“আমার মা বলেছে, খোকা তুই প্রেম করিস না,
ভালো ছেলেদের কপালে ভালো মেয়ে জোটে না…” গানটি শুনে তার তালের সাথে মাথা দুলায় নি,
এমন মানুষ কমই পাওয়া যাবে। প্রীতমের গানের এই মজার আক্ষেপ শুনতে শুনতে কখনো কি মনে
হয়েছে, কথাটা শুধু গানের কথা নয়, আমাদের চারপাশের সম্পর্কের গল্পেও যেন কোথাও না কোথাও
মিল পাওয়া যায়?
প্রথম দেখায় ছেলেটাকে খুব একটা খারাপ লাগেনি
মায়ার। সমস্যা শুধু এটুকুই যে সে একটু বেশি আত্মবিশ্বাসী, একটু বেশি রাগী। বন্ধুরা
অবশ্য বলেছিল, “সাবধান! ছেলেটা একটু পসেসিভ।”
কিন্তু মায়ার মনে হয়েছিল, “আমাকে নিয়ে এতটা
ভাবে বলেই তো ও এমন করে।”
বলা নেই, কওয়া নেই; হঠাৎ হঠাৎ মাঝরাতে ফোন
করে জানতে চাইত, কোথায় আছে, কার সঙ্গে আছে। মায়া কিছুটা বিস্ময়, কিছুটা বিরক্ত হলে
বলত, “তোমাকে হারানোর ভয় থেকেই তো এসব করি।”
ভালোবাসার শুরুতে যে আচরণগুলো মায়ার কাছে
মনে হয়েছিল যত্ন, গুরুত্ব কিংবা গভীর অনুভূতি; কয়েক মাস পর সেগুলোই পরিণত হল নিয়ন্ত্রণ,
সন্দেহ আর মানসিক চাপে।
প্রশ্ন হলো..
"রেড ফ্ল্যাগ দেখেও আমরা কেন ভুল মানুষকে
বেছে নিই?"
"আমরা কেন এমন মানুষকে বেছে নিই, যার
সঙ্গে সম্পর্ক আমাদের ভালো থাকার কথা নয়?"
"সত্যিই কি তাকে ভালোবেসে ফেলি, নাকি
কখনো কখনো ভুল আচরণকেই ভালোবাসার লক্ষণ বলে মনে করি?"
রেড ফ্ল্যাগ দেখেও আমরা কেন এগিয়ে যাই?
সম্পর্কের মাঝে কেউ যখন অতিরিক্ত পসেসিভ
হয়, আমরা ভাবি, “আহা,আমাকে কত্ত ভালোবাসে!”
সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চায়—“আমাকে হারানোর ভয়
পায়।”
বন্ধুদের থেকে দূরে রাখতে চায়—“শুধু আমাকেই নিজের
করে রাখতে চায়।”
রেগে গিয়ে সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেয়—“বাহিরে এমন, আসলে
ও খুব ইমোশনাল।”
কিন্তু কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর এই একই আচরণই
তখন অন্য নামে ধরা দেয়; নিয়ন্ত্রণ, ঈর্ষা, ম্যানিপ্যুলেশন, আবেগগত অপব্যবহার।অর্থাৎ
যেগুলো আসলে রেড ফ্ল্যাগের নমুনা, সেটাকেই আমরা কখনো কখনো রোমান্টিক সিগনাল হিসেবে
ভুল পড়ি।
অনেক সময় এমন হয় যে শান্ত, দায়িত্বশীল, সম্মান
করতে জানা একজন মানুষকে খুব একটা আকর্ষণীয় মনে হয় না; অথচ যে মানুষটি রাগী, আনপ্রেডিক্টেবল,
অতিরিক্ত পসেসিভ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করে, তার প্রতিই তৈরি হয় তীব্র আকর্ষণ?
