ব্যাংক সব সময় নতুন উদ্যোক্তা খোঁজে: শামীম রফিক

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬

ব্যাংক সব সময় নতুন উদ্যোক্তা খোঁজে: শামীম রফিক

ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণে ব্যাংকঋণ গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হলেও ঋণ পাওয়ার চেয়ে তা পরিশোধের সক্ষমতা বেশি জরুরি। একজন নতুন উদ্যোক্তার নিজস্ব বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা, প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং নিয়মিত ব্যাংক লেনদেন—এসব বিষয়ই ব্যাংকারের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে। কিন্তু ব্যবসা দাঁড়ানোর আগেই বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া কতটা যৌক্তিক? ব্যাংকের আস্থা অর্জনে একজন উদ্যোক্তার কী ধরনের প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন? ঋণ নেওয়ার পর কীভাবে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে? এসব বিষয়ে কথা বলেছেন মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসির মতিঝিল শাখার এভিপি ও ম্যানেজার অপারেশন শামীম রফিক। কথপোকথনে ছিলেন রাশিদা খাতুন।


রোদসী: ব্যাংকারের চোখে একজন নতুন উদ্যোক্তা আসলে কেমন? ব্যাংকে প্রথমবার একজন উদ্যোক্তা এলে তার মধ্যে আপনি কোন বিষয়গুলো খেয়াল করেন?


শামীম রফিক: নতুন উদ্যোক্তা তো নতুনের মতোই হবেন। ব্যাংক সব সময় নতুন উদ্যোক্তা খোঁজে এবং নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে চায়। কিন্তু চাইলেই তো আর হয় না। উদ্যোক্তা সৃষ্টি অনেক কঠিন কাজ। কেউ যদি নিজেকে উদ্যোক্তা বানাতে চান, তবে সেটা অনেক সহজসাধ্য কাজ। তবে নতুন উদ্যোক্তার জন্য চ্যালেঞ্জ হলো ক্যাপিটাল। শুধু টাকা থাকলেই হয় না, উদ্যোক্তা যা করতে চান, সে বিষয়ে তাঁর কতটুকু জ্ঞান আছে, সেটাই আসল। একজন উদ্যোক্তাকে ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আর্থিক ও ব্যবসায়িক ঝুঁকি গ্রহণ করতে হয়।


নতুন উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে দেখার বিষয় হলো, তিনি যে ব্যবসাটি করতে চান, সেটি কতটুকু বোঝেন। ব্যবসা না বুঝলে তাঁকে ক্যাপিটাল দিলেও তিনি ভালো কিছু করতে পারবেন না, উল্টো টাকাটাই ক্ষতি করে ফেলবেন।


রোদসী:  নতুন উদ্যোক্তারা নিজেদের ব্যবসা সম্পর্কে যেভাবে বলেন, আর ব্যাংকার যেভাবে ব্যবসাটিকে মূল্যায়ন করেন—এই দুটির মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য কোথায়?


শামীম রফিক: একজন উদ্যোক্তার প্রধান কাজ হলো—১. উদ্ভাবন, ২. সুযোগ চিহ্নিত করা এবং ৩. অর্থসংস্থান ও সম্পদ গুছানো। কিন্তু একজন নতুন উদ্যোক্তা এসবের দিকে নজর না দিয়ে ব্যবসা শুরুর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। উপরোক্ত বিষয়গুলো না বুঝে ব্যবসা শুরু করলে তাতে ক্ষতির ঝুঁকি বেশি থাকে। ব্যাংকার উদ্যোক্তার ব্যবসাকে মজবুত দেখতে চান, উদ্যোক্তাকে ব্যবসার বিষয়ে অধিকতর সচেতন দেখতে চান। ব্যাংকার চান, ব্যবসাটি শুরুর পাশাপাশি সেটি যেন টেকসই হয়।


রোদসী:  আপনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় নতুন উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বেশি যে ভুলটি করতে দেখেছেন, সেটি কী?


