কাজী রাফির ‘ত্রিমোহিনী’ | ধারাবাহিক উপন্যাস | পর্ব–৩

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬

কাজী রাফির ‘ত্রিমোহিনী’ | ধারাবাহিক উপন্যাস | পর্ব–৩

৩

স্কুলের পথে একদিন হেঁটে যাচ্ছিল নওরিন। তাদের বাড়ি থেকে মূল রাস্তায় ওঠার আগে ইট বিছানো রাস্তাটার মাঝখানে একট ব্রিজ। সেই ব্রিজের তলদেশে প্রবাহিত পশ্চিমের জলের স্রোত বিস্তৃত খাল হয়ে মিশেছে পূর্বের করতোয়ায়। কী মনে করে নওরিন এই নলখাগড়ার সাথে অযত্নসম্ভূত অসংখ্য গাছ-পালা আচ্ছাদিত নির্জন খালের কাছে এসে থেমে যায়। শহরের একদম শেষ প্রান্তে এখানে নওরিনদের বসতির আশেপাশে বাড়ি-ঘর তেমন একটা নেই। নিরিবিলি এই পথের দুপাশে উঁচু-নিচু ভূমির     বিস্তার। তারই মধ্য দিয়ে আঁকাবাঁকা খালটির কলকল স্বরে বয়ে চলা প্রবাহ নওরিনের হৃদয়ের নিঃসঙ্গতার তানে মিশে তার চোখের ভাষায় মায়ার স্পর্শ বুলিয়ে দেয়। মায়াময় চোখ নিয়ে নওরিন কলকল জলের সাথে পাল্লা দিয়ে বয়ে চলা এই প্রকৃতি এবং সময় কোথায় বয়ে যায়-তা ভাবার চেষ্টা করে। মা’হীনা এক কন্যা হয়তো তার নিঃসঙ্গ মনোভূমির মাঝে নিঃশব্দ প্রকৃতির মিল খুঁজে পেয়ে একটু থমকে যায়। 


দু একটা পাখির হঠাৎ উড়ে যাওয়া, অবারিত নীল আকাশে সাদা সাদা মেঘের কোণে উঁকি দেওয়া কী এক স্বপ্ন নওরিনের মনের মাঝে স্পষ্ট হয়েও হয় না। টুকরো টুকরো স্বপ্ন ধরা দিয়েই কোথায় যেন হারিয়ে যায়। ব্রিজটার উপর বসে পড়তে ইচ্ছা করে। তবু ভেতরের কী এক আভিজাত্যবোধ নওরিকে শুধু বিস্মিত আর আনমনা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রাখে। ওমন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা নওরিনকে প্রকৃতির অংশ মনে হয় । এই সময়ে আনমনা বাবার কাছ থেকে শোনা প্রজ্ঞাময় পুরুষ নওফেলের কথা কেন জানি মনে হয়। নওরিনের ইচ্ছা করে এই একলা নির্জনে শশী হয়ে যেতে। যেন শশী হয়ে গেলেই নওফেলের গ্রন্থাগারে যাওয়ার এক অবাধ সুযোগ তৈরি হবে। 


ছোট্টবেলায় ক্যান্সার আক্রান্ত মা নাজ তিতিরকে হারিয়ে "বিষন্ন’ শব্দটি নওরিনের শুধু মনেই বাসা বাঁধল না, তার ঋজু শরীর অর হরিণের মতো চকিত চাহনিতে তা এমন এক মাত্রা তৈরি করল যে, অপরিচিত কেউ, বিশেষত পুরুষ মাত্র কৈশোর পেরুনো প্রখর ব্যক্তিত্বের এমন তরুণীকে অতিক্রমের সময় তাকে একবার দেখেই থমকে যায়। পথ চলতে চলতে দ্বিতীয়বার তাকে দেখার জন্য ফিরেও তাকাতে গিয়ে কোনো কিছুর সাথে তারা হোচট খায়। কিন্তু নওরিনের এসব নিয়ে মাথাব্যাথা নেই। পথ চলতে চলতে সে ভাবে অন্য কথা । এই শহরে প্রতিনিয়ত ছুটে চলা মানুষগুলো যেন অনেককাল আগে গত হয়ে যাওয়া অন্য সব মানুষের ছায়া মাত্র। তারা যেভাবে তাদের জীবনকে যাপন করতে চায়, যেভাবে ভাবতে আর আনন্দমুখর হতে চায় তার স্বরূপ আর সন্ধান কিছুই তারা যেন জানে না। 


জলের কলকল প্রবাহ, শহরের প্রান্তের এই নিভৃত একখন্ড প্রকৃতি মাত্র তরুণী হয়ে তা নওরিনের মনোভূমিতে এমন এক অস্পৃশ্য আলো-ছায়া হয়ে খেলা করে যে, নওরিনের খুব ইচ্ছা করে মেঘ হয়ে ভাসতে ভাসতে, পাখি হয়ে উড়তে উড়তে মায়ের আত্মার কাছে চলে যেতে।   

এসবের কিছুই হয় না বলে তার মন অচেনা এক বন্ধুকে খুঁজে বেড়ায়। এমন এক বন্ধু যে বাবার মুখে শোনা ত্রিমোহিনীর গল্পবলিয়ে শুভ্রর মতো প্রাজ্ঞ অথচ প্রাণময়। নওরিনের আত্মা খুঁজে ফেরে শুভ্রর মতো শুভ্র হৃদয়ের এক মানুষকে, অন্ধকারে যার মুখোমুখি বসে সারারাত কেটে যাবে তার গল্পের যাদুতে বুঁদ হয়ে থেকে। নওরিনের ইচ্ছা করে, এমন সাথীকে খুঁজে পেতে যার হৃদয়ে সাদা সাদা গুচ্ছ গুচ্ছ মেঘ ভেসে বেড়ায়। চোখে যার ভাসে এমন দৃশ্যকল্পের কল্পনা যার ভাষায় ভর করে নওরিন সাত-সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে খুঁজে পাবে নাজ তিতিরকে, তার মাকে। যে পুরুষের হৃদয়খানি তার কল্পনাভূমি দিয়ে তৈরি এক মনোময় প্রাসাদ যেখানে সে ইচ্ছা করলেই পরীর ডানা পরে করতোয়া নদীর বুকের কলধ্বনি ধরে ধরে ঢুকে যেতে পারে অনেক অনেক অতীতে, পুণ্ড্র  প্রাসাদে...। এসবের কিছুই যখন হয় না তখন বাড়িতে থাকা কিছু গ্রন্থের বিস্তৃত জগতে নওরিন তার স্বপ্ন আর কল্পনা ফেরি করে ফেরে।


কিন্তু এই সমাজের মাঝে যতই তার সত্তা গল্পবলিয়ের মতো একজন তরুণ খুঁজে ফিরল ততই সে হতাশ হলো। 


এই ব্রিজের কাছে এলেই নওরিনের কাঁধের কাছে কখনো কখনো তার ছোট্ট খোপায় এক নীল প্রজাপতি উড়ে এসে বসে পড়ে। নওরিন খেয়াল করেছে নীল জামাটা পড়লেই নীল প্রজাপতিটা এই কাজ করে। নীল এই প্রজাপতির আবাস যেন নওরিনের দুধ-আলতায় মেশানো আভাময় কাঁধ অথবা খোঁপা। প্রাণীটা নিরিবিলি তার খোঁপায় বসেই থাকে। স্কুলের ভেতর প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত । স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার আগ মূহুর্ত পর্যন্ত। আর যতক্ষণ এই প্রজাপতি বসে থাকে ততক্ষণ তার শরীর থেকে  ছড়িয়ে পড়ে প্রাণাকুল এক গন্ধ । পথে চলা মানুষগুলো বিশেষত নওরিনের স্কুল-কলেজ গমনের পথে নওরিনকে দেখার প্রত্যাশিত অপেক্ষমান তরুণরা, যাদের কেউ পথিকের বেশে একই পথে বারবার পথ হাঁটে, কেউ মটর সাইকেল অথবা বাইসাইকেল ছুটিয়ে বীরত্ব প্রদর্শন করে, মুখচোরা তরুণরা বাড়ির জানালায় উদাস দৃষ্টি মেলে অপেক্ষা করে- যে যাই-ই করুক তাদের সবাই বাতাসে ছড়িয়ে পড়া মন আনচান করা গন্ধে টের পেয়ে যায় যে, নওরিন এই পথ অতিক্রম করেছে বা করতে যাচ্ছে। ঋজু শরীরের মোহনীয় ভঙ্গিমায় পথ চলা নওরিনকে মোটর সাইকেল আরোহী দুই তরুণ পথরোধ করে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার পরিকল্পনা করল কিন্তু তার ব্যক্তিত্বময়তার চেয়েও নওরিনের শরীর থেকে ছড়িয়ে পড়া এই গন্ধটাই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় বাঁধা হয়ে উঠল। 


তরুণদের অনুভবে ঝড় তোলা এই গন্ধ তাদের সব অনুভূতিকে উল্টা অবশ করে কী এক স্বপ্নঘোরে ডুবিয়ে দেয়। নওরিনের কথা ভেবে নীরিহ কোনো তরুণের যেমন প্রাণ আনচান করে, উচ্ছল আড়ম্বরপ্রিয় তরুণদেরও তেমনি আকাশ হয়ে যেতে ইচ্ছা করে। সন্ধ্যায় অথবা রাতের স্বপ্ন-ঘোরে তারা ফিসফিস স্বরে আনমনে নওরিনের সাথে কথা বলা আরম্ভ করল। একা একা আনমনা পথ চলতে চলতে আকাশে কল্পিত নীল সাগরের কথা ভেবে রঙিন আবেশে তারা যখন নওরিনকে দেখার ইচ্ছায় ডানে তাকায়, নওরিন কোথাও না থাকলেও তার গভীর চাহনীর দ্যুতিময় ভাষা তাদের হৃৎম্পন্দন বাড়িয়ে তোলে। মাহজাবিনের ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছায়াময় নওরিন দিন দিন শহরের তরুণদের হৃৎস্পন্দনে বাড়াবাড়ি রকমের স্বপ্নকাতরতা ক্রমশ তাদের এক ধরণের বিকারগ্রস্ততা তৈরি করল। কারো কাছে সে হয়ে উঠল মাহজাবিনের তরুণী বয়সের প্রতিচ্ছবি, কেউ কেউ তাকে শহরময় ঘরে ঘরে বাস করা শুভ্রের গল্পের নায়িকা "কমলা' ভাবা শুরু করে দিল।


সিংহ হত্যাকারী জয়াপীরের স্থানে নিজেকে ভাবতে গিয়ে অনেক তরুণ মাথার চুল দীর্ঘদিন না কেটে বরং তাদের লম্বা কেশগুচ্ছে দখিনা বাতাসের ছন্দময় দোলা অনুভব করল। তাদের মানসপটে গল্পবলিয়ের সব গল্পগুলোর না দেখা প্রতিজন নায়িকার স্থান নওরিন দখল করে বসল। কিন্তু গল্পবলিয়ের গল্পগুলো লোকমুখে আর বাবার মুখে ছোটবেলা থেকে শোনার কারণেই এই শহরটাকে নওরিনের ঠিক নিজের শহর মনে হয় না। সে-ও এই শহরের পথে-ঘাটে চলাফেরা করা কোনো মানুষের মধ্যেই একজন গল্পবলিয়ে অথবা নওফেল আর শশীকে খুঁজে না পেয়ে, এই শহরের বাসিন্দাদের একজন না হয়ে বরং হয়ে উঠল শুভ্রর তৈরি করা কল্পলোকের এক বাসিন্দা । নওরিন মানুষের  মুখের  কথা  শোনার  চেয়ে  তাদের অন্তর্লোকের ফিসফিসের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠল। আর যতই তার স্বপ্নলোক এই শহরের প্রাচীনত্বের মাঝে মহত্ত্ব খুঁজে ফিরল ততই এক দৃঢ় বিশ্বাস তার মননে দানা বাঁধল। আর তা হলো, একদিন পথ চলতে চলতেই দেখা হয়ে যাবে এক শব্দ যাদুকরের সাথে যে তার মনের ঝাঁপি খুলে খুলে তার অনুভূতিগুলো নিজের করে নিতে সক্ষম। শুভ্রর মতো এক গল্পবলিয়ে সত্যিই একদিন এক স্বপ্নভূমির গল্প বলে তাকে চমকে দেবে। স্বপ্নভূমি ছাড়া শৈশবেই হারানো মাকে কি আর ফিরে পাওয়া সম্ভব? 


কিন্তু নওরিনকে অবাক করে বাস্তব জগতে ঘটল এক  পরাবাস্তব ঘটনা। জয়াপীড়ের ন্যায় কেশগুচ্ছ রাখা এক তরুণ মোটর সাইকেলে চেপে হাওয়ায় তার কেশরাজি উড়িয়ে নওরিনের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতে গিয়ে ভুলেই গেল তার দ্রুতগামী যান নিয়ন্ত্রণের জন্য ওমন উদাস ভঙ্গিতে মাথা ঘুরিয়ে নওরিনকে নয়, সামনে তাকাতে হবে। নওরিনের দিকে তাকিয়ে তাকে অতিক্রমের সময় সেই প্রাণাকুল গন্ধ তরুণটিকে ভুলিয়ে দিল স্থান-কাল-পাত্র। সে নওরিনের স্মিত হাসিমাখা মুখটির দিকে তাকিয়েই থাকল আর তার মটর সাইকেল সজোড়ে গিয়ে ধাক্কা খেলো পথের বাঁকের বিদ্যুতের খুঁটিতে। তরুণটির মাথা ফেটে গলগল রক্ত গড়াল তবু তার মুখে ফুটে থাকল অদ্ভুত এক হাসি। নওরিন পথ চলতে চলতে সেদিন প্রথম তরুণটির উদ্দেশে স্মিত হাসি উপহার দিয়েছিল!


