শায়লা জাহান-
নিজের জন্য আলাদা করে সময় রাখা? যত্তসব আদিখ্যেতা! আসলেই কি তাই? পারিবারিক দায়িত্ব, অফিসের কর্মব্যস্ততা, ডেডলাইন সবকিছু ছাপিয়ে নিজের জন্য ভাবা আসলেই কি জরুরী? নিজের মতো করে কাটানো এই মি টাইম পারে আপনাকে নতুন করে শক্তি দিতে, মনকে হাল্কা করতে আর নব উদ্যমে সামনে এগিয়ে নিতে।
রেণু, যিনি পরিবারের কাছে ওয়ান্ডার ওম্যান হিসেবে পরিচিত। পরিবারে রান্না, ঘর গুছানো থেকে শুরু করে সকলের দায়িত্ব পালনে সে ছিলো নিখুঁত। আর সন্তানদের কাছে তো সুপার মা। তাদের সব আবদার পূরণের একমাত্র ভরসার জায়গা। কিন্তু ধীরে ধীরে রেণুর ভেতর কেমন যেনো বদল শুরু হয়। সব আগের মতো চললেও কোথায় যেনো সুর কেটে যায়। অকারণে বিরক্তি, ক্লান্তি, হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়া- রেণু নিজেও বুঝতে পারে, সে আর আগের মতো নেই। কর্মব্যস্ততার মাঝে আগে যে তার প্রাণচাঞ্চল্য ভাব ছিলো, ধীরে ধীরে তা যেনো ফিকে হয়ে যাচ্ছে। এখানে রেণু চরিত্রটি কাল্পনিক হলেও, তার মনের মাঝে যে পরিবর্তন দেখা দিয়েছিলো, সেই একই অবস্থার অভিজ্ঞতা কমবেশি আমাদের মাঝেও পরিলক্ষিত হয়। ব্যস্তময় এই জীবনে বিভিন্ন দায়িত্ব পালনে আমরা যন্ত্রের মতো হয়ে গেছি। এই সবকিছুর ভিড়ে আমরা হারিয়ে ফেলি এই নিজের আমি কে। নিজেকে খুঁজে পেতে, মানসিক অবসাদ ঘুচাতে মনোবিদরা গুরুত্ব দিয়েছেন এই মি টাইম টার্মটিকে।
মি টাইম কি?
মি টাইম মানে হলো ব্যস্ত জীবনের মাঝে নিজের জন্য কিছু সময় নির্ধারণ করা। নিজের যা ভালো লাগে তাই করা। যেখানে থাকবে না কারো কোন দায়িত্ব, চাপ বা প্রত্যাশা। আমরা প্রায়শই নিজের জন্য সময় বের করার বিষয়টি আগামীকালের জন্য ফেলে রাখি। কিন্তু বাস্তবে এই আগামীকাল আর আসেনা। আমাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য এই মি টাইম অপরিহার্য। এই মি টাইম হতে পারে, এক কাপ চা নিয়ে নিরিবিলি বসা, প্রিয় গান শোনা, গল্পের বই পড়া কিংবা নিজের সাথে নিজের একাকীত্ব উপভোগ করা।
কাদের জন্য প্রয়োজন?
নিজের সাথে সময় কাটানোর এই বিষয়টি নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তিবিশেষ ক্যাটাগরিতে ফেলা যাবে না। বয়স, পেশা নির্বিশেষে সকলেরই জন্য প্রয়োজন এটি। যারা নিজেদের মন ও শরীরকে সর্বোত্তমভাবে সচল রাখতে চায়, তাদের প্রত্যেকের জন্য নিজের জন্য কিছুটা সময় অপরিহার্য। কি কর্মজীবি বলুন, আর হাউজ ওয়াইফ, দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি রুটিনের বাহিরে এই মি টাইমের প্রয়োজন। কোন কিছুই আর আগের মতো তেমন আনন্দদায়ক না হওয়া, সবকিছুতে বিরক্ত আসা, অনিদ্রায় ভোগা, ছোটখাটো বিষয়েই আবেগতাড়িত হয়ে পড়া; এগুলো আপনার ভেতরকার আবসাদের ইঙ্গিত দিতে পারে। ফোনের চার্জ শেষ হলে আমরা যেমন চার্জ দিই, আমাদের মনেরও রিচার্জ প্রয়োজন। আর এই মি টাইম সেই রিচার্জেরই কাজ করে।
মি টাইম কেনো প্রয়োজন?
