গান, স্বপ্ন আর রাইনস্টোন: ডলি পার্টনের জীবনকথা

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

টেনেসির পাহাড়ে তখনও বিদ্যুতের ঝলমলে আলো পৌঁছায়নি। ছোট্ট একটি ঘরে বড় হচ্ছিল এক মেয়ে—চারপাশে দারিদ্র্য, অভাব আর প্রকৃতির বিশাল নীরবতা। কিন্তু সেই ঘরেই ছিল গান। ছিল গল্প। ছিল রেডিও। আর ছিল এমন এক কণ্ঠ, যে কণ্ঠ একদিন অ্যাপালেচিয়ার পাহাড় পেরিয়ে পৌঁছে যাবে পুরো পৃথিবীর মানুষের কাছে। মেয়েটির নাম ডলি পার্টন।


১৯৪৬ সালের ১৯ জানুয়ারি টেনেসির সেভিয়ার কাউন্টির লোকাস্ট রিজে জন্ম নেওয়া ডলি ছিলেন ১২ ভাইবোনের চতুর্থ। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য ছিল সামান্য। কিন্তু অভাব তার কল্পনাশক্তিকে ছোট করতে পারেনি। বরং পাহাড়ি জীবনের সরলতা, পরিবারের গান ও গল্প, আর নিজের চারপাশের মানুষদের জীবন—সবকিছু ধীরে ধীরে তার ভেতরে তৈরি করছিল একজন শিল্পীকে।


শৈশবেই তিনি বুঝতে শুরু করেছিলেন, গান শুধু বিনোদন নয়। গান দিয়ে মানুষের জীবন বলা যায়। নিজের আনন্দ, দুঃখ, অভাব, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ—সবকিছুকে কয়েকটি সহজ শব্দ আর সুরের মধ্যে ধরে রাখা যায়।


রেডিওতে যখন গ্র্যান্ড ওলে অপ্রি বাজত, ডলি ও তার ভাইবোনেরা মন দিয়ে শুনত। সেই গানগুলোই হয়ে উঠছিল তার অদৃশ্য শিক্ষক। পরিবারের মধ্যেও গান গাওয়ার ঐতিহ্য ছিল। ফলে খুব অল্প বয়সেই ডলির হাতে মাইক্রোফোন না থাকলেও তার হাতে উঠে এসেছিল একটি খাতা—গানের কথা লেখার খাতা।


অভাবের মধ্যেই তিনি নিজের কণ্ঠ খুঁজে পেলেন। আর সেই কণ্ঠের সঙ্গে যুক্ত হলো গল্প বলার ক্ষমতা।


পাহাড় ছেড়ে স্বপ্নের পথে


অ্যাপালেচিয়ার পাহাড়ি জনপদ থেকে বড় পৃথিবীর দিকে যাত্রা শুরু করা সহজ ছিল না। ন্যাশভিল তখন কান্ট্রি মিউজিকের রাজধানী। সেখানে পৌঁছানো মানেই সফল হওয়া নয়; বরং সেখানে টিকে থাকার জন্য দরকার ছিল প্রতিভা, পরিশ্রম এবং নিজের ওপর অটল বিশ্বাস।


ডলি সেই বিশ্বাস নিয়েই এগিয়েছিলেন


মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি প্রথমবার গ্র্যান্ড ওলে অপ্রিতে গান গাওয়ার সুযোগ পান। কৈশোর পেরোতে না পেরোতেই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, নিজের গান অন্যের হাতে ছেড়ে দিলে চলবে না। গান লেখা, গাওয়া—দুটির সঙ্গেই তিনি নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে শুরু করেন।


২০ বছর বয়সেই নিজের গানের স্বত্ব ধরে রাখার জন্য একটি পাবলিশিং কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। তখন হয়তো অনেকেই বুঝতে পারেননি, এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের ডলি পার্টনকে কতটা বদলে দেবে। কিন্তু ডলি বুঝেছিলেন—শিল্পী হওয়ার পাশাপাশি নিজের কাজের মালিক হওয়াও জরুরি। তারপর এল সেই সময়, যখন তিনি কান্ট্রি সংগীতের বড় মঞ্চে নিজের জায়গা তৈরি করতে শুরু করলেন।


নিজের কণ্ঠে নিজের গল্প


ডলির বিশেষত্ব ছিল, তিনি অন্যের মতো গান গাইতে চাননি। নিজের জীবনের গল্পকেই তিনি গানের বিষয় বানিয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালে একই দিনে লেখা দুটি গান তার সৃষ্টিশীলতার দুই ভিন্ন দিক দেখায়—‘Jolene’ এবং ‘I Will Always Love You’।


