তার অনেক বছর আগের এক শীতের সকাল। নওয়াব সৈয়দ আলতাফ আলী পুত্র মোহাম্মদ আলীর ম্যাট্রিক পরীক্ষার অসাধারণ ফলাফলের খবরে অত্যন্ত খুশি হলেন। করতোয়া নদীর জলের দিকে নিমগ্ন তাকিয়ে তিনি কেন যেন আজ তার বাপ-দাদা আর পূর্ব পুরুষদের স্মৃতি রোমন্থন করার চেষ্টা করছেন। নদী জলের উপরিস্তরের ধোঁয়াশার মতো আস্তরণ তার রোমন্থিত স্মৃতির ভেতর থেকে এই নওয়াব বাড়ির এক একজন কীর্তিমান পুরুষের মুখের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট করে তুলছিল। বঙ্গের অনেক জমিদারগণ যখন নারী আর মদ নিয়ে বুঁদ হয়ে থেকেছেন তখনো এই নওয়াব পরিবারের পূর্ব পুরুষগণ জন-মানুষের মঙ্গল কামনায় আর সমাজের উন্নতিকল্পে দিনাতিপাত করেছেন। দক্ষিণের বৈঠক খানার সামনে-পেছনে তিনি তাকালেন। শত বর্ষে পা রাখা একটা জৈতুন আর একটা কর্পুর বৃক্ষ যেন ঐতিহ্যমন্ডিত এই নওয়াব বাড়ির সেই ইতিহাসকে বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে। পুত্রগর্বিত নওয়াব সৈয়দ আলতাফ আলী মনস্থির করলেন পুত্র সৈয়দ মোহাম্মদ আলীর মাঝে তার এই গর্বিত অনুভব উৎসারিত করাবেন। তিনি ভালো করেই জানেন, ঐতিহ্যমণ্ডিত মহৎ হৃদয় ছাড়া সমাজের উন্নয়ন খুব কম মানুষকে দিয়ে হয়। তাছাড়া এই মুহূর্তে তার মাঝে ব্যাপকভাবে যে আকুলতা কাজ করছে তা হলো মৃত্যুর পরেও নিজ সন্তানের কর্মের মাঝে অনন্ত হয়ে থাকার বাসনা। জীবনের আয়ু হয়তো আর বেশি নেই। তিনি সহধর্মিনী সৈয়দ মেহেরুন নেছাকে ডেকে নিয়ে করতোয়ামুখী হয়ে বসলেন। সাদাটে ঘিয়ে আর উজ্জ্বল পাড়ের সুতী শাড়ি মেহেরুন নেছার পরিপূর্ণ, সরল অথচ মাধুর্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের আভিজাত্য যেন ধারণ করতে পারছে না। হাসোজ্জ্বল হয়ে তিনি নওয়াবের পাশে আসন গ্রহণ করলেন এবং স্মিত হেসে জিজ্ঞাসা করলেন,
সাত সকালে নবাবের উৎফুল্লতার হেতু জানতে পারি?
মেহেরুন নেছা আর আলতাফ আলী দুজনেই খেজুরের রস খেতে ভালোবাসেন। পরিচারক এসে সিংহখচিত পাত্রে নওয়াব-নওয়াবীকে খেজুর রস পরিবেশন করল। তৎক্ষণাৎ নওয়াব পাত্রটি হাতে নিয়ে এক চুমুকে অনেকখানি রস গলাধঃকরণ করে তৃপ্তির শ্বাস ফেললেন। মেহেরুন নেছা শাসনের ভঙ্গিতে বললেন,
এই বয়সে আমাদের ওমন ঢক ঢক করে রস খাওয়া কি ঠিক নবাব? স্নেহমাখা দৃষ্টিতে নওয়াব তাকালেন তার অর্ধাঙ্গিনীর পানে। বললেন
বেগম, সারাজীবন তোমার বাইরে অন্য কোনো নারীতে আসক্ত হইনি। মদের বোতল স্পর্শ করিনি। এটা আমার এক ধরনের গর্ব! মেহেরুন নেছার চোখ ছলছল করে উঠল। নওয়াব তার দিকে ঘুরে বসে বয়সের ভারে দুর্বল হয়ে আসা বেগমের কাঁধে হাত রাখলেন,
তোমার এই কাঁধে মাথা রেখে জীবনের যে অর্থ খুঁজে পেয়েছি, তোমার উন্নত স্কন্ধ আর সমুন্নত গ্রীবা আমাকে যে পরিপূর্ণ অনুভবে ভরে রেখেছিল তার তুলনা কোথায় বেগম? সারাজীবন আমার নেশা বলতে যা ছিল তা হলো এই পূণ্যতোয়া করতোয়ার কলকল বয়ে যাওয়ার পানে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকা। পুণ্ড্র বর্ধনের প্রাচীন ভূমিকে প্রাণভরে ভালোবাসা আর... আর তুমি। আজ না হয় একটু বেসামাল হলাম।
মেহেরুন নেছার অশ্রুসজল চোখেও ভ্রু-কুঞ্চিত হলো। তিনি নওয়াবের ভাবাবেগে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। চোখ মুছে, কণ্ঠের ভেজা আবেগ লুকিয়ে কম্পিত হৃদয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন,
কেউ কি কিছু বলে আপনাকে সত্যি দুঃখ দিয়েছে নবাব? কোনো ঘটনায় আপনি কি মর্মাহত?
না বেগম। বরং বলতে পারো ঘটেছে তার উল্টাটা।
আমাদের পুত্রের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার ফলাফল এই তো?
নারী-হৃদয় সূক্ষ্ম অনুভবসম্পন্ন। হৃদয় দিয়ে মেহেরুন নেছাকে মন প্রাণ উজাড় করে ভালোবেসে তিনি এই সত্যটি বুঝেছেন। নওয়াবের দার্শনিক সত্তা মনে মনে বলল, ‘সত্যিকারার্থে এক নারীকে গভীরভাবে ভালোবাসলে সমগ্র নারীকূলকে বোঝা সহজ হয়। যারা অনেক নারী দিয়ে নারী জাতিকে যাচাই করেন তাদের দার্শনিকতা নারীদের নিয়ে শেষমেশ ভুল বার্তাই পেয়ে থাকে হয়তো।’
মেহেরুন নেছার কথা এড়িয়ে গেলেন নওয়াব। যেন তার কথা শুনেননি এমন ভঙ্গিতে ভেতরের বয়ে যাওয়া রেশ তিনি প্রবাহিত রাখলেন
তোমার স্কন্ধে আর যৌবনে বয়সের যে আভা লেগেছে- তার মাঝেও আমি পরিপূর্ণ এক জীবনের সংকেত পাই। গভীর মমতা যার নাম। জীবনের এই পরিপূর্ণ আনন্দঘন ক্ষণে আমি একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি।
আনত, বয়সী দুই নেত্রকে পাঁপড়ির মতো খুলে দিলেন মেহেরুন নেছা। পূর্ণ দৃষ্টিতে প্রশ্ববোধক চোখে তিনি তাকালেন নওয়াবের চোখে। নওয়াব তার দৃষ্টির উত্তরে বললেন,
আমাদের পূর্ব পুরুষের পবিত্র রক্তধারার যে ঐতিহ্য তার ইতিহাসটা আমার পুত্রের জানা প্রয়োজন। বেগম, আমার ধারণা এই নওয়াব পরিবার অনেক সুকীর্তির ধারক হবে। আমি চাই আমার পূর্বপুরুষ সৈয়দ আহম্মদ হতে আমাদের বংশ ইতিহাস লিখে তা পুত্রের কাছে হস্তান্তর করতে।
নওয়াবের এমন ভালোবাসাপূর্ণ শব্দের ব্যবহারে মেহেরুননেছা তার প্রত্যুত্তরে সব শব্দ হারিয়ে ফেললেন। কিছুক্ষণ তিনি নওয়াবের মুখপানে তাকিয়ে থেকে বললেন,
বেশ তো! খুব ভালো হয়...
