পিরিয়ডের ব্যথা বলে উড়িয়ে দেবেন না!

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

প্রতি মাসে পিরিয়ডের সময় তলপেটে ব্যথা হচ্ছে। কখনো ব্যথা এতটাই তীব্র যে বিছানা ছেড়ে ওঠা যায় না। যার ফলস্বরূপ অফিস কিংবা ক্লাসে যাওয়া বন্ধ রাখতে হয়। ব্যথার ওষুধ খেয়ে, গরম পানির ব্যাগ পেটে চেপে ধরে কোনো রকমে দিন পার করতে হয়। পিরিয়ডের সময় একটু-আধটু ব্যথা তো হয়, এটা স্বাভাবিক। 


কিন্তু সেই ‘একটু-আধটু’ ব্যথা যদি প্রতিমাসে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত করে, যদি পিরিয়ডের বাইরেও তলপেটে ব্যথা থাকে কিংবা সহবাসের সময় যন্ত্রণা হয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। কারণ, কখনো কখনো এর পেছনে থাকতে পারে এন্ডোমেট্রিওসিসের মতো একটি দীর্ঘস্থায়ী ও যন্ত্রণাদায়ক রোগ। অথচ সচেতনতার অভাব ও উপসর্গকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়ার কারণে রোগটি শনাক্ত হতে দেরি হয় অনেকেরই।


এন্ডোমেট্রিওসিস আসলে কী?

 

জরায়ুর ভেতরের আবরণের মতো দেখতে একটি টিস্যু (এন্ডোমেট্রিয়াম) যখন জরায়ুর বাইরে শরীরের অন্য কোথাও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, তখন তাকে এন্ডোমেট্রিওসিস বলা হয়। সাধারণত এটি ডিম্বাশয় (Ovaries), ফ্যালোপিয়ান টিউব (Fallopian tubes) এবং পেলভিসের চারপাশের টিস্যুতে বেশি দেখা যায়, তবে খুব বিরল ক্ষেত্রে শরীরের অন্যান্য অংশেও হতে পারে।



 

জরায়ুর ভেতরের আস্তরণ যেমন প্রতি মাসে হরমোনের প্রভাবে বৃদ্ধি পায় এবং মাসিকের সময় রক্তসহ ঝরে যায়, এই টিস্যুও হরমোনের প্রভাবে প্রতি মাসে পুরু হয় এবং রক্তপাতের চেষ্টা করে। কিন্তু রক্ত শরীরের বাইরে বের হতে পারে না বলে সেখানে প্রদাহ তৈরি হতে পারে, সৃষ্টি হতে পারে ক্ষতচিহ্ন ও অস্বাভাবিক জোড়া লেগে যাওয়া টিস্যু বা অ্যাডহিশন। এর ফলে ব্যথা এবং অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। 

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রজননক্ষম বয়সী নারী ও কিশোরীদের প্রায় ১০ শতাংশ (অর্থাৎ প্রতি ১০ জনে ১ জন) এই রোগে আক্রান্ত, যা সংখ্যায় আনুমানিক ১৯ কোটি (১৯০ মিলিয়ন)। অথচ রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা এখনো সীমিত।


আরোও পড়ুন: প্রথম পিরিয়ডের আগে যেসব প্রস্তুতিজরুরি

 

এন্ডোমেট্রিওসিসের কারণ: এন্ডোমেট্রিওসিসের কারণ অজানা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের আধুনিক গবেষণা অনুযায়ী, এন্ডোমেট্রিওসিস রোগের কোনো একক বা সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। চিকিৎসকেরা একে একটি জটিল বা বহুমুখী রোগ হিসেবে বিবেচনা করেন। হরমোন, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ও জিনগত বৈশিষ্ট্যের মতো বিষয় এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। মা বা বোনের এ রোগ থাকলে নিজের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তবে পরিবারের কারও এন্ডোমেট্রিওসিস না থাকলেও রোগটি হতে পারে।

 

কোন লক্ষণগুলো অবহেলা করা যাবে না?

