৫০ পেরোলে যে কাজগুলো করবেন না


ছবি: এআই/রোদসী
ছবি: এআই/রোদসী

বয়সের প্রতিটি স্তর একজন নারীর জীবনে অনেক-অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসে। সেই পরিবর্তন একদিকে শারীরিক অন্যদিকে মানসিক।


চিকিৎসকেরা বলেন, ৫০ বছর—একজন নারীর জীবনে এটি শুধু বয়সের একটি সংখ্যা নয়, শরীর ও মনের নতুন এক অধ্যায়ের শুরু। এ সময় অনেকের জীবনে মেনোপজ বা মেনোপজ-পরবর্তী সময় আসে। ইস্ট্রোজেনসহ বিভিন্ন হরমোনের পরিবর্তনের কারণে মাসিকের ধরন বদলে যেতে পারে, হট ফ্ল্যাশ বা হঠাৎ গরম লাগা, রাতে ঘাম, ঘুমের সমস্যা, মুডের পরিবর্তন, উদ্বেগ, জয়েন্ট ও পেশিতে ব্যথা, ত্বক শুষ্ক হওয়া কিংবা যৌনইচ্ছার পরিবর্তনের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সবার অভিজ্ঞতা অবশ্য এক নয়—কারও উপসর্গ খুব সামান্য, আবার কারও দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব পড়ে।


সবচেয়ে বড় কথা, এই সময়ে হাড়ের ঘনত্ব কমার প্রবণতা বাড়ে। একই সঙ্গে মেনোপজের আশপাশের সময়ে রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করার মতো হৃদ্স্বাস্থ্যের ঝুঁকির বিষয়গুলোও নতুন করে গুরুত্ব পায়।


ঘুমের ব্যাঘাত, হট ফ্ল্যাশ ও হরমোনের পরিবর্তনের সঙ্গে বিরক্তি, মন খারাপ, উদ্বেগ বা স্মৃতিশক্তিতে সাময়িক পরিবর্তনের অনুভূতি দেখা দিতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মেজাজ, স্মৃতি ও দৈনন্দিন কর্মক্ষমতার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।


তাই ৫০ বছর পেরোনোর অর্থ “নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া” নয়; বরং নিজের শরীরকে নতুনভাবে গুরুত্ব দেওয়ার সময়। কিছু অভ্যাস এই বয়সে বিশেষভাবে এড়িয়ে চলা জরুরি।


১. শরীরচর্চা বন্ধ করবেন না

হাঁটু বা কোমরে সামান্য ব্যথা, দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যাওয়া কিংবা ওজন বাড়ার কারণে ব্যায়াম ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাববেন না। এটি উল্টো ক্ষতি করতে পারে। নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড হৃদ্স্বাস্থ্য, হাড়, পেশি, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।বরং নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী হাঁটা, সাঁতার, যোগব্যায়াম বা অন্যান্য উপযোগী ব্যায়াম চালিয়ে যেতে হবে।

WHO সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়ামের পরামর্শ দেয়।

সেক্ষেত্রে হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হাড়ের সমস্যা বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।


২. নিজেকে অচল ভাববেন না

৫০ বছর মানেই দুর্বল হয়ে যাওয়া—এই ধারণা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও অনেক বেশি ক্ষতিকর। সামাজিক যোগাযোগ, পছন্দের কাজ, ভ্রমণ, বই পড়া, শেখা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা নতুন কোনো দক্ষতা অর্জন—এসব চালিয়ে যাওয়া উচিত। শুধু সন্তান, সংসার বা পরিবারের দায়িত্বকে নিজের জীবনের একমাত্র পরিচয় বানিয়ে ফেলাও ঠিক নয়। নিজের আনন্দ, বিশ্রাম ও ব্যক্তিগত সময়ের জন্য জায়গা রাখা জরুরি।


৩. ঘুমকে অবহেলা করবেন না

অনিয়মিত সময়ে ঘুমানো কিংবা ঘুমের সমস্যাকে বছরের পর বছর সহ্য করা উচিত নয়। প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমানো ও জাগা, রাতে অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা এবং শোবার ঘর আরামদায়ক রাখা উপকারী হতে পারে।


৪. ধূমপানকে “এখন আর কী হবে” বলে চালিয়ে দেবেন না

৫০ বছর বয়সে এসে ধূমপান ছাড়ার কোনো মূল্য নেই—এমন ধারণা ভুল। ধূমপান সামগ্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায় এবং মেনোপজের উপসর্গও খারাপ করতে পারে। NHS-ও মেনোপজের সময়ে ধূমপান না করার পরামর্শ দেয়। তাই ধূমপান করলে এই বয়সকে বরং ছাড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।


৫. না খেয়ে বা কঠোর ডায়েট করে দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা করবেন না

