প্রকৃতি যেন এক নিপুণ শিল্পী। রং-তুলির আঁচড়ে বছরজুড়ে সে আঁকে ষড়ঋতুর অপূর্ব ক্যানভাস। কখনো কাশফুলে ভরা শরৎ, কোকিলের ডাক আর সবুজে ভরা বসন্ত, কখনো রোদের তেজে তপ্তময় গ্রীষ্ম, আবার কখনো টাপুর-টুপুর বৃষ্টির ছন্দে নেমে আসা বর্ষা। প্রতিটি ঋতুরই আছে নিজস্ব সৌন্দর্য, নিজস্ব আবেদন। তবে এই সৌন্দর্যের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে আসে কিছু বাস্তবতাও। ঋতু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে আমাদের শরীর, ত্বক ও চুলের ওপর।
বর্ষা এমনই এক ঋতু, যা একদিকে মনকে শীতল করে, অন্যদিকে বাতাসের অতিরিক্ত আর্দ্রতা, ঘাম, ধুলাবালি ও বৃষ্টির পানির কারণে ত্বক ও চুলে দেখা দিতে পারে নানা সমস্যা। ব্রণ, র্যাশ, ছত্রাকের সংক্রমণ, চুল পড়া কিংবা অতিরিক্ত তেলতেলে ভাব—অনেকেই ভোগেন এমন সমস্যায়। তাই এই সময়ে সৌন্দর্য ধরে রাখতে প্রয়োজন একটু বাড়তি যত্ন ও সচেতনতা।
ত্বকের যত্ন
বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় এ সময়ে ত্বকে তেল ও ঘাম বেশি জমে। তাই ত্বকের ধরন অনুযায়ী দিনে অন্তত দুইবার মৃদু বা ফোমিং ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ পরিষ্কার করুন। এটি ত্বকের বাড়তি তেল ও ময়লা দূর করতে সাহায্য করবে।
বর্ষায়ও ত্বকের আর্দ্রতার প্রয়োজন। ত্বক তেলতেলে মনে হলেও ময়েশ্চারাইজার বাদ দেওয়া যাবে না। ভারী ক্রিমের পরিবর্তে ওয়াটার-বেসড বা জেল-বেসড ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন। হায়ালুরোনিক অ্যাসিড বা গ্লিসারিনযুক্ত ময়েশ্চারাইজার ভালো কাজ করে।
মেঘলা আবহাওয়া হলেও ত্বকে অতিবেগুনি বা ইউভি রশ্মির প্রভাব পড়ে। তাই ঘরের বাইরে গেলে অন্তত ১৫–২০ মিনিট আগে ভালো মানের সানস্ক্রিন লাগিয়ে নিন। অবশ্যই অন্তত এসপিএফ ৩০ প্লাস সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন।
আর্দ্রতার কারণে ত্বকের লোমকূপ বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং মৃত কোষের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে, যা আপনার ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা কমিয়ে দেয়। এর মোকাবিলায় সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার মৃদু স্ক্রাব দিয়ে ত্বক এক্সফোলিয়েট করুন। এটি ত্বকের তেল নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে এবং ত্বককে মসৃণ করে তোলে।
এ সময়ে যথাসম্ভব ভারী মেকআপ এড়িয়ে চলুন। ফাউন্ডেশনের বদলে টিন্টেড ময়েশ্চারাইজার বা বিবি ক্রিম ব্যবহার করলে ত্বক নিঃশ্বাস নিতে পারে। রাতে ঘুমানোর আগে মেকআপ অবশ্যই তুলে ফেলুন।
বৃষ্টিতে ভিজে গেলে যত দ্রুত সম্ভব শরীর ও মুখ পরিষ্কার করে শুকনো কাপড় পরুন। এতে ছত্রাক সংক্রমণের ঝুঁকি কমে। এ ছাড়া শরীরের যেসব ভাঁজে ঘাম বেশি জমে, যেমন বগল, আঙুলের খাঁজ—সেখানে আর্দ্রতা কমে ফাঙ্গাল ইনফেকশন হতে পারে। গোসলের পর শরীর ভালোভাবে শুকিয়ে নিম বা অ্যান্টিফাঙ্গাল পাউডার ব্যবহার করতে পারেন।
ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা বজায় রাখতে আপনার স্কিনকেয়ার রুটিনে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যুক্ত করুন। ভিটামিন সি ও ই সমৃদ্ধ ময়েশ্চারাইজার ত্বককে সুস্থ ও উজ্জ্বল রাখতে সাহায্য করে।
ত্বকের উজ্জ্বলতা ধরে রাখার মূল চাবিকাঠি হলো আর্দ্রতা বজায় রাখা। বৃষ্টির দিনে তৃষ্ণা কম পেলেও শরীরকে ভেতর থেকে আর্দ্র রাখতে নিয়মিত পানি পান করুন। নিয়মিত ৮–১০ গ্লাস পানি পান করার পাশাপাশি আপনার ত্বকের যত্নের রুটিনে পেন্টাভিটিন, হায়ালুরোনিক অ্যাসিড ও গ্লিসারিনের মতো আর্দ্রতাবর্ধক উপাদানসমৃদ্ধ পণ্য অন্তর্ভুক্ত করুন।