• কাজের চাপ থেকে বিরতি দেয় এবং এতে স্ট্রেস ও হতাশা কমে
• নিজের যত্ন নেয়া এবং আমার আমি কে বুঝতে শেখা
• নতুন করে কাজের প্রতি মনোযোগ ও দক্ষতা বাড়া
• আত্মবিশ্বাস বাড়ায়
• মি টাইমের মাধ্যমে নিজের পছন্দনীয় কাজ করা যায় বলে নিজের মাঝে এক ধরনের রিল্যাক্স ভাব থাকে। আর এতে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে
• আমাদের মন ও শরীর একে অপরের সাথে যুক্ত। এবং এই মন ও শরীরকে সর্বোত্তম ভাবে কাজ করার জন্য তাদের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। শারীরিক ভাবে ভালো থাকলে মানসিক শান্তি পাওয়া যায়। এতে করে পরিবারিক সম্পর্কগুলো মজবুত থাকে এবং তাদের প্রতি দায়িত্বগুলো ভালোভাবে পালন করা যায়
• আত্মমর্যাদাবোধ উন্নত করে এবং নিজেকে আরও পজিটিভ এবং পরিতৃপ্ত বোধ করায়
মি টাইম কাটানোর আইডিয়া
প্রত্যেকেরই নিজের জন্য কাটানো সময়ের অর্থ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। যা একজনের জন্য কার্যকর তা আপনার জন্য কার্যকর নাও হতে পারে। এই জন্য লক্ষ্য থাকতে হবে এমন কিছু খুঁজে বের করা যা আপনার করতে ভালো লাগবে, মনের মাঝে সেই মানসিক প্রশান্তি এনে দিবে। মি টাইম হতে পারে-
• প্রিয় লেখকের বই পড়া
• গান শোনা
• ডায়েরি লেখা
• শখের কাজ করা। ছবি আঁকা, বাগান করা কিংবা পছন্দমত কোন রান্না করা
• বিকেলের নরম আলোয় একা কিছুক্ষন হেঁটে আসা
• ডিজিটাল ডিটক্স থেরাপি। অর্থাৎ সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থেকে প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়া
• যোগব্যায়াম বা মেডিটেশন করা
• কোন কফিশপ বা রেস্টুরেন্টে যেয়ে নিজেকে নিজে ট্রিট দেয়া
• মাঝে মাঝে কোন কাজ না করে চুপচাপ বসে থাকাও হতে পারে সেরা মি টাইম
টিপস
• প্রতিদিন অন্তত ১৫-৩০ মিনিট নিজের জন্য বরাদ্দ রাখা। নিজের জন্য সময় পাওয়াটা প্রত্যেকেরই প্রাপ্য
• নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দেয়া। আর এর জন্য মনে কোন ধরনের গিল্ট ফিল করা যাবেনা। নিজেকে সময় দেয়া, পছন্দকে প্রায়োরিটি দেয়া মানে কোন স্বার্থপরতা নয়। এটি আপনার মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে সাহায্য করবে
• মি টাইম নিয়ে মিথ আছে যে, এটা হয়তো ব্যয়সাপেক্ষ। কিন্তু ব্যাপারটি মোটেও সত্য নয়। এমন অনেক ছোটখাটো জিনিস আছে, যেগুলো আপনার ভেতরের শক্তিকে পুনরায় জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে
ব্যস্ততার দৌড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলাটা খুবই সহজ। অথচ একটু থামা, নিজের মতো করে বাঁচা, কিছুটা মুহূর্ত নিজেকে নিয়ে ভাবা- এগুলো আমাদের ভেতরের শক্তিটাকে আরও জাগিয়ে তোলে। মনে রাখা দরকার, নিজের জন্য সময় বের করা কোন বিলাসিতা নয়, বরং বেঁচে থাকার জন্য জরুরি একটুখানি বিরতি। মি টাইম মানে দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং নিজেকে রিচার্জ করে নব উদ্যমে আবার ফিরে আসা।