মায়ের ডায়াবেটিস ছিল। বাবার উচ্চ রক্তচাপ। পরিবারের কারও হৃদরোগ হয়েছে, কারও ওজন নিয়ে লড়াই চলেছে বছরের পর বছর। ছোটবেলায় এসব নিয়ে খুব একটা ভাবেননি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন নিজের পরীক্ষার রিপোর্টে কোনো সংখ্যা একটু এদিক-সেদিক হয় কিংবা শরীর আগের মতো সাড়া দেয় না, তখন হঠাৎ মনে প্রশ্ন জাগে—
আমারও কি একই পরিণতি অপেক্ষা করছে?
মায়ের যে অসুখ হয়েছিল, আমারও কি হবে?
বাবার শরীরের দুর্বলতাগুলো কি আমার শরীরেও লেখা আছে?
আমরা মা-বাবার কাছ থেকে জিন পাই—এটা সত্যি। কিন্তু সেই জিন কি জন্মের দিনই আমাদের পুরো ভবিষ্যৎ লিখে দেয়?
বিজ্ঞানের উত্তরটি বেশ আশাব্যঞ্জক, তবে কোনো জাদুকরি প্রতিশ্রুতি নয়।
আমাদের জিন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জিনই আমাদের শরীরের পুরো গল্প নয়।
আর এই জায়গাটি বুঝতে হলে একটি শব্দের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে—এপিজেনেটিকস।
এপিজেনেটিকস আসলে কী?
একটি রান্নার বইয়ের কথা ভাবুন। বইটিতে শত শত রেসিপি লেখা আছে। কিন্তু বইটি রান্নাঘরে আছে বলেই প্রতিদিন সব রেসিপি রান্না হয় না। কোনো দিন একটি রেসিপি ব্যবহার হচ্ছে, কোনোটি দীর্ঘদিন খোলাই হচ্ছে না, আবার কোনোটি বারবার ব্যবহার হচ্ছে।
আমাদের ডিএনএকে যদি সেই বিশাল নির্দেশনার বই হিসেবে ভাবি, তাহলে জিনগুলো হলো তার বিভিন্ন নির্দেশনা। কিন্তু শরীরের সব কোষে সব জিন সব সময় একইভাবে সক্রিয় থাকে না। কোন জিন কতটা সক্রিয় হবে, শরীর কীভাবে সেই জিনের নির্দেশনা ব্যবহার করবে—এসব নিয়ন্ত্রণে নানা জৈবিক প্রক্রিয়া কাজ করে। এপিজেনেটিকস সেই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এপিজেনেটিক পরিবর্তনে সাধারণত ডিএনএর মূল অক্ষরবিন্যাস বদলায় না; বরং ডিএনএ থেকে তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, অর্থাৎ জিনের কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে। বয়স ও স্বাভাবিক বিকাশের পাশাপাশি পরিবেশ এবং কিছু আচরণগত বিষয়ও এ ধরনের পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
সহজ ভাষায়— আপনি কোন জিন নিয়ে জন্মেছেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই জিনগুলো শরীরে কীভাবে কাজ করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে কী জীবনযাপন দিয়ে জিন বদলে ফেলা যায়?
এখানেই একটু সতর্ক হওয়া দরকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এপিজেনেটিকস নিয়ে এমন অনেক কথা শোনা যায়—‘আপনার জীবনকে নতুন করে প্রোগ্রাম করুন’, ‘চিন্তা বদলান, জিন বদলে যাবে’, ‘এই খাবার খেলেই খারাপ জিন বন্ধ হয়ে যাবে।’
বিজ্ঞান এত সরল নয়
সকালে হাঁটতে বের হলেই একটি ‘খারাপ জিন’ বন্ধ হয়ে যাবে কিংবা ইতিবাচক চিন্তা করলেই শরীরকে ইচ্ছেমতো পুনর্লিখন করা যাবে—এমন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে করা যায় না। বরং বিজ্ঞান আমাদের আরও সূক্ষ্ম একটি সত্য শেখায়—জিন ও পরিবেশ একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে কাজ করে। অধিকাংশ জটিল রোগ শুধু একটি জিনের পরিবর্তনের ফল নয়; জিনগত বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশগত নানা উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্ক সেখানে ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই এপিজেনেটিকসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ‘সবকিছু আপনার হাতে’ নয়। বরং—সবকিছু আপনার হাতে নেই, কিন্তু আপনার জীবনযাপনের গুরুত্বও শূন্য নয়।
