ঘরের কাজ করেন—এমন কোনো নারীকে তাঁর কাজের কথা জিজ্ঞাসা করলে তিনি প্রায়ই বলেন, ‘আমি তো কিছুই করি না।’ অথচ রান্না, ঘর গোছানো, সন্তান লালন-পালন কিংবা পরিবারের সদস্যদের যত্ন নেওয়ার মতো কাজগুলো ছাড়া একটি পরিবার ও সমাজের দৈনন্দিন জীবন কল্পনা করা কঠিন। বাংলাদেশের নারীদের এই অদৃশ্য শ্রমকে স্বীকৃতি দিতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
‘কোনো গৃহিণীকে তাঁর কাজ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি প্রায়ই বলেন, “আমি তো কিছুই করি না।”’ কথাগুলো বলেছেন বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। নারী ও মেয়েদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে কাজ করে সংগঠনটি।
শাহীন আনামের মতে, নারীরা ঘরে যে কাজ করেন, তাকেও কাজ হিসেবে বিবেচনা করার মানসিকতা তৈরি করা জরুরি। কাজের সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করে নারীর গৃহস্থালি শ্রমকে এর অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
তবে তিনি মনে করেন, কোনো কাজের স্বীকৃতি পেতে হলে সেটির হিসাবও থাকতে হবে। সম্প্রতি পর্যন্ত বাংলাদেশে নারীদের অবৈতনিক পরিচর্যা ও গৃহস্থালি কাজের পরিমাপ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে কোনো সরকারি তথ্য ছিল না।
নারীর অদৃশ্য শ্রমের হিসাব
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের লক্ষ্যে জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেনের ‘উইমেন কাউন্ট’ কর্মসূচির সহায়তায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) দেশের প্রথম সময় ব্যবহার জরিপ (টাইম ইউজ সার্ভে—টিইউএস) পরিচালনা করে। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এ জরিপের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম চলে।
জরিপটি পরিচালনার জন্য তথ্য সংগ্রহ ও তথ্য এন্ট্রির বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এতে বিবিএসের ১০০ জনের বেশি তথ্য সংগ্রহকারী, তত্ত্বাবধায়ক, তথ্য সম্পাদক, কোডারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মীরা প্রশিক্ষণ নেন।
বিবিএসের জনমিতি ও স্বাস্থ্য শাখার পরিচালক মাশুদ আলম বলেন, ‘এখন আমাদের প্রশিক্ষিত জনবল বেড়েছে। ফলে ভবিষ্যতে আরও দক্ষতার সঙ্গে লিঙ্গভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।’
দেশের ৬৪টি জেলার ৮ হাজার পরিবারের আনুমানিক ২৪ হাজার উত্তরদাতাকে নিয়ে জরিপটি পরিচালিত হয়। জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরিতেও বিবিএসকে সহায়তা দিয়ে আসছে ইউএন উইমেন বাংলাদেশ।
ইউএন উইমেন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম অ্যানালিস্ট মো. সোহেল রানা বলেন, ‘বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগ প্রথমবারের মতো নেওয়া হয়েছে। তথ্য চূড়ান্ত হওয়ার পর এ বিষয়ে নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়নের জন্য সংসদ পর্যায়ে উচ্চপর্যায়ের অঙ্গীকার রয়েছে।’
অর্থনীতিতে নারীর শ্রমের স্বীকৃতি
সময় ব্যবহার জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে নারীদের অবৈতনিক শ্রমের অর্থনৈতিক অবদান পরিমাপের জন্য একটি ‘স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট’ তৈরির অনুরোধ জানিয়েছিল পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট হলো অর্থনীতির কোনো নির্দিষ্ট খাত বা বিষয়ের ওপর আলোকপাত করে তৈরি সম্পূরক পরিসংখ্যান। এ ধরনের হিসাবের ব্যবহার বাড়লেও অবৈতনিক পরিচর্যা ও গৃহস্থালি কাজের অর্থনৈতিক মূল্য নিরূপণে খুব কম দেশেই এমন ব্যবস্থা রয়েছে।
শাহীন আনামের মতে, স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট তৈরি হলে নারীর গৃহস্থালি শ্রমের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পথ আরও সুগম হবে।
তিনি বলেন, ‘নারীরা তাঁদের উৎপাদিত সেবা বা কাজ বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন না বলে তা জাতীয় পরিসংখ্যানে স্থান পায় না। কিন্তু এটিও কাজ এবং অর্থনীতিতে এর অবদান রয়েছে। রাষ্ট্রের উচিত সেই অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া।’
দীর্ঘদিন ধরে নারীর অবৈতনিক শ্রমের স্বীকৃতি নিয়ে কাজ করা নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠনও এ ধরনের হিসাব তৈরির দাবি জানিয়ে আসছে।
মাশুদ আলম জানান, সময় ব্যবহার জরিপের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর ২০২২ সালের মধ্যে স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট তৈরির লক্ষ্য ছিল বিবিএসের। জরিপের তথ্য নারীর অবৈতনিক পরিচর্যা ও গৃহস্থালি কাজের বিষয়ে একটি প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করবে। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) ৫.৪.১ সূচকের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করাও সম্ভব হবে।