নওরিন আর কোনোদিন কোনো তরুণের দিকে তাকিয়ে হাসে নি। 


জয়াপীড়ের বেশ ধারণকারী ঐ তরুণটির মৃত্যুর পর থেকে নীল প্রজাপতি আর কোনোদিন নীল পোশাক পড়লেও নওরিনের ততদিনে বড় হয়ে ওঠা খোঁপা অথবা কাঁধে আর বসে নি। বাবার কাছ থেকে শোনা গল্পের মাধ্যমে নওরিন জেনেছে গল্পবলিয়ের দাদা নওফেল নাকি মৃত্যুর পূর্বে এগারো বছর বয়সী শুভ্রকে ডেকে বলেছিল-

খোকা তুমি কি জানো মৃত্যু কেমন? মৃত্যু এক মাথা ন্যাড়া করা নারী।

জয়াপীড়ের বেশ ধারণকারী তরুণের মৃত্যুর পর আজ নওরিনের ভেতর থেকে কে যেন উচ্চারণ করল, 

মৃত্যু এক রহস্যময় নীল প্রজাপতি যার সুবাসিত ঘ্রাণে চলমান সময় হারিয়ে যায় -মহাকালের গভীরে।

প্রজাপতি নাই; তাই তার আবাস নিজের খোঁপাটি নওরিন তারপর থেকে আর কোনোদিন বাঁধে না। কলেজ জীবন শেষ করে যখন সে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো ততদিন তার এই শহরের তরুণদের মাঝে একজন গল্পবলিয়েকে খুঁজে পাওয়ার বাসনা মরে গেছে। 


এক বীরমাতার গর্ভে জন্মানো নওরিন যত পরিপূর্ণ নারী হয়ে উঠল, তত সে চারপাশের বাস্তবতায় পরিপূর্ণ অথচ যেখানে স্বপè অনুপস্থিত তেমন জীবনকেই সহজভাবে গ্রহণ করতে শিখল। তবু কোনো একদিন এক গল্পকারকে খুঁজে পাওয়ার বাসনা তার মরল না। 


৪


বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে নির্ঝর। টিপ-টিপ বৃষ্টির ফোঁটারা বাসের গতিকে অলস ভংগিতে ভেংচি কাটছে। নির্ঝরের ভাবনারা একীভূত হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে ওর ঘোর ঘোর আঁধারি শৈশব আর কৈশোরে। আকাশে বকমতো কোনো পাখির উড়ে যাবার দৃশ্য নির্ঝরের সেই স্মৃতিলোককে আরো উতলা অথচ মগ্ন করছে। মা-বাবাকে ছেড়ে যাবার সময় প্রত্যেকবার কষ্ট হয়। এবার মা’র জন্য ওর বেশি খারাপ লাগছে। এমন বৃষ্টির দিনে মাকে ছেড়ে দূরে যেতে কার ভালো লাগে! কর্পোরেট পৃথিবী সন্তানকে মা’র কাছে থাকার অধিকারটুকুও যেন কেড়ে নিয়েছে।


বাসটা শহরতলীর কাছে এসে থেমে গেল। প্রায় নির্জন এই ভোরে চিরচেনা বাস স্টপেজের ছাউনি হতে এগিয়ে আসছে একটি মেয়ে। তার দিকে তাকিয়ে চোখ ফেরাতে গিয়ে চমকে গেল নির্ঝর। মাহজাবিন! ঠিক স্বপ্নে দেখা মাহজাবিনকে সে দেখল যেন। এক পলক-মাত্র। তারপর সবটুকু মনোযোগ আবিষ্ট করে পুনরায় সে মেয়েটার দিকে তাকাল। তার স্বপ্নে দেখা বয়সী-মাহজাবিন যেন লুকিয়ে আছে এই তন্বীর মাঝে। নির্ঝর এই ভেবে অবাক হলো, মাহজাবিন নামের এক নারীর নাম সে শুনেছিল তার স্কুল-জীবনে। করতোয়া নদী তীরে বসে থাকা এক অন্ধের মুখে। তারপর দীর্ঘদিনের ব্যবধানে সেই নাম সে ভুলেই গিয়েছিল। পুন্ড্রের প্রাচীন সভ্যতা নিয়ে একটা উপন্যাস লেখার ভাবনা আসার পর থেকে শুরু হয়েছে প্রিন্সেস মাহজাবিন রোগ। আর এই রোগের উৎপত্তিও সেই অন্ধ ব্যক্তি! তিনিই তাকে বলেছিলেন, ‘মাহজাবিন নামের এক নারী শুধু জানে, সম্রাট অশোকের সমাধীস্থল কোথায়।’ যে নারীকে সে কোনোদিন দেখেনি, উপন্যাস লেখার পটভুমি নিয়ে ভাবতে গিয়ে কোনোদিন না দেখা সেই নারীই দখল করল তার ভাবনাভূমি। নির্ঝর ভাবল, মাহজাবিন নয়, কবিতার ঢঙে কথা বলে সেই অন্ধই আসলে দখল করে বসে আছে তার মনোভূমি। কিন্তু ভাবনাভূমি থেকে শেষমেষ স্বপ্নভূমি দখল করা মাহজাবিন আজ যেন অস্পৃশ্য আলোর মতো বাসের দিকে এগিয়ে আসা এই নারীর ভেতর এক ঝলক স্পষ্ট হলো। এ-ও হয় তবে, অদ্ভুত!


সাদা-কালো চুল-দাড়িওয়ালা একজন ভদ্রলোক মেয়েটার পাশে কালো একটা ব্যাগ টেনে নিয়ে বাসের দিকে এগিয়ে আসছেন। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো কুয়াশাবিন্দুর মতো মেয়েটার মাথার চুলে আদরের চুমু দিয়ে আটকে আটকে যাচ্ছে। ভদ্রলোক হয়তো মেয়েটার বাবা। তাকে বিদায় দেবার জন্য বাসের পা-দানিতে পা দিয়ে দ্রুত সে মুখ ফেরাল। ডানহাত নাড়িয়ে বিদায় সম্ভাষণ জানাল। মেয়েটার মুখের অভিব্যক্তি গেঁথে গেল নির্ঝরের মনে। কিন্তু তরুণীর মেঘ-কালো চুল, আলো ছড়ানো মুখের বিভা, ব্যক্তিত্বময় দাঁড়ানোর ভংগি আর নিষ্পাপ চোখের অভিব্যক্তির মাঝেও মায়াকাড়া চঞ্চলতা। পাশে দাঁড়ানো মানুষটির সাথে তার এত বৈসাদৃশ্য যে, নির্ঝর তাদের সম্পর্ককে, অভিব্যক্তি দিয়ে বাবা-মেয়ে মনে হলেও; ঠিক মাপতে পারল না। 

 

কী আশ্চর্য! নির্ঝরের বুকের ভেতর সেই দৃশ্যের বেদনা টনটন করে বাজল। তিরিশ অতিক্রম করা পুরুষের কাছে এমন উথলে ওঠা আবেগ বড় বেমানান ভেবে চোখ ফেরাল নির্ঝর। বাইরে তিনশ গজ দূরে ৪৫ ডিগ্রিতে ছোট্ট এক চাতালের ভেতরে বাস বরাবর অলস ভঙ্গিতে শুয়ে আছে এক কুকুর। সামনে ছড়ানো পায়ে মাথা এলিয়ে কাঁদো কাঁদো চোখে সেই অলস ভঙ্গিমা। প্রায় ফাঁকা বাসের এতগুলো আসন বাদ দিয়ে মেয়েটি বাসের গতির সাথে টলমল দেহকে কোনোরকমে সামলে নির্ঝরের পাশের আসনে  বসে পড়ল। নির্ঝর কুকুরটিকে ভালো করে দেখার চেষ্টা করল। বাসটি তখন দ্রুততর গতিতে অতিক্রম করছে ৯০ ডিগ্রি হয়ে আসা চাতাল। দাঁড়িয়ে গেছে তীক্ষè অনুভূতিসম্পন্ন প্রাণীটি। বাসটির দিকে এমন করে তাকিয়ে আছে যেন সে এই গতিসম্পন্ন বস্তুটা তার প্রিয় কোনো মানুষকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ নির্ঝরের মুখ ফসকে একটা বাক্য বেরিয়ে গেল


কুকুরটা কি আপনার? প্রশ্ন শুনে হতভম্ব মেয়েটা লাজুক আর্তনাদে প্রতিক্রিয়া জানাল দুটো ইংরেজি শব্দে,

সরি! হোয়াট? কী বলা উচিত বুঝতে না পেরে নির্ঝর এবার বলল,

না, বলছিলাম একটা কুকুর আপনার বিদায় দৃশ্য দেখে... নির্ঝরের কথা শেষ হওয়ার আগেই বিরক্ত স্বরে নওরিন বলল,

দেখুন মি., বাজে কোনো মন্তব্য অথবা বক্তব্য শোনার জন্য ভাগ্যক্রমে আপনার পাশের আসনে আমি বসিনি। একটু আগের সহজ সরল মেয়েটি যাকে দেখে নির্ঝরের প্রিন্সেস মাহজাবিনের কথা মনে পড়ছে, হঠাৎই সে উধাও হলো যেন। আর ছেলেটার কথা শুনে ভেতরের দুঃখ দুঃখ শান্তভাবটা কেটে গেল নওরিনের। তখনই ইচ্ছে করল উঠে গিয়ে পেছনের কোনো আসনে বসে পড়তে। কিন্তু ওমন ঘন ভ্রু-যুগল আর মায়াবী চোখের সুদর্শন পুরুষটি তাকে কেন বাজে কথা বলল তা জানার আগ্রহে আর উঠতে ইচ্ছে করল না। মানুষটির চেহারায় স্পষ্ট ফুটে থাকা ব্যক্তিত্ব ঠিক যেন একটু আগে শোনা বাক্যটার সাথে মিলছে না। সেভ করা নীলাভ ত্বকের ওপর ছড়িয়ে থাকা চুলগুচ্ছের ভেতরে মানুষটির স্বাধীন স্বাধীন এক পৃথিবী দোল দিচ্ছে যেন। আড়চোখে জানালার ডানপাশে বসা মানুষটিকে আবার দেখল নওরিন। হাসি পেল ওর। এক ঝাড়িতে কেমন গুটিয়ে গেছেন ভদ্রলোকে। এবার একটু ভালো লাগল নওরিনের। মেয়ে হোক, পুরুষ হোক সব মানুষই তো আসলে নিজের চারপাশকে নিজস্ব আধিপত্যের আভিজাত্যে মুড়ে রাখতে চায়। নওরিন তার ব্যতিক্রম নয় মোটেও। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকলেও পাশে বসা নারীর দিকেই মনটা ঝুকে ছিল নির্ঝরের। নির্ঝর পূর্ণচোখে একবার দেখে নিয়েছিল মেয়েটাকে। নিরীহ চোখ দুটোতে কোথায় যেন বিদ্রোহ লুকানো। বাতাসে স্থির জল কেঁপে উঠলে জলের সাথে মৃদু ঢেউগুলো খেলতে গিয়ে যে মায়াবী বাঁকের গর্ত তৈরি করে, মেয়েটার গালে তেমনি একটা টোল আছে। তার উজ্জ্বল বাদামী বর্ণের ত্বকের ভেতরে একধরনের কোমলতা উঁকি দিয়ে আছে। নিখুঁত ভ্রু-যুগলের ভেতরে নির্জনতর এক পৃথিবী কেমন করে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। বাংলাদেশের সমতল মাঠের বিস্তৃত সবুজ যেন মিশে আছে মেয়েটার সরলতার অভিব্যক্তিতে। নির্ঝরের বয়স আঠারো অতিক্রম করেছে আরো এক যুগ আগে। অথচ নিজের ভেতরে কোনো নারীকে দেখার এমন অষ্টাদশ বছরের তরুণ আবেগ আগে কেন আসে নি সে ভেবে পেল না। হয়তো নির্ঝরের মতো ভবিষ্যত সচেতন মানুষগুলো বয়সের আবেগের সঠিক ব্যবহারের সময় পায় না- ভাবল সে। 


কী যেন বলতে গিয়ে থেমে গেল নওরিন। ইচ্ছে করল ছেলেটিকে দুষ্টুমি করে বয়সী কোনো সম্বোধনে আরো হকচকিয়ে দিতে। কী এক বাঁধা এসে চুপসে দিল নওরিনকে। বাইরে আশ্বিনের বৃষ্টির অলস ফোঁটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নির্ঝর কখন তলিয়ে যায় ওর মরক্কোর বান্ধবি সাবরিনার ভাবনায়। সাবরিনার ভাবনা আজ অস্থির করছে না মোটেও নির্ঝরকে। সাবরিনা যখন নির্ঝরের খুব কাছে ছিল তখন জন্মভূমি বাংলাদেশ ওকে মোহগ্রস্থের মতো টানছিল। শেষমেশ সাবরিনাকে না বলেই বাংলাদেশে বদলির জন্য সদর-দপ্তরে মেইল পাঠিয়েছিল নির্ঝর। এশিয়ার অনুন্নত দেশগুলোতে কেউ তেমন একটা আগ্রহ নিয়ে বদলি হতে চায় না। যারা এ অঞ্চলের তারাও বড় চাকরি করার অহংকার নিয়ে দেশ থেকে দূরেই থাকতে চায়। সুতরাং দেশে বদলি পেতে খুব ঝামেলা হয়নি নির্ঝরের। নির্ঝরের বদলি আদেশ যখন এসে পৌঁছাল তখন সাবরিনা খুব অবাক হয়ে বলল, 

হাউ কাম! ইউ ক্যুড গেট এ্যা পোস্টিং অ্যাট ঢাকা? ইন ইত্তর ওউন কান্ট্রি? স্মিত হেসে নির্ঝর বলেছিল,

আই’ল মিস ইউ অল দ্য মোমেন্টস্। হতভম্ব চোখে মুখে সাবরিনা জিজ্ঞাসা করল,

ডিড ইউ ম্যানেজ দিজ পোস্টিং? নির্ঝরের নির্মোহ, নীরব আর নিষ্পাপ চাহনিতে ‘হ্যাঁ’ উত্তর পেয়ে আশাহত সাবরিনা আবার প্রশ্ন করল,

বাট হোয়াই? আর ইউ নট লাইকিং মি অর দিজ কান্ট্রি?

নট দ্যাট সাবরিনা! নট অনলি লাইকিং। আই লাভ দিজ কান্ট্রি এ্যান্ড ইউ ঠু। বাট...

বাট?