শামীম রফিক: তাড়াহুড়া। সবাই খুব অল্প সময়ে লক্ষ্যে পৌঁছাতে চান। কিন্তু ব্যবসা কোনো তাড়াহুড়ার বিষয় নয়। অল্প সময়ে লক্ষ্যে পৌঁছাতে চাইলে তাঁকে অন্যায় কোনো পথ বেছে নিতে হবে, যেটা কখনোই সঠিক নয়। ব্যবসার জন্য প্রচুর সময় ও শ্রম দিতে হয়। এটা তাঁরা দিতে চান না। নতুন উদ্যোক্তারা এই ভুলটি বেশি করেন। এ ছাড়া তাঁরা কোনো নিয়মকানুন মেনে চলতে চান না।


রোদসী:  অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসার সম্ভাবনা নিয়ে অনেক কথা বলেন, কিন্তু ব্যবসার হিসাব দিতে পারেন না। একজন ব্যাংকারের কাছে এটি কতটা নেতিবাচক বিষয়?


শামীম রফিক: এটা তো পুরোটাই নেতিবাচক। ব্যবসার প্রধান কাজই হলো হিসাব সংরক্ষণ। ব্যবসা যতই সম্ভাবনাময় হোক, তার যদি হিসাব না থাকে, তাহলে তার লাভ-লোকসান কী দিয়ে বুঝবেন? ব্যবসার লাভ-লোকসান বুঝতে হলে অবশ্যই হিসাব লিপিবদ্ধ করতে হবে। সেই লিপিবদ্ধ হিসাব থেকেই ব্যবসার লাভ-লোকসান বোঝা যাবে। আর লাভ-লোকসানের ওপর নির্ভর করেই ব্যবসা এগিয়ে যাবে, নাকি পিছিয়ে যাবে, সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।


রোদসী: ‘আমার ব্যবসা ভালো চলছে’—এই কথাটিকে ব্যাংকার কীভাবে যাচাই করেন? কোন তথ্য বা প্রমাণ একজন উদ্যোক্তার কথাকে বিশ্বাসযোগ্য করে?


শামীম রফিক: সব উদ্যোক্তা, বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তারা মনে করেন, তাঁদের ব্যবসা ভালো চলছে। ব্যবসার একটা মূল্যবান দলিল হলো হিসাব বিবরণী। উদ্যোক্তা তাঁর প্রতিদিনের বিক্রয়লব্ধ টাকা হিসাবে জমা দেন। আবার ব্যবসার প্রয়োজনে টাকা তোলেন। অর্থাৎ লেনদেন করেন। হিসাব বিবরণী থেকে লেনদেনের চিত্র বোঝা যায়। একজন ব্যাংকার হিসাব বিবরণী দেখলেই ব্যবসার চিত্র বুঝতে পারেন। হিসাব বিবরণীই বলে দেয়, ব্যবসা কেমন চলছে।


রোদসী: একজন উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত আর ব্যবসায়িক অর্থের হিসাব আলাদা না থাকা ব্যাংকের দৃষ্টিতে কী ধরনের সমস্যা তৈরি করে?


শামীম রফিক: একজন উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত আর ব্যবসায়িক অর্থের হিসাব অবশ্যই আলাদা থাকতে হবে। ব্যক্তিগত অর্থ তো তাঁর নিজের সম্পদ। আর ব্যবসায়িক অর্থ হলো, তিনি ব্যবসা থেকে কী পরিমাণ অর্থ উপার্জন করছেন। ব্যবসা থেকে উপার্জিত অর্থই ব্যবসার অর্জন। ব্যবসার অর্জন যদি না থাকে, তবে তো ব্যবসা রেখে কোনো লাভ নেই।


রোদসী: নতুন উদ্যোক্তাদের মধ্যে ব্যবসার টাকা, ব্যক্তিগত খরচ এবং পরিবারের টাকা একসঙ্গে ব্যবহারের প্রবণতা কতটা সাধারণ? এটি ব্যবসার ভবিষ্যতে কী প্রভাব ফেলে?


শামীম রফিক: ব্যবসার টাকা, ব্যক্তিগত খরচ এবং পরিবারের টাকা—প্রতিটিই আলাদা আলাদা হিসাব। এই হিসাবগুলো কখনো এক করা যাবে না। যদি এগুলো একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়, তবে ব্যবসার উপার্জন আলাদা করা যাবে না। ফলে ব্যবসার লাভ-লোকসান বোঝা যাবে না।


রোদসী: অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা শুরু করেন আবেগ ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে, কিন্তু বাজার, বিক্রি, খরচ ও নগদ প্রবাহের হিসাব করেন না। ব্যাংকারের চোখে কোন প্রস্তুতিটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?