এই সূচক মূলত অবৈতনিক পরিচর্যা ও গৃহস্থালি কাজে ব্যয় করা সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এক দিনে নারী ও পুরুষ কীভাবে তাঁদের সময় ব্যয় করেন, তা জানা গেলে নীতিনির্ধারকেরা বিভিন্ন কর্মসূচির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে পারবেন। যেমন, শিশু পরিচর্যার সুযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে নারীর কাজের চাপ কতটা কমানো যাচ্ছে, তা যাচাই করা সম্ভব হবে।
নীতিনির্ধারণে যুক্ত হবে নারীর কাজ
সময় ব্যবহার জরিপের তথ্য শুধু পরিসংখ্যান তৈরিতেই সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না ইউএন উইমেন। অবৈতনিক পরিচর্যা ও গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতি দিতে জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও সংস্থাটি আলোচনা শুরু করেছে।
সোহেল রানার ভাষ্য অনুযায়ী, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করছে ইউএন উইমেন।
২০২১ সালের জুনে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র বিল পাস হয়। শিশুদের নিরাপদ দিবাযত্নের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টি এতে গুরুত্ব পেয়েছে। প্রস্তাবিত জাতীয় অবৈতনিক পরিচর্যা কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বিলটি পর্যালোচনার কাজও করছে ইউএন উইমেন।
এ ছাড়া সময় ব্যবহার জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি, ২০১১-এর কর্মপরিকল্পনা হালনাগাদ করতে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সহায়তা দিচ্ছে সংস্থাটি। নারীর অবৈতনিক শ্রমের বিষয়টি এ কর্মপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালের জুলাইয়ে প্যারিসে অনুষ্ঠিত জেনারেশন ইকুয়ালিটি ফোরামেও এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের অঙ্গীকারের কথা জানানো হয়েছিল।
বাংলাদেশের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার জন্য জেন্ডার কৌশল প্রণয়নেও সহায়তা করেছে ইউএন উইমেন। পরিকল্পনায় লিঙ্গসমতা নিয়ে আলাদা অধ্যায় রাখা হয়েছে। উন্নয়ন ফলাফল পরিমাপের কাঠামোয় যুক্ত হয়েছে লিঙ্গভিত্তিক ১৫টি সূচক। এর মধ্যে অবৈতনিক পরিচর্যা ও গৃহস্থালি কাজের জন্য নির্দিষ্ট সূচক অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা এ ক্ষেত্রে প্রথম উদ্যোগ।
শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়, দরকার তার ব্যবহার
কোভিড-১৯ মহামারির কারণে অগ্রগতি কিছুটা ধীর হলেও জরিপের প্রাথমিক ফলাফল সামনে আসতে শুরু করেছিল। মূল প্রতিবেদনে বিবিএসের পক্ষ থেকে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের প্রত্যাশার কথা জানানো হয়েছিল।
জরিপের ফলাফল মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে জনসচেতনতামূলক কৌশল নিয়েও আলোচনা হয়। বিবিএসের সঙ্গে কাজ করে মূল ফলাফলভিত্তিক প্রচারসামগ্রী তৈরির পরিকল্পনা ছিল ইউএন উইমেনের। এসব তথ্য বিবিএসের ওয়েবসাইটে প্রকাশের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ, সরকারি কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে সেমিনারের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।
শাহীন আনাম মনে করেন, এই জরিপ থেকে পাওয়া তথ্য হবে এমন এক প্রমাণভিত্তিক ভিত্তি, যার জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছেন নারী অধিকারকর্মীরা। তাঁর মতে, এসব তথ্য মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধের প্রচারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি জানান, ২০১০ সালে বিবিএসের একটি পারিবারিক সহিংসতাবিষয়ক জরিপের ফলাফল থেকে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ধারণা করেছিল, নারীর মর্যাদা ও পারিবারিক অবস্থান বাড়ানো গেলে তাঁদের ওপর সহিংসতা কমানো সম্ভব হতে পারে।
তাই জরিপের ফলাফল মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহী মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। কারণ, তথ্য কেবল গবেষণা বা নীতিপত্রে সীমাবদ্ধ থাকলে এর পূর্ণ সুফল পাওয়া যায় না। তথ্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে হয়, যাতে মানুষ নারীর কাজ, পরিবারের মধ্যে তাঁদের মর্যাদা এবং সমাজে তাঁদের অবস্থানের পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে পারেন।
শাহীন আনামের কথায়, ‘শুধু তথ্য তুলে ধরলেই যথেষ্ট নয়। নারীরা কী কাজ করেন, পরিবারের মধ্যে তাঁদের মর্যাদা কী—এই দুটির মধ্যে যে সম্পর্ক রয়েছে, তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। আমরা নারী ও পুরুষ উভয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করি। জরিপের ফলাফল যথাযথভাবে সবার কাছে পৌঁছে দিতে চাই।’
নারীর ঘরের কাজের স্বীকৃতি তাই শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি নারীর মর্যাদা, অর্থনৈতিক অবদান এবং নীতিনির্ধারণে তাঁদের বাস্তব অবস্থান প্রতিষ্ঠারও প্রশ্ন। যে শ্রম প্রতিদিন একটি পরিবারকে সচল রাখে, সেই শ্রমের মূল্যায়ন জাতীয় অর্থনীতির হিসাবেও প্রতিফলিত হওয়া জরুরি।
সূত্র: ইউএন ওমেন