হারিকেনের আলোয় বাবার কবর খুঁড়লেন মেয়ে, রাষ্ট্রের কাছে জবাব চাইলেন সোহেল রানা

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

একাত্তরে যিনি লড়েছিলেন দেশের স্বাধীনতার জন্য, জীবনের শেষ অধ্যায়ে তাঁর দাফন ঘিরেই তৈরি হলো বিতর্ক। প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ, আগের কবর মাটি দিয়ে ভরাট করে দেওয়ার দাবি এবং রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন নিয়ে প্রশ্ন—সব মিলিয়ে ঘটনাটি জন্ম দিয়েছে তীব্র ক্ষোভের। গভীর রাতে হারিকেনের আলোয় মেয়ের হাতে বাবার কবর খোঁড়ার বেদনাদায়ক বিবরণ সামনে আসার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কিংবদন্তি চলচ্চিত্র অভিনেতা সোহেল রানা।



যে দেশের জন্য যুদ্ধ, সেই মাটিতে শেষ বিদায় নিয়েও বিতর্ক



মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুধু বিজয়ের গল্প নয়; এটি আত্মত্যাগ, সাহস আর অসংখ্য মানুষের রক্তে লেখা এক জাতির আত্মপরিচয়। সেই যুদ্ধে অংশ নেওয়া একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জীবনের শেষ বিদায় হওয়ার কথা ছিল শ্রদ্ধা, সম্মান ও মর্যাদার মধ্য দিয়ে। কিন্তু মানিক পশারীর দাফন ঘিরে ওঠা অভিযোগ সেই প্রত্যাশার বিপরীত এক বাস্তবতাকে সামনে এনেছে।



একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত প্রয়াত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বাদী ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী। তাঁর মৃত্যুর পর পিরোজপুরে দাফন নিয়ে তৈরি হয় জটিলতা। পরিবারের স্বজনদের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন ও দাফন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়তে হয় তাঁদের।



পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে মৃত্যুর প্রায় ১৭ ঘণ্টা পর শনিবার গভীর রাতে সম্পন্ন হয় তাঁর দাফন। পরিবারের নারী সদস্যদের খোঁড়া কবরে শেষ পর্যন্ত সমাহিত করা হয় এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজন। পরে পুলিশি নিরাপত্তায় দাফন সম্পন্ন হয়।


একজন মানুষের শেষ বিদায়কে ঘিরে এমন পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, যে মানুষটি দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন, তাঁর শেষ বিদায়ে কেন এমন টানাপোড়েন তৈরি হলো—সেই প্রশ্নই এখন আলোচনায়।



হারিকেনের আলোয় কবর, মেয়ের হাতে শেষ ঠিকানা


ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হয়ে উঠেছে বাবার কবর তৈরিতে মেয়ের নিজের হাতে মাটি খোঁড়ার বিবরণ। চারদিকে রাতের অন্ধকার, হাতে হারিকেন—আর সেই আলোয় বাবার শেষ ঠিকানা তৈরি করছেন তাঁরই কন্যাসন্তান। দৃশ্যটি কেবল একটি পরিবারের শোকের চিত্র নয়; এটি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নিয়েও নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে।


বীর মুক্তিযোদ্ধা সোহেল রানা তাঁর ফেসবুক পোস্টে এই ঘটনার কথা তুলে ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।


তিনি লেখেন, ‘একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা, তাকে কবর দেওয়ায় বাধা সৃষ্টি করল স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এবং হারিকেন জ্বালিয়ে তার আলোতে আলোকিত করে তার কন্যাসন্তান নিজ হাতে মাটি খুঁড়ে বাবার কবর তৈরি করল।’


সোহেল রানার বক্তব্যে উঠে এসেছে একজন সহযোদ্ধার প্রতি বেদনা, ক্ষোভ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ। তাঁর প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট, মানিক পশারীর দাফন ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি তাঁকে শুধু ব্যথিতই করেনি, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে এনেছে।



আগের কবর ভরাটের অভিযোগ, সরকারের কাছে জবাব চান সোহেল রানা


মানিক পশারীর দাফন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে আগের কবরটি মাটি দিয়ে ভরাট করে দেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে সোহেল রানার বক্তব্যে।



