একজন নারী সফল হলেই কী অন্য নারী ব্যর্থ?

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

আপনার মনেও কী এই প্রশ্নগুলো আসে- ‘ও এত ভালো ব্যবসা করছে, আমি পারছি না কেন?’ ‘ওর স্বামী এত সহযোগিতা করে, আমার করে না কেন?’ ‘ও সংসারও সামলায়, আবার নিজের ক্যারিয়ারও—আমি কেন পারছি না?’


এই প্রশ্নগুলো যদি আপনাকে বিরক্ত করতে থাকে তাহলে পুরো লেখাটি পড়ুন। আর জেনে নিন, অন্য একজন নারীর জীবনের সাফল্যের গল্প কখন যে নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনার গল্প হয়ে যায়, তা অনেক সময় টেরও পাওয়া যায় না। কারও পদোন্নতি, কারও ব্যবসার সাফল্য, কারও সুন্দর পোশাক, কারও সুখী সংসার কিংবা নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার ক্ষমতা—সবকিছুই কখনো কখনো অন্য নারীর কাছে অনুপ্রেরণার বদলে নিজের অপূর্ণতার আয়না হয়ে দাঁড়ায়। সেখান থেকেই শুরু হয় অদৃশ্য এক প্রতিযোগিতা। কিন্তু সত্যিই কি একজন নারী এগিয়ে গেলে অন্য একজনকে পিছিয়ে পড়তে হয়?


তুলনার শুরুটা হয় খুব ছোটবেলায়

মেয়েদের বড় হওয়ার গল্পে তুলনা খুব পরিচিত একটি শব্দ। ‘ওর মেয়ে তো খুব ভালো পড়াশোনা করে।’ ‘ওর মেয়েটা দেখতে কত সুন্দর!’ ‘ও তো রান্না শিখে ফেলেছে, তুমি এখনো পারো না?’ ‘ওর বিয়ে হয়ে গেল, তোমার কবে হবে?’ ‘ওর বাচ্চা এত ভালো, তোমারটা এমন কেন?’


শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবন—তুলনার বিষয় বদলায়, কিন্তু তুলনা করার অভ্যাসটি থেকে যায়। কে বেশি সুন্দর? কে বেশি পড়াশোনা করেছে? কে আগে চাকরি পেয়েছে? কে বেশি আয় করে? কার সংসার বেশি গোছানো?


একসময় মনে হতে থাকে, একজন নারীর নিজের মূল্য যেন অন্য একজন নারীর অবস্থানের ওপর নির্ভর করছে। অথচ দুই নারীর জীবন কখনো একই জায়গা থেকে শুরু হয় না।


একজন হয়তো এমন পরিবারে বড় হয়েছেন, যেখানে মেয়ের পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। আরেকজনকে হয়তো খুব অল্প বয়স থেকেই সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়েছে। একজনের পাশে পরিবার আছে, অন্যজনকে হয়তো প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হয়েছে। একজনের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা আছে, অন্যজনকে হয়তো নিজের প্রয়োজন মেটাতেও বহুবার ভাবতে হয়েছে।


তাহলে একই জায়গায় পৌঁছাতে না পারাকে ব্যর্থতা বলা যায় কীভাবে?


ধরা যাক, একই এলাকায় পাঁচজন নারী ঘরে তৈরি খাবারের ব্যবসা করছেন। তাঁদের একজন হঠাৎ খুব ভালো করতে শুরু করলেন। তাঁকে দেখে একজন বলতে পারেন, ‘ও কীভাবে করছে? আমিও শিখি।’ আবার কেউ বলতে পারেন, ‘ও নিশ্চয়ই কারও সাহায্য পাচ্ছে।’ দুটো প্রতিক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য খুব সামান্য মনে হলেও এর প্রভাব অনেক বড়। প্রথম প্রতিক্রিয়ায় আছে সম্ভাবনা। দ্বিতীয়টিতে আছে তুলনা। অথচ পাঁচজন নারী চাইলে একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সহযোগী হতে পারেন। একজন রান্না ভালো করেন, আরেকজন প্যাকেজিং জানেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করতে পারেন, কেউ হিসাব রাখতে পারেন, কেউ সরবরাহের দায়িত্ব নিতে পারেন। তখন পাঁচটি ছোট উদ্যোগ মিলে তৈরি হতে পারে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। একজনের অভিজ্ঞতা অন্যজনের ভুল কমাবে। একজনের পরিচিতি অন্যজনের জন্য নতুন দরজা খুলবে। একজনের ক্রেতা অন্যজনের সম্ভাব্য ক্রেতা হয়ে উঠবেন। একজনের সাফল্য তখন আর শুধু একজনের সাফল্য থাকবে না।


কর্মক্ষেত্রেও কী একই গল্প?