অ্যা হেলোসেশান। নষ্টালজিয়া; আইম গেটিং ম্যাড অফ স্টেয়িং অ্যাওয়ে ফ্রম মাই মম অ্যান্ড দেন মাই কান্ট্রি। লাইক দ্যাট পোয়েট্রি-


It will for the moon

To rise

Then take wing and glide

To meet him


এই কথাগুলোর সাবরিনার পছন্দ হলো না। সে চোখ কপালে তুলে বলল, 

বাট হাউ অ্যাবাউট মি? ডিড ইউ থিংক অফ মাইন? সাবরিনার প্রশ্নে চুপ থাকে নির্ঝর। সাবরিনা রেগে বলে,

গট মি অ্যা কিড? ইত্তর ফাকিং ডল! হোয়াই ডিড’নট ইউ টেল মি বিফোর?

সাবরিনা দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ ঠু স্মল নাউ অ্যা ডেজ। হোয়ারএভার আই ডু রিমেইন, আই’ল পাস মাই লিভ উইথ ইউ।

মে বি মাই সোল লিসনস্ ইউ। বাট আই ক্যান্ট আসিয়োর অ্যাবাউট মাই ফিজিক্যাল ডিমান্ড। নান ক্যান।

তাই-ই স্বাভাবিক। অসাধারণ শারিরিক সৌন্দর্যের অধিকারি সাবরিনা চেষ্টা করলেই কি তার সৌন্দর্যকে পুরুষের কাছ থেকে নিরাপত্তার বলয়ে মুড়ে রাখতে পারবে? নাকি চাইবে?

নওরিন আবার আড়চোখে নির্ঝরকে দেখল। মাথার পেছনে দু’হাত ছড়িয়ে উদাস পুরুষটি কোলের মধ্যে ফেলে রেখেছে ল্যাপটপের ব্যাগ। এবার মনকে শক্ত করে কিছু একটা বলার জন্য নওরিন সরাসরি নির্ঝরের চোখের দিকে তাকাল। এতক্ষণ পর বাস্তবে ফেরা নির্ঝর পাশের তরুণী হয়তো কিছু বলতে চাইছে ভেবে ভদ্রতা করে বামে তাকাল। চোখে চোখ পড়তেই নওরিনের সব যেন এলোমেলো হয়ে গেল। এত সুন্দর চোখ যার তাকে মেয়েদের ঠিক "পুরুষ’ "পুরুষ’ লাগে না। ছেলেটা চোখের ভেতরের মায়া কিছুক্ষণ আগের বিরক্তি কাটিয়ে দিল এবং নওরিনের ভেতরে আটকে থাকা ভাষাকে প্রাণ দিল,

গ্লাসটা... মানে জানালাটা একটু খুলে দিন না। 

বলেই চোখ নামাল নওরিন। ওমন করে বাংলা সিনেমার নায়িকার মতো চোখ সে নামাতে চায় নি। অথচ ব্যাপারটা তাই-ই হলো দেখে আপ্রাণ বিরক্তিতে ছটফট করে উঠল নওরিনের ভেতরটা। কোনো কথা না বলে নির্ঝর খুলে দিল জানালার গ্লাস। ছিটেফোঁটা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো নির্ঝরের চোখ আর নওরিনের নাকের ডগায় তাদের অস্তিত্ব জানিয়ে দিল। ছেলেটা কেন বলল না, ‘বৃষ্টিতে আমি তো ভিজে যাব?’ তাহলেই নওরিন বলত, ‘থাক তাহলে খোলার প্রয়োজন নেই।’ কিন্তু তা হলো না। নওরিন দেখল তার পাশের ছেলেটা বৃষ্টির দু’এক ফোঁটা শরীরে নির্বিকার ভঙ্গিতে মেখে নিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর নওরিন খেয়াল করল ছেলেটার মাথার গুচ্ছ গুচ্ছ অহংকারী চুলের ওপর বৃষ্টির ফোঁটারা শিশিরবিন্দু হয়ে মুক্তার মতো জ্বলজ্বল করছে। একটু মায়া হলো যেন। আবার নওরিনকেই মুখ খুলতে হলো,

আপনি মনে হয় ভিজে যাচ্ছেন। নওরিনের কথায় পাশ ফেরার মতো করে নওরিনের দিকে মুখ ঘুরিয়ে স্মিত হাসল নির্ঝর। বলল,

আপনি তো তাই-ই চেয়েছিলেন।

জী? না... মানে... নওরিন যেন একটু স্বাভাবিক হলো। প্রথম গোমড়া মেঘলা মুখটায় একটুকরো রোদ এনে বলল,

আপনি যে একেবারে পুরো গ্লাস খুলবেন তা তো বুঝিনি।

গ্লাস শুধু? আপনি তো জানালাটা খুলে দিতে বললেন। 

আমি বললাম আর আপনাকে তাই-ই করতে হবে? নওরিন বলতে চাইল ‘ওটা আসলে একটা কথার কথা।’ কিন্তু শুধু কথা বলার প্রয়োজনে হঠাৎ জানালা খুলতে বলা তথ্যটুকু তার নারী মন মোটেও জানতে দিতে চাইল না। নির্ঝরের ভরাট কণ্ঠ তার কানে এলো-

হ্যাঁ তাই-ই করতে হবে।

প্লিজ গ্লাসটা টেনে দিন। আপনি ভিজে যাচ্ছেন।

আপনি মনে হয় সেটাই চেয়েছিলেন। তাছাড়া গ্লাস টানলে তো জানালা বন্ধ হবে।

আমি চাইলে আপনি বৃষ্টিতে ভিজবেন?

হ্যাঁ!

কেন?

জানি না। তবে গুমড়ামুখো সুন্দরী নারীদের আমি খুব ভয় পাই। তারা রাণীর জাত। রাণীদের বিরক্ত করা খুব বোকা পুরুষের কাজ।


বুঝলাম আপনি খুব বুদ্ধিমান। ভিজুন তাহলে। আমার কী! সত্যি সত্যিই নির্ঝর জানালা খোলা রাখল এবং বাইরে তাকাল। আর গায়ে আনন্দে মাখতে থাকল দু’একটা মৃদু ঝরা বৃষ্টির অলস ফোঁটা। কতক্ষণ চুপচাপ কাটল দুজনের। বৃষ্টি এবার প্রায় থেমে গেল। ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে নির্ঝরের। সাবরিনার কথা ভাবতে গিয়ে আবার সে ভুলে গেল পাশের মেয়েটির অস্তিত্ব। আবার ঝরঝর বৃষ্টির তীর্যক ঝাপটা জানালা দিয়ে নওরিনের শরীরেও ভেজা ভেজা অনুভূতি তৈরি করল। নিজ আসনে দাঁড়িয়ে নওরিন নিজেই জানালা বন্ধ করে দিতে গেল। জানালাটা বন্ধ হওয়ামাত্র ড্রাইভার কোনো কারণে দ্রুত ব্রেক করল। আর খুব বাজেভাবে নওরিনের শরীরটা পড়ল নির্ঝরের ঠিক মুখের ওপর। নির্ঝরের মাথার উপরের সীট দুহাতে দ্রুত আঁকড়ে ধরেও শেষ রক্ষা হলো না। নওরিনের বুকের ধাক্কা নির্ঝরের নাককে চ্যাপ্টা করার বদলে মনকে চ্যাপ্টা করল। তবু সহজ হওয়ার ভঙ্গিতে বিস্রস্ত নওরিনকে নির্ঝর দুষ্টুমি করে বলল, 

আমি জীবনে স্ক্রিন প্লে দেখার সময় খুব একটা পাই নি। আমার জীবনটাও সিনেমার মতো নয়। বাট স্টিল আই’ম ভেরি সরি ফর দিজ সিনেমাটিক ইনসিডেন্ট। 

কাপড় ঠিক করে নিল নওরিন। এত বোকা বোকা লজ্জা এসে অস্থির করে ফেলল তাকে, ইচ্ছে করল পাশের ছেলেটাকে... কী যে সেই ইচ্ছা তা বুঝতেও পারছে না নওরিন এবং প্রায় নিজেকেই অবাক করে নির্ঝরকে জিজ্ঞাসা করল,

আপনি কোথায় যাবেন বলুন তো?

আপনি কি চাইছেন আমি এখানেই নেমে যাই?

বা রে। আমি তাই-ই বলেছি নাকি?

এটা ঢাকার বাস। আপনার ওমন প্রশ্নের সুরটা অন্যরকম। প্রশ্নের ভেতর মেয়েরা মেটাফোর, সিমিলি ইত্যাদি ব্যবহার করে আসলে অন্য কিছু বোঝায়।

নারী বিশেষজ্ঞ দেখছি! আপনি?

সমরবিদ আর নারী বিশেষজ্ঞ! বাংলা ভাষাটা কেমন অদ্ভুত বিশেষণে ভরা, তাই না? 

যেমন?

এই যে, আপনি! খুব সুন্দরী বলা যাবে না। আবার না বলেও থাকা যাবে না। মাঝখানে থেকে আমি হয়ে যাব নারী-বিশেষজ্ঞ। 

বাহ! মেয়েদের মুগ্ধ করার বেশ ঢঙ জানেন তো।

মোটেও নয় ম্যাডাম। আপনার চেয়ে বয়সে কম করে হলেও নয় দশ বছরের বড় হব আমি। আর এ বয়সে নারী আমার জীবনে নতুন কোনো বিষয় নয়। 

বুঝলাম, বেশ অসভ্যও আপনি। 

কীভাবে?

বাহ্ আপনিই তো বললেন। যাহোক নারী বিষয়ক এসব আলোচনা আমার ভালো লাগছে না। প্রসঙ্গটা বাদ দিলেই খুশি হব।

আমিও।

মানে?

মানে আমিও খুশি হব। দেখুন ম্যাডাম আমি নিজ থেকে আপ্রাণ চেষ্টা করছি আপনাকে বিরক্ত না করতে।

কিন্তু আপনার পাশে বসামাত্র বিব্রত করলেন কিসব ‘কুকুর’ ‘ফুকুর’ এসব বাজে শব্দ বলে। 


হো হো করে হেসে উঠল নির্ঝর। তার প্রাণখোলা হাসি যেন ওর চোখে ভোরের সূর্যোদয়ের সাগর হয়ে খেলছে। নওরিনের মুগ্ধতা নির্ঝরের দুচোখের ভেতরে মগ্ন হয়ে তাকে ভুলিয়ে দিল, পাশের যে ছেলেটির নাম পর্যন্ত সে জানে না তাকে ওভাবে মুগ্ধ হয়ে দেখতে হয় না। নওরিনের শুধু মনে হলো, ভদ্রলোকটি তার দীর্ঘদিনের চেনা। পরিপূর্ণ পুরুষের শরীর থেকে যে ঘ্রাণ, আভিজাত্য ছড়িয়ে দেয়, সেই ঘ্রাণে নওরিন যেন ফুল চেনার মতো কতকাল আগেই তাকে চিনে রেখেছিল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে নওরিন আবার বলল,

কই; বললেন না যে কোথায় নামবেন?

আচ্ছা বলুন তো, আপনি নিজে কি ঢাকার আগে কোথাও নামছেন?

কীভাবে বুঝলেন?

বাসটা ঢাকা যাবে। তা হোক আমি ঢাকায় নামব। আপনি? জাহাঙ্গীর নগরে?

নগর কিনা জানি না। তবে সম্রাটের নামে তো আর গ্রাম হয় না। জী ওখানেই নামছি আমি।

কী নিয়ে পড়ছেন?

বাংলা সাহিত্য। কী? ভয় পেলেন?

নাহ। তা কেন? বাংলা নিয়ে যারা পড়ে বলতে পারেন আমি তাদের পরম শ্রদ্ধা করি। কিন্তু ভয় পাওয়ার প্রশ্ন এলো কেন?

ঠিক তা নয়। আমি নিজেই বাংলা-সাহিত্য পড়ছি বলতে ভয় পাই। সবার ধারণা ভালো কোনো সাবজেক্ট না পেলেই শুধু কেউ বাংলা পড়ে। অনেকে তো প্রশ্নই করে বসেন, বাংলায় পড়ে কী করবেন? শিক্ষকতা?

যারা অমন প্রশ্ন করে তাদের বাংলা ভাষাশূন্য পৃথিবীতে কয়েকদিন আটকে রাখা উচিৎ।


নির্ঝরের কথায় এই প্রথম নওরিন তার দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। যেন এতক্ষণ পর তার মতের সমান্তরালে ভদ্রলোক কিছু বলায় সে সন্তুষ্ট। সাথে সাথে নওরিন ভাবল, তারা এতক্ষণ কেউ কারো নামটা পর্যন্ত জানে না। কেমন একটা হাদারাম পুরুষ রে বাবা! নাম না জেনেই কেউ কি এতক্ষণ কথোপকথোন করে? ভাবনাটা মাথায় আসামাত্র প্রশ্ন করল নওরিন,

যারা বয়সে বড়, তাদের উচিত অপরিচিতা অথচ বয়সে ছোট তার নামটা জেনে নেওয়া।

আর ছোটকে স্মৃতির দায় থেকে মুক্তি দেওয়া।

বুঝলাম না। স্মৃতির দায় মানে?

ধরুন আপনার নাম সাবরিনা। অবশ্য আমি নিশ্চিত, আপনার নাম যাই-ই হোক তা হবে চার অক্ষরের। নওরিন নির্ঝরকে কথা বাড়াতে দিল না। অবাক হয়ে প্রশ্ন করল।

কেন?

জানি না। তবে আমার তাই-ই মনে হচ্ছে। যাহোক বলছিলাম, বড়র দায়িত্ব পালন করে আমি আপনার নাম জেনে নিলাম। তা যদি সাবরিনা হয়, তাহলে শাবান মাস, সাবান এমনকি রিনা শব্দ কানে পড়ামাত্র অথবা মনে হওয়ামাত্র মেয়েটিকে মানে আপনাকে আমার মনে পড়বে। আর মেয়েটির? আমার নাম না জানায় স্মৃতির কোনো দায়ভার তার কাছে থাকবে না।

এত সহজে শুধু নাম দিয়ে কেউ যদি কাউকে স্মৃতি বানাত! হাস্যকর আপনি। জানিনা কোন পৃথিবীর মানুষ আপনি।

এই যে বাংলার ছাত্রী; আপনি কি বিশ্বাস করেন কোনো দৃশ্যকল্পের চেয়ে শব্দ বেশি শক্তিশালী?

করি। আবার করি না। ঠিক যদি উল্টা করে বলি তাহলেও ব্যাপারটা অবিশ্বাস করতে কষ্ট হবে। তাই নয় কি?