নওয়াব সেদিনই বারান্দায় করতোয়ামুখী হয়ে বসলেন। করতোয়াকে তার পবিত্র আর প্রাচীন পুণ্ড্র ভূমির মাতা বলে মনে হয়। করতোয়ার বয়ে আনা উৎকৃষ্ট পলির কারণেই এই অঞ্চলের ভূমিতে ফলে যে ফল আর ফসল, বিশ্বে তার তুলনা কোথায়? স্বাদ আর পুষ্টিই শুধু নয় এদেশের উৎপাদিত শস্য-ফল আর প্রকৃতিতে লুকানো কী এক যাদুকরী মায়া সুদূর ইরান থেকে আসা তার পূর্ব পুরুষদের এখানেই থিতু করল। আজীবনের জন্য। গভীর ভালোবাসায় করতোয়াকেই সাক্ষী মেনে তিনি দোয়াত কলম নিয়ে লেখা আরম্ভ করলেন-
‘ইরানের বাসিন্দা সৈয়দ আহম্মদ সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলের কিছুদিন পূর্বে শেলবর্ষ পরগণায় আগমন করেন। তিনি হযরত আবদুল কাদের জিলানীর বংশধর ছিলেন বলে লোকশ্রুতি আছে। শেলবর্ষ পরগণার প্রাচীনত্ব এবং এর সংস্কৃতির সাথে এই উর্বর ভূ-প্রকৃতি এবং খাদ্যবস্তুসমূহের অভূতপূর্ব স্বাদে মুগ্ধ হয়ে তিনি শেলবর্ষ পরগণায় স্থায়ীভাবে বসবাস আরম্ভ করেন। তখন সুবা বাংলার শাসনকর্তা ছিলেন নওয়াব শায়েস্তা খাঁন। শেলবর্ষ পরগণার ইজারাদার দুনী চাঁদ সম্রাটের খাজনা দেওয়ার বদলে বিলাস-ব্যসনে মত্ত ছিলেন। এই সুযোগ গ্রহণ করলেন সৈয়দ আহম্মদ। নওয়াব শায়েস্তা খাঁনের সাথে সুসম্পর্ক থাকার সুবাদে তার সুপারিশ সম্বলিত একটি আবেদনপত্রসহ মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে হাজির হলেন তিনি। সম্রাট তার আবেদনপত্র গ্রহণ করলেন এবং দুনী চাঁদের পরিবর্তে সৈয়দ আহম্মদকে শেলবর্ষ পরগণার চৌধুরী ঘোষণা করলেন (১৬৬২-১৬৭০ খ্রিঃ)। এই বংশ পরম্পরার পরবর্তী বংশধর তহুরুন্নেছাকে বিবাহ করেন আব্দুস সোবহান চৌধুরী। বৈবাহিক সূত্রে বগুড়ায় এসে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের জমিদার মীর মসনদ আলীর পুত্র আব্দুস সোবহান চৌধুরী টাঙ্গাইলে আর ফিরে যাননি। যৌবনে কলকাতায় ব্যবসা করে তিনি প্রভূত সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন এবং কলিকাতাবাসীগণের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। ১৮৯৮ সালে ব্রিটিশ সরকার আব্দুস সোবহান চৌধুরীকে নওয়াব উপাধিতে ভূষিত করলেন। এই উপাধি প্রদানকালে বাংলার লেফটেন্যান্ট চার্লস এরিয়েট তার ভাষণে বললেন ‘সৈয়দ আব্দুস সোবহান চৌধুরী সাহেব, ভারত গভর্নমেন্ট আপনাকে নওয়াব উপাধি প্রদানপূর্বক এই সনদ প্রদান করছেন। প্রভূত ভূ-সম্পদের অধিকারী হয়েও জনগণের প্রতি আপনার বিবেচনাপূর্ণ সদ্ব্যবহার সরকারের প্রশংসা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও ছাত্রবৃত্তি স্থাপনপূর্বক তাদের ব্যয় মুক্তহস্তে প্রদান করে আপনি স্বীয় জেলায় শিক্ষা-বিস্তারে যথেষ্ট সহায়তা করেছেন। এতদ্ব্যতিত আপনি নারীদের চিকিৎসার জন্য দাতব্য চিকিৎসালয় সংস্থাপনকল্পে ২৫ হাজার টাকা দানকরত জেলার স্বাস্থ্যোন্নতি বিষয়ে যথেষ্ট যতœবান হয়েছেন। এ সকল কারণে আমি ভারত গভর্নমেন্ট সমীপে আপনার সৎ কাজের পুরস্কার স্বরূপ ‘নওয়াব’ উপাধি প্রদানের নিমিত্তে প্রস্তাব করেছিলাম। আমি আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে আপনার গুণাবলীর স্বীকৃতিস্বরূপ গভর্ণমেন্ট এই নওয়াব সনদ প্রদান করেছেন।’ ‘নওয়াব’ উপাধি প্রাপ্তির পর আব্দুস সোবহান চৌধুরী স্ত্রী তহুরুন্নেছার নামে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালে নারীদের বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। এরপরই তিনি বগুড়া শহরের ভেতর দিয়ে ফুলছড়িঘাট পর্যন্ত রেল লাইন স্থাপনের জন্য ব্রিটিশ সরকারকে অনুরোধ জানালেন এবং এই রেলপথ বসানোর জন্য তিনি রেল-কোম্পানিকে সমুদয় জমি দান করলেন। বগুড়ার ইতিহাস রচনার জন্য তিনি সক্রিয় হয়ে পন্ডিতদের জন্য অর্থ বরাদ্দ ব্যবস্থা প্রবর্তন করলেন।
সুলতান বলবনের পুত্র নাসির উদ্দিন বুগড়া খান বিদ্রোহ দমনের জন্য শেলবর্ষ পরগনায় (যা পাবনা-সিরাজগঞ্জ ও ময়মনসিংহ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল) আগমন করেন। এখানে এসে তিনিও এই ভূমির প্রেমে পড়েন। তিনি বঙ্গদেশকে এত ভালোবেসে ফেলেন যে তার পক্ষে আর দিল্লির মসনদে ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তার নামে স্থাপিত হয় বুগড়া মোকাম এবং তার মৃত্যুর পর তাকে বুগড়া মোকামে সমাধিস্থ করা হয়। তার নামানুসারে শেলবর্ষ পরগনা বুগড়া থেকে ‘বগুড়া’ শব্দে রূপান্তরিত হয়েছে।’
এটুকু লিখে নওয়াব থামলেন এবং হঠাৎ মনের আবেগ থেকে উঠে আসা ইতিহাস বিবর্জিত একটা বাক্য লিখে বসলেন
‘ভালোবাসা আসলে বৃথা যায় না! ১৬৯৮ খ্রিঃ সৈয়দ আহম্মদের মৃত্যুবরণে তার পরবর্তী বংশধরগণের মাঝে’... এ পর্যন্ত লিখে একটা অবান্তর প্রসঙ্গে গিয়েছেন সৈয়দ আলতাফ আলী, যেন হঠাৎ তার চৈতন্যোদয় হয়েছে।