মেনোপজের পর শরীরের গঠন ও ওজনের পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু সমাধান হিসেবে দিনের পর দিন না খেয়ে থাকা, একেবারে কার্বোহাইড্রেট বাদ দেওয়া কিংবা সামাজিক মাধ্যমে দেখা “ম্যাজিক ডায়েট” অনুসরণ করা ঠিক নয়। বরং শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও পর্যাপ্ত প্রোটিনসমৃদ্ধ সুষম খাবারের দিকে নজর দিতে হবে। হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-ও গুরুত্বপূর্ণ।


৬. হাড়ের যত্নে অবহেলা করবেন না

মেনোপজের পর হাড়ের ঘনত্ব কমে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই শুধু ক্যালসিয়ামের ট্যাবলেটের ওপর নির্ভর না করে নিয়মিত ওজন বহনকারী ও পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম, সুষম খাবার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভিটামিন ডি গ্রহণের বিষয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। নিজে থেকে উচ্চমাত্রার ক্যালসিয়াম বা ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট শুরু করাও ঠিক নয়।


৭. মেনোপজের উপসর্গকে সবসময় “স্বাভাবিক, বলবেন না

মেনোপজ জীবনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও এর অর্থ এই নয় যে কষ্টকর উপসর্গ সহ্য করতেই হবে। বিশেষ করে ১২ মাস মাসিক না হওয়ার পর আবার যোনিপথে রক্তপাত হলে সেটিকে মেনোপজের স্বাভাবিক অংশ ধরে নেওয়া উচিত নয়; দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।


৮. নিজের ইচ্ছায় হরমোন বা হারবাল সাপ্লিমেন্ট খাবেন না

মেনোপজের উপসর্গের জন্য হরমোন থেরাপি বা অন্য কোনো চিকিৎসা কিছু নারীর ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে, কিন্তু এটি সবার জন্য সমানভাবে উপযুক্ত নয়। বয়স, উপসর্গ, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক রোগের ইতিহাসসহ নানা বিষয় বিবেচনা করতে হয়। একইভাবে “প্রাকৃতিক” বা “হারবাল” লেখা থাকলেই কোনো সাপ্লিমেন্ট নিরাপদ—এমন ধারণাও ঠিক নয়। 


৯. বয়সের প্রতিটি স্তর একজন নারীর জীবনে অনেক-অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসে।

৫০-এর পর “শরীর ভালোই আছে” বলে বছরের পর বছর স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করাও একটি বড় ভুল। রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল ও ওজনের মতো বিষয়গুলো নিয়মিত নজরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। মেনোপজের সময় হৃদ্রোগের ঝুঁকির কিছু সূচক পরিবর্তিত হতে পারে।

স্তন, জরায়ুমুখ ও কোলোরেক্টাল ক্যানসারের স্ক্রিনিংসহ বয়স ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা কখন করতে হবে, তা চিকিৎসকের সঙ্গে ঠিক করা উচিত।


১০. টিকাকে ভুলে যাবেন না


বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছু সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ে। উদাহরণ হিসেবে, CDC-এর নির্দেশনায় ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের শিংলস প্রতিরোধে দুই ডোজ জোস্টার ভ্যাকসিন নেওয়ার সুপারিশ রয়েছে। তবে কোন টিকা প্রয়োজন, তা দেশ, স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ও স্থানীয় টিকাদান নীতির ওপর নির্ভর করতে পারে।

তাই ৫০ বছরে একটি “ভ্যাকসিন চেক” করাও স্বাস্থ্যপরিকল্পনার অংশ হতে পারে। তাহলে ৫০ পেরিয়ে করণীয় কী? সংক্ষেপে, এই বয়সে একজন নারী নিজের জন্য একটি “মিডলাইফ হেলথ রুটিন” তৈরি করতে পারেন—


প্রতিদিন


কিছুটা হাঁটা বা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা


পর্যাপ্ত পানি ও সুষম খাবার


নিয়মিত সময়ে ঘুম


নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখা


প্রতি সপ্তাহে


নিয়মিত অ্যারোবিক ব্যায়াম


অন্তত দুই দিন পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম


বন্ধু, পরিবার বা সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা


এমন কিছু করা যা আনন্দ দেয় বা মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে


নিয়মিত


রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল সম্পর্কে সচেতন থাকা


বয়স ও ঝুঁকি অনুযায়ী ক্যানসার স্ক্রিনিং করা


প্রয়োজনীয় টিকা সম্পর্কে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা


মেনোপজের কষ্টকর উপসর্গ হলে চিকিৎসা নেওয়া


হাড়ের স্বাস্থ্য ও অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো—৫০ বছর কোনো “শেষ সীমা” নয়; বরং নিজের শরীরকে নতুনভাবে জানার সময়। এই বয়সে লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু রোগ না হওয়া নয়, বরং শক্তি, চলাফেরা, ঘুম, মানসিক স্বস্তি ও স্বাধীনতা ধরে রাখা। 

sidebar ad