আপনি কোথায় যান, কী খোঁজেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ করেন—আপনার ফোন এসবের কতটা জানে, কখনো ভেবে দেখেছেন?
স্মার্টফোন এখন শুধু কথা বলা বা ছবি তোলার যন্ত্র নয়। প্রতিদিনের জীবনের এমন অনেক তথ্য এর ভেতরে জমা হয়, যেগুলো মিলিয়ে একজন মানুষের জীবনযাপন, পছন্দ, অভ্যাস এমনকি চলাফেরার একটি ধারণাও তৈরি করা সম্ভব। তবে এর অর্থ এই নয় যে ফোন আপনার সব কথা গোপনে শুনছে বা সব তথ্যই কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাচ্ছে। আসল বিষয় হলো—আপনি ফোনকে কোন কোন অনুমতি দিয়েছেন এবং বিভিন্ন অ্যাপ কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহার করছে।
আপনার অবস্থান কোথায়?
ফোনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলোর একটি হলো আপনার অবস্থান। পথ দেখানো, কাছাকাছি দোকান বা রেস্তোরাঁ খুঁজে দেওয়া কিংবা আবহাওয়ার তথ্য দেখানোর জন্য কোনো কোনো অ্যাপ অবস্থানের তথ্য ব্যবহার করতে পারে। আইফোনে কোনো অ্যাপকে সঠিক অবস্থান, আনুমানিক অবস্থান, শুধু ব্যবহার করার সময় বা অন্যভাবে অনুমতি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অ্যান্ড্রয়েড ফোনেও কোনো অ্যাপকে সব সময়, শুধু ব্যবহারের সময়, প্রতিবার অনুমতি চেয়ে অথবা একেবারেই অবস্থান ব্যবহার না করার সুযোগ দেওয়া যায়।
অবস্থান তথ্য শুধু ‘আপনি এখন কোথায়’—এতটুকু নয়। দীর্ঘ সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে আপনি কোথায় থাকেন, কোথায় কাজ করেন কিংবা কোন জায়গায় নিয়মিত যান—এমন ধারণাও তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশন একাধিক ঘটনায় সুনির্দিষ্ট অবস্থান তথ্য বিজ্ঞাপন ও বিপণনের কাজে ব্যবহারের বিষয়ে ব্যবস্থা নিয়েছে।
আপনার পরিচিত মানুষ কারা?
কিছু অ্যাপ আপনার পরিচিতির তালিকা ব্যবহারের অনুমতি চাইতে পারে। যেমন, কোনো বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপ আপনার পরিচিতদের মধ্যে কারা একই সেবা ব্যবহার করছেন, তা খুঁজে দিতে পরিচিতির তালিকা ব্যবহার করতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই অনুমতিটি অ্যাপটির সত্যিই প্রয়োজন কি না।
আইফোনে পরিচিতি, ছবি, ক্যালেন্ডার, অবস্থানসহ বিভিন্ন তথ্যের জন্য আলাদা অনুমতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অ্যান্ড্রয়েডেও একইভাবে কোন অ্যাপ কোন ধরনের তথ্য ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছে, তা দেখা ও পরিবর্তন করা যায়।
আপনার ছবি শুধু ছবি নয়
আপনার ফোনে থাকা ছবি আপনার ব্যক্তিগত স্মৃতির ভাণ্ডার। কিন্তু ছবির সঙ্গে কখনো কখনো অতিরিক্ত তথ্যও যুক্ত থাকতে পারে—যেমন ছবি কখন এবং কোথায় তোলা হয়েছে।
অ্যাপকে ছবি ব্যবহারের অনুমতি দিলে সে ছবির তথ্যের নির্দিষ্ট অংশে প্রবেশ করতে পারে—অনুমতির ধরন ও ফোনের ব্যবস্থার ওপর বিষয়টি নির্ভর করে। তাই ছবি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার আগে অ্যাপটির কাজের সঙ্গে সেই অনুমতির প্রয়োজনীয়তা মিলিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যাপলও জানিয়েছে, ক্যামেরায় তোলা ছবি ও ভিডিওতে কোথায় এবং কখন তা তোলা হয়েছে—এ ধরনের তথ্য থাকতে পারে।
মাইক্রোফোন কি আপনার কথা শুনছে?
এটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভয় কাজ করে।
আপনি হয়তো কোনো পণ্যের কথা বন্ধুর সঙ্গে বললেন, কিছুক্ষণ পর সেই পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখতে পেলেন। তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে—ফোন নিশ্চয়ই কথা শুনেছে।
কিন্তু এমন ঘটনার অর্থ সরাসরি এই নয় যে ফোনের মাইক্রোফোন গোপনে আপনার কথা রেকর্ড করেছে। আপনার অনলাইন অনুসন্ধান, ওয়েবসাইটে যাতায়াত, অবস্থান, আগে দেখা পণ্য, অ্যাপ ব্যবহারের ধরনসহ নানা তথ্য বিজ্ঞাপনকে ব্যক্তিগতভাবে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারে।
তারপরও মাইক্রোফোনের অনুমতি হালকাভাবে দেওয়া উচিত নয়। আইফোনে কোনো অ্যাপ মাইক্রোফোন ব্যবহার করলে ব্যবহারকারীকে জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে। অ্যান্ড্রয়েডেও ক্যামেরা বা মাইক্রোফোন ব্যবহারের সময় পর্দায় নির্দেশক দেখা যায়।
আপনার পছন্দ-অপছন্দও গুরুত্বপূর্ণ
আপনি কী খোঁজেন, কী ধরনের ভিডিও দেখেন, কোন ধরনের পণ্য দেখেন, কোন বিষয় নিয়ে বারবার পড়েন—এসব আচরণগত তথ্য থেকেও আপনার পছন্দের একটি ধারণা তৈরি হতে পারে।
এর ওপর ভিত্তি করে আপনাকে নির্দিষ্ট ধরনের কনটেন্ট বা বিজ্ঞাপন দেখানো হতে পারে। বিজ্ঞাপন প্রযুক্তিতে অবস্থান, মোবাইল শনাক্তকারী এবং অন্যান্য তথ্য ব্যবহার করে নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের কাছে বিজ্ঞাপন পৌঁছানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
অর্থাৎ, আপনার ফোন হয়তো আপনাকে ‘বোঝে’ না। কিন্তু আপনার ব্যবহারের তৈরি করা তথ্যের ধরণ আপনাকে সম্পর্কে অনেক কিছু প্রকাশ করতে পারে।
তাহলে কি ফোন আমাদের সবকিছু জানে?
না।
ফোন বা কোনো অ্যাপের কাছে আপনার সব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে যায়—এমন ধারণা ঠিক নয়। কোন তথ্য অ্যাপ ব্যবহার করতে পারবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে আপনি কী অনুমতি দিয়েছেন, ফোনের ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে এবং সংশ্লিষ্ট অ্যাপ কীভাবে তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহার করে তার ওপর।
তবে সমস্যাটা অন্য জায়গায়
আমরা অনেক সময় কোনো অ্যাপ ইনস্টল করার সময় একের পর এক ‘অনুমতি দিন’ চাপতে থাকি। পরে সেই অনুমতিগুলো কী ছিল, তা আর মনে থাকে না।
ফলে ফোনে এমন অনেক অ্যাপ থেকে যেতে পারে, যেগুলোকে আমরা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তথ্য ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে রেখেছি।
একবার দেখে নিন—আপনার ফোন কী জানে
আইফোন ব্যবহার করলে:
সেটিংস থেকে গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা অংশে গিয়ে অবস্থান, ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, ছবি, পরিচিতি ইত্যাদির অনুমতি পরীক্ষা করুন। অ্যাপলের অ্যাপ গোপনীয়তা প্রতিবেদন চালু করলে গত সাত দিনে কোন অ্যাপ কোন ধরনের তথ্য ব্যবহার করেছে এবং কোন কোন ইন্টারনেট ঠিকানার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, তারও ধারণা পাওয়া যায়।
অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহার করলে:
গোপনীয়তা নিয়ন্ত্রণ ও অনুমতি ব্যবস্থাপনা অংশে গিয়ে কোন অ্যাপ অবস্থান, ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, পরিচিতি, ছবি, বার্তা বা অন্যান্য তথ্য ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছে তা পরীক্ষা করুন। অ্যান্ড্রয়েডের গোপনীয়তা ড্যাশবোর্ড থেকেও সাম্প্রতিক সময়ে কোন অনুমতি ব্যবহার হয়েছে, তা দেখা যায়।
যে অ্যাপের কাজের সঙ্গে কোনো অনুমতির সম্পর্ক নেই, সেই অনুমতি বন্ধ করে দিন। দীর্ঘদিন ব্যবহার করছেন না এমন অ্যাপের অনুমতিও পর্যালোচনা করুন।
আপনার ফোন আপনার সম্পর্কে অনেক কিছু জানে—কিন্তু সেই জ্ঞানের বড় একটি অংশ তৈরি হয় আপনার নিজের ব্যবহারের মাধ্যমে। আপনি কোথায় যান, কী খোঁজেন, কোন ছবি রাখেন, কোন অ্যাপ ব্যবহার করেন, কোন অনুমতি দেন—সব মিলিয়ে আপনার ডিজিটাল জীবনের একটি ছবি তৈরি হয়। তাই গোপনীয়তা রক্ষার প্রথম ধাপ কোনো প্রযুক্তিবিদ হওয়া নয়। প্রথম ধাপ হলো, নিজের ফোনে কোন অ্যাপকে কী অনুমতি দিয়েছি—সেটা জানা।
ঢাকা/আরএস