চমৎকার। কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে হয়ত তা হবে। কিন্তু এই যুগে মানুষ নিজ থেকে স্মৃতি অথবা দৃশ্যকল্পের মতো কিছুই লালন করে না ম্যাডাম। চারপাশে যা শুধু খুব প্রকট তাই-ই নিয়ে মানুষ সামাজিক জীব হয়ে যায়। চারপাশে শব্দরা বেশি অস্তিত্বময়। আত্মাকে বরং আমাদের চারপাশের বাস্তবতাগুলো বেশি শেখাচ্ছে। আমাদের সত্তা দিয়ে আমরা কতটুকু এই বর্তমান পরিস্থিতিকে শাসন করতে পারি।

শব্দরা তো মানুষের তৈরি। যা মানুষের সৃষ্টি তা তার অন্তজ। শব্দ সবচেয়ে বেশি অস্তিত্বময় কবিতায়।


কবিতার ক্ষেত্রে কথাটা সত্যি। কিন্তু শব্দরা তো আজকাল বেশি ব্যবহৃত হয় কর্পোরেট ব্রাঞ্চ অথবা বাণিজ্য সংক্রান্ত এ্যাডভার্টাইজমেন্টে। সেজন্যই বলছিলাম কারো মুখ মনে রাখার চেয়ে তার নাম মনে রাখাটা সহজ। আমার ক্ষেত্রে যদিও ব্যাপারটা ঠিক উল্টা হয়। আমি নামটা ঠিক মনে রাখতে পারিনা, হয়তো কেউ যখন প্রথম পরিচয়ে তার নামের অক্ষরগুলোতে শব্দ বসায় আমি তখন খেয়াল করি তার চোখের ভাষা, মুখে উচ্চারিত তার ভেতরের ছন্দ। সুতরাং নামটা আমি খুব দ্রুত ভুলে যাই। মুখটা অথবা চেহারা গেঁথে যায় ভেতরে।

ব্যাপারটা ওরকম নয়, আপনি আসলে মানুষরটার চেয়ে নিজকে গুরুত্ব দেন বেশি। নাম মনে রাখতে না পারলে একজনের মুখ তো আরেক জনের মুখের সাথে মিশে গন্ডগোল পাকাবে। 


হাসল নওরিন। রিনিঝিনি মিষ্টি সে হাসি নওরিনকেই একটু অবাক করল। গলায় কোত্থেকে যেন লাজুক আর মিষ্টি সুর এসে বাজছে। একটু আগের সেই পড়ে যাবার দৃশ্য আবার মনে হতেই একরাশ লজ্জা এসে যেন নওরিনের গলা চেপে ধরল। লাজুক লাজুক হৃৎস্পন্দন বুকের স্পর্শের সেই ক্ষণকে স্পষ্ট করে নওরিনকে তলিয়ে নিচ্ছে লজ্জার অতল গভীরে। চুপচাপ কাটল কিছুক্ষণ। নওরিনই এবার বলল, 

আমি নওরিন।

আমি নির্ঝর। ছিলাম গহীন অরণ্যে। 

পার্বত্য-চট্টগ্রামে ছিলেন?

অম-হো। নাহ্। ছিলাম মনরোভিয়া, লাইবেরিয়ায়।

সেখানে কি করছিলেন?

চাকরি। একটা আন্তার্জাতিক সংস্থার চাকরগিরি করছিলাম। 

বুঝলাম। আপনি খুব পাকনা। পাকনা লোকগুলো খুব ভয়ংকর।

আমাকে খুব ভয়ংকর মনে হচ্ছে?

এখন হচ্ছে।

শুনুন, গোবেচারাগুলো পড়াশুনা শেষ করেই ভালো চাকরি পায়।

আচ্ছা আপনার চাকরিটা কী?

সেটা আপনাকে পরে বলব। যদি সম্ভব হয়। নওরিন আপনার সুন্দর নামটা জানানোয় ধন্যবাদ।

আপনি কীভাবে বুঝেছিলেন আমার নামটা চার অক্ষরের হবে?

ছোট্টবেলায় দেখা, করতোয়া নদীর পশ্চিমতীরে, প্রাচীন এক মাঠের পাশে বটগাছের নিচে ধ্যানরত অন্ধের লোকটির কথা মনে পড়ল নির্ঝরের। প্রাণীর অভিব্যক্তি আর বস্তুগত প্রকৃতিকে দেখে তার ভেতরের সব নির্যাসকে দেখে নেয়ার স্পৃহা নামক তার যে চোখের জন্ম হয়েছে তা সেই অন্ধের থেকে পাওয়া তার অনবদ্য অনুপ্রেরণা। কিন্তু অন্ধ গল্পবলিয়ের কথা কিছু না বলে নির্ঝর শুধু বলল,

আপনাকে দেখে আমার তাই-ই মনে হয়েছিল। 

কী আশ্চর্য! আমার কী ধারণা জানেন, টিকেট কাটতে গিয়ে আপনি কৌশলে জেনে নিয়েছেন, চার অক্ষরের নামবিশিষ্ট একজন মেয়ে আপনার পাশের আসনে টিকেট কেটেছে।

তাহলে সভাপতি সাহেবকে ধন্যবাদ।

সভাপতি?

হ্যাঁ। বাস মালিক সমিতির সভাপতি টিকেটটা আমাকে নিজেই পৌঁছে দিয়েছিলেন। বাসে উঠে প্রথম টিকেট খুলে দেখলাম আমার আসন নাম্বার-বি-৪। নির্ঝরের কথার রেশ ধরে নওরিন কিছুটা ব্যঙ্গ করে বলল,

সো এভরিথিং ইজ ফোর! ইজনট ইট?

আপনার মনে হয় বাংলাকেই লালন করা উচিৎ। যদিও ঠিক এ জায়গায় আপনার ইংলিশ বাক্যটা জুড়ে দেওয়া পারফেক্ট হয়েছে। জীবনের প্রতিটি স্তরে ছন্দ বলে একটা ব্যাপার আছে তো। আর যাদের ভেতরে বিশেষত যে সব নারীদের ভেতরে ছন্দ আছে, তারা ফ্যাট হয় না। নির্ঝরের কথায় দমফাটা হাসি পেল নওরিনের। নিজেকে সংবরণ করেও হাসির পুরোটা আটকাতে পারল না নওরিন। হাসতে হাসতে বলল,

তার মানে সব মোটা মেয়েরা ছন্দহীন?

ঠিক তা নয়। তবু আমার অযথাই মনে হয়, তাদের গতি শুধু হিন্দি-সিরিয়ালে। আসলে হিন্দি-সিরিয়াল আর ড্রামা তাদের ফ্যাট সেলের খাদ্য তো!

আপনি খুব আজব। হিন্দি-সিরিয়ালের সাথে ছন্দহীনতা অথবা মোটা হওয়ার কী সম্পর্ক?

আপনি ছোটবেলায় কোন কোন মাধ্যমে পড়াশুনা করেছেন?

বাংলা অবশ্যই। ইংরেজি একটা সাবজেক্ট তো আবশ্যিক ছিলই।


আশেপাশের মানুষ, বাবা-মা, সব প্রিয়জন তারা কখনো হিন্দি বলে আপনার ভাবনা, কল্পনা অথবা শোনাকে হিন্দির সাথে সম্পৃক্ত করেনি। আপনার জীবন-ছন্দ, স্বপ্ন-কল্পনা সবকিছু বাংলায়। অথচ বিনোদনের মাধ্যম যখন হিন্দি হয় তখন সমস্যা তো হবেই। হিন্দি ভাষার প্রতি কোনো বিদ্বেষ থেকে নয়, বলছি বাস্তবতা থেকে। যে কোনো ভাষার যা কিছু মহৎ তার সবটুকু গ্রহণ করলে সমস্যা নেই। আমার আপত্তি শুধু জন্মের পর দেখা, বোঝা এবং আত্মস্থ করা ভাষা ছাড়া অন্যভাষায় চিত্তবিনোদিতদের নিয়ে।

কেন?

নারীরা ভবিষ্যত প্রজন্মের বড় দিক নির্দেশক। মায়েরা অন্য ভাষায় চিত্তবিনোদন করলে শিশুরা তা আত্মস্থ করে। আত্মস্থ করা ভাষাতে ভাবনা এবং স্বপ্ন দেখা সহজ হয়ে যায়। এভাবেই ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে মায়ের এবং ভাষার দাবী ছোট হয়ে যায়। কালক্রমে নিজ ভাষায় কথা বলা মানুষগুলো ‘স্পেসিস’ হয়ে যায়। অথচ ভাষার রয়েছে মহান শক্তি। সেই শক্তি কাজে লাগানোর স্থানগুলোতে মরচে পড়লে...। এটা মানব শরীরের মতো। স্পৃহাহীন, স্পিরিটলেস হয়ে গেলে অলসতা এবং পঙ্গুত্ব বাড়তে থাকে।


বর্তমান প্রেক্ষাপটে আপনার মতো করে কে ভাবে? আর মুক্ত বাজারের মতো মুক্ত এই সমাজে এই আগ্রাসন প্রতিরোধ করা প্রায় অসম্ভব।

অসম্ভব নয়। সম্ভব। যারা ভালোবাসতে পারে এবং আপনার মতো বাংলা নিয়ে অধ্যবসায় করে তাদেরকে দিয়েই সম্ভব। সেজন্যই বলেছিলাম, যারা আপনার বিষয় বাংলাকে পাঠ্য এবং জীবনপুঞ্জি করার সাহস রাখে তাদের আমি শ্রদ্ধা করি। আপনার সৌন্দর্য এখানে যদি কর্পোরেট ভূমিকাও রাখে তাতেও আমি খুশি হবো। 

একটা প্রশ্ন করি?

প্লিজ।

নাহ থাক। আর একদিন। অবশ্য ব্যাপারটা নিয়ে আপনার সাথে আলোচনা না করা পর্যন্ত প্রশ্নটা লম্বা হতেই থাকবে। তবু আজ নয়। 

আমরা সামনের দিনগুলোতে আত্মমগ্ন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের প্রশ্ন লম্বা হতেই থাকে।

 নির্ঝরের এই বাক্য শুনে ছেলেটাকে পাগল মনে হলো নওরিনের। নওরিনের মিটিমিটি হাসি দেখে নির্ঝর আবার বলল,

আমরা যখন অনেক অনুভূতিতে আক্রান্ত অথচ বলার মতো অনুভূতির সমান্তরাল কিছু খুঁজে পাই না, ভেতরের কথাগুলোকে প্রাণপণ আকুলতায় শব্দ দিয়ে ধরার চেষ্টা করি, তখন; কী জানি হয়তো মানুষ কবিতা করার চেষ্টা করে। অর্থাৎ কবিতা হলো মানব-মনের সর্বোৎকৃষ্ট নির্মাণের মহত্তম শব্দমালা। মানুষ যেখানে অলসতার আশ্রয় চায়। আমার ধারণা ভুল হতে পারে। আপনি বাংলার ছাত্রী, আমার চেয়ে ভালো বুঝবেন।

আপনার মতো করে ভাবার ক্ষমতাটুকুও আমার নেই। সাহিত্য অথবা দর্শন যারা পড়ে অথবা পড়ান, তারা তা সৃষ্টি করতে পারবেন- এটা ভুল ধারণা। একদম ভুল। আপনি অধ্যাপক হলে ভালো করতেন। তা আফ্রিকায় আপনার জব কী ছিল? বাংলাদেশেই বা কী করছেন?

ইউএন ডিপি’র জব।

বাপরে! কর্পোরেট কর্তার মুখে অথবা ভাবনায় এত মানব-দরদ?

মানুষের জন্য আকুলতা অথবা ভাবনার কাছে শব্দ খোঁজার ব্যকুলতা কখন তীব্র হয় জানেন?

কখন?

আপনার মতো অসম্ভব সুন্দরীকে যখন পুরো বাস প্রায় ফাঁকা থাকলেও বিধাতা সেই একাকী পুরুষের পাশে বসান। তাকে আরো ভাগ্যবান করার জন্য স্রষ্টা তার মনের আগুনালাগা অথচ নরম অনুভূতি নিয়ে খেলা করেন। সারারাস্তা ঝর ঝর বৃষ্টি। গুমড়ে গুমড়ে কেঁদে ওঠা মেঘলা আকাশ। আর আমার পাশে বসা আপনার অভিমানভরা ভুল বোঝাবুঝি।

ভুল বোঝাবুঝি? আর...?