শামীম রফিক: উদ্যোক্তাকে শুধু আবেগপ্রবণ হলে হবে না। তাঁকে মার্কেট সার্ভে করে নিজের ব্যবসা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ ছাড়া উদ্যোক্তা যে ব্যবসাটি শুরু করার প্রস্তুতি নিয়েছেন, সে সম্পর্কেও তাঁর সম্যক অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। ব্যবসা শুরুর আগে মার্কেট সার্ভে এবং যে ব্যবসাটি শুরু করবেন, সে বিষয়ে প্রচুর জ্ঞান অর্জন করা উচিত।


রোদসী: জামানত নেই—তাই ব্যাংক ঋণ দেবে না, এমন ধারণা কতটা সত্য? জামানতের বাইরে একজন উদ্যোক্তার বিশ্বাসযোগ্যতা কীভাবে তৈরি হয়?


শামীম রফিক: জামানত একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে জামানত ছাড়াও ব্যাংক ঋণ দেয়। বিভিন্ন ব্যাংকে জামানতবিহীন নানা রকমের ঋণের ব্যবস্থা আছে। তবে জামানতবিহীন ঋণ কি সবাইকে দেয়? একজন উদ্যোক্তা নতুন। তাঁর ব্যবসা সম্পর্কে ব্যাংকারের কোনো আইডিয়া নেই, উদ্যোক্তা সম্পর্কে কোনো ধারণা বা পরিচিতি নেই। সে অবস্থায় কি ঋণ দেওয়া সম্ভব? জামানতবিহীন ঋণ তো আরও পরের কথা।


ব্যবসার একটা স্থিতিশীলতা থাকতে হবে, ব্যবসার ন্যূনতম একটা বয়স থাকতে হবে, নিয়মিত লেনদেন থাকতে হবে, যাতে তাঁর হিসাব বিবরণী পরীক্ষা করা যায়। তাছাড়া উদ্যোক্তা যদি দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের সঙ্গে চলতি হিসাবে লেনদেনের মাধ্যমে একটা সম্পর্ক তৈরি করতে পারেন, উদ্যোক্তার যদি কোনো সামাজিক পরিচিতি থাকে অথবা সামাজিকভাবে পরিচিত হন, অথবা ব্যাংকের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যক্তি কিংবা ব্যাংকের কোনো স্বনামধন্য গ্রাহকের সুপারিশ থাকে, তাহলে উদ্যোক্তা জামানতবিহীন ঋণ পেতে পারেন।


তবে ব্যবসার শুরুতেই ঋণ না দেওয়াই উত্তম। ঋণের একটা খরচ আছে। শুরুতে উদ্যোক্তার পক্ষে নিজের সংসার চালিয়ে, ব্যবসা চালিয়ে এবং ঋণের সুদ পরিশোধ করে ব্যবসা পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। এতে ব্যবসার ক্ষতি হতে পারে।


রোদসী: একজন নতুন উদ্যোক্তার ব্যাংক হিসাব পরিচালনার ধরন তার ব্যবসা সম্পর্কে ব্যাংকারকে কী বার্তা দেয়?


শামীম রফিক: নতুন উদ্যোক্তার ব্যাংক হিসাব পরিচালনা থেকে তার ব্যবসা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। ব্যবসা ভালো চলছে, নাকি খারাপ অবস্থায় আছে, একজন ব্যাংকার তা বুঝতে পারেন।


রোদসী: উদ্যোক্তার নিজস্ব বিনিয়োগ কতটা গুরুত্বপূর্ণ? একজন উদ্যোক্তা নিজে ব্যবসায় কতটা ঝুঁকি নিয়েছেন, ব্যাংক কি সেটিও বিবেচনা করে?