‘আমাদের পরিবারে ডায়াবেটিস আছে, আমারও হবেই’ এই কথাটি আমরা কত সহজে বলে ফেলি। ‘আমার মা মোটা ছিলেন, আমিও এমনই হব।’ ‘বাবার হার্টের সমস্যা ছিল, আমারও হবে।’ ‘আমাদের বংশেই উচ্চ রক্তচাপ।’
পারিবারিক ইতিহাসকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। কিছু রোগে বংশগত ঝুঁকি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঝুঁকি থাকা আর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়ে যাওয়া এক কথা নয়। একই পরিবারের দুই মানুষের জিনে মিল থাকতে পারে, কিন্তু তাঁদের জীবন এক নয়।
একজন নিয়মিত হাঁটেন, অন্যজন সারাদিন বসে থাকেন। একজন ধূমপান করেন, অন্যজন করেন না। একজনের খাবারের ধরন এক রকম, অন্যজনের আরেক রকম। তাঁদের কাজ, ঘুম, পরিবেশগত সংস্পর্শ, চিকিৎসাসেবার সুযোগ—সবই ভিন্ন হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, তামাক ব্যবহার, ক্ষতিকর মাত্রায় অ্যালকোহল গ্রহণ এবং বায়ুদূষণ অসংক্রামক রোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও টাইপ–২ ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
অর্থাৎ পরিবারে রোগ আছে জেনে ভয় পাওয়ার চেয়ে বেশি প্রয়োজন—নিজের ঝুঁকিটা জানা।
নিজের যত্ন নিতে নিতে নারীর নিজের জন্যই সময় থাকে না
এবার বাংলাদেশের একটি পরিচিত ঘরের দিকে তাকাই।
সকালে সবার আগে ঘুম থেকে ওঠেন একজন নারী।
সন্তানের নাশতা, স্কুল, স্বামীর প্রয়োজন, নিজের অফিস। দিনের শেষে যানজট পেরিয়ে বাড়ি ফিরে আবার রান্নাঘর, পরিবারের খোঁজখবর, আগামী দিনের প্রস্তুতি।
সবাই ঘুমালে হয়তো তাঁর নিজের সময় শুরু হয়।
তখন শরীর ক্লান্ত।
হাঁটা হয়নি।
নিজের খাবার ঠিকমতো খাওয়া হয়নি।
স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার কথা মনে ছিল, পরে ভুলে গেছেন।
কয়েক মাস ধরে শরীর কোনো সংকেত দিচ্ছে, কিন্তু নিজেকে বলেছেন—
‘সময় হলে ডাক্তার দেখাব।’
এই গল্প শুধু একজন নারীর নয়।
আমাদের সমাজে নারীর যত্ন নেওয়াকে দায়িত্ব মনে করা হয়, কিন্তু নারীর নিজের যত্ন নেওয়াকে অনেক সময় বিলাসিতা বানিয়ে ফেলা হয়।
অথচ শরীর জানে না আপনি সংসারের জন্য কতটা অপরিহার্য।
শরীর তার নিজের নিয়মেই সাড়া দেয়।
মা শুধু জিন দেন না, জীবনযাপনের ভাষাও দেন
এখানেই উত্তরাধিকারের আরেকটি দিক আছে।
আমরা মা-বাবার কাছ থেকে শুধু জিন পাই না।
পরিবার থেকেই অনেক অভ্যাস শিখি।
খাবারের টেবিলে কী থাকবে।
শরীর খারাপ হলে বিশ্রাম নেওয়া হবে, নাকি কাজ চালিয়ে যাওয়া হবে।
হাঁটা জীবনের অংশ, নাকি ‘সময় থাকলে’ করার বিষয়।
অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া হবে, নাকি কয়েক মাস অপেক্ষা করা হবে।
মানসিক চাপ নিয়ে কথা বলা যাবে, নাকি সবকিছু নিজের মধ্যে রেখে দিতে হবে।
এসব জিন নয়।
কিন্তু প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে যেতে পারে।
একটি মেয়ে যদি সারাজীবন দেখে তার মা নিজের শরীরের প্রয়োজনকে সবার শেষে রেখেছেন, সে-ও হয়তো অজান্তেই একই জীবন শিখবে।
আবার সেই মা-ই যদি একদিন বলেন—
‘সংসারের সবাই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমিও এই পরিবারের একজন মানুষ। আমার শরীরের যত্নও প্রয়োজন।’
তাহলে মেয়েটি অন্য একটি শিক্ষা পায়।
এটিও উত্তরাধিকার।
আজ থেকে শুরু করলে কি সত্যিই লাভ আছে?
হয়তো আপনার বয়স ৩০।
হয়তো ৪৫।
হয়তো ৬০।
হয়তো মনে হচ্ছে—এত বছর তো নিজের যত্ন নিইনি, এখন আর কী হবে?