‘কিন্তু এই নওয়াব প্যালেসের ইতিহাস লেখার চেয়ে জরুরি হলো পুণ্ড্র জাতি এবং এই বঙ্গের প্রাচীন রাজধানী পুণ্ড্র বর্ধনের ইতিহাস জানা। আমাদের নওয়াব প্যালেসের লাইব্রেরি কক্ষের কোনো একটি গ্রন্থে পাটলিপুূত্রের সম্রাট অশোকের জীবনলিপি সংগৃহীত আছে। কোনো একটি গ্রন্থে সংস্কৃত শ্লোকে অশোকের সমাধিস্থলেরও নির্দেশ আছে। বিলাসব্যসনে যে জীবন অতিক্রান্ত হয় তার পক্ষে এতবড় গ্রন্থাগার খুঁজে সেই সংস্কৃত শ্লোকের মমার্থ বের করা সম্ভব নয়। বড় বিলম্ব হয়ে গেছে। বিলম্বের ভুল! আর একটা ব্যাপারÑ’ এইটুকু লিখে নওয়াব আর লিখতে পারেন নি। তার মৃত্যুর পর তরুণ মোহাম্মদ আলীর কাছে বাবার হাতে লেখা এই কয়েকটা পৃষ্ঠা ইতিহাসের চেয়ে স্মৃতি হিসাবেই সংরক্ষিত হয়ে থাকল।
আলতাফ আলী চেয়েছিলেন তার কলকাতাস্থ ‘মিটিয়াব্রুজ’ প্যালেস থেকে প্রকাশিত ‘মেহের’ এবং ‘সুধাকর’ পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লেখাটি প্রকাশ করাবেন।
কৃষ্ণচূড়ার একটা ডাল নুয়ে আছে নির্ঝরের দোতলার শোয়ার ঘরের জানালায়। থাই গ্লাসে থোকা থোকা অগ্নিরঙের ফুল খোঁপায় গুঁজিয়ে নিয়ে কৃষ্ণচূড়ার এই ডালটা যেন আয়নায় নিজের রূপ দেখে অবিশ্বাসী মুগ্ধতায় মগ্ন। টিপ টিপ বৃষ্টি ঝরছেই। সানজিদা এক গ্লাস দুধ নিয়ে ছেলের শোবার ঘরে গিয়ে অবাক হয়ে তার এলেমেলো বিছানার দিকে তাকালেন। কাগজ, বইপত্র, অনেক পুরানো ম্যাগাজিন, পেপার বিছানার ওপর ছড়ানো। সাথে গৌতম বুদ্ধের ধ্যানরত মূর্তির একটা ছবি। প্রিন্টারে মাত্র প্রিন্ট হওয়া একটা কাগজ। সানজিদা প্রিন্টেড পেপারটা হাতে নিলেন। জার্মানির নাৎসী বাহিনীর পতাকায় ব্যবহৃত প্রতীকের প্রিন্ট নিয়েছে নির্ঝর। ভোর হলেই কর্মস্থল ঢাকা চলে যাবে তার ছেলে। কিন্তু এই শেষ রাতটাতে ছেলের এইসব কর্মকাণ্ডে বিরক্ত হলেন সানজিদা। গলা উঁচিয়ে তিনি নির্ঝরকে ডাকলেন,
নির্ঝর? লাইব্রেরি থেকে কয়েকটা বই হাতে বের হতে হতে নির্ঝর উত্তর দিল,
আসছি মা। এক গাদা বই হাতে নির্ঝরের দিকে শাসনের দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকালেন সানজিদা। বইগুলো টেবিলে রেখে লক্ষ্মী ছেলের মতো গ্লাসের সবটুকু দুধ ঢক ঢক করে খেয়ে ফেলল সে। নাৎসী বাহিনীর পতাকার মাঝখানের প্রতীকের প্রিন্টেড পেপার দেখিয়ে সানজিদা জিজ্ঞাসা করলেন,
এই অসভ্য হিটলারকে নিয়ে এত সাধনার কারণটা কী? আমি স্পষ্ট করে বলছি- এই মানুষটাকে নিয়ে তুই কিছুই লিখবি না। নির্ঝর অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল,
কেন মা?
মানবতা-বিধ্বংসী জঘন্য কাজ করে একটা মানুষ পৃথিবীর ইতিহাসে এতদিন আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকুক আমি চাই না।
হিটলার আমার লেখার দ্রষ্টব্য নন।
তাহলে? তার বাহিনীর ফ্লাগের এই প্রতীক?
ঠিক এই প্রতীকটাই আমার গবেষণার বিষয়।
মানে? মায়ের প্রশ্নের উত্তর নির্ঝর তৎক্ষণাৎ দিল না। বৌদ্ধ মূর্তির ছবিটা সে কম্পিউটার জুম দিয়ে বড় করল। সানজিদাকে বলল,
মা, এই ছবিটার দিকে মনোযোগ সহকারে চোখ রাখো। সানজিদা আগ্রহভরে গৌতম বুদ্ধের মূর্তির ছবিটায় চোখ রাখলেন। নির্ঝর গৌতম বুদ্ধের গলায় ঝুলানো একটা লকেটে কম্পিউটার কারসার নির্দিষ্ট করিয়ে মায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। সানজিদা বিরক্ত হয়ে বললেন,
কতদিন ধরে বলছি, বিয়ে কর। বউ ঘরে থাকলে চলে যাবার আগের এই মধ্যরাতে নাৎসী বাহিনী আর গৌতম বুদ্ধ নিয়ে তোর এই পাগলামির... সানজিদার মুখের কথা কেড়ে নিল নির্ঝর,
বারোটা বাজত! তাইনা মা? সেজন্যই তো আমি বিয়ে করতে চাই না। যাহোক দ্যাখো, গৌতম বুদ্ধের বুকে ঝুলানো লকেটে যে চিহ্ন অথবা প্রতীক, তোমার হাতে ধরে থাকা প্রিন্টেড পেপারে সেই একই প্রতীক।
তাতে সমস্যা কী? হিটলারের মতো জঘন্য মানুষ যুদ্ধ বিগ্রহেই শান্তির মিথ্যা অন্বেষণ করতে পারে। গৌতম বুদ্ধের ব্যবহার করা প্রতীক সে ব্যবহার করতেই পারে।
হুমম... সমস্যাটা সেখানে নয় মা। ড. আরশাদ আকাশ বাতে কাবু শরীরটা নিয়ে কখন এসে নির্ঝরের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়েছেন। নির্ঝরের বিছানায় বসতে বসতে তিনি বললেন,
নির্ঝর কোথাও মনে হয় ভুল হচ্ছে। বাবাকে ধরে তার পিঠের পেছনে বালিশ রেখে নির্ঝর তাকে বসিয়ে দিল। ভ্রু কুঁচকে আরশাদ ছেলের মুখ পানে তাকালেন। তিনি তার বাক্যটা শেষ করলেন,
নাৎসীরা যদি আর্য না হয়ে থাকে তাহলে নাৎসী বাহিনীর পতাকা হুবহু আর্যদের পতাকা অনুসরণ করে তৈরি করা। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো নাৎসীরা আর্যদের এই পতাকা হাজার বছরেরও বেশি সময় পর কীভাবে পেল?
এই উত্তর নির্ঝরের জানা নেই। প্রত্যুত্তরে সে বলল,
বাবা ইতিহাসকে দর্শনশাস্ত্র আর সাহিত্যের সাথে যোগ করে দিলে এর একটা উত্তর আমার কাছে স্পষ্ট হয়।
কী রকম?