শামীম রফিক:  উদ্যোক্তার নিজস্ব বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যত বেশি নিজের বিনিয়োগ থাকবে, ব্যবসা তত শক্তিশালী হবে। ঋণ তো সহযোগী, যা ব্যবসাকে বড় হতে সাহায্য করে। ব্যবসা ভালো না হলে ঋণ নেওয়া উচিত নয়। ঋণের একটা খরচ আছে। সেটা ব্যবসার লাভের টাকা থেকে পরিশোধ করা উচিত। কখনোই ব্যবসার মূলধন থেকে ঋণের সুদ বা সুদসহ কিস্তি পরিশোধ করা উচিত হবে না।


একজন উদ্যোক্তা নিজে ব্যবসায় কতটা ঝুঁকি নিয়েছেন, ব্যাংকার তা অবশ্যই বিবেচনা করেন। ব্যবসার ঝুঁকি নিরূপণ ব্যাংকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ঋণ দেওয়ার সময় এই বিষয়গুলো বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়। ব্যবসার নেট ওয়ার্থ ও ঋণের পরিমাণ নিরূপণের জন্য এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারবেন কি না, তা যাচাই করতে রেশিও অ্যানালাইসিস করতে হয়। সুতরাং উদ্যোক্তার ঝুঁকি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


রোদসী: কোনো উদ্যোক্তার ঋণের আবেদন করার সময় কোন নথি বা তথ্য না থাকলে ব্যাংকারের মনে সবচেয়ে বেশি কী প্রশ্ন তৈরি হয়?


শামীম রফিক:  প্রথমত, ব্যবসা বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে। উদ্যোক্তা কোন ধরনের ব্যবসা করতে চাচ্ছেন? সেই ব্যবসা সম্পর্কে তাঁর কেমন ধারণা আছে? সব ব্যবসায় নগদ টাকার প্রয়োজন হয় না। কোনো কোনো ব্যবসা প্রযুক্তিভিত্তিক, কোনো কোনো ব্যবসা গ্যারান্টিভিত্তিক, আবার কোনো কোনো ব্যবসা পণ্যভিত্তিক। সব ব্যবসায় টাকা লাগে না বা একই পরিমাণ টাকা লাগে না। সব ব্যবসার জন্য ঋণের হিসাবও এক রকম নয়।

উদ্যোক্তা যদি ঠিকমতো তথ্য দিতে না পারেন, তবে তার অর্থ দাঁড়ায়—হয় তিনি ব্যবসাটি সম্পর্কে ধারণা রাখেন না, অথবা তাঁর উদ্দেশ্য ভালো নয়। একজন ভালো উদ্যোক্তা সবকিছু ভালোভাবে জেনেই ব্যবসায় বিনিয়োগ করবেন।


রোদসী: একজন উদ্যোক্তা যদি প্রথমবার ব্যাংকে যান, কীভাবে নিজের ব্যবসার কথা বললে তিনি পেশাদার ও প্রস্তুত উদ্যোক্তা হিসেবে বিবেচিত হবেন?


শামীম রফিক: উদ্যোক্তা প্রথমবার ব্যাংকে গিয়ে প্রথমে শাখা ব্যবস্থাপকের সঙ্গে পরিচিত হবেন। তারপর নিজের পরিচয় দেবেন। তিনি কী ব্যবসা করেন, তা বিস্তারিত বলবেন। শাখা ব্যবস্থাপকের কথাও শুনবেন। তিনি যে ব্যবসা করেন বা করতে যাচ্ছেন, তার বিস্তারিত বর্ণনা দেবেন। বাজারে সেই ব্যবসার অবস্থা তুলে ধরবেন। প্রয়োজনে কিছু প্রাসঙ্গিক নথিপত্র জমা দেবেন।


সেই ব্যবসা সম্পর্কে তিনি যে প্রচুর পড়াশোনা ও গবেষণা করেছেন, তা তাঁর কথা থেকেই বোঝা যাবে। মনে রাখতে হবে, একজন ব্যাংক ব্যবস্থাপক অনেক অভিজ্ঞ এবং বিভিন্ন বিষয়ে বাস্তব জ্ঞান রাখেন। কাজেই তাঁকে বোঝাতে হলে সেভাবেই প্রস্তুতি নিতে হবে। তিনি যদি শাখা ব্যবস্থাপক ও ঋণ কর্মকর্তাকে তাঁর ব্যবসা এবং ব্যবসার সম্ভাবনা সম্পর্কে বোঝাতে সক্ষম হন, তবেই তাঁকে পেশাদার ও প্রস্তুত উদ্যোক্তা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

তাছাড়া ব্যাংক সব সময় দক্ষ ও পেশাদার গ্রাহক খোঁজে। এটি একজন শাখা ব্যবস্থাপকের অন্যতম প্রধান কাজ।


রোদসী:  বিপরীতে, কোন ধরনের কথা বা আচরণ একজন উদ্যোক্তার প্রতি ব্যাংকারের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে?