 

এন্ডোমেট্রিওসিসের প্রধান এবং সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো তীব্র ও অসহ্য ব্যথা। তবে এই রোগের লক্ষণ একেক জনের শরীরে একেক রকম হতে পারে তাই উপসর্গ সবার ক্ষেত্রে এক রকম হবে এটা বলা যায়না। কারও ব্যথা অত্যন্ত তীব্র, আবার কারও ক্ষেত্রে রোগ থাকলেও তেমন লক্ষণ দেখা যায় না। এন্ডোমেট্রিওসিসের সবচেয়ে বড় ফাঁদ হলো এটাই যে, এর উপসর্গগুলো এত বৈচিত্র্যময় থাকে, যার জন্য সহজেই অন্য রোগ ভেবে ভুল করা হয়। তাই শুধু ব্যথার তীব্রতা দিয়ে রোগটির উপস্থিতি বা পর্যায় নির্ধারণ করা যায় না। সাধারণত যে লক্ষণগুলো দেখা যায়:



 

- পিরিয়ডের সাধারণ ব্যথার চেয়ে এটি অনেক গুণ তীব্র হয়। এই সময় তলপেটে তীব্র ব্যথা, যা ক্রমে বাড়তে পারে, যা স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যাহত করতে পারে। সাধারণ ব্যথানাশকে আরাম না পাওয়া বা প্রতিমাসে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।

 

- মাসিকের বাইরেও তলপেটে ব্যথা। মাসিক শেষ হওয়ার পরও তলপেট বা কোমরে ব্যথা থাকতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী পেলভিক পেইন কখনো কখনো দৈনন্দিন জীবন ও ঘুমের ওপরও প্রভাব ফেলে।

 

- শারীরিক ক্রিয়াকলাপের সময় ব্যথা হওয়া। বিশেষ করে সহবাসের সময় বা পরে ব্যথা এন্ডোমেট্রিওসিসের একটি পরিচিত লক্ষণ। শারীরিক মিলনের সময় বা মিলন পরবর্তী সময়ে জরায়ু ও তলপেটের গভীর অংশে তীব্র মোচড়ানো ব্যথা অনুভব হয়। এ ধরনের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে সংকোচ বোধ করায় অনেকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতেও দেরি করেন।

 

- প্রস্রাব বা মলত্যাগে ব্যথা। বিশেষ করে মাসিকের সময় প্রস্রাব বা মলত্যাগের সময় ব্যথা, পেটের অস্বস্তি কিংবা অন্ত্রের সমস্যার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে মাসিকের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রস্রাব বা মলের সমস্যাও হয়।

 

- মাসিকের রক্তক্ষরণজনিত সমস্যাও দেখা দিতে পারে।  কারো কারো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মাত্রায় রক্তক্ষরণ হওয়া বা চাকা চাকা রক্ত যেতে পারে। এছাড়াও অনিয়মিত মাসিক বা দুই মাসিকের মধ্যবর্তী সময়ে হঠাৎ রক্ত দেখা দেওয়া বা ফোঁটা ফোঁটা রক্তপাত হতে পারে।

 

- এছাড়াও অন্যান্য শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন পেট ফাঁপা, তীব্র কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া বা বমি বমি ভাব হওয়া। পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরেও শরীর সবসময় ক্লান্ত, অবসন্ন ও দুর্বলভাবে লাগে। আবার সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করেও গর্ভধারণে সমস্যা হলে, বিশেষ করে সঙ্গে অন্য উপসর্গ থাকলে, এন্ডোমেট্রিওসিসের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

 

তবে এটাও মনে রাখতে হবে, এসব উপসর্গ থাকলেই এন্ডোমেট্রিওসিস হয়েছে—এমন নয়। ফাইব্রয়েড, অ্যাডেনোমায়োসিস, পেলভিক সংক্রমণ কিংবা অন্ত্রের কিছু সমস্যাতেও কাছাকাছি লক্ষণ দেখা দিতে পারে। সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের মূল্যায়ন জরুরি।


সন্তানধারণে কি সমস্যা হতে পারে?