জার্মানরা জেনে গিয়েছিল গৌতম বুদ্ধের মূর্তির বুকের অঙ্কিত এই চিহ্নটুকু ভারতবর্ষের প্রাদেশিক রাজধানী পুণ্ড্র বর্ধনের পতাকার প্রতীক মাত্র। পুণ্ড্র সভ্যতার প্রতীক এবং পরবর্তীকালে গৌতম বুদ্ধের গলার লকেটে খুদিত স্বস্তিকা চিহ্নটি তারা চুরি করেছে। ভারতীয় সভ্যতা ইউরোপীয় সভ্যতার চেয়ে অনেক প্রাচীন। আজ হতে বারো থেকে চৌদ্দশত বছর আগেই ইউরোপীয়রা নরখাদক ছিল। সুতরাং তারা নয়, আর্যরা আসলে ভারতবর্ষীয়।
সানজিদা বিরক্ত হয়েও তাদের আরো সংলাপ শোনার লোভ সামলাতে পারলেন না। চেয়ার টেনে বসতে বসতে তিনি বললেন,
এক ইতিহাসের অধ্যাপকের স্ত্রী আর লেখক-সন্তানের মা হওয়া হিটলারের মা হওয়ার চেয়ে কম কিছু নয়। তোদের এই জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শুনতে শুনতে আমার জীবন অতীষ্ট। আরশাদ থামালেন সানজিদাকে,
তাহলে কষ্ট করে এই আলোচনা না শুনে তুমি বরং বিশ্রাম নাও। সানজিদা ঝাঁজের সাথে বললেন,
হুমম... আমি গিয়ে ঘুমাই আর কাল আমার ছেলে যাওয়ার পর ছেলের কথাগুলো নিজের আর নিজের ভুল তথ্যগুলো ছেলের বলে চালিয়ে দিয়ে সারাদিন আমার কানের পোকা উদ্ধার করো। তাই না ?
নির্ঝর মুখ টিপে হাসল। আর তখনই বাইরে কড়ড়-কড়-ক্বরাৎ শব্দে আকাশ বিদীর্ণ করা বজ্রপাত হলো। গায়ের শালটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে আরশাদ বললেন,
তুমি ইতিহাসের অধ্যাপকের স্ত্রী হয়ে কিছু না জানলেও, একজন লেখকের মা হিসাবে তোমার...
মহাভারত মুখস্থ করতে হবে?
বাবা-মায়ের মধুর এই ঝগড়া আর বাড়তে দিল না নির্ঝর । সে বলল,
হ্যাঁ বাবা, আমার এই ধারণার পক্ষে দলিলপত্র না থাকলেও অনেক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের যোগসূত্র আছে।
যেমন?
বাবা, চাইনিজ পরিব্রাজক ইয়ান চুয়াং পুণ্ড্র বর্ধনের ৬ কি.মি.পশ্চিমে অবস্থিত ভাসুবিহার পরিদর্শন করেছিলেন। তার লেখা থেকেই বলছি...
হঠাৎ সানজিদা নির্ঝরের ডায়েরি খুলে নির্ঝরের লেখাগুলো আবৃত্তির ঢঙে বলতে আরম্ভ করলেন-
‘অনেক বছর আগে হেমন্তের এমনি এক কুয়াশাভেজা রাতে আমি জন্মেছিলাম। তিনদিনের প্রসব বেদনায় মৃতপ্রায় আমার মাকে বিধ্বস্ত করে। আমি জন্মেছিলাম প্রাচীন ক-লু-তু আর আজকের করতোয়া বিধৌত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পলির সমৃদ্ধ জনপদ পুণ্ড্র বর্ধনে। ৬৩৯ খৃষ্টাব্দে হিউয়েন সাং যে ভূমিতে প্রবাহিত নদীকে পূণ্যতোয়া আর জনপদকে সভ্যতার লীলাভূমি বলেছিলেন। আমি জন্মেছিলাম সেই ভূমিতে, চীনের মহা প্রাচীর নির্মাণের অনেক কাল আগেই নির্মিত হয়েছিল এই মহা প্রাচীর। যেখানে (পুণ্ড্র বর্ধন-ভাসুবিহার) পূর্বদেশীয় আর এদেশীয় সাতশ ভিক্ষু-ছাত্র নিয়ে ১২৫ কক্ষবিশিষ্ট মহাবিদ্যালয় অধিষ্ঠিত ছিল। গৌতম বুদ্ধ যেখানে তিন মাস অবস্থান করে তাদের দীক্ষা দিয়েছিলেন। যখন গ্রিস মাত্র পড়ালেখা আরম্ভ করেছে আর ইউরোপ বিদ্যাচর্চা শুরুই করেনি (যদিও আজকে চরম উদাসিন জাতির ধারক হিসাবে, বঙ্গসন্তানগণ ইংরেজি জীবনাচরণকে বিশেষ ‘সচেতনতা’ ভাবেন)। আমি জন্মেছিলাম সেই সাম্রাজ্যে যেখানে প্রজাদের দুর্দশা লাঘবে আড়াই হাজার বছর আগে, সম্রাট অশোকের আমলে খ্রিঃ পূঃ ২৭৩ -২৩৬ অব্দের কোনো এক সময় বাংলালিপিতে অশোকীয় ব্রাক্ষ্মীলিপিতে পুংদংগলের গভর্নর ধর্মমহামাত্যকে রাজভান্ডার খুলে দেওয়ার নির্দেশ উৎকর্ণ করা হয়েছিল। সেই ভূমিতে আমি জন্মেছিলাম যেখানে ভারতবর্ষের প্রথম সংস্কৃত কলেজ সোমপুর প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। অষ্টম শতাব্দীতে যে ভূমিতে পা রেখে কার্কট বংশীয় কাশ্মীররাজ জয়াপীড় কমলা নামের এক নারীর নৃত্য-কলায় বিমুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ে করেছিলেন। পুণ্ড্র সভ্যতা রক্ষার কৌশল হিসাবে ‘ভীমের জাংগাল’ নামে পরিচিত যে মহারাজপথটি ভূমি হতে ১৫ থেকে ৩০ ফুট উঁচু হয়ে সিরাজগঞ্জ থেকে ঘোড়াঘাট-দিনাজপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল (কারো কারো মতে এই মহারাজপথটি টাঙ্গাইল হয়ে গাজীপুর-মধুপুর, ভাওয়াল-নরসিংদী-ময়মনসিংহ হয়ে চট্টগ্রাম ও সিলেটের সাথে যুক্ত ছিল আর উত্তরে উড়িষ্যা-সিংভূম-মানভূমের পাহাড়ি এলাকার সাথে সংযুক্ত ছিল)।
ধন্য আমি; জন্মেছিলাম এমন মায়ের কোলে কবিতা যার মুখে আজও ক-লু-তু নদীর মতোই প্রবহমান। বাংলাভাষার সূতিকাগার, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ফকির মজুন শাহর ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ এবং ওয়াহাবি আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু তথা প্রাচীন পুণ্ড্র বর্ধন আর শেলবর্ষ পরগণা হয়ে এই বগুড়ায় তথা বঙ্গদেশে জন্মগ্রহণ করে যে গর্বে আমি গর্বিত ঠিক সেই কারণে আজ সমানভাবে দুঃখিত! গর্বিত হওয়ার মতো এমন ইতিহাস আর ঐতিহ্য মিথ আর সংস্কৃতি থেকেও আমাদের অস্তিত্ব-মনন-মজ্জা বড় ফাঁপা আর ফাঁকা। আমাদের আভিজাত্য হারিয়ে যাচ্ছে নিষ্ঠুর সামাজিক-নিরাপত্তাহীনতার পেষণে।’
দিনলিপি বন্ধ করে সানজিদা আবেগি অশ্রুত স্বরে বললেন,
আমার ছেলের জন্মদিনে সে এই লেখাটা লিখেছে। প্রফেসর, এইটুকু লেখার জন্য শুধু ইতিহাস জানলে হয় না, হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা দিয়ে শব্দের ছন্দপ্রবাহ জানতে হয়। বলেই সানজিদা চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে নির্ঝরকে জড়িয়ে কপালে চুমু দিয়ে বললেন,
ঢাকা যাবার সময় তোর এই দিনলিপিটা রেখে যাবি। অনেকগুলো কবিতা লেখা আছে এখানে। আমি বসে বসে পড়ব।
সানজিদা ছেলের উপন্যাস, আর ছোটগল্পগুলো মুগ্ধ হয়ে পড়েন। কবিতার এই শব্দগুলো নির্ঝর যেন তারই অন্তরের অন্তস্থল কেটে কেটে, ঘেঁটে-ঘেঁটে, খুঁজে খুঁজে সানজিদারই ইচ্ছামাফিক ছন্দে বসিয়েছে। সানজিদা সন্তানের এই শব্দ সম্ভারের দ্যোতনায় লুকানো অনুভবের সাথে বড় একাত্মতা অনুভব করেন।
সানজিদা ছেলের লেখা কবিতাগুলোকে নিজেরই লেখা কবিতা ভেবে মাঝে মাঝেই ভুল করেন। শুধু মনে হয় অনেক অনেক কাল আগে তিনি ঠিক এভাবেই ভেবেছিলেন। তার ভাবনাটা নির্ঝর যেন ঠিক ধরে ফেলেছে। দিনলিপির একখানে নির্ঝর লিখেছে-
‘দিনের যত আলো, রাত তা ধরে রাখে না
আনমনা হয়েও তবু কেন তোমায় ভুলি না?
