পিরিয়ডকালীন সময়ে রাশমিকার অস্বস্তি কমাতে যেভাবে যত্ন নেন স্বামী বিজয়

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ঋতুস্রাব—নারীর জীবনের স্বাভাবিক একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। অথচ এই স্বাভাবিক বিষয়টিই অনেকের কাছে অস্বস্তি, সংকোচ আর নীরবতার কারণ। মাসের কয়েকটি দিন শারীরিক যন্ত্রণা, মানসিক অস্থিরতা ও ক্লান্তির সঙ্গে লড়াই করতে হয় অসংখ্য নারীকে। 



ব্যক্তিগত জীবনে এই সময়টুকুতে প্রয়োজন হয় একটু বাড়তি যত্ন আর সহমর্মিতার। আবার কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় বোঝাপড়া ও সহযোগিতার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ঋতুস্রাবের কষ্টকে এখনো অনেক ক্ষেত্রেই যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এই নীরব বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছেন ভারতীয় অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানা।



নিজের ঋতুস্রাবকালীন অভিজ্ঞতা, স্বামী বিজয় দেবরাকোন্ডার সহযোগিতা এবং চলচ্চিত্রের শুটিং সেটে ‘পিরিয়ড লিভ’ বা ঋতুস্রাবকালীন ছুটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন এই অভিনেত্রী। 




তাঁর বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত জীবনের গল্প নয়, বরং নারীর শারীরিক বাস্তবতা, সম্পর্কের সংবেদনশীলতা এবং কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তা নিয়েও নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।



যন্ত্রণার সময়ে পাশে থাকার নামই ভালোবাসা



ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘মিড-ডে’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাশমিকা জানিয়েছেন, ঋতুস্রাবের সময় শারীরিক অস্বস্তি ও মেজাজের পরিবর্তন দেখা দিলে তিনি আগেই স্বামী বিজয় দেবরাকোন্ডাকে বিষয়টি জানিয়ে রাখেন। 



তাঁর মতে, একজন পুরুষের পক্ষে নারীর এই শারীরিক অভিজ্ঞতা নিজের শরীরে অনুভব করা সম্ভব নয়। তবে পাশে থাকা, কষ্টের কথা মন দিয়ে শোনা এবং যত্ন নেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি সঙ্গীকে মানসিক স্বস্তি দিতে পারেন।



রাশমিকার কথায়, বিজয়ের বেড়ে ওঠার পরিবেশে ঋতুস্রাব নিয়ে খুব একটা আলোচনা না হলেও তিনি বিষয়টি সংবেদনশীলতার সঙ্গে বিবেচনা করেন। 



যন্ত্রণার সময়ে রাশমিকার অস্বস্তি কমাতে পেটে ও হাত-পায়ে মালিশ করে দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।



এখানেই উঠে আসে সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক। ভালোবাসা মানে সব সমস্যার সমাধান করে দেওয়া নয়; কখনো কখনো প্রিয় মানুষটির কষ্টকে স্বীকৃতি দেওয়া, তাঁর কথা শোনা এবং প্রয়োজনের সময়ে পাশে থাকাই সবচেয়ে বড় সহযোগিতা। ঋতুস্রাব নিয়ে সংকোচের পরিবর্তে এমন স্বাভাবিক ও সহানুভূতিশীল আচরণ পরিবারে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে পারে।




প্রথম ঋতুস্রাবের স্মৃতিতে ভয় ও অসচেতনতা



রাশমিকার নিজের কৈশোরের অভিজ্ঞতাও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। প্রথম ঋতুস্রাবের সময় প্রয়োজনীয় তথ্য ও সচেতনতার অভাবে তাঁকে ভয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। 



অভিনেত্রী জানিয়েছেন, তখন স্যানিটারি প্যাড সম্পর্কে তাঁর ধারণা ছিল না। তাই তোয়ালে ভাঁজ করে প্যাডের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতেন তিনি। এমনকি একসময় তাঁর মনে হয়েছিল, এই ঘটনা বুঝি জীবনে একবারই ঘটে।



এই অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েদের শরীরে কী ধরনের পরিবর্তন আসে, সে বিষয়ে যথাযথ ধারণা থাকা কতটা জরুরি। 




ঋতুস্রাব সম্পর্কে আগে থেকে জানা থাকলে প্রথমবার রক্তপাতের সময় আতঙ্কিত হওয়ার আশঙ্কা কমে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, উপযুক্ত স্যানিটারি উপকরণ ব্যবহার এবং প্রয়োজন হলে বড়দের বা স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তা নেওয়াও সহজ হয়।



এ ক্ষেত্রে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেদেরও ঋতুস্রাব সম্পর্কে বয়সোপযোগী ও বিজ্ঞানভিত্তিক ধারণা দেওয়া প্রয়োজন। 




কারণ বিষয়টি কেবল নারীর একার অভিজ্ঞতা নয়; পরিবারের সদস্য, বন্ধু ও সহকর্মীদের সচেতনতাও নারীর জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।




প্রতি মাসের যন্ত্রণা, অথচ আলোচনা কতটা?