ওটা সংস্কৃতির দোলাচাল। বাঙালি নারী সংস্কৃতির অবয়ব। নারী মনের নিরাপত্তা বোধ বলতে পারেন।


নওরিনের এতক্ষণ পর ইচ্ছার ডানা যেন পাখা মেলল। নির্ঝরের কথাগুলো কেন তার এই মুহূর্তে শুনতে ইচ্ছে করছে সে জানে না।  মেয়েরা নাকি প্রশংসা শুনলে তার মনের দূর-অন্ত পাখি সুখের ডানা মেলে। কিন্তু নওরিনের ব্যাপারটা সেরকম ঠিক নয় সে বুঝতে পারছে। কারণ ওকে অসম্ভব সুন্দরী বলার চেয়ে নির্ঝরের অন্য কথাগুলোকেই তার বেশি ভালো লাগছে। নির্ঝর আবার বলল,

আর...? অনেক কিছু। জানি না ঠিক। সোজা ভাষায়, আপনি একটু পরই নেমে পড়বেন। আমার সময়টা দীর্ঘ হয়ে যাবে। ছোট্ট জীবনের কিছু দীর্ঘ সময়! ভাগ্যবানদের জীবনে এসব হয়। তার জন্য আমি আপনার চেয়ে স্রষ্টাকেই বেশি ধন্যবাদ দেবো।

বাসটা থেমে গেল। সামনে সারি সারি বাস-ট্রাক দাঁড়িয়ে। সামনে কোথাও কোনো গন্ডগোল পেকেছে। নওরিন বিরক্ত কণ্ঠে বলল,

শুরু হলো... কী জানি রেল ক্রসিং-এ কোনো দুর্ঘটনা কিনা? নির্ঝর গলায় কৌতুক মিশিয়ে বলল,

আমাদের ইতিহাস! নওরিন মুখ ফিরিয়ে পূর্ণচোখে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে চোখ রাখল নির্ঝরের চোখে। উত্তরে বিনিময়ে নির্ঝর শুধু মিষ্টি করে হাসল। জানালার বাইরে একজন ‘আমড়া’-ওয়ালা লবণ মরিচের মিশ্রণ নিয়ে ছেলা আমড়া ফেরি করছিল। ‘আমড়া’ ‘আমড়া’ শব্দটা কানে পড়ামাত্র নওরিন পাশে বসা নির্ঝরকে মনে মনে অভিসম্পাত দিল। ওর জিহবার সব টক্সিক এনজাইমগুলো নির্ঝরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করল। আর তখনই নওরিনকে অবাক করে এবং নওরিনের জিহবার সব এনজাইমের বন্ধু হয়ে নির্ঝর আমড়াওয়ালাকে ডেকে চারটা আমড়া কাটতে বলল। নওরিন অবাক হয়ে প্রশ্ন করল ,

চারটা কেন? নির্ঝর স্বরে কৌতুক এনে বলল, 

চার অক্ষরের নামের নারীর সামনে তার নিচের কোনো সংখ্যায় অন্তত খাবার, বিশেষত টক-ঝাল খাবারের অর্ডার দিই কীভাবে? আপনার এনজাইমের শত্র“ হয়ে যাব না? অবশ্য চার অক্ষরে এক মাত্রা অদৃশ্য থাকতে পারে। সেই হিসাবে একটা আমার, তিনটা আপনার। 


লজ্জায় অথচ ভেতর থেকে ছলকে ওঠা একরাশ হাসির বর্ণচ্ছটাকে মুখে হাত রেখে লুকাল নওরিন। নওরিনের চোখের কোণে লজ্জামেশানো মিষ্টি হাসির ছলনার ভাষা নির্ঝরের বুকের ভেতর কেমন অনুরণন তুলল। নওরিন মাথা ঝাঁকিয়ে বিস্রস্ত চুলগুলোকে আঙুলের ডগা দিয়ে ঠিক করে নিল। মাথার ডানপাশ থেকে সবগুলো চুলকে শাসিয়ে বাম পাশে এমনভাবে সরিয়ে রাখল যেন নির্ঝরের পাশের অংশে মুখটাকে সে স্পষ্ট করল। নির্ঝর বামপাশে ঘটা এইসব মোহনীয় মুহূর্তকে আড়চোখে দেখে নিল। গালে টোল ফেলে, চাপা হাসি ঠোঁটে রেখে নওরিন প্রশ্ন করল, 

চার অক্ষরের নারীর সামনে কেন তার নিচের সংখ্যা ব্যবহার করা যায় না?

সে-ই ছন্দের ব্যাপার। চার মাত্রা শুনে যে কান অভ্যস্ত; তার শরীরের এনজাইমগুলো...  

নির্ঝরের কথা শেষ হওয়ার আগে এবার সত্যি সত্যি নওরিনের চোখ দুটো ঢেকে ফেলতে ইচ্ছে করল। সে সুযোগ পেল না নওরিন। আমড়াওয়ালা নির্ঝরের হাতে আমড়া দিয়ে টাকা না নিয়েই দৌড় শুরু করল। কোথায় একটা বিস্ফোরণ হলো। সাথে গোলাগুলির শব্দও। একদল মানুষ দিগি¦দিক দৌড়াচ্ছিল। হঠাৎ এত মানুষ কোত্থেকে এলো নির্ঝর ভেবে পেল না। কন্ডাক্টর দ্রুত বাসের দরজা বন্ধ করে দিল। বাসের ভেতরের মানুষগুলোর ভেতরে উদ্বিগ্নতা ছড়ালেও ‘এ যাত্রায় হয়তো কোনোরকমে বেঁচে যাব’, সবার ভেতরে এমন নির্বিকার অভিব্যক্তি। নির্ঝর জানালা খুলে আশেপাশে কোথাও ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা অথবা দুর্ঘটনার তথ্য জানার চেষ্টা করল। নির্ঝরের ডাকে কেউ কোনো সাড়া দিল না। যে যার মতো নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছিল। কিন্তু কোথায় নিরাপদ আশ্রয়? নির্ঝর দেখল ফাঁকা একটা অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভারকে এক বয়োবৃদ্ধ তার কন্যাসহ কিসব আকুল আকুতি জানাচ্ছে। কিন্তু বৃদ্ধের মিনতি শোনার আগেই অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার কষে এক থাপ্পড় খেলো। একদল ছেলে চাপাতি লাঠিহাতেই এ্যাম্বুলেন্সের ভেতর ঢুকে পড়ল।


বাস একটু একটু চলতে শুরু করলে নওরিন খেয়াল করল, সে কখন থেকে এক হাতে চারটি আমড়া আর আরেক হাতে লবণ মরিচের মিশ্রণটি নিয়ে হতভম্ব হয়ে বসে আছে। বাসের গতি যখন একটু বাড়ল বাসযাত্রীদের চুপসে যাওয়া স্নায়ুগুলো টান টান হয়ে উঠল। বাসটা যখন দাউ দাউ আগুনে পুড়তে থাকা ট্রেনটা অতিক্রম করল তখন তাদের বীরত্ব কণ্ঠে প্রকাশ পেতে আরম্ভ করল। তাদের মোবাইলগুলো সচল হয়ে উঠল। চোখের সামনে পুড়তে থাকা একটা ট্রেন তাদেরকে মানব-প্রজাতির উত্থান-পতনের ইতিহাসের সাক্ষী করায় তারা সাড়ম্বরে মুঠোফোনে আত্মীয়-স্বজনকে সেই ঘটনা জানাতে থাকল। বাঙালির ইতিহাস! কেউ একজন বলল,

চারদিকে আগুন। একটা ট্রেনে আগুন জ্বলছে। হাজার হাজার মানুষ চারদিকে উদভ্রান্তের মতো ছুটছে। আরো একজন মোবাইলে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

কী যে হয়? চারদিকে হট্টগোল মিছিল আর গন্ডগোল। আমার জন্য দোয়া করো। বাঁচি কি মরি! অন্যজন বলল,

দেশটা উচ্ছন্নে গেছে। যেভাবেই হোক এখান (এ দেশ) থেকে ভাগতে হবে। তাদের মোবাইলে কথোপকথোন এক সময় কমে এলে বাসের যাত্রীদের মাঝে গরুগম্ভীর আলোচনা শুরু হয়। একজন বলে,

সব শালা জোচ্চোর! সব শালা মধ্যস্বত্ত্বভোগী। ব্যবসায়ীরা ঠকাচ্ছে কৃষকদের। মাঝখানে পুলিশ করছে চাঁদাবাজি। দুই প্রান্তে আমরা বসে আছি শোষিত জনগোষ্ঠি। বিজ্ঞাপন পাওয়ায় জন্য ধর্ণা দিতে গিয়ে মিডিয়াও বিক্রি হয়ে যাচ্ছে মধ্যস্বত্তভোগী আর পুলিশের পকেটের কাছে। দল চালানোর জন্য এদের কাছে হাত পেতে বসে আছে রাজনীতিকরা। মাঝখান থেকে এরা গোগ্রাসে গিলছে জলাভূমি, মাঠ-ঘাট, মানুষের মূল্যবোধ। আমরা ভাই, সাধারণ জনগণ, সমাজের ব্যবসায়িক মনোবৃত্তির মানুষের কাছে বন্দী হয়ে পড়েছি। আরেকজন বলল,


নেতৃত্ব দুর্বল হলে যা হয়। খাদ্যের উৎপাদন মূল্য, সুতার মূল্য, পরিবহনে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সবই নেতৃত্বের গুণ। বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ায় মূল্যস্ফিতির শীর্ষ-দেশ! আমার মনে হয় দেশটার জিম্মা নিয়ে রেখেছে ঐ লেংটি সারা সাধারণ কৃষকই। ওরা ছাড়া এদেশের সর্বনাশ কেউ ঠেকাতে পারবে না। এদেশের লেঙটি মারা কৃষকরা যতদিন জেগে না উঠবে, যতদিন না তারা ‘লাজ নাই হালার (হাল চাষ করেন যিনি) আর লাজ নাই জ্যালার (জাল দিয়ে মাছ ধরেন যিনি)’ এই থিওরি থেকে বেরিয়ে লাঠি-সোটা হাতে নিয়ে রাস্তায় নামবে, ততদিন এভাবেই দেশ চলবে। কারণ ওরা ছাড়া আমরা সবাই মোটামুটি সুবিধাভোগী। প্রায় সামনে বসা এক ভদ্রলোক কান থেকে ফোনটা নামিয়ে রেখে, পেছনের যাত্রীদের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বললেন,

ঘটনা কী হয়েছে না জেনেই আপনারা মিয়া দেশ উদ্ধার করে ফেলছেন! এই আমাদের এক দোষ; কান না দেখে আমরা চিলের পেছনে দৌড়াতে থাকি। মাঝখানের এক যাত্রী প্রতিবাদ করল, 

ঘটনা জানি না, আপনাকে কে বলল? আপনি দেখছি এক সবজান্তা শমশের।


নির্ঝর নওরিন সত্যিই এখনো জানতে পারে নি, আজ কী ঘটেছে? একটা ট্রেন দাউ-দাউ জ্বলছিল। আগুন লাগার পর ট্রেন থেকে লাফিয়ে পড়ে মানুষগুলো বাঁচার জন্য ছুটছে এটুকু না জেনেও বোঝা যায়। কিন্তু সেই ট্রেনে কারা আগুন জ্বালাল? এটা কি নিছক অ্যাকসিডেন্ট? নওরিন নির্ঝর পরস্পরের দিকে মুখ চাওয়া চাওয়ি করল। প্রতিপক্ষের উত্তরে সামনের আসনে বসা সেই যাত্রী তার স্বরে বলল, 

আমরা তো বাঙালি। তুচ্ছ ঘটনাকে বিরাট করে ফেলতে আমাদের জুড়ি মেলা ভার। ‘তিলকে তাল করা’-ব্যাকরণে এমন অসংখ্য বাগধারা যা শুধু আমাদের জন্য প্রযোজ্য; পৃথিবীর আর কোথাও আছে কি না জানি না। ঘটনা কিছুই নয়। শুনলাম রাস্তায় বসে কয়েকজন ছেলে ভেরেন্ডা ভাজছিল। মানে, তারা খাজুরে গল্প করছিল। এতই খাজুরে যে ট্রেনটাও দেখতে পেল না। ব্যস, ট্রেনে কাটা পড়ে দুজন মারা গেল। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন এই অবস্থা! ট্রেন থেকে নেমে গ্রামের দিকে দৌড়ে পালাচ্ছিল একটা পরিবার। আপনারা ভাবতে পারেন তাদের পেছনে পড়া মেয়েটিকে খুন করা হয়েছে।


বাসের যাত্রীরা এই খবরে ইস্ততত করল শুধু। প্রতিনিয়ত লোমহর্ষক এই সব ঘটনা শুনে অভ্যস্থ যাত্রীদের গভীর কোনো দুঃখ স্পর্শ করল না। শুধু নওরিন, হাতে ধরে থাকা চারটা আমড়া জানালা দিয়ে বাইরে হাত বাড়িয়ে ফেলে দিল। তা করতে গিয়ে নওরিনের শরীর স্পর্শ করল নির্ঝরের শরীরকে। একগুচ্ছ চুল নির্ঝরের বুকে ঝাপটা দিয়ে নাকের কাছে প্রাণময় গন্ধ ছড়াল।  নওরিনের মুখের ভেতরে আমড়াকে গ্রহণের এনজাইম কখন শুকিয়ে গিয়ে বিস্বাদ এনজাইমে পরিণত হয়েছে। সে ঢোক গিলল।  নওরিনের শরীরের গন্ধমিশ্রিত চুলের গন্ধের ভেতর দিয়ে নির্ঝর কেমন করে যেন নিজের শৈশবের অনুভূতির অতলে হারিয়ে গেল। শহরতলীতে   হেমন্তের ঘুড়ি উড়ানো দিনগুলোতে। বাবা একটা সাইকেল কিনে দিলে কেমন আনন্দে ভেসে গিয়েছিল ওদের সময়গুলো। ওর আর তৃণার। প্রতিবেশি নাসের চাচার মেয়ে তৃণা। নাসের চাচা শেষ বয়সে এক কন্যা সন্তানের জনক হলেন।  তৃণার বয়স সাত হতে না হতে তিনি অবসর গ্রহণ করেছিলেন। অভাব অনটনের চিহ্নগুলো ছোট্ট তৃণার পোশাকে, শরীরে স্পষ্ট হয়ে ফুটে থাকত। তৃণা হাসলে ওর ছোট্ট শরীরের কাঁধের কাছে জেগে ওঠা "বিউটি-বন’ নামের কঙ্কালটাও হেসে উঠত। অল্প বয়সেই অসাধারণ হাতের কাজ রপ্ত করেছিল তৃণা। নির্ঝরের মা তৃণার থেকে কাঁথায়, বালিশের ওয়্যাড়ে ফুল তুলে নিয়েছিলেন। তৃণা বেতের ফুলদানী, পাট দিয়ে পুতুল বানিয়ে তাতে নিজ হাতে বানানো রঙিন ফুল পরিয়ে দিত। আশেপাশের অনেক বাড়ির কাঁথায়, বিছানার বালিশে, দরজায় ঝুলানো বেতের ফুলগুচ্ছে, ফুলের টবে তৃণার শিল্পকর্ম শোভা পেত। তৃণার পড়াশুনার খরচ চালানোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন সানজিদা। স্কুলের অংকন শিক্ষক সত্য নারায়ণ তৃণার আঁকানো ছবি দেখে মন্তব্য করলেন,

তোমার আঁকানো দেখলে পাবলো পিকাসোও মুগ্ধ হতেন আর আমি তো সামান্য এক সত্য নারায়ণ।


পরম স্নেহে সত্য নারায়ণ তৃণা নামক এক রাষ্ট্রীয় সম্পদের মাথায় হাত রেখে অভূত-স্বপ্নে বিভোর হতেন। তৃণা একদিন দেশ খ্যাত হবে আর সত্য-নারায়ণকে স্মরণ করবে, তার জীবন ধন্য হবে। সত্য নারায়ণের স্বপ্ন সত্যি হয়নি। প্রতিবেশীরা অর্থ সাহায্য ছাড়াই তৃণার কাছ থেকে কাজ করিয়ে নিয়ে তারা তাকে মেধা-চর্চার সুযোগ দিচ্ছে এমন ভাবনায় নিজেদের প্রতি নিজেরাই কৃতার্থ ছিলেন। আর তৃণার ঐ শিল্পীসত্তাটুকুই ওর কাল হয়েছিল।


