নারীর হাতে মমতার কবর

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬

নারীর হাতে মমতার কবর

সমাজের পাশবিকতার বিপরীতে সাহস ও ভালোবাসার নতুন ইতিহাস। রাত গভীর। চারদিকে নেমে এসেছে নীরবতা। পিরোজপুরের চিতলিয়া গ্রামে এক মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ পড়ে আছে শেষ বিদায়ের অপেক্ষায়। তিনি মানিক পশারী। দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়েছিলেন যে মানুষটি, মৃত্যুর পর নিজের গ্রামের মাটিতে তাঁর দাফন নিয়েই তৈরি হলো বাধা। পরিবারের অভিযোগ, গ্রামের কিছু মানুষ তাঁকে কবর দিতে বাধা দেন। এমন পরিস্থিতিতে এগিয়ে এলেন তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও বোনেরা। শোকাতুর নারীরা নিজেরাই কবর খুঁড়তে নামলেন। প্রিয়জনের শেষ আশ্রয়টুকু তৈরি করতে তাঁদের হাতে উঠে এল মাটি কাটার দায়িত্ব।


কী নির্মম পরিহাস! যে মানুষটি দেশের মাটিকে ভালোবেসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, মৃত্যুর পর সেই মাটিতেই তাঁর শেষ ঠাঁই নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ল। যেখানে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা ছিল সমাজের, সেখানে বাধার অভিযোগ উঠল। মানুষের এমন নিষ্ঠুরতা আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে—শোকের মুহূর্তেও কি আমরা মানবিক হতে ভুলে যাই?


কিন্তু এই অমানবিকতার মধ্যেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল নারীর অসাধারণ সাহস। স্বামী, বাবা ও ভাইকে হারানোর শোক বুকে নিয়েও তাঁরা থেমে থাকেননি। যে হাতে সংসার আগলে রেখেছেন, সেই হাতেই খুঁড়েছেন প্রিয় মানুষের কবর। চোখের জল মুছে, বুকের হাহাকার সামলে তাঁরা পালন করেছেন ভালোবাসার শেষ দায়িত্ব। তাঁদের এই কাজ শুধু শোকের প্রকাশ নয়, প্রিয়জনের মর্যাদা রক্ষার এক নীরব প্রতিবাদ।


এ কেবল একটি কবর খোঁড়ার ঘটনা নয়। এটি সমাজের পাশবিকতার বিপরীতে নারীর সাহস ও মমতার দাঁড়িয়ে যাওয়ার গল্প। প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে নারীদের এই দায়িত্ব পালন সমাজের সামনে এক আয়না তুলে ধরে—যেখানে একদিকে মানুষের নিষ্ঠুরতা, অন্যদিকে নারীর ভালোবাসা, আত্মমর্যাদা ও অদম্য শক্তি।


ইতিহাস সব সময় যুদ্ধক্ষেত্রে রচিত হয় না। কখনো তা রচিত হয় গভীর রাতে, অশ্রুসিক্ত চোখে, মুঠোভরা মাটি সরানোর মধ্য দিয়ে। মেয়েরা সাধারণত কবর খোঁড়েন না। কিন্তু যখন সমাজের নিষ্ঠুরতা তাঁদের সেই কাজ করতে বাধ্য করে, তখন তাঁদের হাতের মাটি হয়ে ওঠে প্রতিবাদ, আর সেই কবর হয়ে ওঠে সময়ের এক নতুন ইতিহাস।


লেখক: সম্পাদক, রোদসী।

sidebar ad