বর্ষা শেষ হয়ে শরৎ আসার এই সময়টায় অনেক পরিবারেই দেখা যাচ্ছে জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, দুর্বলতা, সর্দি-কাশি কিংবা গলা ব্যথা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে ঋতু পরিবর্তনের কারণেই কি এত জ্বর হচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আবহাওয়া পরিবর্তনকে জ্বরের কারণ বলা ঠিক নয়। মূল কারণ সাধারণত বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ। এই সময়ে বৃষ্টি, আর্দ্রতা, তাপমাত্রার ওঠানামা এবং মানুষের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণে কিছু সংক্রমণ বেশি ছড়াতে পারে।
ডেঙ্গুর ঝুঁকি এখন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশে সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর ড্যাশবোর্ড অনুযায়ী, চলতি বছরে এ পর্যন্ত ৬০,৩৭৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ১৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
শুধু সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টাতেই ১,২৩২ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ বাংলাদেশে ডেঙ্গুকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাই এই সময়ে জ্বর হলে সেটিকে শুধু ‘সিজনাল ফ্লু’ ধরে নেওয়া উচিত নয়।
আবার ইনফ্লুয়েঞ্জাও হতে পারে
ইনফ্লুয়েঞ্জা একটি সংক্রামক শ্বাসতন্ত্রের রোগ। বাংলাদেশে IEDCR-এর National Influenza Surveillance অনুযায়ী, দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা সারা বছরই হতে পারে এবং বাংলাদেশের influenza season সাধারণত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর, যা বর্ষা মৌসুমের সঙ্গে মিলে যায়।
ইনফ্লুয়েঞ্জায় সাধারণত জ্বরের সঙ্গে সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা ও দুর্বলতা থাকতে পারে।
তাহলে কীভাবে বুঝবেন?
ডেঙ্গুতে জ্বরের সঙ্গে তীব্র শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, বমি বমি ভাব বা বমি, র্যাশ এবং প্রচণ্ড দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। তবে লক্ষণ দেখে নিশ্চিতভাবে ডেঙ্গু শনাক্ত করা যায় না,প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করতে হয়।
ইনফ্লুয়েঞ্জা বা অন্য ভাইরাল শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে জ্বরের পাশাপাশি সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা, নাক বন্ধ হওয়া ও শরীর ব্যথা বেশি দেখা যেতে পারে।
তবে একই ধরনের লক্ষণ একাধিক রোগেও থাকতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ মিলিয়ে নিজে নিজে রোগের নাম ঠিক করা নিরাপদ নয়।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন?
জ্বরের সঙ্গে যদি শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, বারবার বমি, তীব্র পেটব্যথা, রক্তপাত, প্রস্রাব কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ঝিমুনি বা জ্ঞান হারানোর মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
বিশেষ করে ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বর কমে গেলেই বিপদ শেষ এমন ধারণা ঠিক নয়। তাই জ্বরের গতিপ্রকৃতি ও অন্যান্য লক্ষণ নজরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
ঘরে কী করবেন?
পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার গ্রহণ করুন, বিশ্রাম নিন এবং জ্বর থাকা ব্যক্তিকে মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখুন। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করুন।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করবেন না। জ্বরের কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা আলাদা হতে পারে।
ঋতু পরিবর্তন আমাদের শরীরকে কিছুটা সংবেদনশীল করে তুলতে পারে, কিন্তু জ্বরকে শুধু ‘আবহাওয়া বদলের জ্বর’ বলে উপেক্ষা করা ঠিক নয়।
বর্তমান বাংলাদেশে ডেঙ্গুর পাশাপাশি ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ অন্যান্য সংক্রমণও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র:
* Directorate General of Health Services (DGHS), Bangladesh—Dengue Dynamic Dashboard, 19 September 2026.
* World Health Organization (WHO) Bangladesh—Dengue response update, September 2026.