এক ধরনের নেশা আর আশায় সে কাজ করেই যেত। কেউ কাজের বিনিময়ে কিছু দিতে চাইলে তৃণার ঠোঁটের কোণের ‘না’ সূচক হাসির সাথে কণ্ঠের নিম্নের স্পষ্ট হয়ে কঙ্কালটাও হেসে উঠত। মানুষগুলো বুঝত না তৃণার কঙ্কালের ঐ অংশটুকু বিনে পয়সায় কাজ করে নেওয়ার জন্য আসলে নিরীহ ভঙ্গিতে প্রতিবাদ জানাত।

তৃণার মায়ের অসুস্থ্যতায় চিকিৎসায় টাকা যোগাতে না পেরে তার বাবা আবু নাসের খ্রিস্টান মিশনারীর আর্থিক প্রলোভনে ধর্মান্তরিত হলেন। তাতে ক্ষিপ্ত সানজিদা তৃণার পড়াশুনার খরচ বন্ধ করে দিলেন। পাড়ার প্রতিটি ঘরে ঘরে জেগে থাকা তৃণার শিল্পকর্ম সবার প্রতি করুণ চোখে তাকিয়ে থেকেও তৃণার জন্য কোনো সহানুভূতি আদায় করতে পারল না। তৃণার শিল্পকর্মগুলি সানজিদার মতো শিক্ষিৎ মানুষসহ সমাজের কোনো মানুষকেই বুঝাতে সক্ষম হলো না, ‘ধমর্’ নামের একটা শব্দ মানুষের শিল্প সত্তায় কোনো প্রভাব বিস্তার করে না। তবে অসুস্থ্যতা, দারিদ্র এরা জীবনের অন্তর্মূলে প্রভূত প্রভাব বিস্তারকারী। অসুস্থ্য তৃণা তার শিল্পকর্মের সত্তায় ‘লক্ষ্য’ শব্দটাকে নির্দিষ্ট করতে দিন দিন ব্যর্থ হচ্ছিল। কারণ তৃণা, নিজে লক্ষ্যহীন হয়ে গিয়েছিল।


সানজিদা কড়া ভাষায় নির্ঝরকে তৃণার সাথে মিশতে বারণ করে দিলেন। শেষবার লুকিয়ে নির্ঝর ওকে যখন সাইকেলের সামনে রডের ওপর বসিয়ে কাঁচা-পাকা রাস্তা পেরিয়ে গ্রামের দিকে ছুটল, তখন শুকনো তৃণার স্বাস্থ্যময় চুলগুলো উড়ে উড়ে নির্ঝরের মুখের ওপর পড়ছিল। স্রষ্টা মনে হয় শিল্পীদের নিজহাতে সৃষ্টি করেন। স্রষ্টা তৃণার অগোচরেই ওর কেশের বিন্যাসে লুকিয়ে রেখেছিলেন নদীর ছন্দময় ঢেউ। বৃষ্টির সোঁদাগন্ধ। শিল্পীদের প্রকৃতিও মনে হয় নিভৃত-স্বেচ্ছাচারিতায় পরিপূর্ণ হয়। তৃণার নির্জনতম স্বভাবের কারণে নির্ঝর ওর মৃত্যুর আগে জানতেও পারে নি-তৃণা ক্যান্সারে ভুগছে। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে তৃণা যেন এই সমাজকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছিল। তৃণার শিক্ষক সত্য নারায়ণ আকুল কান্নায় ভেঙে পড়া নির্ঝরকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন,

আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট, আজ তৃণার পাশে মুসলমান অথবা খ্রিষ্টান কোনো সমাজই নেই। কোনো সমাজই বুঝল না আজ কত বড় এক সম্ভাবনার মৃত্যু হয়েছে!


নির্ঝর সেদিন ধর্ম আর দারিদ্র এই দুুই শব্দকে একসুতায় বেঁধে ঘৃণা করতে শিখেছিল। কিশোর নির্ঝর চিৎকার করে সমাজের প্রতিটি মানুষকে অশিক্ষিত বলে গালি দিতে চেয়েছিল। নির্ঝর শেষবার তৃণার নিথর মুখের দিকে তাকিয়েছিল। মৃত কিশোরী তৃণার মুখে মোনালিসার মতো এক হাসি লুকিয়ে আছে। তৃণার আঁকানো ছবি, তৃণার সব শিল্পকর্ম আর খেলার সময় বিনয়ী ভঙ্গিতে সবকিছু মেনে নেওয়ার আচরণ- সবকিছু একসাথে নির্ঝরের চোখের সামনে ভাসতে থাকল। নির্ঝরের নাকে তৃণার কেশের বিন্যাসে লুকিয়ে থাকা সোঁদা গন্ধ ভেসে এলো; আর আজ নওরিনের চুলেও সেই গন্ধ; সাথে শ্যাম্পুর অতিরিক্ত একটা গন্ধ। নির্ঝরের মনে হলো, ওর পাশে তৃণা বসে আছে। আর সাথে সাথে মনে হলো, আজকে তৃণা ট্রেন থেকে নেমে বাবা-মায়ের সাথে দৌড়ে পালাতে চাচ্ছিল। সন্ত্রাসীরা ওকে মেরে ফেলেছে এবং তৃণার মতোই আজকে কেউ মারা গেছে- এমন ভাবনায় নির্ঝরের চোখ টলটল করে উঠল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকানোর ছলে সে চোখ মুছল। নওরিন এই বয়সী মানুষদের কোনোদিন আবেগি হতে দেখে নি। নির্ঝরের আবেগ মুগ্ধ করল নওরিনকে। একজন যাত্রী বলল,

এটা কখনোই হতে পারে না। দিন-দুপুরে গল্প করতে করতে ট্রেনে কাটা পড়বে দুজন... তাই নিয়ে সাধারণ জনগণ ট্রেনে আগুন ধরিয়ে দেবে; পুরো ট্রেন লুটপাট হবে! জনগণ শুধু লুটপাট নয়, ট্রেনের সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে মালামাল লুট করতে গিয়ে তাদের খুন করবে? পরিকল্পনা করে এই কাজটা করা হয়েছে। অপর একজন যাত্রী বলল,

ভাই পরিকল্পনা করে লাভ কী? তাহলে ট্রেনের নিচে যে দুজন কাটা পড়েছে তারা নিজেরাও কি এই পরিকল্পনা জেনে মারা গেছে? শুনুন ভাই, নিজের জীবন যাবে এমন পরিকল্পনার সাথে কোনো বাঙালির সম্মতি পাবেন না। এটা নিছক একটা দুর্ঘটনা। অন্যজন ভদ্রলোকের কথায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন, বললেন,

ভাই আপনি কি এদেশে বাস করেন? নাকি মাঝে মাঝে এখানে আসেন? বাজে কথা বলেন কেন? একাত্তরে আমরা... তার কথা শেষ হওয়ার আগেই আরেক যাত্রী বললেন, 

রাখেন মিয়া, এখন আর একাত্তরের মানসিকতার মানুষ নাই। নিছক দুর্ঘনা থেকে যদি আজকের ঘটনার উৎপত্তি না হয়, তাহলে কেন হয়েছে, বলুন।

ইস্যু তৈরির জন্য হয়েছে মিয়া। সরকার দেশ চালাতে ব্যর্থ এমন ইস্যু তৈরির জন্য বিরোধী দলের এসব স্রেফ হিংস্রতা। একজন লোক চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। নখ উঁচিয়ে শাসনের ভঙ্গিতে বলল,

আপনি একজন ফালতু লোক। পাবলিক সেন্টিমেন্টের প্রতি আপনার কোনো শ্রদ্ধা নাই, বিরোধি দল বলল আর ট্রেনের সামনে দুজন লোক বসে থাকল? কী পরিপক্ক আপনার চিন্তা হ্যাঁ, দুটা লোক অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে বলে তারপর এমন নৈরাজ্য মানা যায় না, কিন্তু নৈরাজ্য তো করছে তারা যাদের নৈরাজ্য করার মতো ধ্যাঙাড়ে বাহিনী আছে। 

একসময় দুপক্ষের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ে বাসের অন্যান্য যাত্রীরাও অংশগ্রহণ করল। অতঃপর অল্পকিছু সংখ্যক মানুষ বাদে বাসের যাত্রীরা দুদলে বিভক্ত হয়ে একদল অন্যদলের উদ্দেশ্যে বাজে মন্তব্য বিনিময় করতে থাকল। এই ফাঁকে নওরিন-নির্ঝর অসহায় ভঙ্গিতে একে অন্যের প্রতি মুখ চাওয়া চাওয়ি করল। সুন্দর গুছিয়ে অসাধারণ ভংগিতে আর স্বরে কথা বলতে পারার নির্ঝরকে এমন ভাষা-হারানো অসহায় ভংগিতে বসে থাকতে দেখে বরং মায়া হলো নওরিনের। বাসটা ডানে একটু কাত হলো। তাতে ডান পাশে বসা নির্ঝরের শরীরকে স্পর্শ করল নওরিনের ডান বাহু। নওরিন সাথে সাথে বাহুটা সরিয়ে নেওয়ার তাগাদা অনুভব করল না। দুজনের শরীর আলতো ছুঁয়ে থাকল একে অন্যকে। জীবনের প্রতি বিনয়ী আচরণ নারী হৃদয়ে মনে হয় মায়া তৈরি করে। বুদ্ধিদীপ্ত কথা নয়। ভরাট কণ্ঠ নয়, পৌরুষত্ব ভরা চেহারা নয়, একটু আগে একটা ছোট্ট মেয়ের মৃত্যু সংবাদে নির্ঝরের টলটল দু'চোখ আর বাসের ভেতরে যাত্রীরা যখন প্রায় কথাযুদ্ধে লিপ্ত তখন নির্ঝরের ভাষাহীন অসহায় ভঙ্গি নওরিনকে তার সত্যিকার স্বরূপটা চিনিয়ে দিল। নওরিন, নির্ঝরের ভেতরে এই মুহূর্তে যে প্রবহমান ভাষা তার সারথী হয়ে গেল। পুরুষরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অর্জন, নারীকে করায়ত্ব করতে শত শত প্রচলিত যুদ্ধেও লিপ্ত হয়েছে। অথচ নারীর মনের কোণে উঁকি দিয়ে থাকা ছোট্ট এক দৃষ্টির দিকে মনের আলো ছড়াতে মনের যে গড়ন অথবা আচরণ প্রয়োজন, তা নির্ণয় করতে মাঝে মাঝেই তাদের ভুল হয়, হয়েছে। অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। নওরিন গলায় মায়া এনে প্রশ্ন করল, 

খারাপ লাগছে?

চমকে উঠল নির্ঝর। কতদিনের আপন মানুষের কণ্ঠে যেন সে প্রশ্নটা শুনল। সে কিছু একটা ভাবল। তারপর শান্তকণ্ঠে বলল,

আমি ছোটবেলার এক স্মৃতির ভেতরে ডুবে ছিলাম। আমার নিজের জন্য নয়। আপনার জন্যই এতক্ষণ খারাপ লাগছিল।

নির্ঝরের মুখটা আরো অসহায় দেখাল। নির্ঝরের এই অসহায়ত্ব নিয়ে নওরিনের খেলা করতে ইচ্ছে করল। ঠোঁটের কোণে চপল হাসি এনে বলল

আপনার পক্ষেই সম্ভব। তা স্মৃতিটা কি আমাকে বলা যায়? 

নির্ঝর দ্রুত চোখ ফেরাল নওরিনের চোখে। গভীর দৃষ্টি রেখে কথা বলার খেই যেন হারিয়ে ফেলল। নির্ঝরের ওমন গভীর দৃৃষ্টির সামনে লাজুক ভঙ্গিতে চোখ নামাল নওরিন। তারপর মুখে স্মিত হাসি এনে চোখ তুলে বলল,

কী? কী দেখছেন ওমন করে?  

নির্ঝর নওরিনের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেও অন্য কোথাও নিজেকে হারাতে থাকল। চোখের দৃষ্টিকে ক্রমশ সংকুচিত করে নিজের ভেতরে স্মৃতি নামের এক ইতিহাসকে খুঁজে ফিরল যেন তার দুচোখ। অস্ফুট স্বরে নওরিনকে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,

স্মৃতি? নাহ, স্মৃতি ঠিক নয়। ইতিহাস। চৈত্রের তালপাতায় বাবুই এর ঝুলন্ত বাসা যেমন শনশন বয়ে চলা বাতাসের সাথে নির্জনতার ইতিহাস হয়ে আছে, তেমনি ইতিহাস! বাঙালির ইতিহাস।


বাঙালীর সংগ্রাম। তারপর মুনাফালাভের অর্থলিপ্সতার সাথে দুর্ভিক্ষের ইতিহাস।

স্বাধীনতা লাভের পর জনসংখ্যা বৃদ্ধি আর দিন দিন অসহিষ্ণু হয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠিকে সহিষ্ণু করার ইতিহাস।

সেই অন্ধ গল্পবলিয়ের ইতিহাস। সত্য নারায়ণ স্যারের স্বপ্নের ইতিহাস-অন্ধকার রাতে বিস্তৃত সমতল মাঠের মাটিতে গুটিশুটি মেরে লেপ্টে থাকা আঁধারের সাথে মানুষের দীর্ঘশ্বাসের যুগ যুগ প্রবাহমান ইতিহাস।

বাঙালির কাজ ব্যতিত অতিকথন প্রিয়তার ইতিহাস।

হিন্দি চ্যানেল থেকে হিংসা-বিদ্বেষ আর পরকীয়া প্রীতিতে মনস্তাত্ত্বিক গড়ন তৈরির ইতিহাস। হিন্দি সিনেমা দেখে চাঁদাবাজ হওয়ার ইতিহাস।

শিক্ষার নামে, মায়েদের শিশুদের কচি মন নিয়ে পড়াশুনা- প্রতিযোগিতা নামের ভয়ংকর খেলায় নিপতিত হয়ে তাদের  বিকাশকে ধ্বংস করার ইতিহাস।