শামীম রফিক:  উদ্যোক্তা ব্যাংকে গেলেন, কিন্তু সঙ্গে কোনো তথ্য বা উপাত্ত নিলেন না এবং নিজেও সেগুলো সম্পর্কে কিছু বলতে পারলেন না। তাছাড়া তিনি ব্যবসা শুরু করতে চান ব্যাংকের টাকায়। যিনি ব্যবসা শুরুই করতে চান ঋণের টাকায়, তাঁর প্রতি ব্যাংকের আস্থা কমে যায়। ব্যাংক তাঁকে ঋণ দিতে চায় না।


রোদসী: অনেক নতুন উদ্যোক্তা ব্যবসা দাঁড়ানোর আগেই বড় ঋণ নিতে চান। কখন ঋণ ব্যবসার জন্য সহায়ক, আর কখন সেটি ব্যবসার ওপর চাপ হয়ে দাঁড়ায়?


শামীম রফিক:  এ প্রশ্নের জবাব আগেই দেওয়া হয়েছে। তারপরও বলছি, যেসব নতুন উদ্যোক্তা ব্যবসা দাঁড়ানোর আগেই বড় ঋণ নিতে চান, ব্যাংক কখনোই তাঁদের ঋণ দিতে চায় না। ব্যাংকার ও গ্রাহকের প্রধান সম্পর্ক হলো গ্রাহকের হিসাবের লেনদেন। লেনদেন শুরুর আগেই ঋণ হয় কীভাবে? ব্যাংক তো গ্রাহককে জানতেই পারল না। তাছাড়া গ্রাহক কী ব্যবসা করছেন, কোথায় ব্যবসা করছেন, ব্যবসা কেমন হচ্ছে—এসব না জেনে ঋণ দেবে কীভাবে?


এসব হলো ব্যাংকের দিকের সমস্যা। নতুন অবস্থায় গ্রাহকেরও ঋণ নেওয়া উচিত নয়। ঋণের একটা খরচ আছে। নতুন অবস্থায় সেই খরচ বহন করা গ্রাহকের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।


একটি ব্যবসা চলমান। তার বিক্রি ভালো, প্রফিট মার্জিনও ভালো। কিন্তু টাকার অভাবে ব্যবসাটি আরও বড় করা যাচ্ছে না। টাকা পেলে ব্যবসাটি সম্প্রসারণ করা যাবে এবং মুনাফাও বাড়বে। এমন অবস্থায় ঋণ ব্যবসার জন্য সহায়ক। কিন্তু ব্যবসা ভালো নয়, বিক্রি কম, মুনাফাও কম। এমন অবস্থায় গ্রাহক ভাবছেন, টাকা পেলেই বুঝি লাভবান হওয়া যাবে। তাই তিনি ঋণ নিতে চান। এমন ব্যবসায় ব্যাংক ঋণ প্রদান করে না। আর করলেও সেটি উদ্যোক্তার জন্য চাপ হয়ে দাঁড়াবে।


রোদসী: ঋণ পাওয়া আর ঋণ পরিশোধ করতে পারা—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্যটা একজন নতুন উদ্যোক্তার কীভাবে বোঝা উচিত?


শামীম রফিক: একজন নতুন উদ্যোক্তাকে সব সময় মনে রাখতে হবে, ব্যবসাটির ওপর ঋণের দায় রয়েছে। তাঁকে খেয়ে না খেয়েও আগে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই ঋণকে অবহেলা করা যাবে না। নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। যদি নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করেন, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। তবে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে না পারলে তা মহাবিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।


রোদসী: কোনো উদ্যোক্তার ঋণের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে তিনি কি সেটিকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখবেন, নাকি নিজের ব্যবসাকে আরও প্রস্তুত করার সুযোগ হিসেবে দেখবেন? এরপর তাঁর কী করা উচিত?