এর সহজ কোনো উত্তর নেই। আর “মেয়েরা খারাপ
ছেলে পছন্দ করে” ঢালাওভাবে এমন
সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক নয়। মনোবিজ্ঞানের গবেষণা দেখায়, মন যা চায়, মন
যাতে অভ্যস্ত আর জীবনের জন্য যা সত্যি দরকার—এই পথগুলো সবসময় এক বিন্দুতে মেলে না।
প্রথম ভুলটা হয় এখানেই, আকর্ষণ আর ভালো সঙ্গী
এক জিনিস নয়।
কিছু মানুষের স্বভাবজাত আত্মবিশ্বাস, নির্ভীকতা,
ঝুঁকি গ্রহণের প্রবণতা, স্বতঃস্ফূর্ততা ও মায়াবী আকর্ষণ থাকে, যা আদতে কোনো নেতিবাচক
গুণ নয়। তবে এই একই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তির মাঝে যদি ম্যানিপুলেশন,
আক্রমণাত্মক আচরণ বা অপরকে নিয়ন্ত্রণ করার মানসিকতা যুক্ত হয়; তখন সাময়িক মোহ আর দীর্ঘস্থায়ী
মানিয়ে চলার মধ্যে তফাতটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মনোবিজ্ঞানে এমন কিছু নেতিবাচক স্বভাবগত
বৈশিষ্ট্যের সমষ্টিকে ডার্ক ট্রায়াড (Dark Triad) বলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে- নার্সিসিজম (Narcissism)- নিজেকে অতিরিক্ত
গুরুত্বপূর্ণ মনে করা
ম্যাকিয়াভেলিয়ানিজম
(Machiavellianism)- নিজের স্বার্থে অন্যকে কৌশলে ব্যবহার বা ম্যানিপুলেট করার প্রবণতা
সাইকোপ্যাথি (Psychopathy)- অন্যের অনুভূতি
বুঝতে না পারা, নিজের ভুলের জন্য অনুশোচনা কম থাকা।
এই তিনটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে মিল থাকলেও এগুলো একে অপরের সমার্থক নয়। ২০০২ সালে মনোবিজ্ঞানী ডেলরয় পলহাস এবং কেভিন উইলিয়ামস এই ধারণাটি প্রথম সামনে আনেন। কিছু নারী স্বল্পমেয়াদী সম্পর্কে এসব বৈশিষ্ট্যেসম্পন্ন পুরুষের প্রতি বেশি আকর্ষণ অনুভব করতে পারেন।
শৈশবের সম্পর্কের অভিজ্ঞতাও কি ভূমিকা রাখে?
এখানে আসে এটাচমেন্টের বিষয়টি। শৈশবের পারিবারিক
পরিবেশ এবং মা-বাবার সাথে সম্পর্কের ধরন একজন মানুষের অবচেতন মনে সম্পর্কের একটি
"ব্লুপ্রিন্ট" বা নকশা তৈরি করে দেয়। শিশুকাল ও কৈশোরে আমরা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক,
নিরাপত্তা, প্রত্যাখ্যান, ভালোবাসা ও দ্বন্দ্ব কীভাবে অনুভব করেছি—সেগুলো পরবর্তী
সম্পর্কের প্রত্যাশাকে প্রভাবিত করতে পারে।
আমাদের মস্তিষ্ক পরিচিত পরিবেশ বা অনুভূতিতে
স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে—তা যতই ক্ষতিকর হোক না কেন। শৈশবে কেউ যদি সবসময় অশান্তি, চিৎকার বা অবহেলার
মধ্যে বড় হয়, তবে প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে শান্ত ও সুস্থ সম্পর্কের চেয়ে অশান্ত ও জটিল সম্পর্ককেই
তার কাছে 'পরিচিত' এবং 'স্বাভাবিক' মনে হয়।
তবে এখানেও সতর্ক থাকা দরকার। “আপনার শৈশব
খারাপ ছিল, তাই আপনি খারাপ মানুষ বেছে নেন”—এমন সরল সমীকরণ মনোবিজ্ঞান সমর্থন করে না।
আরোও পড়ুন: সন্তান জন্মের পর দাম্পত্যে দূরত্বকেন বাড়ে
মানুষের ব্যক্তিত্ব, বর্তমান অভিজ্ঞতা, আত্মমর্যাদা,
সামাজিক পরিবেশ এবং সম্পর্কের অভিজ্ঞতা—সব মিলেই জীবনসঙ্গী পছন্দ তৈরি হয়।
"আমি ওকে বদলে দেব”—এই ফাঁদ
"আমার ভালোবাসা দিয়ে আমি ওকে বদলে দিব"
নায়ককে ঘিরে নায়িকার এমন সিনেম্যাটিক ডায়লগ
হরহামেশাই আমরা বড় পর্দায় দেখে থাকি। কিছুটা
হাস্যকর শোনালেও আমাদের মাঝেও কিন্তু এমন টেন্ডেসি কাজ করে। অনেকের মধ্যেই অবচেতনভাবে
একজন 'উদ্ধারকর্তা' বা সেভিয়ার হওয়ার ইচ্ছা থাকে। তারা ভাবেন, "ওর জীবনটা অগোছালো,
আমি পাশে থাকলে ও সুধরে যাবে।" এই মানসিকতা ক্ষতিকর বা অপূর্ণ ব্যক্তিত্বের মানুষের
প্রতি এক ধরণের তীব্র আকর্ষণ তৈরি করে, যাকে ভালোবাসা ভেবে ভুল করা হয়।
কাউকে ভালোবাসা আর কাউকে ঠিক করার দায়িত্ব
নেওয়া এক জিনিস নয়। কেউ নিজের আচরণ পরিবর্তন করতে চাইলে অবশ্যই পরিবর্তন সম্ভব। কিন্তু
সম্পর্কের ক্ষেত্রে আসক্তি, সহিংসতা, ম্যানিপুলেশন
বা নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ থাকলে “আমি ওকে বদলে দেব” সম্পর্কের নিরাপদ কৌশল নয়।
তাহলে “ভালো ছেলে” কেন কখনো চোখে
পড়ে না?