চোখের যত পাপড়ি, জল তো থাকে না
শুকিয়ে গিয়েও অশ্র“, মনের কান্না কেন থামে না?
বৃষ্টির যত ফোঁটা বাতাস তা ধরতে পারে না
অ-ধরা তুমি যে আজ, মন কেন বুঝেও বোঝে না?
রাত থাকে দিনের কোলে দেখা তো যায় না
ঘুমিয়ে গিয়েও স্বপ্ন তুমি, স্মৃতি কেন হারায় না?
প্রকৃতির এত লীলা গাছদের নেই খেলা
তুমি না থেকেও তুমিই কেন থাকো সারাবেলা!’
এই কবিতা পড়লেই সানজিদার নির্ঝরকে গর্ভে ধারণের দিনগুলো মনে পড়ে। নির্ঝরের বাবা তখন ইংল্যান্ডে পিএইচডি ডিগ্রি নিতে ব্যস্ত শহর প্রান্তের অনেক বড় বাড়িটার অসংখ্য বৃক্ষ-ফুল আর ফলই যখন তার সঙ্গী। আর সঙ্গী তার গর্ভে দিন দিন বড় হয়ে ওঠা সন্তানের জন্য শুভকামনার অনন্ত মুহূর্তগুলো। কোনো ফুল অথবা ফলের সামান্য গন্ধেই যখন ভেতরটায় কেমন এক অনুভূতি মোচড় দিয়ে যেত। অকারণে আঁষটে গন্ধ পাওয়া অবুঝ নাসারন্ধ্র তাকে তলিয়ে দিত অবশ বিবশতায়। এই অনুভূতির মাঝে ছোটবেলার স্মৃতিগুলো তার গর্ভের অনাগত সন্তানের সাথে এক দৃশ্যকল্প তৈরি করত। ছোট্ট সানজিদা তার গর্ভের অস্তিত্বময় এক শিশুর হাত ধরে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে তারই দিকে যেন তাকিয়ে আছে। সেই দিনগুলো! এই কবিতা পড়লে সেই দিনগুলোর প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে স্পষ্ট হয়। সানজিদার শুধু মনে হয় এই কবিতার সবগুলো শব্দ ঐ মুহূর্তে তার ভেতরেও গুণগুণ করেছে। কী করে নির্ঝর তার সেই একান্ত অনুভব টের পেল?
সানজিদা এই গভীর মগ্নতায় যখন ডুবে আছে তখন আর্যদের পতাকা নিয়ে আগ্রহান্বিত আরশাদ ভাবাবেগ কাটিয়ে উঠতে নির্ঝরকে প্রশ্ন করলেন,
জার্মানরা যদি সত্যিই জেনে যায় এই পতাকা পুণ্ড্র বর্ধনের...
বাবা একটু সংশোধনি আছে; কর্তা জার্মানরা জানত ওটা আর্যদের পতাকা, আমার ধারণা সাধারণ জার্মানি অথবা নাৎসীদের কাছে এই সত্য গোপন করেছেন তারা।
কোন সত্য?
...যে ওটা রাজধানী পুণ্ড্র বর্ধনের তোরণে উড়তে থাকা শান্তির প্রতীক। ঐ পতাকা পুণ্ড্র নগরীর পতাকাÑ এ কথা অন্য জার্মানিরা না জানলেও হিটলার তা জানতেন।
কিন্তু খোকা, হিটলার কেন নাৎসী বাহিনীর পতাকা হিসাবে শান্তিপ্রিয় পুণ্ড্র বাসীর পতাকা বেছে নিলেন?
হিটলারের শৈশব অধ্যায়ন করলে এই উত্তরটা পাওয়া যাবে। মনে মনে হিটলার পরম শান্তিময় এক বিশ্ব কামনা করতে গিয়ে অন্যান্যদের যুদ্ধ করার সকল সামর্থ কেড়ে নিতে চেয়েছিলেন। আরশাদ বললেন,
তোমার যুক্তিটা খুব জোরালো নয়। তাহলে গৌতম বুদ্ধের প্রতীমার বুকে পুণ্ড্র বর্ধনের পতাকার প্রতীক কেন?
মা একটু আগেই আমার ডায়েরিতে লেখাটুকু পড়েছে। বাবা, গৌতম বুদ্ধ ধর্ম প্রচার অথবা তার অনুসারীদের দীক্ষাদান যে কারণেই হোক পুণ্ড্র বর্ধনে বেশ কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন। গৌতম বুদ্ধ কোনো নগরীতে আশ্রয় নিতেন না । পুণ্ড্র সভ্যতায় যে অশোক-স্তূপ নির্মাণ করা হয়েছিল সেখানেই মহান এই অতিথি অবস্থান করতেন। পুণ্ড্র র শান্তিপ্রিয় কোনো রাজা শান্তির বাণী প্রচারক মহান এই ব্যক্তিকে নিশ্চয়ই কোনো স্মৃতিস্মারক ব্যতিত শুধু শুধু বিদায় জানান নি। পুণ্ড্র বর্ধনের পতাকায় ব্যবহৃত রঙ আর প্রতীক সমন্বিত লকেটটি তিনি হয়তো তার অতিথিকে উপহার দিয়েছিলেন।
আরশাদ সোজা হয়ে বসলেন। কথাগুলো তার বেশ মনে ধরেছে। শান্তভাবে তাকিয়ে থাকা তার নিমীলিত দৃষ্টি বিছানার চাদরে প্রক্ষিপ্ত করে তিনি অস্ফুটস্বরে বললেন,
ইয়েস... ইয়েস! খুব যুক্তিসংগত কথা। পৃথিবীতে এমন রাজধানী আর কোথাও পাওয়া যাবে না যেখানে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ বিগ্রহ, ষড়যন্ত্র আর রক্তারক্তির ইতিহাস নেই। এখনো এই অঞ্চলের বাসিন্দারা শান্তিপ্রিয়। তাদের মায়া, মমতা এবং ভালোবাসার ধরণ গভীরতর। পুন্ড্রে যারা একবার এসেছে তারা আর ফিরে যেতে চায় নি।
কিন্তু বাবা দ্যাখো, এই শান্তিপ্রিয়তার কারণে এই পুণ্ড্র সভ্যতা আজ ইতিহাস-বিস্মৃত। তার চেয়ে ইখতিয়ার উদ্দিন বিন বখতিয়ার খিলজি ইতিহাসে সক্রিয়। আর সবচেয়ে সক্রিয় হিটলার।
সানজিদা তিন কাপ চা দিতে বলেছিলেন শ্রাবণীকে। এই আলাপচারিতায় এখন আর তিনি আগ্রহ খুঁজে পাচ্ছেন না। আবার এর ভেতরে অনাগ্রহের কোনো কারণও নেই। আগামিকাল নির্ঝর চলে যাবে। বৃষ্টিমুখর এই রাতে ছেলেকে বিয়ের জন্য আগ্রহী করতে চেয়েছিলেন সানজিদা। তা করতে না পারলেও চা খেতে খেতে চুপচাপ বাপ-ছেলের কথোপকথোন আর বাইরের টিপ-টিপ বৃষ্টি উপভোগের জন্য এখানেই বসে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। আরশাদ বললেন,
একটা ব্যাপারে সন্দেহ থেকেই যায়। গৌতম বুদ্ধের বুকের ঝুলানো লকেটের প্রতীক বলো অথবা রাজধানী পুণ্ড্র বর্ধনের পতাকার মাঝখানে আঁকা প্রতীকই বলো- সেটা কীভাবে হিটলারের কাছে পৌঁছাল?