এন্ডোমেট্রিওসিসের সঙ্গে বন্ধ্যত্ব বা সন্তানধারণে সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। প্রজননতন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে বাধা তৈরি করে এটি সন্তান ধারণের প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তোলে।


এন্ডোমেট্রিওসিসের কারণে সৃষ্ট স্কার টিস্যু বা দাগ এবং পেটের ভেতরের অঙ্গগুলোর একে অপরের সাথে জোড়া লেগে যাওয়ার ফলে ফ্যালোপিয়ান টিউব অবরুদ্ধ বা বেঁকে যেতে পারে। এর ফলে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন ঘটার পথটি বন্ধ হয়ে যায়।


এছাড়াও ডিম্বাশয়ে রক্ত জমে সিস্ট (চকলেট সিস্ট) তৈরি হয়, যা স্বাভাবিক ডিম্বাশয়ের টিস্যুকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ডিম্বস্ফোটন ব্যাহত করে।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা -এর তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ্যত্বের সমস্যায় থাকা নারীদের মধ্যে আনুমানিক ২৫–৫০ শতাংশের এন্ডোমেট্রিওসিস থাকতে পারে। তবে মনে রাখা জরুরি যে, এন্ডোমেট্রিওসিস মানেই কিন্তু স্থায়ী বন্ধ্যাত্ব নয়; সঠিক চিকিৎসা ও পরামর্শের মাধ্যমে অনেক নারীই সফলভাবে মা হতে পারেন।


সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে চিকিৎসককে সেটি জানানো গুরুত্বপূর্ণ। তবে আশার কথা হল যে, এন্ডোমেট্রিওসিসের তীব্রতা অনুযায়ী ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি, হরমোন থেরাপি এবং উন্নত উর্বরতা চিকিৎসা যেমন আইভিএফ (IVF/টেস্টটিউব বেবি) প্রযুক্তির সহায়তায় বন্ধ্যাত্বের সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।


রোগ শনাক্ত করতে এত দেরি হয় কেন?


এন্ডোমেট্রিওসিসের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো রোগ শনাক্তে দীর্ঘসূত্রতা। যাদের উপসর্গ থাকে, তারা হয়তো এই অবস্থা সম্পর্কে অবগত থাকেন না, আবার এমনও অনেকে আছেন যাদের এন্ডোমেট্রিওসিসের কোনো লক্ষণই প্রকাশ পায় না।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা -এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, এন্ডোমেট্রিওসিস রোগটি শনাক্ত বা নির্ণয় করতে বিশ্বজুড়ে গড়ে প্রায় ৪ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। রোগটি শনাক্ত করতে এত দীর্ঘ সময় লাগার পেছনে বেশ কিছু সামাজিক, শারীরিক এবং চিকিৎসা পদ্ধতিগত কারণ রয়েছে।


আরোও পড়ুন: নারীর জরায়ুতে টিউমার: কেন হয়,লক্ষণ কী, টিকা কতটা সুরক্ষা দেয়?


মাসিক বা পিরিয়ডের ব্যথাকে স্বাভাবিক মনে করা: আমাদের সমাজে (এমনকি অনেক পরিবারের মধ্যেও) মাসিকের সময় তীব্র ব্যথা হওয়াকে একটি সাধারণ বা স্বাভাবিক বিষয় বলে ধরে নেওয়া হয়। ফলে অনেক মেয়ে বা নারী বছরের পর বছর অসহ্য কষ্ট সহ্য করলেও চিকিৎসকের কাছে যান না বা বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন।


উপসর্গের ভিন্নতা: কারও শুধু মাসিকের সময় ব্যথা হয়, কারও থাকে দীর্ঘস্থায়ী পেলভিক পেইন, আবার কারও প্রধান সমস্যা সন্তানধারণে অসুবিধা। এন্ডোমেট্রিওসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে উপসর্গগুলোর ভিন্নতার কারণে স্বাস্থ্যকর্মীরা সহজে এটি নির্ণয় করতে পারেন না।


লক্ষণের সাথে অন্যান্য রোগের হুবহু মিল: এন্ডোমেট্রিওসিসের লক্ষণগুলো খুবই সাধারণ এবং অন্য অনেক রোগের সাথে মিলে যায়। যেমন;



১. পেটের সমস্যা বা হজমের গোলমালকে আইবিএস মনে করা।


২. শ্রোণী অঞ্চলের ব্যথাকে সাধারণ জরায়ুর ইনফেকশন বা পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ মনে করা।


