিবীটা ক্রমেই ছোট হয়ে আসে, আর জীবনের আগুনে পুড়ে স্বপ্নগুলো যেন ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে যায়। কিন্তু কেউ কেউ সেই চাপা ছাইয়ের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে ক্ষীণ স্ফুলিঙ্গটুকু ঠিক খুঁজে পায়। সোনাবাই রাজওয়ার ছিলেন তেমনই একজন।
সোনাবাই রাজওয়ারের গল্পটি শুধু একজন শিল্পীর জীবনী নয়; এটি একটি ঘর, একাকিত্ব, মাটি আর সৃষ্টিশীলতার সম্মিলনে রচিত এক অনন্য গল্প।
ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যের সরগুজা জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম পুহপুত্রা। গ্রামের ঘরবাড়িতে তেমন কোনো শৈল্পিক দেয়ালচিত্র বা নান্দনিক স্থাপত্যের দেখা মিলত না। সেই সাধারণ ঘরগুলোই ধীরে ধীরে নিজের সৃষ্টিশীলতার ক্যানভাসে পরিণত হয়েছিলো সোনাবাইয়ের। মাটি, খড় ও বাঁশের মতো সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক বিশেষ ধরনের রিলিফ বা ত্রিমাত্রিক ভাস্কর্যশৈলী। সম্পূর্ণ হাতে তৈরি এসব শিল্পকর্মে ফুটে উঠত তাঁর নিজস্ব কল্পনা, পর্যবেক্ষণ ও জীবন থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা।
মজার বিষয় হলো, এই শিল্পরীতি কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহ্য, প্রথা, ধর্মীয় বিশ্বাস কিংবা প্রার্থনা-অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। চারপাশের জীবন, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও নিজের অর্জিত জ্ঞানকে তিনি নিজের মতো করে রূপ দিয়েছিলেন মাটি ও বাঁশের শিল্পে। ফলে তাঁর সৃষ্টিতে কোথাও লোকজ জীবনের ছাপ, কোথাও ধর্মীয় আচার-অনুষঙ্গের আভাস, আবার কোথাও নিছক কল্পনার এক নিজস্ব জগত; সবকিছুই যেন মিলেমিশে এসে ধরা দিয়েছে।
কে এই সোনাবাই? আর কেনোই বা করেছিলেন এই সৃষ্টির প্রয়াস?
১৯৪০-এর দশকের শুরুর দিকে বিয়ের পর যখন সোনাবাইকে তাঁর স্বামীর বাড়িতে পাঠানো হয়, তখন তিনি ছিলেন এক সাধারণ ও সরলমনা তরুণী। তাঁর চেয়ে দশ বছরের বড় স্বামী হোলিরাম রাজাওয়ার ছিলেন কিছুটা ঈর্ষাপরায়ণ স্বভাবের। অন্যদের থেকে তাকে আলাদা থাকার বিষয়ে এবং এক ধরনের বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করার জন্য জোর করেন। যে জীবনের সাথে সোনাবাই ছিলেন সম্পূর্ণ অপরিচিত। তিনি বেড়ে উঠেছিলেন ১৬ সদস্যের এক যৌথ পরিবারে; যেখানে ভাই-বোন ও চাচাতো-মামাতো ভাইবোন মিলে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ বিরাজ করতো। তাঁদের সমাজে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো কঠোর বিভাজন ছিল না। সংস্কৃতি অনুযায়ী প্রত্যেকের নির্দিষ্ট কিছু ভূমিকা থাকলেও, তাঁদের একে অপরের সাথে ছিলো সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক।
পঁচিশ বছর বয়সে তিনি কার্যত এক বন্দি জীবনে দিন কাটাচ্ছিলেন; জানালাবিহীন এক বাড়িতে তাঁকে আটকে রাখা হয়েছিল, যেখানে বাইরের কারও সাথে কথা বলা বা কারও সামনে আসা ছিল নিষিদ্ধ—এক কথায়, তিনি ছিলেন পুরো দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন।