রাতের বেলা ত্বকের যত্নের রুটিন মেনে চলা জরুরি। কারণ, ঘুমের সময় ত্বক নিজেকে পুনর্গঠন করে। তাই ত্বক ভালোভাবে পরিষ্কার করা এবং সারারাত ত্বককে পুষ্টি জোগাতে একটি হাইড্রেটিং নাইট ক্রিম ব্যবহার করা উচিত।
চুলের যত্ন
চুল ও মাথার ত্বককে বৃষ্টির পানিতে ভেজা থেকে রক্ষা করা চুল পরিচর্যার অন্যতম কার্যকর ও সহজ একটি উপায়। বৃষ্টির পানি প্রায়ই অম্লীয় এবং দূষক পদার্থে পূর্ণ থাকে। তাই সব সময় ছাতা বা রেইনকোট সঙ্গে রাখুন। যদি চুল ভিজে যায়, তবে তা ভালোভাবে শুকিয়ে নিন এবং সুযোগমতো ধুয়ে ফেলুন। এ ক্ষেত্রে নরম মাইক্রোফাইবার তোয়ালে ব্যবহার করুন। এটি দ্রুত পানি শুষে নেয় এবং তোয়ালে ও চুলের মধ্যে ঘর্ষণ কমায়, ফলে চুল পড়ার হারও কমে।
সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন অ্যান্টিড্যান্ড্রাফ বা মাইল্ড শ্যাম্পু ব্যবহার করলে মাথার ত্বক পরিষ্কার থাকবে এবং খুশকি কমবে। তবে অতিরিক্ত ধোয়া এড়িয়ে চলুন, কারণ এতে চুলের স্বাভাবিক তেল বা আর্দ্রতা নষ্ট হয়ে যায়।
শ্যাম্পু শেষে চুল জটমুক্ত ও মসৃণ রাখতে এবং চুলের আগা শুষ্ক হয়ে যাওয়া রোধ করতে স্ক্যাল্প এড়িয়ে শুধু চুলে কন্ডিশনার লাগান। অতিরিক্ত ফ্রিজি ভাব এড়াতে লিভ-ইন কন্ডিশনার বা সিরাম ব্যবহার করতে পারেন।
ভেজা অবস্থায় চুল দুর্বল থাকে এবং সহজে ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ভেজা চুল জোরে আঁচড়ানো থেকে বিরত থাকুন। চুল পুরোপুরি শুকিয়ে যাওয়ার পর মোটা দাঁতের চিরুনি দিয়ে আঁচড়ান। এ ছাড়া ছত্রাকজনিত সংক্রমণ এড়াতে অন্যের ব্যবহৃত চিরুনি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।
শ্যাম্পু করার ১৫ মিনিট আগে নারিকেল তেল ব্যবহার করলে তা চুলকে প্রি-কন্ডিশনিং বা ধোয়ার আগের প্রস্তুতিতে সহায়তা করে। নারিকেল তেল দিয়ে শ্যাম্পুর আগে এই প্রস্তুতি নিলে চুলের ছিদ্রতা বা পোরোসিটি কমায় এবং ধোয়ার সময় চুল যে পরিমাণ পানি শোষণ করে, তা হ্রাস করে। এই সময় তেল বেশিক্ষণ মাথায় দিয়ে রাখবেন না। এতে মাথায় ধুলাবালি ও ময়লা বেশি জমে। ভারী তেল এড়িয়ে হালকা ধরনের তেল, যেমন অর্গান অয়েল, জোজোবা অয়েল বা আমন্ড অয়েল ব্যবহার করা বেশি সুবিধাজনক হবে। এগুলো চুলে খুব বেশি আস্তরণ তৈরি করে না এবং সহজে ধুয়ে ফেলা যায়।
বর্ষাকালে আর্দ্র আবহাওয়ায় মাথার ত্বকের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে, খুশকিজনিত অস্বস্তি কমাতে এবং চুলের গোড়া ও কান্ডের শক্তি বাড়াতে ঘরোয়া মাস্ক বেশ কার্যকর। এই সময় টক দই-মেথির মাস্ক, অ্যালোভেরা-নারিকেল তেলের মাস্ক, ডিম-অলিভ অয়েলের মাস্ক—এমন অনেক জনপ্রিয় হেয়ার মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন।
চুল সুস্থ রাখার ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান চুলকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করে এবং চুলের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। আপনার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় ডিম, আখরোট, দুগ্ধজাত খাবার ও পূর্ণ শস্যের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের পাশাপাশি সবুজ শাকসবজি অন্তর্ভুক্ত করুন। এ ছাড়া বাদাম, পালংশাক এবং মিষ্টি আলু চুলের বৃদ্ধির জন্য অন্যতম সেরা কিছু খাবার।
স্ক্যাল্পে অতিরিক্ত চুলকানি, তীব্র খুশকি বা ত্বকে কোনো লালচে র্যাশ ও সংক্রমণ দেখা দিলে ঘরোয়া টোটকা না চালিয়ে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই শ্রেয়।