‘Jolene’-এ আছে হারানোর ভয়, ঈর্ষা আর অসহায় আকুতি। অন্যদিকে ‘I Will Always Love You’ জন্ম নিয়েছিল পেশাগত বিচ্ছেদের বেদনা থেকে। কিন্তু দুটি গানেই একটি বিষয় স্পষ্ট—ডলি মানুষের খুব সাধারণ অনুভূতিগুলোকে এমনভাবে লিখতে পারতেন, যেন সেগুলো প্রত্যেক মানুষের নিজের গল্প হয়ে ওঠে।


‘Coat of Many Colors’-এ তিনি ফিরে গেলেন নিজের শৈশবে। দারিদ্র্যের কারণে একটি নতুন কোট কেনার সামর্থ্য ছিল না; সেই অভাবই গানে রূপ পেল। কিন্তু গানটি কেবল দারিদ্র্যের গল্প হয়ে থাকেনি। ভালোবাসা, আত্মমর্যাদা আর মায়ের স্নেহ তাকে অন্য এক অর্থ দিয়েছে। আর ‘9 to 5’-এ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সীমানা ছাড়িয়ে তিনি কথা বললেন কর্মজীবী নারীদের বঞ্চনা ও বৈষম্য নিয়ে।ডলির গান তাই শুধু গান ছিল না। তার গান ছিল মানুষের জীবনের ছোট ছোট গল্পের আয়না।


মঞ্চ থেকে পর্দায়


কান্ট্রি সংগীতে নিজের অবস্থান তৈরি করার পর ডলি থেমে থাকেননি। তিনি জানতেন, তার পরিচয় শুধু একজন গায়িকা বা গীতিকার হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়।


সত্তর ও আশির দশকে তিনি চলচ্চিত্রে পা রাখেন। ‘9 to 5’ এবং ‘Steel Magnolias’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করে প্রমাণ করেন, ক্যামেরার সামনেও তিনি নিজের স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখতে পারেন।


মঞ্চ, রেকর্ডিং স্টুডিও, চলচ্চিত্র—প্রতিটি জায়গাতেই তিনি নিজের আলাদা উপস্থিতি তৈরি করেন।


তার জনপ্রিয়তা তখন আর শুধু যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ নেই। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার মঞ্চে একের পর এক কনসার্ট করতে থাকেন তিনি। ২০০৬ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তার অ্যারেনা ও স্টেডিয়াম সফর দেখিয়ে দেয়, কয়েক দশক পেরিয়েও তার শ্রোতারা তাকে ছেড়ে যায়নি।


তারকাখ্যাতির পাশাপাশি ব্যবসায়ী ডলি


ডলি পার্টনের আরেকটি বড় পরিচয় তৈরি হয় ব্যবসায়। পূর্ব টেনেসিতে তিনি গড়ে তোলেন ডলিউড। ধীরে ধীরে সেটি শুধু একটি থিম পার্ক নয়, গোটা অঞ্চলের অন্যতম বড় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়। এখানেও তার শৈশবের সঙ্গে একটা যোগসূত্র ছিল। যে পাহাড় তাকে বড় করেছে, সেই পাহাড়কেই তিনি নিজের সাফল্যের অংশ করে তুলেছিলেন।


শোবিজ সম্পর্কে ডলির দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল বেশ বাস্তববাদী। তিনি জানতেন, তারকার চেহারা, পোশাক, আলো, মঞ্চ—সবকিছুর মধ্যেই একটা নির্মিত জগত আছে। কিন্তু সেই নির্মিত চেহারার আড়ালে নিজের মানুষটিকে তিনি কখনও হারিয়ে ফেলেননি।


তার নিজের ভাষায়, তাকে দেখতে যতটা কৃত্রিম মনে হতে পারে, লেখক, পেশাজীবী এবং মানুষ হিসেবে তিনি ততটাই সত্যি।


যে ডলি বই পড়তেন


ঝলমলে পোশাক আর বিশাল মঞ্চের ডলিকে দেখলে হয়তো মনে হবে, তার জীবন কেবল গান আর বিনোদনের। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন আগ্রহী পাঠক।


তিনি বছরে প্রায় ৫০টি বই পড়ার কথা বলেছেন। জন স্টাইনবেক ছিলেন তার পছন্দের লেখকদের একজন। ‘The Grapes of Wrath’ তিনি একাধিকবার পড়েছিলেন। মহামন্দার সময় দরিদ্র মানুষের সংগ্রামের সেই গল্পের সঙ্গে নিজের শৈশবের অভাবেরও যেন একটি নীরব সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি।