বাবা এটা তো তোমার ভালো করেই জানা আছে, এককালের বিশাল করতোয়ার নৌপথের কারণে একদিকে গাঙ্গেয় সভ্যতার সাথে অন্যদিকে জাভা-শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া হয়ে ভারত ও আরব সাগর বেয়ে প্রাচ্য এবং রোম সাম্রাজ্যের সাথে শক্তিশালী যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল। এমনও তো হতে পারে বিপ্লবের কালে ব্রিটিশদের তাড়ানোর প্রেক্ষাপট নিয়ে নেতাজি সুভাস চন্দ্র বসু, যিনি যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে ব্রিটিশদের মিত্র বাহিনীকে পরাজিত করে ইমফল এবং ব্রক্ষ্মদেশ দখল করে নেন; তিনি যখন হিটলারের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন হয়তো তিনিই হিটলারকে তার পতাকায় স্বস্তিকা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
সানজিদা এই আলোচনা থামানোর জন্য সক্রিয় হয়ে উঠলেন,
প্রফেসর, অনেক হয়েছে... এখন দয়া করে তুমি ওঠো।
তুমি তাহলে বসে আছ কেন?
নির্ঝরের সাথে আমার কথা আছে। আমার ছেলের সাথে একান্তে কিছু কথা বলার ছিল।
ওহ! ছেলেরা বড় হলে তারা মায়েদের ‘একান্ত’ হয়ে যায়? আরশাদ ছেলের মাথা ছুঁয়ে শুভরাত্রি জানালেন। তিনি চলে যাওয়ামাত্র আনমনে নির্ঝর হঠাৎ বলল,
মাহজাবিন... প্রিন্সেস মাহজাবিন!
ছেলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শব্দটা হ্নদয়াঙ্গম করার চেষ্টা করলেন সানজিদা। শব্দটা কোনো একটা নারীর নাম বুঝতে পেরে তার ঠোঁটে স্মিত হাসি ফুটল। ছেলের পছন্দের কোনো মেয়ে আছে ভেবে তিনি খুশি হয়ে উঠলেন,
তোর কাছে ওর ছবি আছে...? মায়ের প্রশ্নে যেন সম্বিৎ ফিরল নির্ঝরের,
ছবি? কার ছবির কথা বলছ মা?
এই যে তুই যেন কার কথা বলছিলি। মনে হয় আদর করে তুই তাকে ‘প্রিন্সেস’ ডাকিস!
একটু শব্দ করেই হাসল নির্ঝর। মায়ের কাঁধে আদুরে ভঙ্গিতে দুহাত রেখে, চোখে আনমনা এক মগ্নতা মেখে বলল,
মাহজাবিন! হ্যাঁ মা, মাঝে মাঝেই আমি এই স্বপ্নটা দেখি, একজন নারী অন্ধকার গভীর রাতে আমাকে পথ দেখাতে দেখাতে এক সমাধিস্থলে নিয়ে যাচ্ছে। তার শরীর হতে বিচ্ছুরিত বিভা যেন অন্ধকারেও একটা সমাধি স্পষ্ট করে তোলে। সমাধির সম্মুখপ্রান্তের মার্বেল পাথরের দেওয়ালে পুন্ড্রের পতাকার মাঝখানের প্রতীক আঁকা। প্রতীকটার দিকে আমি অনিমেষ তাকিয়ে থাকি। একসময় পতাকার প্রতীক অঙ্কিত চিহ্ন দুটি চাকা-দৃশ্য হয়ে যায়। চাকাটি ঘুরতে থাকে আমার চোখের সামনে। ঘুরতে থাকা সেই চাকাটি দেখি শিশুর হাতে ধরা একটা খেলনা। যে খেলনায় বাতাস লেগে ঘুরতে থাকে। হাতে ধরে থাকা ঐ খেলনাটি যে ধরে থাকে সে আর কেউ নয়, সমাধিস্থলে আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া ঐ নারী। আমার দিকে তাকিয়ে তিনি স্মিত হাসেন। আমি তাকে প্রশ্ন করি,
এটা কার সমাধি? তিনি উত্তর দেন, ‘এটা রাজা অশোকের সমাধি।’ পাটলিপূত্রের রাজা অশোকের সমাধি এখানে? আপনি কে? ‘পাটলিপূত্রের হলেও তার আত্মাটা এখানে, এই পুন্ড্রে। আমি মাহজাবিন... প্রিন্সেস মাহজাবিন! ’
ছেলের ভাবাবেগ পছন্দ হলো না সানজিদার। যিনি কবিতা ভালোবাসেন তিনি আবেগের চেয়ে বাস্তবতা দিয়ে জীবনকে সাজাতে মরিয়া হয়ে প্রশ্ন করলেন,
মেয়েটা কোথায় থাকে বলতো? আমি তাদের বাসায় কালকেই যাব।
মা তাকে তো আমি নিজেই খুঁজছি।
চুপ করে ভ্রু কুঁচকে সানজিদা তাকালেন ছেলের চোখে। ছোট্টবেলার এক দৃশ্য তার মনে পড়ল, নির্ঝরকে গোসলের জন্য সারাবাড়ি আর বাগানে দোড়াদৌড়ি করে যখন তিনি তাকে ধরতেন তখন নির্ঝর ফিক ফিক করে হাসলেও সানজিদা হাঁপাচ্ছেন। মাকে খুশি করার জন্য নির্ঝর তার ডানহাত নিজের হাতে নিয়ে, তালুর উল্টাপৃষ্ঠে চুমো দিয়ে বলছে,
মাই প্রিন্সেস! সানজিদাকে একরাশ লজ্জা এসে গ্রাস করত। স্বামী-স্ত্রী মিলে তারা তখনকার একমাত্র টিভি চ্যানেল বিটিভিতে ‘মুভি অব দ্য উইক’ দেখছিলেন। বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা চার বছরের ছোট্ট নির্ঝর কখন চোখ মেলে নায়ক-নায়িকার প্রেম দৃশ্য দেখে ফেলেছিল। তারই হুবহু নকল করে নির্ঝর তাকে ফেলেছে লজ্জায়। কিন্তু প্রথমদিন লজ্জা পেলেও ছেলের কাছ থেকে ঐ বাক্যটাই বার বার শোনার জন্য তার ভেতরটা পিপাসার্ত হয়ে থাকত। ঘুমানোর আগে ছোট্ট নির্ঝরের দিকে সে তার হাত বাড়িয়ে দিত। মজার ব্যাপার হলো অন্ধকারে নির্ঝর চুমোটা শব্দ করে দিত।
মাই প্রিন্সেস! বলেই সে তার মায়ের গায়ের ওপর ছোট্ট চিতা বাঘের মতো লাফিয়ে উঠে তার বাবাকে ধমকে দিত,
বাবা - মাকে ‘মাই প্রিন্সেস’ বলো!