৩. প্রস্রাবের সময় ব্যথাকে সাধারণ ইউরিন ইনফেকশন ভেবে ভুল করা।


এর ফলে প্রাথমিক অবস্থায় ভুল রোগ নির্ণয় বা ভুল চিকিৎসা চলতে থাকে, যা আসল রোগটি শনাক্ত করতে দেরি করিয়ে দেয়।



সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার সীমাবদ্ধতা: অনেক রোগী মনে করেন একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষা বা আল্ট্রাসনোগ্রাফি করলেই রোগ ধরা পড়বে।  কিন্তু বাস্তবে এন্ডোমেট্রিওসিস নিশ্চিত করার মতো কোনো সহজ রক্ত পরীক্ষা বা বায়োমার্কার এখনও আবিষ্কৃত হয়নি।


রোগটি যদি প্রাথমিক স্তরে থাকে, তবে সাধারণ আল্ট্রাসাউন্ড বা এমআরআই -তে কোনো অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে না. কেবল অভিজ্ঞ রেডিওলজিস্ট দ্বারা করানো বিশেষায়িত ট্রান্সভ্যাজাইনাল আল্ট্রাসাউন্ড বা উন্নত এমআরআই -এর মাধ্যমেই এটি ধরা সম্ভব।


সচেতনতার অভাব: অনেক সময় সাধারণ স্তরের চিকিৎসকদের মধ্যেও এই রোগটির জটিল রূপ ও বিস্তৃতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা বা সচেতনতা থাকে না। আবার অনেকে রোগীর কথা গুরুত্ব না দেওয়ারও অভিযোগ করেন। তাদের ব্যথাকে অতিরঞ্জিত বলা হয় বা "মনে হয়" বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে সঠিক সময়ে রোগীকে একজন গাইনোকোলজিস্ট বা এন্ডোমেট্রিওসিস বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করতে অনেক দেরি হয়ে যায়।


কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?


এন্ডোমেট্রিওসিস নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করার একমাত্র উপায় হলো ল্যাপারোস্কোপি অস্ত্রোপচার, তবে এর আগে চিকিৎসকরা রোগীর লক্ষণ ও কিছু ইমেজিং পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে একটি প্রাথমিক বা ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্ত নেন।


১. এন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্তের প্রথম ধাপ হলো উপসর্গের বিস্তারিত ইতিহাস জানা। চিকিৎসক রোগীর মাসিকের সময় ব্যথার তীব্রতা, সহবাসে কষ্ট, অতিরিক্ত রক্তপাত বা পিঠ ও শ্রোণী অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার ইতিহাস বিস্তারিতভাবে শোনেন।


২. প্রয়োজন অনুযায়ী আলট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে পেলভিসের ভেতরের অঙ্গ পরীক্ষা করে এন্ডোমেট্রিওসিসের কিছু লক্ষণ শনাক্ত করা যায়। গভীরভাবে বিস্তৃত রোগের অবস্থান ও ব্যাপ্তি বুঝতে এমআরআই করা হয়।


৩. ল্যাপারোস্কোপি এন্ডোমেট্রিওসিস নির্ণয়ের "গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড" বা স্বর্ণমান। পেটের ছোট ছিদ্র দিয়ে ক্যামেরা প্রবেশ করিয়ে পেলভিসের ভেতর দেখা হয়। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এটি রোগ শনাক্ত ও একই সঙ্গে চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হতে পারে।


৪. বর্তমানে রক্তের বিশেষ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা (যেমন- CA-125) কিছুটা ব্যবহৃত হলেও তা নিশ্চিত ফলাফল দেয় না। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে দ্রুত রোগ নির্ণয়ের জন্য বর্তমানে লালা বা মাসিকের রক্ত পরীক্ষার মতো আধুনিক ও সহজ পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চলছে।


এন্ডোমেট্রিওসিসের কি চিকিৎসা আছে?