বিয়ের পর দশ বছর কেটে গেছে, যার বেশিরভাগ সময়টাই সন্তানহীনতার কারণে তাঁকে সমাজচ্যুত হয়ে থাকতে হয়েছিল। এরপর যখন অবশেষে তিনি এক পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেন, তখন তাঁর স্বামী তাঁকে ঘরের ভেতর আটকে রাখলেন। ঘরের কাজকর্ম আর নিজের বাচ্চাকে দেখাশোনা করা ছাড়া—মানুষের সাথে মেলামেশা বা বাড়ির বাইরে যাওয়ার ছিল না কোনো অনুমতি। যার দরুণ এক গভীর একাকীত্ব তাঁকে গ্রাস করে রেখেছিলো।
ভারতের অধিকাংশ নারীই তাঁদের বসবাসের পরিবেশকে নান্দনিকভাবে সাজিয়ে তুলতে ভালোবাসেন। ঘাসের ঝাড়ুর হাতল বোনা, বালিশের ওয়াড়ে নকশা তোলা কিংবা দেয়ালে ছবি আঁকা—এসবের মাধ্যমেই তাঁরা নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ করেন। পুরুষশাসিত ও প্রথাগত গ্রামীণ সমাজে এটিই তাঁদের যোগাযোগ ও সৃজনশীলতা প্রকাশের একটি মাধ্যম হয়ে ওঠতো।
তাই হতাশায় ভেঙে না পড়ে, সোনাবাই নিজের অসাধারণ মননশক্তি, মানসিক দৃঢ়তা ও সৃজনশীল হাতের কাজকে কাজে লাগিয়েই খুঁজে নিলেন প্রশান্তি ও আত্মতৃপ্তি। সেই শ্বাসরুদ্ধকর অন্ধকার ও নীরব যন্ত্রণার মাঝেও স্বাধীনতার প্রতি তাঁর তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নিয়েছিল লোকশিল্পের কিছু অসাধারণ সব সৃষ্টি।
একমাত্র সন্তানের জন্য খেলনা তৈরির মধ্য দিয়ে তাঁর মাটির রিলিফ বা ভাস্কর্য-ধর্মী কাজের যাত্রা শুরু হয়। না ছিলো শিল্পকলা নিয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, তার পরিবর্তে সেখানে ছিলো ছোট ছেলেকে আনন্দ দেওয়ার এক মায়ের মরিয়া প্রচেষ্টা। বাড়ির কুয়োর পাড় থেকে মাটি খুঁড়ে ছোট ছোট খেলনা ও মূর্তি গড়তে শুরু করেন। খেলনা তৈরির এই প্রক্রিয়াটি তিনি যেমন ভালোবাসতেন, তেমনি তাঁর ছেলেও সেই খেলনাগুলো পেয়ে দারুণ আনন্দ পেত। খেলার ছলে শুরু হওয়া সেই কাজ দ্রুতই এক নতুন রূপ নিল। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর অন্ধকার ও শূন্য ঘরটি নানা রকম ভাস্কর্যে ভরে উঠতে লাগল। ঘোড়া, গরু, ছাগল, পাখি, এমনকি মানুষের মূর্তিও ছিল তার মধ্যে।
গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৪৬ থেকে ৫২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকত। কোনো জানালা না থাকায় ঘরটি হয়ে উঠত অনেকটা চুল্লির মতো। এই অসহনীয় গরম পরিবেশকে শীতল রাখার কোনো একটা উপায় খুঁজে বের করার জন্য সোনাবাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন। আর এর মাধ্যমেই সৃষ্টি হয় তাঁর শিল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি, বাঁশ ও মাটি দিয়ে তৈরি সূক্ষ্ম জালি বা জিনঝারি।
এই জালি তৈরির জন্য তিনি বাড়ি তৈরির সময় বেঁচে যাওয়া বাঁশ ব্যবহার করেছিলেন। বাঁশের কঞ্চিগুলোকে চেঁছে পাতলা করে নিলেন। এরপর সেগুলোকে বাঁকিয়ে বিভিন্ন আকার দিলেন এবং তা জালের মতো কাঠামোয় বেঁধে ঘরের ভেতরের আঙিনার স্তম্ভগুলোর মাঝে জুড়ে দিলেন। এরপর পুরো কাঠামোটির ওপর মাটির প্রলেপ দিয়ে প্রতিটি অংশকে মসৃণ করে তুললেন; এভাবেই তৈরি হলো এক ধরণের জালি-নকশা, যা ঘরের ভেতরের অংশে ছায়া ফেলত এবং বাইরের বাতাসকে ভেতরে টেনে আনত।
