সুস্থ সম্পর্কের সূত্রাবলী

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬

সুস্থ সম্পর্কের সূত্রাবলী

কিছু সম্পর্ক শুরুটা হয় চোখের ভাষায়। ধীরে ধীরে আলাপচারিতা বাড়ে, বাড়ে সখ্যতা। সম্পর্ক গভীর হতে শুরু হয়। প্রথম দেখা, দীর্ঘ আলাপন, ছোট ছোট মুহূর্তে অকারণে হেসে উঠা; সবকিছুই যেনো সিনেম্যাটিক লাগে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সবকিছুতেই পরিবর্তনের জোয়ার লাগে। সম্পর্কগুলোতেও কোথাও না কোথাও যেনো কিছুর শূন্যতা দেখা যায়। সুস্থ সম্পর্কের কিছু নীরব সূত্র আছে। যেগুলো মনে ধারণ করলে সম্পর্ক শুধু টিকে না, বরং আরও গভীর হয়। 


সম্পর্ক তৈরি করা সহজ, কিন্তু তা টিকিয়ে রাখা এবং দিনশেষে দুজনেই একসাথে ভালো থাকা; ঠিক ততটাই কঠিন। মনে হতে পারে, আরেহ! আমি তো তাকে ভালোবাসিই। এটাই তো একটি সম্পর্কের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু আসলেই কি তাই? যে কোন সম্পর্কই শুধু অনুভূতির উপর দাঁড়িয়ে থাকেনা। সমস্ত রোমান্টিক সম্পর্ক অনেক আপস-ডাউনের মধ্য দিয়ে যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও সকলেই নিজ সঙ্গীর সাথে মানিয়ে নিতে বা পরিবর্তিত হতে চায়। একটি সুস্থ সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করার একটি অংশ হলো আপনি সম্পর্কটি ঠিক কীভাবে দেখতে চান এবং তা কোথায় নিয়ে যেতে চান তার একটি লক্ষ্য সেট করে নেয়া। সম্পর্ক সবেমাত্র শুরু হোক বা বছরের পর বছর চলতে থাকুক, একটি সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলতে কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। আর এগুলোই হতে পারে সুসম্পর্কের মূল চাবিকাঠি। 


বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা

আমরা সকলেই চাই নিজ পার্টনার যেন মনের মতো হয়। কিন্তু কেউই সবকিছু হতে পারেনা যা আমরা তাদের মধ্যে দেখতে চাই। একটি সম্পর্কের মধ্যে থাকা দুজন ব্যক্তি পৃথক অভিজ্ঞতা, চিন্তাভাবনা, আচরণ এবং ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়ে থাকে। স্বাস্থ্যকর সম্পর্কের অর্থ হলো যে যেমন আছে তাকে তেমনই গ্রহণ করা এবং তাদের মধ্যে জোর করে পরিবর্তন করার চেষ্টা না করা। 


কমিউনিকেশন ব্যবস্থা

একটি হেলদি এবং স্ট্রং রিলেশানের জন্য স্মুথলি কমিউনিকেশন অপরিহার্য। সঙ্গীকে প্রয়োজনীয়, প্রশংসনীয় এবং প্রশংসা করার জন্য কীভাবে যোগাযোগ ব্যবহার করবেন সে সম্পর্কে চিন্তা করুন। যে কোন ধরনের আগ্রাসন, নীরব আচরণ, গালিগালাজ বা এই ধরনের কার্যক্রম উদ্বেগের সংকেত দেয়। তাই একে অন্যের নানা বিষয়ে তথ্য ভাগাভাগি করা, সে ব্যাপারে মতামত প্রদান করাকে সম্মান জানাতে হবে। 


ন্যায্য যুদ্ধ

ব্যাপারটি দেখলে মনে হবে বিধ্বংসী যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে। আসলে ব্যাপারটি তা নয়। বেশিরভাগ সম্পর্কের মধ্যেই কিছু দ্বন্দ্ব থাকেই। এর মানে এই নয় যে আপনি কোন বিষয়ে একমত নন, আবার এটাও নয় যে আপনি একে অপরকে পছন্দ করেননা। একসাথে চলতে গেলে এমন মনোমালিন্যতা থাকবেই। আর এর জন্য যা করতে পারেন- 