সমগ্র জাতির ভেতরে সন্দেহ প্রবণতা তৈরি করে যৌথ পরিবারের প্রথা ভেঙে খণ্ড খণ্ড করার ইতিহাস।

দু’শ বছর শাসন আর শোষণ করা ব্রিটিশদের ইংরেজি মাধ্যম সংস্কৃতিতে অভ্যস্থ হওয়ার নামে আরো শোষিত, নিজ সংস্কৃতিকে নিপীড়িত করার ইতিহাস।

সত্য নারায়ণ আর সেই করতোয়া নদীর তীরে বসে থাকা অন্ধের স্বপ্নভঙ্গের দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস।


নির্ঝরের কণ্ঠ থেমে গেল। নির্ঝরের আলতো স্বরে, আনমনা ভঙ্গিতে কথার ভেতরে মগ্ন হয়ে হারিয়ে গিয়েছিল নওরিন। বাইরে দ্রুত অপসৃয়মান বিদ্যুতের খুঁটিগুলো ওদের চোখ থেকে হারিয়ে যাচ্ছিল। এই খুঁটির তারে নির্ঝর ছোটবেলায় অনেক বাদুড় মরে ঝুলে থাকতে দেখত। ‘বিদ্যুতের তারে শুধু বাদুড়ই কেন মরে?’ বাবাকে এমন প্রশ্নের উত্তরে নির্ঝর জেনেছিল বাদুড়  স্তন্যপায়ী প্রাণী। ‘স্তন্যপায়ী’, ‘বিদ্যুতায়িত’ এই শব্দগুলো সেদিন শিশু নির্ঝরকে ভাবিয়েছিল। জটিল এই ব্যাপারগুলোর সহজ একটা উত্তর সে মনে মনে বের করে নিয়েছিল। স্তন্যপায়ী প্রাণী যেহেতু বিদ্যুতের উদ্ভাবক, সুতরাং তার উদ্ভাবন, তাকে ধ্বংস করবে-এমনই মনে হয়েছিল নির্ঝরের। কিন্তু ছোট্ট নির্ঝর সেদিন জীবনের জটিল সব ধাঁ ধাঁর উত্তর নিজ থেকে তৈরি করে নিলেও, এখন কোনো বাদুড় কেন বিদ্যুতের তারে মরে ঝুলে নেইÑএমন ভাবনার সঠিক উপাত্ত ওর কাছে নেই।


‘ফিঙে কোথায় নাচে রে? সে আমাদের বাংলাদেশ, আমাদেরই বাংলা রে!’ ছোটবেলায় পড়া অসাধারণ শিশু ছড়াটি এসে নির্ঝরের সত্তায় দোল দিল। অসংখ্য পাখির কিচির মিচির ডাকে প্রাণের হয়ে জেগে জেগে ওঠা এক একটি ভোর তার শৈশব-কৈশোর স্মৃতিলোককে দুলিয়ে দিল। দোয়েল, শ্যামা, ফিঙে, হটিটি শব্দের সাথে অগ্রহায়ণের ধানকাটা মাঠ, ডাহুক, পেঁচা, ঘুঘু, বক, সারস, পানকৌড়ি, হরিয়ালসহ আরো অনেক পাখির নাম এক একটা শব্দের ছন্দ হয়ে আর সেই পাখিগুলোর পালকের রঙগুলো স্মৃতির রঙ হয়ে নির্ঝরের মনে ভাসতে লাগল। শৈশবে দেখা পাখির পালকের রঙগুলোতে নির্ঝর কল্পনায় আগামি অনাগত দিনগুলোর অনাবিল আনন্দের এক একটা প্রতীক খুঁজে পেত। পাখির নীল-সোনালি অথবা ধূসর পালক দেখলেই নির্ঝরের মনে হতো, কোনো একদিন, এক বসন্তের রোদেলা বিকেলে এমনি সোনালি পাখনায় ছোপ ছোপ নীলের আকাশ শরীরে মেখে নেমে আসবে এক ডানাওয়ালা পরী। যে পরী সাত-সমুদ্র, তেরো নদী পেরিয়ে নিঃসীম এক রাজ্যের গোপন সব গল্পগুলো ধরে রেখেছে তার মায়াবী চোখে। পরীটা এসে নির্জন মাঠে নির্ঝরের হাত ধরবে। তারপর তার রিনিঝিনি হাসির ঝিলিক ছড়িয়ে পড়বে নির্জন মাঠের খোলা প্রান্তরে। তার গা থেকে বেরুবে সোনালি ধানের শিষের মতো মৌ মৌ গন্ধ। তারপর সে পরীটাকে নিয়ে বাসার পাশে বাগান-ঘরে লুকিয়ে রাখবে। বৃষ্টি হলে, বাগান ঘরের মাচায় বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে দুজন বৃষ্টি দেখবে। সেই পরী দিন-রাতভর, তার চোখে লুকিয়ে রাখা গোপন গল্পগুলো নির্ঝরকে শোনাবে। ভূত-প্রেতনি, রাজা-রাণী, রাক্ষস, পাতালপুরীতে ঘুমিয়ে থাকা রাজকন্যাÑ নির্ঝরকে সে সবার গল্প শোনাবে।


এভাবে একটা হলুদ টিয়া; একটা হলুদ হলুদ শস্যক্ষেত পেরিয়ে কোনো একদিন অনেক দূরে হারিয়ে যাবার স্বপ্ন দেখাত। পাখির সবুজ, কালো, ধূসর-প্রতিটি বর্ণের সাথে নির্ঝরের আগামি দিনগুলো এক অদৃশ্য-বন্ধন তৈরী করে এক অস্পৃশ্য স্বপ্ন হয়ে ভাসতে থাকত। আর রাতের পরতে পরতে ডাহুকের ডাক শুনে বাইরের আঁধারের ভেতর এক অপার্থিব রহস্যময়তা তার শিশু মনে আলোড়ন তুলত। সেই আলোড়ন বস্তুত নিরীহ 

ভঙ্গিতে বয়ে চলা রাতটিকে জানতে চাওয়া। 

শিশু মনের এই আলোড়ন তাকে জীবনের বহুবিধ প্রশ্নের গভীরে নিয়ে শান্ত করে ফেলেছিল। বাবাকে সে প্রশ্ন করেছিল,

রাতে তারাগুলোও ঘুমায় কি না? অথবা ‘পাখিদের যখন রাতে ক্ষিদে পায়, তখন তারা কী খায়?’ ‘বাবা তুমি কি আমাকে পাখিদের বাসাগুলো দেখাতে পারো?’ আর একটু বড় হওয়ার পর ঘুঘুর ডাক শুনে মাকে সে প্রশ্ন করেছে,

‘মা, ঘুঘুটা ওমন মন খারাপ করে কাকে ডাকছে?’ সানজিদা তখন নির্ঝরকে বানিয়ে বানিয়ে গল্প শুনিয়েছেন

বিয়ের পর মেয়েটা মাকে ছেড়ে চলে গেছে তো। মা ঘুঘু তার মেয়েকে ডাকছে- ‘ফিরে আয়! ফিরে আয়!’ নির্ঝরের চোখের ভেতরে উৎসুক মায়াবি চাহনিÑ

তাহলে মেয়েটা বিয়ে করে চলে গেল কেন?

সানজিদা এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ছেলের অভিব্যক্তিতে ছড়ানো মায়াকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখতে থাকেন। অনেক কিছু বলতে গিয়ে নির্ঝর ঠিক ভাষাটি খুঁজে না পেয়ে আবার প্রশ্ন করে,

মেয়েটা ওর মায়ের কাছে এখনো আসছে না কেন?

তারপর সারাজীবন ঘুঘুর ডাক শুনলেই, কোনো মেয়ের বিয়ে হতে দেখলেই, মায়েদের জন্য এক ধরণের বিষন্ন স্বরের স্রোত বয়ে গেছে নির্ঝরের হৃদয়ে। আজও যায়। কোথায় গেছে সেই পাখিগুলো?

বাস থেকে দ্রুত পেছনে অপসৃয়মান বিদ্যুতের তারগুলোতে নির্ঝরের স্বপ্ন-ডানার স্বপ্নস্বরের সেই পাখিগুলোর কেউ নেই! আছে শুধু সারি সারি কাক। এদের দেখলে, অথবা কা কা শব্দ শুনলে মন খারাপ-ভালোর কোনো ব্যাপার হয় না। কা কা শব্দ বরং নির্ঝরকে একধরনের চরম বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়। এক দ্যোতনাহীন, বিরতিহীন ‘রুটিন’ জীবনের নির্মোহতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

কর্পোরেট কাক।

শুধু খাবার খোঁজ! শুধু খাবারের খোঁজ। কা কা । কা কা ।

ছোটবেলায় তার ছোট্ট মফস্বল শহরটাতে এই প্রাণীগুলোই বরং অতিথি ছিল। সীমানা প্রাচিরে কোনো গাছের ডালে একটিও কাক বসে ডাকলে দাদা-দাদি আর মাকে বরং সে কাক তাড়াতে দেখেছে। ঢিল অথবা লাঠি হাতে কাককে তাড়াতে তাড়াতে নির্ঝর তাদের বলতে শুনেছে,

এই যা কুষ্মান্ডি। সাত সকালে কোত্থেকে মৃত্যুর খবর নিয়ে এলি?

নির্ঝর পাখিটার সাথে ওমন আচরণ করার কারণ জানতে চাইলে তারা জানিয়েছেÑ কোথাও কেউ মারা গেলে কাক এসে ওভাবে ডাকে। কাক মৃত্যু সংবাদ বহনকারী! আত্মার অথবা মূল্যবাধের মৃত্যু-সংবাদ। এখন অনেক কাক, অনেক মৃত্যু! তাই মৃত্যু সংবাদের ভয়ে কেউ ভীত নয়। এখন কেউ কাককে অভিশাপ দেওয়ার কথা ভাবে না। তাড়াতেও যায় না।

এখন অনেক মানুষ। মৃত্যু সংবাদ প্রদানকারী কুসংস্কারটি তাই সমাজে আর প্রচলিত নেই। এটা কর্পোরেট যুগ, কুসংস্কার নেই, তাই কাকেরও মূল্য নেই।

অথচ কাক নির্ঝরকে বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়। নিজের এলোমেলো ভাবনায় হাসল নির্ঝর।


মাইকে তখন দূর থেকে ভেসে ভেসে আসছিল একটা গানের সুর। বর্ষাস্নাত মেঘলা দিনে সেই সুর বাতাসে ভাসা গোপন তরঙ্গে মিশে ছড়িয়ে পড়ল নির্ঝরের অন্তরাত্মায়। নওরিনের বুদ্ধিদীপ্ত স্নায়ুর রন্ধ্রে রন্ধ্রে। যারা স্মৃতিকে জাগিয়ে দিয়ে নিজেকে হারিয়ে যেতে বলে। সেই হারিয়ে যাওয়া মানে জীবন থেকে চলে যাওয়া সময়কে আলিঙ্গন করা। কাঁচা অনুভূতির আবেশের ভেতরে ছড়ানো উত্তাপ দিয়ে আগামি দিনের স্বপ্নের সাথে ফিসফিস কথা বলা।

নওরিনের মা নাজ তিতির তখনো বেঁচে ছিলেন। বাড়ির আঙিনা পেরিয়ে বাঁশ আর সারি সারি আমগাছের সীমানা অতিক্রম করে সামনে যতদূরে চোখ যায় বিস্তৃত সবুজ শস্য ভরা ধানক্ষেত। সেই ধানক্ষেত যখন তুমুল বৃষ্টির সাথে উন্মাতাল খেলায় মেতে উঠে নিজের দুষ্টুমি ঢাকার জন্য বৃষ্টির ভেতরে অদৃশ্য হয়ে যেত, মায়ের বৃষ্টিভেজা শাড়ি যখন তার শরীরে লেপ্টে থাকত, সেই দিনগুলোতে নওরিনের স্বপ্নগুলো নিজের নরম বিছানাটায় লুকিয়ে থাকা কাঁথার সাথে নিজের শরীরের উষ্ণতার মৌ মৌ আবেশ নিয়ে ভবিষ্যতকে কল্পনায় বুঁনতÑ নওরিন তা বুঝত না। একটা পুতুলকে কোলে নিয়ে নওরিন তাকে বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখত। নওরিনের ইচ্ছা করত পুতুলটার সাথে কথা বলতে। বড় হয়ে কোনো একদিন এমনি একটা পুতুলের মতো শিশু তার বুকে মুখ লুকিয়ে থাকবে এমনি ভাবনায় লাজুক হয়ে উঠত নওরিনের স্বপ্ন। গাছপালার ভেতরে মুখ লুকিয়ে থাকা শানবাঁধানো পুকুরটায় নেমে পড়ত নওরিন। ঝুপঝাপ বৃষ্টির সাথে জলের গায়ে লুকিয়ে থাকা মৃদু উত্তাপের সখ্যতার ভাষা বোঝার চেষ্টা করত। আশেপাশের আমবাগান এবং বাঁশগুচ্ছের আলো-আঁধারির ভেতরে চোখ রেখে কী যেন খুঁজত সে। 


অনাগত আগামি দিন! স্বপ্নের ভবিষ্যত। কল্পনায় সেই বাস্তবতাকে ধরতে পারে না নওরিন। শেষমেশ সে হাত পা ছুঁড়ে প্রাণভরে পুকুরজল আর ঝুপঝাপ ঝরে পড়া বৃষ্টির সাথে খেলায় মেতে ওঠে।


শাহনেওয়াজ রহমতউল্লাহর কণ্ঠের স্বরের মাদকতাকে মাইকটা বাতাসে ছড়িয়ে দিয়েছিল। ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়...’ বাতাসের কম্পনে শব্দের ওঠানামা থাকলেও নওরিনের মননে স্থির হয়ে সুরগুলো প্রোথিত হচ্ছিল। আর নওরিন হারিয়ে গিয়েছিল তার হৃদয়ের কোণে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট স্মৃতির কিনারায়।

বাইরের প্রকৃতির দিকে তাকাতে চাইল নওরিন। বাইরের চেয়ে ডানে বসা ছেলেটা ওর সব মনোযোগ কাড়ল। সেও কি নওরিনের মতো কোনো স্মৃতির ঝুপঝাপ বৃষ্টিতে গোসল করছে? ভাবল নওরিন।


স্মৃতিসৌধের স্মৃতির ডানা মেলা স্তম্ভ দেখে নওরিনের ভাষাগুলো স্তব্ধ হয়ে গেল। যেন এত দ্রুত ঢাকা পৌঁছার স্মৃতি সে মনে করতে পারছে না। সেই অবিশ্বস্ত মন নিয়ে নওরিন ঘড়ির কাঁটা দেখল। নাহ্ অন্যদিনের চেয়ে বরং আজ সময় অনেক বেশি লেগেছে।

হোস্টেলে পৌঁছে আজ কী করবেন?