সুতরাং আরশাদও সানজিদার হাতে আলতো চুমো দিয়ে বলতেন,
মাই প্রিন্সেস! নির্ঝর আবারো লাফ দিয়ে বাবার পাশে নিজেই শুয়ে আবার তার বাবাকে নাইট-কিস দেয়া শেখাত,
ওভাবে নয়। এই যে এভাবে! বলে সে শব্দ করে সানজিদার হাতে চুমো দিত। অর্থাৎ আরশাদকে শব্দ করে চুমো দিতে হবে। আরশাদ আবার শব্দহীন "কিস’ দিলে সানজিদা হেসে বলতেন,
আকাশ ছেলের মতো একটু স্মার্ট হও। ও তোমাকে ওর মতো শব্দ করে চুমো দিতে বলছে এবং ওর মতো মিষ্টি করে ‘মাই প্রিন্সেস’ বলতে বলছে। সুতরাং আরশাদকে এবার প্রাণময় হতেই হয়। অন্ধকারে চোখের ভাষার প্রকাশ থাকে না বলে প্রকাশময় উচ্ছাসে ভালোবাসা প্রকাশ করতে হয়। নির্ঝর সেই বয়সে কিছু না বুঝেই তাদের দুজনের চেয়ে বেশি বুঝেছিল-সব শিশুই বোঝে হয়তো। আর এক সন্তান এবং স্বামীর মাঝখানে প্রিন্সেস হয়ে পরম শান্তির পরিতৃপ্ততায় সানজিদা ঘুমিয়ে যেতেন। ঘুমন্ত সানজিদার ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে থাকত একরাশ হাসির অনুরণন। মনে মনে তিনি বলতেন- ‘তোকে আমি সত্যি সত্যি এনে দেবো এক প্রিন্সেস, মাই সান।’ তারপর নির্ঝর সকালে ঘুম থেকে উঠলে, মেয়ে পুতুলটা ওর দিকে এগিয়ে তিনি বলতেন -‘ইয়োর প্রিন্সেস!’
কিন্তু নির্ঝর আজ এ কোন প্রিন্সেসের কথা বলছে? স্বপ্নে যে তাকে পাটলিপুত্রের সম্রাট অশোকের সমাধিস্থল দেখায়? অথচ বাস্তবে সে তাকে খুঁজছে। সানজিদা উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞাসা করলেন,
তুই তাকে খুঁজছিস মানে?
মা ছোটবেলায় কোনোভাবে ‘মাহজাবিন’ শব্দটা আমার কানে এসেছিল। কেউ হয়তো তার গল্প বলেছিল। আর বড় হয়ে এই কিছুদিন হলো জেনেছি নওয়াব প্যালেসে বেড়ে ওঠা প্রিন্সেস মাহজাবিন এখনো বেঁচে আছেন।
আমাদের শহরের নওয়াব প্যালেসে?
হ্যাঁ, ঠিক তাই।
মোহাম্মদ আলীর তো ‘মাহজাবিন’ নামে কোনো কন্যা নেই।
মোহাম্মদ আলীর ঐ নামে কোনো কন্যা না থাকলেও মোহাম্মদ আলীর কাছে তিনি ছিলেন নওয়াব-প্যালেসের একমাত্র প্রিন্সেস। মোহাম্মদ আলী তাকে আদর করে ডাকতেন- প্রিন্সেস মাহজাবিন! সানজিদার দুঠোঁট কেঁপে উঠল থর থর। কাঁপা কণ্ঠে তিনি প্রশ্ন করলেন,
নওয়াব মোহাম্মদ আলী তাকে প্রিন্সেস ডাকতেন? তাহলে তো তিনি এখন বৃদ্ধা! তুই তাকে খুঁজছিস?
হ্যাঁ মা, আমি তাকেই খুঁজছি। কর্পোরেট চাকরি করি বলে সময় পাই না, তা না হলে আমি তাকে এতদিনে খুঁজে বের করতাম।
কিন্তু কেন বাবা?
তার কাছে রয়ে গেছে প্রাচীন পুণ্ড্র বর্ধনের কিছু গোপন দলিল। মা এই পৃথিবীতে এই মুহূর্তে আমার কাছে একমাত্র জীবন্ত কিংবদন্তী প্রিন্সেস মাহজাবিন। নওয়াব প্যালেসের গ্রন্থাগারে রক্ষিত প্রাচীন সব কবির আর লেখকের রচনা এখন তার কাছে। নওয়াব-পরিবারের এসব নিয়ে কারো মাথা ঘামানোর সময় নেই ভেবে তিনি এইসব গ্রন্থ গোপনে মাহজাবিনকে হস্তান্তর করেছেন। তিনি অমূল্য এইসব সম্পদের যোগ্য উত্তরসূরী মাহজাবিনকেই ভাবতেন। আর মাহজাবিন তার সারাজীবন কাটিয়েছেন আমাদের প্রাচীন ইতিহাস আর মিথের ভেতর সত্য খুঁজে খুঁজে। তাকে আমার বড় প্রয়োজন।
প্রাচীন কবির আর লেখকদের লেখা তো এ যুগে অচল খোকা!
ভুল মা; খুব ভুল। আদমদীঘি থানার অন্তর্গত কুন্দগ্রামে কবি অদ্ভুতার্যের জন্মভূমি। তার প্রকৃত নাম ছিল নিত্যানন্দ আচার্য। সাত বছর বয়সে রঘুপতির স্বপ্নাদেশে তিনি রামায়ন রচনা করে ‘অদ্ভুতার্য’ উপাধি পান। বগুড়া গেজেটিয়ারে তার সম্পর্কে কী বলা হয়েছে জানো?
নির্ঝর একটা ফাইল থেকে একটা প্রিন্টেড কাগজ বের করে সানজিদার হাতে ধরিয়ে দিল।
সানজিদা পড়লেন, 'It is interesting to note that the Bengali versions of Ramayana, the authorship of one is attributed to a resident of Bogra district, named Nityanunda whose Pseudonym was 'Advutacharjya' as he is supposed to have written his Ramayan througha divine inspiration.'
তার নিচে একটা কবিতা—
‘আত্রাইর তীর সেহি কুরুক্ষেত্র সমান।
মহাপূণ্য স্থান সেই পুরাণে ব্যাখ্যান।
করতোয়া পশ্চিম ভাগে জাহ্নবীর সীমা।
হেন পুণ্যস্থান সেহি নাহি উপমা।’
নির্ঝর বলল,
অদ্ভুতার্যের কবিতা। মা অদ্ভুত যে রামায়ণ রচনা করেছিলেন তা কৃত্তিবাসের রামায়ণের চেয়েও বড়। আচার্যের রামায়ণে রামের চেয়ে সীতার গুণ-কীর্তন করা হয়েছে বেশি। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিও এই পৃথিবীতে মানব-জীবনের বহমানতা আর অনুপ্রেরণার উৎকৃষ্টতা বলতে নারীকে বুঝতেন।
নির্ঝর একটু থামল এবং দৃষ্টিকে দূরে কোথাও নিক্ষিত করে, কোনো এক দৃশ্যকল্পের ভেতর ডুবে গিয়ে বলল,
আচার্যের রচিত রামায়ণটা এখন মাহজাবিনের হাতে। কবিবল্লভ, অথবা কমলাপুঞ্জীর রাজা অচ্যুত সেনের প্রাসাদকেন্দ্রিক কবিতা... বলে নির্ঝর কবিতাটা আবৃত্তি করল-
‘আগাডুম বাগাডুম ঘোড়াডুম সাজে।
ঢোল মৃদঙ্গ ঘাঘর বাজে ॥
বাজতে বাজতে চলল ঢুলি।
ঢুলি গেল কমলাফুলি।
কমলাফুলির টিয়েটা ॥
সূয্যি মামার বিয়েটা ॥’
এসব ছাড়াও ১৪৮০ সালে কাহালু থানার নিশিন্দ্রা গ্রামে জন্মগ্রহণকারী উদায়ণাচার্য ভাদুরীর উচ্চমার্গীয় শাস্ত্রীয় গ্রন্থ ‘কুসুমাঞ্জলী’ও মাহজাবিনের কাছে।
এসব দিয়ে মাহজাবিন কি দেশ উদ্ধার করতে পেরেছে, না পারছে?