* কথা বলার আগে নিজেকে ঠান্ডা করে নিন। রাগের মাথায় মানুষ সবচেয়ে বেশি ভূল ডিসিশান নিয়ে থাকে। তাই কথোপকথনটি আরও ফলপ্রসূ হবে যদি আপনার আবেগ কিছুটা ঠান্ডা  হয়ে যায়। তাই এমন কিছু বলবেন না যা পরে অনুশোচনার সৃষ্টি করে। 

* অন্যকে সরাসরি ব্লেইম বা দোষ দেয়ার পরিবর্তে ঘটমান পরিস্থিতিতে আপনি কি ফিল করছেন এবং কি চান তা শেয়ার করবেন।

* বলার ভাষা পরিষ্কার এবং নির্দিষ্ট রাখুন। সমালোচনা এবং বিচার না করে পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করার চেষ্টা করুন। অর্থাৎ সমস্যাকে আক্রমণ করুন, ব্যক্তিকে নয়। 

* বর্তমান ইস্যুতে ফোকাস করুন। পূর্বে কি হয়েছে না হয়েছে তা সমস্ত কিছু স্তুপ করা এড়িয়ে একেবারে একটি সমস্যা সমাধান করুন। 

* নিজের ভূল স্বীকার করার মানসিকতা থাকতে হবে। আপনি যদি কিছু ভূল করে থাকেন তবে তা মানার দায়িত্ব নিতে হবে। এই ছোট্ট একটি কাজ অনেক সমস্যার সমাধান করে দেয়। 


অনুভূতির প্রকাশ

সম্পর্ক গবেষক জন গটম্যানের মতে, সুখী দম্পতিদের প্রতি ১টি নেতিবাচক মিথস্ক্রিয়া বা অনুভূতির জন্য ৫টি ইতিবাচক মিথস্ক্রিয়া বা অনুভূতির অনুপাত থাকে। সময়ে সময়ে নিজের উষ্ণতা এবং এফেকশান প্রকাশ করুন। 


কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা

আমরা অনেক সময় ধরে নিই, মানুষটা তো আছেই। তাই তার করা কাজগুলো, ছোট ছোট চেষ্টাগুলো আলাদা করে আর চোখে পড়েনা। অথচ এই একটা “ধন্যবাদ’’, “তোমার জন্য ভালো লাগলো’’, “পাশে আছি’’ এই অল্প কথাগুলো সম্পর্ককে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলে। 


কমিটমেন্ট থাকা

প্রতিশ্রুতির মানে একে অপরকে এবং সম্পর্ককে প্রথমে রাখা। এর জন্য অনেক কিছু দিতে হবে, এবং অবশ্যই ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। কিন্তু প্রতিদান হলো এমন একটি সম্পর্ক যা একে অপরের জিবনে সত্যিকারের আনন্দ এবং পরিপুর্ণতা নিয়ে আসে। প্রতিটি ব্যক্তি চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে কাজ করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং একসাথে বেড়ে উঠা বিশ্বাস এবং ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে এবং দম্পতিদের ভয় ও সন্দেহ মুক্তি দিতে সাহায্য করে। 


প্রতিটি সম্পর্কই চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। একটি সুস্থ সম্পর্কের সবচেয়ে বড় কারেন্সি হলো সময় এবং উপস্থিতি। প্রাক্তন চলচ্চিত্রের সেই বিখ্যাত সংলাপটি যেন এই পরম সত্যটিকেই খুব সহজ ভাষায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়- “একটা জন্মদিন, একটা এনিভার্সারি। এই দিনগুলো কখনো ফিরে আসেনা। প্ল্যান করতে হয়। ট্যুর পোস্টপোন করতে হয়। সবকিছু ছেড়েছুড়ে মনটাকে এক জায়গায় নিয়ে আসতে হয়.....মাঝে মাঝে সবকিছুর উর্ধে গিয়ে আমরা প্রিয় মানুষগুলোর কাছে একটু সময় আর যত্ন চাই।’’   তাই সব নিয়ম বা সূত্রের বাইরে গিয়ে আজই আপনার প্রিয় মানুষটিকে কিছুটা বাড়তি সময় দিন। সম্পর্কের আসল ম্যাজিক কোনো দামী উপহারে আবদ্ধ থাকেনা, তা লুকিয়ে থাকে কাটানো কিছু সময় এবং আলতো যত্নের মাঝে।

sidebar ad