শামীম রফিক: কোনো উদ্যোক্তার ঋণের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে তিনি কোনো অবস্থাতেই সেটিকে নিজের ব্যর্থতা হিসেবে দেখবেন না। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়া মানেই এই নয় যে তিনি আর ঋণ পাবেন না বা কোথাও ঋণ পাবেন না। এটি এই সময়ের জন্য প্রত্যাখ্যাত হওয়া, সব সময়ের জন্য নয়।

যে কারণগুলোর জন্য ঋণটি হলো না, তিনি সেই কারণগুলো কাটিয়ে উঠলেই আবার ঋণের আবেদন করতে পারবেন। এতে তাঁর ব্যবসার সমস্যাগুলোও দূর হবে এবং ব্যবসার পরিস্থিতি আরও ভালো হবে। এরপর তিনি আবার ঋণের জন্য আবেদন করবেন।


রোদসী: একজন নতুন উদ্যোক্তা যদি ব্যাংকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করতে চান, ব্যবসার শুরু থেকেই কোন অভ্যাসগুলো গড়ে তোলা উচিত?


শামীম রফিক: প্রথম এবং প্রধান কাজ হলো সঠিকভাবে ও নিয়মিতভাবে লেনদেন করা। নিয়মিত ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। যোগাযোগ মানে ব্যবসা ফেলে প্রতিদিন ব্যাংকে এসে বসে থাকা নয়। আজকাল অনেকভাবেই যোগাযোগ করা যায়। মনে রাখবেন, ব্যাংক ভালো উদ্যোক্তা খোঁজে। তাই প্রয়োজনটা শুধু আপনার একার নয়।


রোদসী: আপনি যদি একজন নতুন উদ্যোক্তাকে ব্যাংকে যাওয়ার আগে মাত্র তিনটি প্রস্তুতি নিতে বলতেন, সেগুলো কী হতো?


শামীম রফিক: 

১. যে ব্যবসাটি করতে চান, সে সম্পর্কে সঠিকভাবে ও ভালোভাবে জ্ঞান অর্জন করুন।

২. ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কাগজপত্রগুলো গুছিয়ে নিন।

৩. ব্যাংক হিসাবে নিয়মিত লেনদেন করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করুন।


রোদসী: আপনার চোখে একজন ‘ব্যাংক-প্রস্তুত’ উদ্যোক্তা কেমন? নতুন উদ্যোক্তারা নিজেদের সেই পর্যায়ে নিতে আজ থেকেই কী করতে পারেন?


শামীম রফিক: আপনি যদি একজন ‘ব্যাংক-প্রস্তুত’ উদ্যোক্তা হতে চান, তাহলে নিচের কাজগুলো আজ থেকেই শুরু করুন:

১. প্রথমে ব্যবসাটি ঠিক করুন।

২. ব্যবসার একটি নাম নির্ধারণ করুন।

৩. ব্যবসার নামে ট্রেড লাইসেন্স করুন।

৪. আপনার পছন্দমতো ব্যাংক নির্বাচন করুন।

৫. ব্যাংকে এসে একটি চলতি হিসাব খুলুন।

৬. চলতি হিসাবে নিয়মিত লেনদেন শুরু করুন।

৭. লেনদেন অনেক বড় অঙ্কের হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।

৮. এ অবস্থায় বাকি ডকুমেন্টগুলো প্রস্তুত করে নিন।

৯.মাঝে মাঝে ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করবেন।

১০. চাইলে কোনো কোনো কর্মকর্তার সঙ্গেও সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন।

১১. লেনদেন করতে করতে যদি কোনো কাগজপত্র বা ডকুমেন্ট বাকি থাকে, তবে সেগুলো তৈরি করে নিন।

১২.কয়েক মাস লেনদেনের পর ম্যানেজারের কাছে ঋণের প্রস্তাব দিন।

১৩. আজ থেকেই এ কাজগুলো শুরু করতে পারেন।

sidebar ad