এখানেও একটা ভুল ধারণা ভাঙা দরকার। ভালো
মানুষ মানেই যে আকর্ষণীয় হবে না, তা নয়। আবার কনফিডেন্ট, স্টাইলিশ বা ক্যারিশমাটিক
মানুষ মানেই যে খারাপ, তাও নয়।
বরং একটি সুস্থ সম্পর্কের কিছু বৈশিষ্ট্য
প্রথমে খুব নাটকীয় মনে নাও হতে পারে। সে হয়তো আপনার ফোনের পাসওয়ার্ড চাইবে না, কোথায়
যাচ্ছেন কিংবা কি করছেন তার কৈফিয়ত চাইবে না, অকারণে সন্দেহ করবে না, আপনার নিজস্বতাকে
সম্মান করবে। প্রথম দেখায় এগুলো সাধারণ মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে এই সাধারণ আচরণগুলোই
নিরাপত্তার ভিত্তি হবে।
গবেষণা কি বলে...
রিলেশনশিপ সাইকোলজি-তে মানুষের সঙ্গী নির্বাচনের
মনস্তত্ত্ব, বিশেষ করে ডার্ক ট্রায়াড এর বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা হয়েছে।
২০০৯ সালে পিটার জোনাসন ও তাঁর সহকর্মীরা একটি গবেষণায় দেখতে পান, ডার্ক ট্রায়াড বৈশিষ্ট্যের
অধিকারীরা তাদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বা 'চার্ম' এর কারণে হয়তো দ্রুত বা স্বল্পমেয়াদি
সম্পর্কের (short-term mating) ক্ষেত্রে সফল হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের
(long-term mating) ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্যগুলো তেমন ইতিবাচক ভূমিকা রাখে না।
সমাজ বা পপ-কালচারে প্রচলিত "মেয়েরা
ব্যাড বয় পছন্দ করে" কিংবা "খারাপ মানুষরাই বেশি প্রেম পায়"—এই ধারণাটি যে একপেশে,
তা ২০২৪ ও ২০২৫ সালের গ্যাভোর ড্রাগোস্টিনভ এবং টম বুথের গবেষণাটি জোরালোভাবে প্রমাণ
করে। " জার্নাল অব পার্সোনালিটি" -তে দুটি গবেষণা প্রকশিত হয়। প্রথম গবেষণায়
৪৭৫ জন এবং দ্বিতীয়টিতে ৭৯৪ জন অংশগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় গবেষণায় নারী ও পুরুষ—উভয়েই স্বল্পমেয়াদী
এবং দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের জন্য কম ডার্ক ট্রায়াড
সম্পন্ন বা ইতিবাচক মানবিক গুণসম্পন্ন ব্যক্তিদেরই বেশি পছন্দ ও মূল্যায়ন করেন।
সম্পর্কের ক্ষেত্রে রেড ফ্ল্যাগ চিনব কীভাবে?
সম্পর্কের শুরুতে, "ও আমাকে কতটা ভালোবাসে?"
এই প্রশ্ন না করে, নিজেকেই নিজে জিজ্ঞাসা করুন-
- আমি কি ওর সঙ্গে নিজের মতামত প্রকাশ করতে
নিরাপদ বোধ করি?
- রেগে গেলে কীভাবে আচরণ করে?
- ও কি আমার ‘না’কে সম্মান করে?
- ও কি আমার বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক
নিয়ন্ত্রণ করতে চায়?
- নিজের ভুলের দায়িত্ব নেয়, নাকি সবসময় অন্যকে
দোষ দেয়?
- আমার ব্যক্তিগত সীমারেখা মানে?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
এই মানুষটির সঙ্গে থাকার পর আমি কি নিজেকে
আরও বেশি আমি মনে করি, নাকি ধীরে ধীরে নিজেকেই হারিয়ে ফেলছি?
যে কোন সম্পর্কের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হচ্ছে; সে যে আমাকে ভালোবাসে, কীভাবে ভালোবাসে?”
কারণ ভালোবাসা মানেই যদি স্বাধীনতা কেড়ে
নেয়া, যত্ন মানেই নিয়ন্ত্রণে পরিণত হওয়া, আর
আবেগ মানেই নিজেকে নিজের কাছ থেকেই দূরে সরিয়ে দেয়া; তাহলে তাতে ভালোবাসা কতটা থাকে,
তা আসলেই ভাবার বিষয়।
ঢাকা/টিএ