মা! তুমি ছাড়া আমার জন্ম অনেকটাই অর্থহীন হয়ে যায়। তোমার সমৃদ্ধ মনন আছে বলে আমার ভেতরে অতীত থেকে ভেসে আসা ছন্দের দোলা আমার জীবনের অর্থময় দ্যোতনা তৈরি করে। মা তুমিই তো শিখিয়েছ, যে শিশু জন্মের পর পর মা-বাবা-দাদা-দাদির কাছে থেকে ছন্দের দোলায় দোলিত হয় না, সে শিশু বড় হয়ে পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন করতে পারে না। কারণ ছন্দহীনতা তাকে গুছিয়ে কাজ করতে শেখায় না। লিওনার্দোর এক মোনালিসা আজ পুন্ড্রের তুলনায় ইতিহাসহীন ইউরোপকে কীভাবে সমৃদ্ধ করছে। পুণ্ড্র আমলে আমাদের হয়তো লিওনার্দোর মতো প্রতিভা হারিয়ে গেছে। আমাদের অতীতকে আমাদের ভবিষ্যতের জন্যই স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
এ জন্য তুই...
মাকে কথা বলতে না দিয়ে নির্ঝর বলল,
শুধু এজন্য নয় মা, মাহজাবিন জানেন সম্রাট অশোকের সমাধিস্থলটা আসলে কোথায়। সানজিদা চোখ কপালে তুললেন এবং বিস্ময়ে সাথে বললেন,
তাও কি সম্ভব! সত্যি তীলকে তাল বানাতেও পুন্ড্রের মানুষের জুড়ি মেলা ভার। যতসব ‘আগাডুম বাগাডুম’ ভাবনা।
মা তুমি এভাবে বললেও, সত্যিটা তুমি জানো। আগাডুম-বাগাডুমের ছন্দ কতকাল বাঙালিকে বৃষ্টির মতো তাল-লয় বিলিয়েছে অকৃপণ।
‘জীবে দয়া কৃষ্ণে ভাব বৈষ্ণব সেবন।
ইহা ধিক নাহি আর নিদান ভজন।’
মহাস্থানের পশ্চিমে আরোড়া বর্তমানে যা আড়োলা গ্রাম নামে পরিচিত সেখানেই জন্মেছিলেন এই পংক্তিগুলোর স্রষ্টা মধ্যযুগের কবিবল্লভ।
সানজিদা নির্ঝরকে আর কিছু বলতে দিলেন না। ছেলের ব্যাগ গোছানোতে নিজেও হাত লাগালেন। ব্যাগ গোছানো শেষ হলে নির্ঝর বাথরুমে ঢুকল আর এই ফাঁকে সানজিদা মানিব্যাগসহ সম্ভাব্য সকল স্থানে নির্ঝরের গোপন কোনো ‘প্রিন্সেস’ এর অস্তিত্ব খুঁজলেন। সাবরিনার সাথে ছেলের সম্পর্ক চুকেবুকে গেছে-এটা তার কাছে পরম তৃপ্তির ব্যাপার। হঠাৎই তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। তিনি নিজেকেই বললেন,
দেখলে সানজিদা তুমিও তোমার ছেলের ভাবনাকে কত বিশ্বাস করো। সভ্য পুণ্ড্র রক্তের সাথে তখনকার দিনের অসভ্য আর শোষক ইউরোপীয় রক্তকে উত্তরাধিকার হিসাবে তুমি চাইছ না। বিশুদ্ধ বংশগতি চাইছ।
নিজেকেই যেন ধমকে তিনি আবার বললেন, ‘নারীরা মানব-প্রবাহের ধারক। মনের মতো উন্নততর আর বিশুদ্ধ প্রজাতি ধারণে নারীদের গোপন স্বার্থপরতা এই প্রবাহকে বয়ে নিচ্ছে অনন্তের দিকে।’ নির্ঝর বাথরুম থেকে বের হয়ে চিন্তাগ্রস্থ সানজিদাকে বলল,
কী ভাবছ মা?
কিছু নয়। অনেক রাত হয়েছে, শুয়ে পড়।
নির্ঝর শুয়ে পড়ল। বাইরে বৃষ্টি ততক্ষণে থেমে গেছে। অপেক্ষাকৃত উঁচু গাছগুলোর পাতা থেকে তার চেয়ে নিচু গাছগুলোর পাতায় বৃষ্টিফোটারা এখনো টিপ টিপ শব্দে সরব। একটা কাঁথা টেনে সানজিদা মায়াভরে ছেলের গা ঢেকে দিলেন। তারপর তার বিছানার পাশে বসে নির্ঝরের কপালে চুমো দিলেন এবং ছেলের বুকে আলতো করে নিজের মাথা রাখলেন। এত দলগোত্রের মাঝে হানাহানির এই দেশে, হিংসা-দ্বেষ আর বহুবিধ ভাবনায় বিক্ষত একটা জাতির অতীতকে খুঁজে বেড়ানো নির্ঝরের এই উদার হৃদয়, কী জানি কীভাবে ব্যথিত হবে- ভেবে ছলছল হয়ে উঠল সানজিদার দুচোখ। নিজেদের ঐতিহ্য, ইতিহাস আর আভিজাত্য নিয়ে প্রায় অজ্ঞ আবার নির্বিকার একটা জাতি যখন দলাদলির বহু অস্তিত্বের মাঝে অস্তিত্ব খুঁজে বেড়ায় তখন তারা বস্তুত অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। আর অস্তিত্বহীন একটা জাতিকে একাত্ব করার জন্য তার নির্ঝর, সম্রাট অশোকের সমাধি অথবা পুণ্ড্র জাতির সমৃদ্ধ ইতিহাস খোঁজার কাজ করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত যে দুঃখ খুঁড়ে আনবে সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত। অর্থ উপার্জনের শক্ত-উৎস ছাড়াই এ সমাজের অনেক মানুষ প্রভূত সম্পদের মালিক। প্রভূত সম্পদের মালিক এসব মানুষই এখন এদেশের মান্য-গণ্য, হর্তা-কর্তা ব্যক্তি। ঘৃণা যাদের প্রাপ্য তারাই এ সমাজে জোর করে শ্রদ্ধার আসন দখল করায় জনমনে পৌঁছে গেছে ভুল বার্তা। অনেক ভ্রান্ত ধারণা যে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বড় অস্তিত্বময় আর সব কথার বড় কথা হলো, ‘বই’ শব্দটার সাথে যে জাতির ভুল বোঝাবুঝি, তাদের জন্য নির্ঝর হয়তো....
তিনি আর ভাবতে পারলেন না। নির্ঝরকে কথাগুলো বলতে চাইলেন। কিন্তু এখন অনেক রাত। ঘুম ঘুম চোখে ছেলে তার মাথার চুলে পরম স্নেহে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এমন সময় কার কথা বলতে ইচ্ছে করে? নির্ঝর মনে হয় মায়ের আবেগটুকু টের পেল। মাকে সে ডাকল না। শুধু তার ডানহাত নিজের হাতে ধরে মুখের কাছে এনে ভেজানো নখগুলোর মাঝখানে আলতো চুমু দিল নির্ঝর। মুখে একটুও শব্দ না করে বলল ‘মাই প্রিন্সেস-মাই সুইট মম।’
আরও পড়ুন: কাজী রাফির ‘ত্রিমোহিনী’ | ধারাবাহিক উপন্যাস | পর্ব–১