এন্ডোমেট্রিওসিস পুরোপুরি নিরাময় বা ১০০% কিউর করার মতো কোনো চিকিৎসা এখনও আবিষ্কৃত হয়নি, তবে ওষুধ ও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এই রোগটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো—তীব্র ব্যথা কমানো, রোগের বিস্তার রোধ করা এবং সন্তান ধারণে বা গর্ভধারণে সাহায্য করা।


রোগীর বয়স, ব্যথার তীব্রতা এবং তিনি ভবিষ্যতে সন্তান চান কিনা—তার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসকরা মূলত নিচের তিন ধরণের চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করেন:

 

হরমোন থেরাপী: যেহেতু প্রতি মাসে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে এন্ডোমেট্রিওসিসের টিস্যুগুলো বৃদ্ধি পায় ও রক্তপাত ঘটায়, তাই হরমোন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এর বৃদ্ধি থামানো হয়। কিছু হরমোনাল ওষুধ রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যথা ও উপসর্গ কমাতে সাহায্য করে। তবে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে চিকিৎসককে তা অবশ্যই জানাতে হবে।

 

ব্যথা উপশমকারী ওষুধ: চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যথানাশক ও হরমোনভিত্তিক ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে। কোন ওষুধ উপযুক্ত হবে, তা রোগীর উপসর্গ ও অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। তবে এগুলো রোগ নিরাময় করে না, কেবল সাময়িক আরাম দেয়।


অস্ত্রোপচার বা সার্জারি: ওষুধে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ না হলে, রোগের বিস্তার বেশি হলে কিংবা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সন্তানধারণে সমস্যা দেখা দিলে অস্ত্রোপচারের কথা বিবেচনা করা হতে পারে। অস্ত্রোপচারের পরও রোগের উপসর্গ ফিরে আসতে পারে।


কোন চিকিৎসা সবচেয়ে ভালো হবে, তা ব্যক্তি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তাই নিজে থেকে হরমোনের ওষুধ বা ব্যথানাশক দীর্ঘদিন ব্যবহার না করে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।


বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এন্ডোমেট্রিওসিস পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন মেডিকেল জার্নালের প্রতিবেদনে এর ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সচেতনতার অভাব, রোগ নির্ণয়ে দীর্ঘ বিলম্ব এবং পিরিয়ডের ব্যথাকে "স্বাভাবিক" মনে করার সংস্কৃতির কারণে বহু নারী নীরবে এই রোগে ভুগছেন।


বারডেম জেনারেল হাসপাতাল-২ এবং বিএসএমএমইউ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন ও পূর্ববর্তী ডাটা অনুযায়ী, বাংলাদেশে বন্ধ্যাত্বের সমস্যায় ভুগছেন এমন নারীদের মধ্যে ২২% থেকে ৪৬% পর্যন্ত নারীর ক্ষেত্রে ল্যাপারোস্কোপির মাধ্যমে এন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্ত হয়েছে।


দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়ার কারণে চিকিৎসকের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেক নারীর রোগটি গুরুতর স্তরে চলে যায়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে এন্ডোমেট্রিওসিস ধরা পড়া নারীদের মধ্যে ৪৭.৭% রোগীই ছিলেন একদম শেষ ধাপে বা 'স্টেজ-৪'।


বাংলাদেশে আক্রান্ত নারীদের গড় বয়স সাধারণত ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে (গড়ে প্রায় ২৯.৯ থেকে ৩২ বছর)। অর্থাৎ নারীদের জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম ও প্রজননক্ষম বয়সেই এই রোগটি সবচেয়ে বেশি আঘাত হানছে।


মাসিকের ব্যথা নিয়ে কথা বলতে এখনো অনেকেই সংকোচ বোধ করেন। কেউ ভাবেন, এটি নারীদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেউ আবার পরিবারের অন্যদের কাছ থেকে শুনতে পান, ‘আমাদেরও তো পিরিয়ড হয়, এত কষ্ট হয় না!’


কিন্তু প্রত্যেকের শরীর আলাদা। একজনের সামান্য ব্যথা অন্যজনের অসহনীয় হতে পারে। আবার ব্যথার তীব্রতা কম হলেই যে কোনো সমস্যা নেই, তা-ও নয়। সামাজিক ট্যাবু ও লোকলজ্জার ভয়ে এসব ব্যাপারে অবহেলা না করে শুরুতেই গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।


স্বাস্থ্য বিষয়ে যেকোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সুস্থ পরিবার, সচেতন জীবন- এই বার্তাই রোদসীর অঙ্গীকার।


তথ্যসূত্র : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস

বিডি জার্নাল


ঢাকা/টিএ

sidebar ad