একা একা নিরিবিলি ক্যাম্পাস আমার ভালো লাগে। উপন্যাস পড়ার জন্য। কী করব ঠিক জানি না। আচ্ছা আপনার কাছে কোনো উপন্যাস আছে?

কী আশ্চর্য! নির্ঝরের কাছে একটা উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি। একটু বিস্মিত মনে কোনো কথা না বলে নির্ঝর ল্যাপটপের ব্যাগের পাশ পকেট থেকে একটা পাণ্ডুলিপি বের করে নওরিনের হাতে দিল। নওরিন অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,

এটা কী?

পাণ্ডুলিপি । উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি।

এত বিশাল উপন্যাস : আপনার লেখা? 

সর্বনাশ। আমি লিখব এতবড় উপন্যাস? আমার সাথে চাকরি করতেন ভদ্রলোক। পশ্চিম আফ্রিকায় বসে বসে তিনি এই কুকীর্ত্তি করেছেন।

কুকীর্ত্তি কেন? 

কারণ ঢাউশ এই পাণ্ডুলিপি নিয়ে আমাকে ঘুরতে হচ্ছে। উপন্যাসের ঘোরের মধ্যে থেকে মাঝে মাঝে কেমন যেন অস্থির লাগে।

তিনি উপন্যাসটা আপনাকে অনুবাদ করতে দিয়েছেন? 

আরো কয়েকজনকেও দিয়েছেন, যারটা পছন্দ হবে তিনি সেটা গ্রহণ করবেন।

এটা পাবলিশ হয়েছে?

না এখনো নয়। নওরিন ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,

মাত্র লেখা কোনো উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার আগেই পড়তে পারব এ আমার পরম সৌভাগ্য। আসি তবে। ভালো থাকবেন।

আপনিও ভালো থাকবেন। টেক কেয়ার।


৪

মোহাম্মদ আলী করতোয়া নদীর দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন। করনেশন স্কুলে মাত্র কিছু দিনের পড়াশুনা শেষে স্কুলের পাট চুকিয়ে তার পিতা আলতাফ আলী তাকে সুশিক্ষার জন্য কলিকাতায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিনয়ী আর কঠোর পরিশ্রমী কিশোর মোহাম্মদ আলীর মন আজ বড্ড খারাপ। তবু আগামি দিন আর কর্তব্যের কথা মনে করে তিনি পিতৃ সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা রাখলেন। অদ্ভুত এক স্বপ্ন তার মনে দোল খেতে থাকল। কলিকাতা থেকে ম্যাট্রিক পাশ করতে করতেই বগুড়ায় ততদিনে কলেজ প্রতিষ্ঠিত হবে। কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলেই তিনি আবার ফিরে আসবেন তার প্রিয় এই নওয়াব বাড়ির প্রাঙ্গনে। 


এ বাড়ির উত্তর প্রাঙ্গনের আম্রকানন তার বড় প্রিয়। এখানে বসে চুপিচুপি জোছনালোকিত রাতের মায়ায় ভেসেছেন তিনি। আর হৃদয় ভরে আলিঙ্গন করেছেন আম্রকাননের পূর্বপ্রান্ত দিয়ে প্রবাহিত করতোয়ার কুলকুল ধ্বনি।


কিন্তু মোহাম্মদ আলীর স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল। ম্যাট্রিক তো দূরের কথা কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণিতে পাশ করার পর পর্যন্ত বগুড়ায় একটাও কলেজ প্রতিষ্ঠা পেল না। অবশেষে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে বিএ অনার্স ডিগ্রি লাভের পর নিজেই এ বিষয়ে উদ্যোগি হয়ে উঠলেন। এরই মাঝে ঘটল এক ঘটনা। মোহাম্মদ আলীর পিতা মৃত্যুবরণ করেছেন পাঁচ ছয় বছর হয়েছে। তাঁর কাঁধে জমিদারীর দায়িত্ব বর্তেছে। তিনি এখন ওয়াকফ স্টেটের দ্বিতীয় মোতয়াল্লি হিসাবে নিযুক্ত। বৃদ্ধ ম্যানেজার গৌর গোপাল রায় মোহাম্মদ আলীর সামনে এসে হাত তুলে প্রণাম জানিয়ে বললেন,

হুজুর দেলদুয়ার এস্টেটের একজন মুরুব্বি দুই এতিম সন্তানসহ এসেছেন। আপনার সাহায্য প্রার্থী।


মোহাম্মদ আলী তাদের সাথে সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করলেন। নওয়াব বাড়ির সামনেই একশো বছরের প্রাচীন জৈতুন গাছ। তার ছায়াতলে সম্প্রতি বসার জন্য গোলঘর নির্মাণ করা হয়েছে। সুঠামদেহী মোহাম্মদ আলী সেখানে এসে দেখলেন নয়-দশ বছর বয়সী এক মেয়ের সাথে উনিশ-বিশ বছর বয়সী এক তরুণ যুবক বসে আছে। তাদের সংগে আসা দীর্ঘ শরীরের পক্ক দাড়ির মানুষটি মোহাম্মদ আলীকে ছালাম দেবার পূর্বে তিনিই তাকে ছালাম প্রদান করলেন। বৃদ্ধ লোকটির শরীর এবং বেশ-ভূষায় আভিজাত্য স্পষ্ট। তার চেয়েও বেশি আভিজাত্য লুকিয়ে আছে যেন মেয়ে শিশুটি আর তরুণ যুবার সৌন্দর্যে। কুশলাদি বিনিময়ের পর বৃদ্ধ জানালেন, 

আমি আপনার কাছে এসেছি বিশেষ এক দাবি নিয়ে। 

বেশ তো, বলুন।

বৃদ্ধ ইতস্তত করলেন। খুব সম্ভবত ম্যানেজার গৌরগোপাল পাশে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য তিনি অস্বস্তিবোধ করলেন। মোহাম্মদ আলী গৌরগোপালকে নিষ্ক্রান্ত হওয়ার ইশারা করলেন। ম্যানেজার চলে যাওয়ার লগ্নে দুজন খাদ্য পরিবেশনকারী ভৃত্য ফলাহার আর শরবত পরিবেশন করে চলে গেল। মোহাম্মদ আলী বললেন,

এখন তবে বলুন।

আমি কিছুই বলব না, শুধু নওয়াব সমীপে একটা অনুরোধ পেশ করব।

আমি আপনার অনুরোধ রক্ষার চেষ্টা করব।

এই দুইজনকে আপনি আপনার সন্তান হিসাবে গ্রহণ করুন। পঁচিশ বছর বয়সী মোহাম্মদ আলী এতবড় দুই সন্তানের পিতার স্থানে নিজেকে কল্পনা করে কৌতূহল বোধ করলেন। বৃদ্ধ বললেন,

শর্ত হলো এরা কারা আপনি তা জানতে চাইবেন না। সম্প্রতি ওদের অভিমানী মা মারা গেছে। আজ থেকে এ দুজন আপনার সন্তান। আপনাকেই ওরা পিতা হিসাবে জানবে।

গোলাপি ওষ্ঠাধর, রেশম কালো চুল, গোলাপের আভামিশ্রিত ত্বকের দুই ভাই-বোনের উন্নত গ্রিবায় চোখ রেখে মোহাম্মদ আলীর মায়া হলো, নাকি আরো কৌতূহলী হয়ে ওঠার কারণে তিনি বৃদ্ধকে উল্টা কোনো প্রশ্ন না করেই বললেন, 

আজ থেকে এই দুজন আমারই সন্তান গণ্য হবে। বৃদ্ধের দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়াল। তিনি মোহাম্মদ আলীর দুহাত জড়িয়ে বললেন,

খোদা আপনার মঙ্গল করুন। শুধু এটুকু বলে রাখি, আমার নাম মুন্সি আব্দুল বশির। শৈশব থেকে হতভাগ্য এই দুই ছেলেমেয়ের পিতাকে আমি পিতৃস্নেহে মানুষ করেছিলাম। অথচ ওদের পরিবারে আমি ছিলাম জায়গীর এবং পরবর্তীতে সামান্য খাজাঞ্চি। ছোট্ট মাহজাবিনের চোখ ছলছল করে উঠল। মুন্সি আব্দুল বশির বললেন,

আজ তবে আমি উঠি। আল্লাহ হাফেজ। মাহজাবিন শক্ত করে বৃদ্ধের হাত চেপে ধরল। তাকে এক সময় জড়িয়ে ধরে বলল,

দাদাজান!

দাদার কাছে নয় আম্মা, পিতার কাছে থাকতে হয়। আজ থেকে এই মানুষটিকেই নিজের পিতা মনে করবে। টলটল জল গড়াল মুন্সি আব্দুল বশিরের চোখ থেকে। নাগিব কোনো কথা বলতে পারল না। একবার শুধু বৃদ্ধের বুকে মুখ রেখে কান্না লুকানোর চেষ্টা করেও পারল না। মুন্সি আব্দুল বশির আর আপক্ষা করলেন না। দৃপ্ত পদক্ষেপে অপসৃয়সান হতে হতে এক সময় তিনি নওয়াব প্যালেস থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। বিদায় জানানোর পর মোহাম্মদ আলী স্নিগ্ধ আর হাসিমুখে মেয়েটাকে জিজ্ঞাসা করলেন,

আম্মি, তোমার নাম কি?

মাহজাবিন।

মাহজাবিন? বাহ! আজ থেকে তুমি শুধু মাহজাবিন নও। তুমি এ প্যালেসের প্রিন্সেস। প্রিন্সেস মাহজাবিন। তরুণটির জন্য একই আদুরে বাক্য ব্যবহার করলেন নব-নিযুক্ত নওয়াব মোহাম্মদ আলী,

নাগিব আহমেদ। সুন্দর তোমার নাম।

বৃদ্ধ বিদায় নেবার সময় দুজনের কাপড় চোপড় আর প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সবই ঘোড়ার গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। ফিরে যাবার পূর্বে তিনি মাহজাবিনের বিশেষ এক গুণের কথা বলতে ভুলে যান নি,

কন্যাটি পড়াশোনা করতে বড়ই ভালোবাসে। আপনার কারণে তার বিদ্যাচর্চার পথ আরো সুগম হবে বলে মনে ভরসা পাই। 


নিশ্চয়ই। বলেই আহাম্মদ আলী মুগ্ধ চোখে তাকালেন মাহজাবিনের উজ্জ্বল নেত্রপানে। বিদ্যুৎগতিতে তার ভাবনা দোল খেয়ে গেল। স্কুলের গণ্ডি শেষ করানোর পর তিনি মাহজাবিনের মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেবেন। ঐতিহ্যসমৃদ্ধ এই প্রাচীন নগরী থেকেই তিনি নারীদের উচ্চশিক্ষার জন্য উদ্বুদ্ধ করাতে পারলে ধণ্য হোন। মাহজাবিন যেন তার ভেতরের স্পষ্ট হওয়া এক স্বপ্নের প্রতীকি উজ্জীবন! তাকেই তিনি নারীদের উচ্চশিক্ষার পথিকৃৎ হিসাবে গড়ে তুলবেন। অনন্য এক সুখানুভূতিতে আপ্লুত হলেন নবনিযুক্ত নওয়াব। মনের ভেতরে ডালপালা মেলতে থাকা স্বপ্নকে আনমনে তিনি যেন আলিঙ্গন করলেন। ম্যানেজারকে তিনি ডাকলেন। তাঁর ডাকে গৌরগোপাল ছুটে এলেন। নওয়াবের সামনে, বুকের কাছে তার দুহাত প্রণামের ভঙ্গিতে ধরাই আছে সারাক্ষণ। মোহাম্মদ আলী তাকে বললেন,

এই তরুণ আর কন্যাটি আমার ভগ্নির গর্ভজাত। অকালে আমার ভগ্নি মারা যাওয়ায় আজ থেকে আমিই ওদের পিতা।

জো-হুকুম নওয়াবজাদা।

আজ থেকে আপনি নওয়াবজাদা-নওয়াবজাদী সম্বোধনের যোগ্য পাত্র-পাত্রী পেয়ে গেছেন। গৌরগোপাল জিহবা কাটলেন। নওয়াব আলতাফ আলী মৃত্যুবরণ করেছেন কয়েক বছর আগেই। মোহাম্মদ আলীকে শিশুকাল থেকে নওয়াবজাদা ডাকতে ডাকতে তার অভ্যাসই খারাপ হয়ে গেছে ভেবে তিনি নিজেকে শোধরানোর তাগিদ অনুভব করলেন।


মাহজাবিনের জন্য দোতলার গ্রন্থাগারের পাশের কামরা আর নাগিবের জন্য উত্তর পাশের কোণার কামরা দুটো প্রস্তুত করুন। মোহাম্মদ আলীর এমন আদেশে গৌরগোপাল চোখ কপালে তুললেন। মাহজাবিনের জন্য যে কামরা নওয়াব বরাদ্দ করলেন সে খাস কামরাটি এই নবাব-বাড়ির অত্যন্ত সম্মানিত এবং গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের জন্য নির্ধারিত। দোতলার উত্তরের কোণায় কামরাটি নাগিবকে দেওয়াতে তার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু....


মোহাম্মদ আলী মনে হয় পড়ে ফেললেন গৌরগোপালের মনের কথাটি। তিনি স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন গৌরগোপালের চোখে। এই দৃষ্টির ভাষা গৌরগোপালের মুখস্থ। সুতরাং তিনি বিনা বাক্য ব্যয়ে নওয়াবের আদেশ পালনে ব্রতী হলেন।


আরও পড়ুন: কাজী রাফির ‘ত্রিমোহিনী’ | ধারাবাহিক উপন্যাস | পর্ব–১

কাজী রাফির ‘ত্রিমোহিনী’ | ধারাবাহিক উপন্যাস | পর্ব–২

sidebar ad