একজন নারী সহকর্মী পদোন্নতি পেলেন। ‘ও কেন পেল?’—এই প্রশ্নটি খুব স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্নটি একটু বদলে দিলে দৃশ্যটিও বদলে যায়। ‘ও কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছে?’ ‘ওর কোন দক্ষতাগুলো আমাকে শিখতে হবে।’ ‘পরের সুযোগের জন্য আমি কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করব?’


একজন নারী নেতৃত্বের জায়গায় পৌঁছানো মানেই অন্য নারীদের জন্য জায়গা কমে যাওয়া নয়। বরং তিনি চাইলে তাঁর অবস্থানকে আরও অনেক নারীর জন্য সুযোগ তৈরির জায়গা বানাতে পারেন। একজন নারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান হলে তিনি আরও নারীকে নেতৃত্বের সুযোগ দিতে পারেন। একজন নারী শিক্ষক হলে তাঁর কাছ থেকে অনেক মেয়ে আত্মবিশ্বাস পেতে পারে। একজন সফল উদ্যোক্তা চাইলে অন্য নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেন। অর্থাৎ সাফল্য শুধু নিজের জন্য রাখার বিষয় নয়; চাইলে সেটিকে অন্যের জন্য পথও বানানো যায়।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলনার নতুন অধ্যায়


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই তুলনার প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে। কারণ সেখানে আমরা মানুষের পুরো জীবন দেখি না। দেখি তার জীবনের বেছে নেওয়া কিছু সুন্দর মুহূর্ত। দেখি অফিসে পদোন্নতির ছবি। দেখি নতুন গাড়ি। দেখি সুন্দর ভ্রমণ। দেখি সাজানো সংসার।


দেখি সন্তানের সাফল্য। দেখি ব্যবসার নতুন অর্জন। কিন্তু দেখি না সেই রাতগুলো, যখন সে ঘুমাতে পারেনি। দেখি না তার ব্যর্থতা, ঋণ, পারিবারিক টানাপোড়েন, আত্মবিশ্বাস হারানোর সময় কিংবা একা কাঁদার মুহূর্তগুলো। তাই অন্যের জীবনের ‘হাইলাইট’ দেখে নিজের জীবনের পুরো গল্পের সঙ্গে তুলনা করা কখনোই ন্যায্য নয়।


প্রতিযোগিতা থাকুক, কিন্তু একে অপরের বিরুদ্ধে নয়


নারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতি, ব্যবসায় বাজার, নেতৃত্বের জায়গা—সবখানেই যোগ্যতার প্রতিযোগিতা থাকতে পারে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যেন অন্য নারীকে ছোট করার প্রতিযোগিতা না হয়। ‘আমি ওর চেয়ে ভালো’—এর বদলে যদি বলা যায়, ‘আমি গতকালের চেয়ে আজ আরও ভালো হতে চাই’, তাহলে প্রতিযোগিতার অর্থটাই বদলে যায়। অন্য নারীর সাফল্য তখন হুমকি নয়, একটি সম্ভাবনার গল্প হয়ে ওঠে।


একজনের পথ অন্যজনের পথও হতে পারে


একজন নারী প্রথমবার কোনো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে পৌঁছালেন। তাঁর পরে হয়তো আরও কয়েকজন নারী সেই পদে যাওয়ার সাহস পেলেন। একজন নারী ব্যবসা শুরু করলেন। তাঁর দেখে পাশের বাড়ির আরেক নারীও নিজের পণ্য বিক্রি শুরু করলেন। একজন নারী পরিবারকে বুঝিয়ে আবার পড়াশোনা শুরু করলেন। তাঁর গল্প শুনে আরেকজন বহু বছর পর বই খুললেন। এভাবেই একজনের ব্যক্তিগত সাফল্য কখনো কখনো অনেকের সম্মিলিত সম্ভাবনার শুরু হয়ে যায়। তাই প্রশ্নটা হয়তো এমন হওয়া উচিত নয়—‘ও পারল, আমি কেন পারলাম না?’ প্রশ্নটা হতে পারে—‘ও পেরেছে। আমি কী শিখতে পারি?’


আর যদি কোনো নারী আমাদের চেয়ে একটু আগে পৌঁছে যান, তাহলে তাঁর দিকে তাকিয়ে হিংসা করার বদলে হয়তো বলা যায়—‘তুমি পথটা পার হয়েছ। এবার আমার জন্যও একটু পথ দেখাও।’ কারণ নারীর এগিয়ে যাওয়া কোনো সীমিত আসনের প্রতিযোগিতা নয়।


একজন নারী সফল হলেই অন্য নারী ব্যর্থ হন না। বরং একজন নারী যখন নিজের জন্য একটি দরজা খুলে দেন, সেই দরজা দিয়ে আরও অনেক নারী বেরিয়ে আসতে পারেন।


সাফল্যের সবচেয়ে সুন্দর অর্থ হয়তো সেখানেই—আমি একা এগিয়ে গেলাম না; আমার এগিয়ে যাওয়ার পথে অন্য কারও পথটাও একটু সহজ হলো।

sidebar ad