আলেকজান্ডার দ্যুমার ‘The Count of Monte Cristo’, লি স্মিথের ‘Oral History’—এসব বইয়ের কথাও তিনি বিভিন্ন সময়ে বলেছেন। আর নির্জন দ্বীপে একটি মাত্র বই সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ পেলে তার পছন্দ ছিল বাইবেল। এভাবেই মঞ্চের আলো থেকে দূরে, বইয়ের পাতার মধ্যেও নিজের পৃথিবী তৈরি করেছিলেন ডলি।


বাবার অপূর্ণ স্বপ্ন থেকে ‘বুক লেডি’


ডলির জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়গুলোর একটি হয়তো শুরু হয়েছিল তার নিজের শৈশবের একটি বেদনা থেকে। তার বাবা লি পার্টন পড়তে বা লিখতে জানতেন না। ডলির চোখে তিনি ছিলেন অসাধারণ বুদ্ধিমান একজন মানুষ। কিন্তু পড়তে না জানার সীমাবদ্ধতা তার অনেক স্বপ্নকে অপূর্ণ রেখেছিল। বাবার সেই অপূর্ণতার কথা ডলি ভুলতে পারেননি।


১৯৯৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘Imagination Library’—শিশুদের বিনামূল্যে বই পৌঁছে দেওয়ার একটি উদ্যোগ। শুরুতে এটি ছিল ছোট একটি কর্মসূচি। কিন্তু ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে।


লক্ষ লক্ষ নয়, কোটি কোটি বই শিশুদের হাতে পৌঁছাতে থাকে।


একসময়ের অভাবী পাহাড়ি মেয়েটি এবার শিশুদের হাতে তুলে দিচ্ছেন এমন একটি জিনিস, যা তার নিজের পরিবারে একদিন সহজলভ্য ছিল না—বই।


শিশুরা তাকে ভালোবেসে নাম দিল—‘বুক লেডি’।


এই পরিচয়টি হয়তো ডলির সবচেয়ে প্রিয় পরিচয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছিল।


আলো, সাফল্য এবং আড়ালের লড়াই


ডলির জীবনকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, সাফল্য যেন তার জন্য অবধারিত ছিল। কিন্তু বাস্তব গল্পটি ছিল অনেক কঠিন।


ন্যাশভিলের সংগীতজগতে একসময় তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তাকে মামলা ও হুমকির মুখেও পড়তে হয়েছে। এমন সময়ও এসেছে, যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি ভেঙে পড়ার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন।


নিজের ভেতরের বিষণ্নতার সঙ্গেও লড়াই করেছেন তিনি।  কিন্তু তার স্বভাবের একটি জিনিস তাকে বারবার ফিরিয়ে এনেছে—নিজেকে নতুন করে তৈরি করার ক্ষমতা। তিনি নিজের দুর্বলতাকে লুকিয়ে রাখেননি; বরং হাস্যরস, গান আর কাজের মধ্যে দিয়ে সেগুলোকে অতিক্রম করেছেন।


খ্যাতির চেয়েও বড় হয়ে উঠল মানুষের পাশে থাকা


ডলির মানবিক পরিচয়ও সময়ের সঙ্গে আরও বিস্তৃত হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারে তিনি ১০ লাখ ডলার দান করেন। সেই অর্থ মডার্নার কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন গবেষণায় সহায়তা করেছিল বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়।


নিজে ভ্যাকসিন নেওয়ার সময়ও রসিকতা করতে ভোলেননি। বলেছিলেন, তিনি নিজের ‘ওষুধের’ এক ডোজ নিচ্ছেন। তার এই রসবোধই ছিল ডলির আরেকটি পরিচয়। বিপুল খ্যাতি, সম্পদ আর সম্মানের পরও তিনি নিজেকে নিয়ে মজা করতে পারতেন। যেন বলতে চাইতেন—তারকা হওয়া এক বিষয়, মানুষ থাকা আরেক বিষয়।


ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে নীরব জীবন


১৯৬৬ সালে কার্ল ডিনকে বিয়ে করেছিলেন ডলি পার্টন। শোবিজের পৃথিবীতে তাদের সম্পর্ক ছিল অস্বাভাবিকভাবে ব্যক্তিগত। ডলির বিপুল তারকাখ্যাতির পাশে কার্ল ছিলেন অনেকটাই আড়ালে। প্রায় ছয় দশকের দাম্পত্যজীবন কাটিয়েছেন তারা। ২০২৫ সালের মার্চে কার্লের মৃত্যু ডলির জীবনে গভীর শূন্যতা তৈরি করে।


সেই শোক সামলে তিনি নিজেকে আবার মানিয়ে নেওয়ার কথা বলেছিলেন—আত্মিক, মানসিক ও শারীরিকভাবে। যে নারী সারা জীবন অন্যদের আনন্দ দিয়েছেন, তাকেও এবার নিজের ভেতরের শূন্যতার সঙ্গে বসবাস শিখতে হচ্ছিল।

sidebar ad