৭৪ শতাংশ নারী স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন না, কিন্তু কেন?


ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে, ১৫–৪৯ বছর বয়সী নারীদের মাত্র ২৬.২২ শতাংশ স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন—অর্থাৎ প্রায় ৭৪ শতাংশ নারী তা ব্যবহার করেন না।


স্যানিটারি ন্যাপকিন নয়, এখনো ভরসা কাপড়ে


বাংলাদেশের নারীদের মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার চিত্র এখনো উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশ Multiple Indicator Cluster Survey (MICS) ২০১৯-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের মাত্র ২৬.২২ শতাংশ স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন। অর্থাৎ প্রায় চারজন নারীর মধ্যে তিনজনই স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন না। গবেষণাটিতে ৫৪ হাজার ৭০২ জন নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। 


আরও পড়ুন: কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারে নারীরা পিছিয়ে, বাড়ছে চ্যালেঞ্জ


আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ব্যবধান শুধু শহর ও গ্রামের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা, শিক্ষা, সামাজিক অবস্থান এবং তথ্য পাওয়ার সুযোগ। গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে ধনী পরিবারের নারীদের মধ্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের হার ছিল ৫৮.৩৬ শতাংশ। বিপরীতে দরিদ্রতম পরিবারের নারীদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৬.২৯ শতাংশ। অর্থাৎ মাসিকের স্বাস্থ্যবিধি অনেক ক্ষেত্রেই এখনো অর্থনৈতিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল। 


মাসিক এসেছে, কিন্তু নিরাপদ ব্যবস্থাপনা?


মাসিক একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। কিন্তু বাংলাদেশের বহু নারী ও কিশোরীর কাছে এটি এখনো এমন একটি বিষয়, যা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা অস্বস্তিকর। প্যাড কেনা, ব্যবহার করা কিংবা ব্যবহৃত প্যাড ফেলার বিষয়েও রয়েছে সামাজিক সংকোচ।


ইউনিসেফ বাংলাদেশের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মাসিক এখনো নীরবতা, সামাজিক ট্যাবু ও ভুল ধারণায় আবৃত। এমনকি অনেক কিশোরী জানে যে তাদের স্যানিটারি প্যাড প্রয়োজন, কিন্তু দোকানে গিয়ে প্যাড কিনতেও অস্বস্তি বোধ করে—বিশেষ করে যখন দোকানদার পুরুষ হন। 


ফলে অনেক পরিবারে মাসিক ব্যবস্থাপনার প্রধান উপকরণ এখনো পুরোনো কাপড়। জাতীয় পর্যায়ের গবেষণাতেও দেখা গেছে, আধুনিক মাসিক শোষক ব্যবহারের বাইরে প্রচলিত কাপড়ের ব্যবহার বাংলাদেশে ব্যাপক। ২০১৯ সালের MICS-ভিত্তিক আরেক গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৭৯.৮ শতাংশ নারী প্রচলিত উপকরণ ব্যবহার করেছেন। 


দারিদ্র্যই বড় বাধা


স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার না করার পেছনে শুধু সচেতনতার অভাবকে দায়ী করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত পণ্যের দাম ও পরিবারের আয়।


২০২৫ সালে WaterAid Bangladesh-এর তিন জেলার একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৭১ শতাংশ নারী ও কিশোরী গত তিনটি মাসিক চক্রের অন্তত একবার স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে অনেকে কাপড়ও ব্যবহার করেন। 


গবেষণায় অংশ নেওয়া মাত্র ৪৭ শতাংশ নারী নারী প্যাডকে সাশ্রয়ী মনে করেছেন। নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৯১ শতাংশ নারী এখনো খরচের কারণে কাপড় ব্যবহার করেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। 


অর্থাৎ প্যাড সম্পর্কে জানেন না—বিষয়টি এমন নয়। অনেক নারী জানেন, প্যাড স্বাস্থ্যসম্মত ও সুবিধাজনক। কিন্তু মাসের পর মাস নিয়মিত প্যাড কেনার মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতা নেই।


শহর-গ্রামেও বড় পার্থক্য


স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক বৈষম্যও স্পষ্ট। MICS ২০১৯-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, শহরাঞ্চলে প্রায় ৪৫ শতাংশ নারী স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন। বিপরীতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ হার অনেক কম। ময়মনসিংহ বিভাগে ব্যবহারের হার ছিল মাত্র ১৪.৪৮ শতাংশ। ঢাকায়ও হার ছিল প্রায় ৩৬ শতাংশের কিছু বেশি। 


শিক্ষার সঙ্গেও রয়েছে শক্তিশালী সম্পর্ক। উচ্চ মাধ্যমিক বা তার বেশি শিক্ষিত নারীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করলেও প্রাথমিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ নারীদের মধ্যে এ হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, গণমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকা নারীদের মধ্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের প্রবণতা বেশি। 


কাপড় ব্যবহার কি সবসময় অনিরাপদ?


এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কাপড় ব্যবহার করলেই তা অনিরাপদ, এমন নয়। পরিষ্কার, শোষণক্ষম কাপড় ব্যবহার করে তা সাবান ও নিরাপদ পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে, সম্পূর্ণ শুকিয়ে এবং পরিষ্কার জায়গায় সংরক্ষণ করা গেলে ঝুঁকি কমানো যায়। সমস্যা তৈরি হয় যখন পুরোনো কাপড় অপরিষ্কার থাকে, সঠিকভাবে ধোয়া হয় না, ভেজা অবস্থায় রাখা হয় কিংবা লোকলজ্জার কারণে সূর্যের আলোতে শুকানো সম্ভব হয় না।


রাজশাহী বিভাগের কিশোরীদের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৩৭.৭ শতাংশ কিশোরী নিয়মিত স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করত। কাপড় ব্যবহারকারীদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ কাপড় পুনরায় ব্যবহার করত।


কাপড় ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি।  ইউনিসেফও জানিয়েছে, ব্যবহৃত কাপড় যথাযথভাবে না ধুয়ে ও না শুকিয়ে পুনরায় ব্যবহার করলে, সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে থাকে। 


আরও পড়ুন: সব সময় শক্ত থাকার দরকার নেই


ঢাকা/আরএস

sidebar ad