ঈদ শেষ, রান্নাঘরের যুদ্ধও কি শেষ?

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬

ঈদ শেষ, রান্নাঘরের যুদ্ধও কি শেষ?

ত্যাগের মহিমা ও উৎসবের বারতা নিয়ে কুরবানি ঈদ এসে চলেও গেলো। ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই খুশি। নতুন পোশাক, স্বজনদের আনাগোনা আর মন মাতানো খাবারের সুবাসে ভরে ছিলো পুরোটা দিনময়। শুধু বাস্তবেই নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এর ঝলক দেখতে পাওয়া যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঈদের ছবি দেখে মনে হয়, সবাই যেন আনন্দের এক নিখুঁত ফ্রেমে বন্দি। কিন্তু এতো এতো যে আয়োজন, তার সফলতার পেছনে এক নীরব যোদ্ধা রয়েছে। তিনি হতে পারেন ঘরের মা, স্ত্রী কিংবা পরিবারের সেই নারী; যার ঈদের সকাল শুরু হয় সবার আগে আর শেষ করেন সবার পরে। ঈদ তো শেষ, মেহমানও বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু রান্নাঘরের যুদ্ধটা কি আসলেই শেষ হয়েছে?  


রান্না অনেকের কাছেই ভালোবাসা প্রকাশের একটি মাধ্যম। এটি যে কেবল উদরের ক্ষুধা মেটায় তা কিন্তু নয়, মনকেও করে তৃপ্ত। স্পেশাল দিনগুলোতে পরিবার প্রিয়জনদের মুখে হাসি ফোটাতে ও অতিথি আপ্যায়নে রান্নার আয়োজনটিতে থাকে বাড়তি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। এজন্য ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় এর প্রস্তুতি। বাজারের তালিকা করো, মসলা গুছাও, অতিথি আপ্যায়নের জন্য পরিকল্পনা করো; আরও কতো কি!  উৎসবের আমেজের ক্ষেত্রে দুই ঈদের থাকে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র। আর প্রসঙ্গ যদি আসে কুরবানি ঈদের কথা, এই ঈদে আনন্দের সাথে সাথে যুক্ত হয় বিশাল কর্মযজ্ঞ। একদিকে চলে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পশু কুরবানি, অন্যদিকে শুরু হয় রান্নাঘরের আরেক যুদ্ধ। সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত চলে মাংস কাটা, ধোয়া, বিলি বণ্টনের জন্য ভাগ করা, প্যাক করা, ফ্রিজে রাখা এবং তারসাথে  তো চলে অবিরাম রান্নাবান্না। কেউ মাংস ভুনা খাবে তো, কারো লাগবে পাতলা ঝোল। স্টেকের জন্য আলাদা করে মাংস রাখো তো, অন্যদিকে গরুর নল্লি টুকরো করো পছন্দমতো। মোট কথা এসব কাজে বড় অংশই এসে পড়ে নারীদের কাঁধে। সবার জন্য এই দিনটি উৎসবমুখর দিন হলেও, নারীদের জন্য বিশেষ করে মায়েদের জন্য খাটুনি বেড়ে হয়ে যায় দ্বিগুণ। আর এই অদৃশ্য শ্রমের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এতে নেই কোন আলাদা ছুটি, নেই প্রশংসা। অনেক সময় মেলেওনা স্বীকৃতি। 


ঈদের আমেজ শেষ হয়েছে আরো আগেই। মেহামানদারী ও ভারী ভারী হাড়ি পাতিলের ভারও আস্তে আস্তে কমে এসেছে। গৃহিণীদের শরীরে ভর করা রাজ্যের ক্লান্তি দূর আর রান্নাঘরে সেই পুরাতন ছন্দ ফিরিয়ে আনা এখন সত্যিই এক বড় চ্যালেঞ্জ। তাহলে উপায়? সঠিক পরিকল্পনা আর কিছুটা কৌশল অবলম্বন করলে এই পোস্ট ঈদ হট্টগোল সামলানো অনেক সহজ। 


একদিনের জন্য পুরোপুরি জিরো কুকিং ঘোষণা করুন। আজ কি রান্না হবে- এই বাড়তি চাপও মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। সেদিন হবে না রান্নার কোন ভারী আয়োজন। ফ্রিজে থাকা লেফটওভার খাবারের হয়ে যাক স্মার্ট রুপান্তর। মাংস তো কমবেশি থেকেই থাকে। সেই একটানা একই ধরনের খাবার না খেয়ে বেঁচে যাওয়া মাংসের পিসগুলো হাত দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে ঝুরি করে তাতে পেঁয়াজ, মরিচ দিয়ে ভেজে ফেলুন। পরোটা হোক কিংবা লুচি, এগুলোর সাথে এই আইটেম জাস্ট জমে যাবে।  মাংসের তেল-ঝোল জমে গেছে? তা ফেলে না দিয়ে তাতে চাল- ডাল মিশিয়ে করে ফেলুন সুস্বাদু ভুনা খিচুড়ি। শুধু তাই নয়, ভুনা মাংস দিয়ে স্যান্ডউইচ, পরোটা রোল, ফ্রাইড রাইস বানিয়ে ফেলা যায় ঝটপট। সময় ও শ্রম দুটোই বাঁচবে। 