এ প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, ‘আগের কবরটি স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুরা মাটি দিয়ে ভরাট করে দিয়েছে। স্বাধীনতার স্বপক্ষীয় শক্তি নাকি বর্তমানে সরকার পরিচালনা করছে। কোনো আলামত তো দেখা গেল না।’



ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়ে তিনি সরকারের উদ্দেশে লেখেন, ‘সরকারের কাছে এর সঠিক জবাব চাই।’



তাঁর এই বক্তব্যে মূলত দুটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে—একদিকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও জবাবদিহি, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণের দাবির সঙ্গে বাস্তব কর্মকাণ্ডের সামঞ্জস্য।



তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ এবং ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।



মুক্তিযোদ্ধারা কি তাঁদের চেতনা পৌঁছে দিতে ব্যর্থ?


মানিক পশারীর দাফন ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক সোহেল রানাকে আরও একটি কঠিন উপলব্ধির মুখোমুখি করেছে। তাঁর মতে, মুক্তিযোদ্ধারা জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে তাঁরা হয়তো ব্যর্থ হয়েছেন।


এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নইলে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ কোনোটাই তো দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না।’


এই বক্তব্যের মধ্যে রয়েছে হতাশা, আত্মসমালোচনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে উদ্বেগ। স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রাখা মানুষেরা যখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়ছেন, তখন তাঁদের লড়াইয়ের ইতিহাস, মূল্যবোধ ও চেতনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব কার—সেই প্রশ্নও সামনে আসে।


মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেবল পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ থাকলে তার চেতনা সমাজের গভীরে কতটা পৌঁছায়, এমন ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেই প্রশ্নও নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে।



‘এবার আর ক্ষমা নয়’


সোহেল রানার প্রতিক্রিয়ার শেষাংশে রয়েছে ব্যক্তিগত বেদনা ও প্রতিবাদের আহ্বান। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সহযোদ্ধার দাফন ঘিরে এমন পরিস্থিতির খবর তাঁকে কতটা আঘাত করেছে, তা তাঁর বক্তব্যেই স্পষ্ট।


তিনি লেখেন, ‘না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার আগে এমনি ধরনের সংবাদ আমার মতো অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তক্ষরণ করে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষীয় শক্তি সবাই জেগে ওঠো। এবার আর ক্ষমা নয়।’


এই আহ্বান শুধু ক্ষোভ প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা রক্ষা, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির দাবি।


একজন মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায় যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক বিরোধ, মতাদর্শিক সংঘাত কিংবা সামাজিক বিভাজনের উপলক্ষ হয়ে না ওঠে—এমন প্রত্যাশাও এই ঘটনার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।



শেষ বিদায়ে মর্যাদা, রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি


মানিক পশারীর দাফন ঘিরে ওঠা অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ, কবর ভরাটের দাবি এবং দাফন সম্পন্ন করতে পরিবারের সদস্যদের দুর্ভোগ—প্রতিটি বিষয়ই গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।


একজন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ কিংবা ব্যক্তিগত অবস্থানের ঊর্ধ্বে রয়েছে তাঁর শেষ বিদায়ের মর্যাদা। আর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার ক্ষেত্রে সেই মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত হয় দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস ও জাতীয় দায়িত্ববোধ।


হারিকেনের আলোয় মেয়ের হাতে বাবার কবর খোঁড়ার যে বেদনাদায়ক বিবরণ সামনে এসেছে, তা তাই কেবল একটি পরিবারের শোকের গল্প নয়। এটি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সমাজের দায়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে—সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।


মানিক পশারীকে শেষ পর্যন্ত দাফন করা হয়েছে। কিন্তু তাঁকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ ও প্রশ্নগুলোর নিষ্পত্তি না হলে বিতর্কের অবসান হবে না। প্রয়োজন সত্য উদ্‌ঘাটন, ন্যায়সংগত পদক্ষেপ এবং এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে দেশের জন্য লড়াই করা মানুষদের শেষ বিদায়টুকুও হয় যথাযথ সম্মান ও মর্যাদায়।

sidebar ad