স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের উপকারিতা কেবল তরুণ বয়সের জন্য নয়। নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা প্রাপ্তবয়স্ক ও বয়স্ক মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসও হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক ও কিছু ক্যানসারসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে।
তবে পরিবর্তন মানেই জীবনকে একদিনে নিখুঁত করে ফেলা নয়।
হয়তো শুরুটা হবে প্রতিদিন একটু হাঁটা দিয়ে।
হয়তো নিজের স্বাস্থ্য পরীক্ষাটি আর পিছিয়ে না দিয়ে।
হয়তো খাবারের প্লেটে একটু পরিবর্তন এনে।
হয়তো ধূমপান থাকলে তা ছাড়ার সহায়তা নিয়ে।
হয়তো শরীরের কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণকে ‘এমনিই ঠিক হয়ে যাবে’ বলে আর উপেক্ষা না করে।
ছোট সিদ্ধান্ত সব রোগ ঠেকিয়ে দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
কিন্তু ছোট সিদ্ধান্তেরও মূল্য আছে।
অসুস্থ হলেই কি তবে জীবনযাপনের দোষ?
না।
এই জায়গাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কেউ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন, কারও ডায়াবেটিস হয়েছে, কেউ হৃদ্রোগে ভুগছেন—তাঁকে দেখে বলা যায় না, ‘আপনি নিশ্চয় নিজের যত্ন নেননি।’
রোগের কারণ জটিল। জিন, বয়স, পরিবেশ, সংক্রমণ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা, স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার এবং আরও অনেক বিষয় একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
এপিজেনেটিকসের ধারণাকে তাই মানুষের অসুস্থতার জন্য মানুষকেই দায়ী করার অস্ত্র বানানো ঠিক নয়।
বিজ্ঞান আমাদের অপরাধবোধ শেখাচ্ছে না।
শেখাচ্ছে সম্ভাবনা ও ঝুঁকিকে আরও গভীরভাবে বুঝতে।
সন্তানের জন্য কী রেখে যাচ্ছেন?
আমরা সন্তানকে সম্পত্তি দিতে চাই।
শিক্ষা দিতে চাই।
নিরাপদ ভবিষ্যৎ দিতে চাই।
কিন্তু হয়তো আরেকটি উত্তরাধিকারও খুব মূল্যবান—
নিজের যত্ন নেওয়ার সংস্কৃতি।
সন্তান যদি দেখে মা নিয়মিত নিজের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন, শরীরকে সময় দেন, প্রয়োজন হলে বিশ্রাম নেন, স্বাস্থ্যকর খাবারকে শাস্তি নয়, বরং যত্ন হিসেবে দেখেন—তাহলে সে একটি জীবনদর্শন শিখছে।
‘নিজের শরীরকে অবহেলা করাই ত্যাগ’—এই ধারণার বদলে সে শিখছে—
নিজেকে বাঁচিয়ে রাখাও পরিবারের প্রতি দায়িত্ব।
মায়ের মুখটা আয়নায় দেখলে
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়নায় কখনো কখনো মায়ের মুখটা দেখতে পাওয়া যায়।
একই চোখ। একই হাসি। হয়তো একইভাবে চুলে পাক ধরছে। একদিন হয়তো মনে হয়—আমি ক্রমেই মায়ের মতো হয়ে যাচ্ছি। সেই মিল সুন্দর। তার মধ্যে ইতিহাস আছে, শিকড় আছে, ভালোবাসা আছে। কিন্তু মায়ের জীবনের প্রতিটি অসুখ, প্রতিটি কষ্ট, প্রতিটি অভ্যাসও যে আপনাকে পুনরাবৃত্তি করতেই হবে—তা নয়।
আপনি আপনার পূর্বপুরুষের জিন বহন করছেন। আপনার শরীরে তাঁদের ইতিহাস আছে। আপনার পরিবার থেকে পাওয়া অভ্যাসও আছে। কিন্তু আজকের দিনটিও আছে।
আজ আপনি কী খাবেন, কতটা চলবেন, শরীরের সংকেত শুনবেন কি না, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেবেন কি না—এই সিদ্ধান্তগুলোরও মূল্য আছে।
এপিজেনেটিকস আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের কোনো জাদুর চাবি দেয় না। বরং আরও মানবিক একটি কথা মনে করিয়ে দেয়— জন্মের সময় পাওয়া জিন আমাদের গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু পুরো গল্পটি নয়।
তাই মায়ের মুখ নিজের মুখে দেখতে পেলে ভয় নয়।
মনে মনে বলা যায়— ‘মা, তোমার কাছ থেকে আমি আমার শিকড় পেয়েছি। তোমার অনেক কিছু আমার মধ্যে বেঁচে আছে। কিন্তু নিজের শরীরের যত্ন নেওয়ার যে সুযোগ আমার আছে, সেটুকু আমি হারাতে চাই না।’
হয়তো উত্তরাধিকার বদলানোর অর্থ জিন বদলে ফেলা নয়। হয়তো তার অর্থ—একই পরিবারের পরের প্রজন্মকে একটু বেশি সচেতন, একটু বেশি যত্নশীল জীবনের গল্প দিয়ে যাওয়া।
ঢাকা/এসই/আরএস