এবার আসা যাক ফ্রিজের প্রসঙ্গে। মাংস কাটাকাটির পর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ শুরু হয় ফ্রিজে তা রাখা নিয়ে। আর ফ্রোজেন হওয়ার পর তো কোনটা গরুর পায়ের অংশ আর কোনটা গরুর সলিড মাংশ, তা সব একাকার হয়ে যায়। তাই একদিনেই সব কিছু প্রসেস করার চেষ্টা না করাই ভালো। গরুর বিভিন্ন অংশ ছোট ছোট এয়ারটাইট বক্স বা জিপলকে ভাগ করে মার্ক করে নিন। ছোট প্যাকেটে করে রাখলে পরবর্তীতে তা প্রসেসিং করার জন্য নেয়া সহজ হবে। এই সময় যেহেতু ফ্রিজের উপর কিছুটা বাড়তি চাপ পড়ে, তাই আগে থেকেই ফ্রিজে থাকা অন্যান্য খাবারগুলোর ব্যবস্থা করতে হবে। যা খাওয়া যাবে না, তা নির্দ্বিধায় ফেলে দিন। সবশেষে ফ্রিজের এক কোণে একটি লেবু কেটে রেখে দিন, ঈদের কাঁচা মাংস বা অতিরিক্ত মসলাদার খাবারের কোনো গন্ধ থাকলে তা নিমিষেই দূর হয়ে যাবে। 


ঈদের দিনগুলোতে সবচেয়ে বড় ঝড় যায় রান্নাঘরে। অনেক অনেক রান্না, তেল-মসলার চিটচিটে অবস্থা চারদিকে সয়লাব হয়ে থাকে। কিছুটা উষ্ণ পানিতে লিকুইড ডিশওয়াশ এবং ভিনেগার বা লেবুর রস মিশিয়ে নিন। এই মিশ্রণটি চুলা ও চারপাশের টাইলসে দিন। একটি স্ক্রাবার দিয়ে হালকা ঘষে নিন। তেল- কালি ম্যাজিকের মতো উঠে আসবে। তেল- চর্বি ভরা প্লেট একসাথে ডিটারজেন্টে পানিতে ডুবিয়ে ১০ মিনিট বিরতি নিন, এরপর ধুয়ে ফেলুন। এতে সহজেই কাজও হয়ে যাবে আবার বাড়তি প্রেশারও কম পড়বে। 


এতো এতো গুরুপাক খাওয়ার পর একটু রেস্ট দিন। মসলাদার খাবারকে টা টা বলে কয়েকদিনের মেন্যু হোক একদম সাদামাটা। লাউ বা পেঁপের মতো সবজি, সালাদ, ডাল কিংবা মাছের পাতলা ঝোল- শরীরকে দিবে স্বস্তি, রান্নাও হবে সহজ। এছাড়াও, শরীরকে ডিটক্সিফাই করতে এবং হজমপ্রক্রিয়া ঠিক রাখতে প্রতিদিন নিয়ম করে টকদই বা লেবুর শরবত খেতে পারেন। 


সবসময় সবকিছু নিখুঁত রাখার চাপ নিজের উপর দিবেন না। ইদের পর ঘর একটু এলোমেলো হবেই। পুর ঘর একদিনে ঝকঝকে করার চেষ্টা না করে প্রতিদিন ১৫-২০ মিনিট করে গুছান। সবকিছু করার ফাঁকে ফাঁকে নিজের জন্য কিছু সময় বরাদ্দ রাখুন। ক্লান্ত শরীর ও মন দুটোরই যত্ন প্রয়োজন। হালকা মিউজিক শোনার সাথে সাথে কাজগুলো করুন। তাতে একঘেয়েমি ভাব কমে যাবে। রান্নাঘর গোছানোর পর এককাপ কফি বা চা নিয়ে বসে পড়ুন। এতে টায়ার্ডনেসও কমবে। আর সবচেয়ে বড় যে কাজ তা হলো, নোট করে রাখুন কোন কাজ সবচেয়ে বেশি ক্লান্ত করেছে, কোথায় সাহায্যের জন্য বাড়তি হাত থাকলে ভালো হতো। সেই হিসেবে আগামী ঈদে তার ব্যবস্থা অগ্রিম করে রাখলে ঈদ হবে আরও সহজ। 


ঈদ পূর্ব ও পরবর্তী যুদ্ধ সব পরিবারেই লেগেই থাকে। যুদ্ধ শেষে যেমন সৈনিক বিশ্রাম পায়, ঠিক তেমন ঈদের পর রান্নাঘরের সেনাপতিরও কিছুটা বিরতি প্রাপ্য। ঈদের আনন্দ যেমন সকলের, রান্নাঘরের এই দায়িত্বগুলো একজনের কাঁধে তুলে না দিয়ে সবাই যদি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিই তখন আর তা যুদ্ধক্ষেত্র মনে হবে না। বরং হাসিমুখে পার হয়ে যাবে আরও একটি সুন্দর দিন। আপনার রান্নাঘরের কি অবস্থা? এর মাঝেই কি ফিরে এসেছে এর স্বাভাবিক ছন্দ নাকি এখনো চলছে যুদ্ধ?


লেখা- শায়লা জাহান

sidebar ad