সবশেষে, তিনি সেই জালি-কাঠামোর গায়ে মাটির তৈরি নানা আকৃতি যুক্ত করলেন। কুণ্ডলী বেয়ে ওঠা সাপ, কোনো কোনো ফাঁকা জায়গায় বসে থাকা টিয়া পাখি, কোথাও বাঁশিবাদক আবার কোথাও বা নৃত্যরত কোনো মূর্তি। এভাবেই সোনাবাই শিল্পের এক সম্পূর্ণ নতুন শৈলী উদ্ভাবন করলেন।
গাছের ছোট ডালের আগা চিবিয়ে আঁশ ছাড়িয়ে তিনি তুলি তৈরি করতেন। তাঁর রঙের জগতও ছিল প্রকৃতিনির্ভর। রান্নাঘরের নানা ভেষজ উপাদান, মশলা ও শাকসবজি ব্যবহার করে তিনি তাঁর রঙের জোগান দিতেন; এসবের সাথে মিশিয়ে নিতেন সামান্য রান্নার তেল। জালিগুলিকে সাদা এবং ভাস্কর্যগুলিকে নানা রঙে রাঙিয়ে তুলতেন।
তাঁর সৃজনশীল যাত্রার ফলে শেষ পর্যন্ত তাঁর কাজ এক অনন্য শিল্পকলায় পরিণত হয়। ১৯৮৩ সালে প্রথমবারের মতো বাইরের মানুষ সোনাবাইয়ের সেই শিল্পময় জগতের সন্ধান পায়। ভোপালের ‘ভারত ভবন’-এর কয়েকজন প্রতিনিধি তাঁর বাড়িতে আসেন এবং তাঁর তৈরি অসাধারণ সব শিল্পকর্ম দেখতে পান। কোনো রকম প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই তিনি যে এত চমৎকার সব শিল্পকর্ম সৃষ্টি করতে পারতেন, তা দেখে শিল্পানুরাগী ব্যক্তিরা সত্যিই বিস্মিত হয়েছিলেন। সেই বছরই তাঁর শিল্পকর্মের অসাধারণ দক্ষতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তিনি ‘তুলসী সম্মান’ পুরস্কার লাভ করেন, যা তাঁকে ভারতের একজন বিখ্যাত লোকশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
এরপর ধীরে ধীরে তাঁর কাজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিতি পেতে শুরু করে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়াজুড়ে বিভিন্ন মেলা, উৎসব ও প্রদর্শনীতে নিজের প্রতিভা তুলে ধরার জন্য তিনি আমন্ত্রিত হন। এছাড়াও, কুইন্সল্যান্ড আর্ট গ্যালারি অ্যান্ড গ্যালারি অব মডার্ন আর্টের সংগ্রহেও তাঁর কাজ রয়েছে।
স্টিফেন পি. হাইলরের লেখা এবং লেসলি আম্বারগারের ভূমিকা-সম্বলিত ‘সোনাবাই: অ্যানাদার ওয়ে অফ সিয়িং’ গ্রন্থটি ১২৮টি পৃষ্ঠা ও ১৭৮টি রঙিন ছবির মাধ্যমে তাঁর জীবনকাহিনিকে জীবন্ত করে তুলেছে। বইটিতে তাঁর জীবন, তাঁর সম্প্রদায় এবং সেই একাকীত্ব থেকে জন্ম নেওয়া অসাধারণ শিল্পকর্ম নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণালব্ধ তথ্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে।
২০০৭ সালে সোনাবাই পরলোকগমন করেন। কিন্তু তাঁর গল্প সেখানেই শেষ হয়নি। তাঁর শিল্পচর্চা রাজওয়ার সম্প্রদায়ের মৃৎশিল্পকে নতুন পরিচিতি দিয়েছে এবং পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদেরও প্রভাবিত করেছে। ছত্তিশগড় সরকার ২০১৫ সালে তাঁর স্মৃতিতে তাঁর গ্রাম পুহপুতরায় একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করে।
পনেরো বছর ধরে একাকী জীবন কাটাতে বাধ্য হলেও, সেই বন্দিদশা তাঁর কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দিতে পারেনি। বরং রঙ, আলো আর খেয়ালি কল্পনার মিশেলে তিনি তার জবাব দিয়েছেন। কোনো পূর্ব-নির্দেশনা বা শিক্ষা ছাড়াই তিনি সৃষ্টি করেছেন এক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র শৈল্পিক ভাষা।