রাশমিকা জানিয়েছেন, প্রতি মাসে ঋতুস্রাবের সময় তীব্র যন্ত্রণায় ভোগেন তিনি। এমনকি এই সময়টি আসার আগেই তাঁর মধ্যে একধরনের দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। এই স্বীকারোক্তি ঋতুস্রাব নিয়ে প্রচলিত একটি ভুল ধারণাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়—সব নারীর অভিজ্ঞতা এক রকম নয়।



কারও ক্ষেত্রে সামান্য অস্বস্তি দেখা দেয়, আবার কারও তলপেটে তীব্র ব্যথা, কোমরব্যথা, মাথাব্যথা, ক্লান্তি কিংবা মেজাজের পরিবর্তন হতে পারে। এসব উপসর্গ দৈনন্দিন কাজকর্মেও প্রভাব ফেলতে পারে। 




গরম পানির ব্যাগ বা হিটিং প্যাড দিয়ে সেঁক অনেকের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। তবে ব্যথা অত্যন্ত তীব্র হলে, নিয়মিত কাজে বাধা দিলে কিংবা আগের তুলনায় বেড়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কখনো কখনো এমন ব্যথার পেছনে এন্ডোমেট্রিওসিসের মতো সমস্যাও থাকতে পারে।




রাশমিকা নিজের অভিজ্ঞতায় গরম পানির প্যাড ও জিরাপানির মতো ঘরোয়া উপায়ের কথা বলেছেন। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, এসব উপায় সবার ক্ষেত্রে সমান কার্যকর নয় এবং জিরাপানি ঋতুস্রাবজনিত ব্যথার প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসার বিকল্প নয়।




শুটিং সেটে কেন প্রয়োজন ‘পিরিয়ড লিভ’?



ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি রাশমিকার বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো কর্মক্ষেত্রে ঋতুস্রাবকালীন ছুটির দাবি। 



তাঁর মতে, চলচ্চিত্র শিল্পে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কাজ করলেও ঋতুস্রাবের সময় তাঁদের জন্য আলাদা ছুটির সুবিধা এখনো যথেষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে শারীরিক কষ্ট নিয়েই অনেককে দীর্ঘ সময় কাজ করে যেতে হয়।



চলচ্চিত্রের শুটিং মানেই অনেক সময় দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, টানা দাঁড়িয়ে থাকা, ভোর থেকে কাজ শুরু করা কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দৃশ্য ধারণ শেষ করার চাপ। 



এমন পরিস্থিতিতে তীব্র ব্যথা বা দুর্বলতা নিয়ে কাজ করা একজন নারীর জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে। শুধু অভিনয়শিল্পী নন, চিত্রগ্রহণ, পোশাক পরিকল্পনা, মেকআপ, সম্পাদনা ও প্রযোজনাসহ বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত নারীরাও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন।



তবে ঋতুস্রাবকালীন ছুটি নিয়ে আলোচনার অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেক নারীর প্রতি মাসেই ছুটি প্রয়োজন। বরং যাঁদের উপসর্গ তীব্র, তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম, নমনীয় কর্মঘণ্টা কিংবা ছুটির সুযোগ থাকা উচিত। পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, স্যানিটারি পণ্যের সহজলভ্যতা, বিশ্রামের জায়গা এবং সহকর্মীদের সহযোগিতাও কর্মপরিবেশকে আরও মানবিক করতে পারে।



এ ধরনের নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কর্মীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, ছুটির অপব্যবহার রোধে স্বচ্ছ নিয়ম এবং নারী-পুরুষ সবার জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্কৃতি নিশ্চিত করাও জরুরি।



ট্যাবু ভাঙতে তারকাদের কণ্ঠ কতটা গুরুত্বপূর্ণ?



বিনোদনজগতের তারকাদের ব্যক্তিগত বক্তব্য অনেক সময় সমাজে প্রচলিত বিষয় নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু করে। রাশমিকা মান্দানার ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটেছে। জনপ্রিয় একজন অভিনেত্রী যখন নিজের শারীরিক যন্ত্রণা কিংবা কৈশোরের অসচেতনতার কথা প্রকাশ্যে বলেন, তখন অনেক নারী নিজেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তার মিল খুঁজে পান। একই সঙ্গে যাঁরা বিষয়টি সম্পর্কে জানেন না, তাঁদের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি হতে পারে।



তবে শুধু তারকাদের বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। পরিবারে খোলামেলা আলোচনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানভিত্তিক স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত সহায়তার ব্যবস্থা—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। ঋতুস্রাব নিয়ে কটূক্তি, লজ্জা দেওয়া কিংবা কষ্টকে তুচ্ছ করে দেখার সংস্কৃতি বদলানোও সমান জরুরি।




রাশমিকার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তাই উঠে আসে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। প্রথমত, ব্যক্তিগত সম্পর্কে সহমর্মিতা ও যত্ন নারীর মানসিক স্বস্তি বাড়াতে পারে। দ্বিতীয়ত, কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া কোনো বিশেষ অনুগ্রহ নয়; এটি সম্মানজনক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশের অংশ।



sidebar ad