‘বিচ্ছেদ মানেই সম্পর্কের শত্রুতা নয়’ প্রীতম–শেহতাজের বার্তা

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ভালোবাসার গল্পের সব শেষ কি একইভাবে হয়? কখনো হয় সংসারে, কখনো হয় দূরত্বে। আবার কখনো সম্পর্কের শেষটা আসে এমন এক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে, যেখানে অভিমান বা অভিযোগের চেয়ে পারস্পরিক সম্মানটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রীতম হাসান ও শেহতাজের বিচ্ছেদের খবর যেন সেই কথাটিই নতুন করে মনে করিয়ে দিল।



প্রায় এক দশকের পথচলার পর আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সংগীতশিল্পী প্রীতম হাসান ও অভিনেত্রী-সংগীতশিল্পী শেহতাজ। ২০১৭ সালে ‘জাদুকর’ গানের কাজের সূত্রে তাঁদের পরিচয়। সেই পরিচয় একসময় গড়ায় ভালোবাসায়। এরপর ২০২২ সালে বিয়ের মধ্য দিয়ে সম্পর্ক পায় নতুন পরিচয়। চার বছরের দাম্পত্যের পর এবার তাঁরা বেছে নিয়েছেন আলাদা পথ। তবে এই গল্পের সবচেয়ে আলোচিত দিক হয়তো বিচ্ছেদ নয়; বরং বিচ্ছেদের ভাষা।



সম্পর্ক ভেঙে গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ কিংবা একে অপরকে দায়ী করার ঘটনা নতুন নয়। সেখানে প্রীতম ও শেহতাজের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন এক সুর—সম্পর্কের একটি অধ্যায় শেষ হলেও মানুষের প্রতি সম্মান শেষ হয়ে যেতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।



তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, সিদ্ধান্তটি হঠাৎ নেওয়া কোনো বিষয় নয়। দীর্ঘ সময় ধরে বোঝাপড়ার কিছু বড় পার্থক্য উপলব্ধি করার পরই তাঁরা আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অর্থাৎ, একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কখনো কখনো দুজন মানুষের জন্য আলাদা হয়ে যাওয়াটাও হতে পারে পরিণত সিদ্ধান্ত।



ভালোবাসার শেষ মানেই কি তিক্ততা?



একসময় যাঁর সঙ্গে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় ভাগ করে নেওয়া হয়েছে, সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর তাঁর প্রতি সব অনুভূতিও যে শত্রুতায় পরিণত হবে—এমনটা নয়। ভালোবাসার সম্পর্ক বদলে যেতে পারে, কিন্তু সেই সম্পর্কের স্মৃতি, একসঙ্গে কাটানো সময় কিংবা একে অপরের প্রতি সম্মান অটুট থাকতে পারে।



প্রীতম–শেহতাজের ঘটনাতেও প্রকাশ্যে এসেছে সেই পরিণত অবস্থান। তাঁরা একে অপরের প্রতি সম্মান ও শুভকামনা থাকার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নিজেদের ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করার জন্য গণমাধ্যম ও ভক্তদের প্রতিও অনুরোধ জানিয়েছেন। এই জায়গাটিই তাঁদের বিচ্ছেদের ঘটনাকে অন্যরকম করে তোলে।



সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাই কি সবসময় সাফল্য?



আমাদের সমাজে দীর্ঘ সম্পর্ক কিংবা বিয়েকে টিকিয়ে রাখাকে প্রায়ই সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়। সম্পর্ক ভেঙে গেলে প্রশ্ন আসে—‘কেন টিকল না?’ কিন্তু সব সম্পর্কের ক্ষেত্রে টিকে থাকাই যে একমাত্র সঠিক সিদ্ধান্ত, এমন নয়।



দুজন মানুষ যখন বুঝতে পারেন তাঁদের জীবন, প্রত্যাশা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে পথ আলাদা হয়ে যাচ্ছে, তখন সেই বাস্তবতাকে মেনে নেওয়াও এক ধরনের সাহস। বিশেষ করে পরিচিত মুখদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও কঠিন। কারণ তাঁদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত খুব সহজেই পরিণত হয় জনসম্মুখের আলোচনায়।



প্রীতম ও শেহতাজ সেই আলোচনার মাঝেও নিজেদের সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত রাখার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের বক্তব্যে কাউকে ছোট করার চেষ্টা নেই, নেই প্রকাশ্য দোষারোপও। বরং আছে একটি সম্পর্কের সুন্দর স্মৃতিগুলোকে সম্মান করার এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত।



‘দুজনেই ভালো থাকুন’—এমন সমাপ্তিও সম্ভব



বিচ্ছেদ শব্দটির সঙ্গে আমাদের মনে প্রায়ই কান্না, অভিমান, অভিযোগ কিংবা তিক্ততার ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু সম্পর্কের শেষটা সবসময় যুদ্ধের মতো হতে হবে না। কখনো কখনো দুজন মানুষ বুঝতে পারেন—একসঙ্গে থাকার চেয়ে আলাদা থাকাই হয়তো দুজনের জন্য ভালো।



সেখানেও থাকতে পারে কৃতজ্ঞতা। থাকতে পারে সম্মান। থাকতে পারে একে অপরের ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা।



প্রীতম–শেহতাজের গল্প তাই শুধু একটি তারকা দম্পতির বিচ্ছেদের গল্প নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও মানুষটির প্রতি সম্মানটুকু শেষ করে দিতে হয় না।



দশ বছরের পথচলায় তাঁদের জীবনে যে স্মৃতি, গান, ভালোবাসা ও অভিজ্ঞতা জমেছে, বিচ্ছেদ সেগুলো মুছে দিতে পারে না। বরং কখনো কখনো একটি সম্পর্কের সবচেয়ে পরিণত সমাপ্তি হতে পারে—দুজন মানুষ আলাদা পথে হাঁটবেন, কিন্তু একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ নয়, রেখে যাবেন সম্মান।



হয়তো এ কারণেই প্রীতম–শেহতাজের বিচ্ছেদের গল্পের সবচেয়ে বড় বার্তা হলো—সব সম্পর্কের শেষ শত্রুতায় হয় না; কিছু সম্পর্ক শেষ হয় নীরবে, সম্মানে, এবং দুজন মানুষের ভালো থাকার ইচ্ছা নিয়ে।

sidebar ad