সৌন্দর্য আছে, খ্যাতি আছে, অর্থ আছে, হাজারো ভক্তের ভালোবাসা আছে তবুও জীবনের কোনো এক সন্ধ্যায় তাঁদেরও মনে হয়, পাশে একজন মানুষ নেই কেন? একটু কল্পনা করুন। একজন নারী, যার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয় হাজারো মানুষ। যার ছবি দেখে প্রশংসার বন্যা বয়ে যায়, যার একটুখানি হাসি নিয়ে ভক্তদের মধ্যে চলে আলোচনা। নাম, যশ, অর্থ, গ্ল্যামার সবই আছে তার জীবনে। অথচ একদিন তিনিও হয়তো নিজেকেই প্রশ্ন করেন, “Why am I still single?”- আমি এখনো একা কেন?
প্রশ্নটা শুনতে সাধারণ মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে একাকিত্ব, সম্পর্কের প্রতি ভয়, অতীতের ক্ষত কিংবা নিজের জন্য সঠিক মানুষটিকে খুঁজে পাওয়ার দীর্ঘ অপেক্ষা। কিন্তু সত্যিই কি সুন্দরী নারীদের একা থাকার পেছনে কোনো বিশেষ রহস্য আছে? নাকি সমাজের চোখে যাদের জীবন নিখুঁত, তাদের ব্যক্তিগত জীবনও নিখুঁত হতে হবে আমরা এমনটাই ধরে নিই সবসময়।
সৌন্দর্য কি ভালোবাসার নিশ্চয়তা?
অতি সুন্দরী না পায় বর।খুব পুরাতন একটা প্রবাদ। আমাদের সমাজের একটা প্রচলিত ধারণা আছে সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গীর অভাব হয় না। অথচ বাস্তবতা হলো, কাউকে আকর্ষণ করা আর কারও সঙ্গে সুন্দর একটি সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সৌন্দর্য হয়তো প্রথম দেখায় মুগ্ধতা তৈরি করে, কিন্তু একটি সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে বিশ্বাস, সম্মান, মানসিক পরিপক্বতা, দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া। একজন নারীকে শত মানুষ পছন্দ করতে পারেন। কিন্তু সেই শত মানুষের মধ্যে এমন একজন মানুষ পাওয়া, যার কাছে তিনি নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করতে পারবেন, যার সামনে তাকে সব সময় সুন্দর, সফল কিংবা নিখুঁত হয়ে থাকতে হবে না সেটিই আসল চ্যালেঞ্জ। কারণ, প্রশংসা পাওয়ার মানুষ অনেক হতে পারে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠার মানুষ খুব কম।
অনেক নায়িকা-মডেলরা একা থাকেন কেন?
প্রথমেই মনে রাখতে হবে, সব নায়িকা বা মডেল একা নন। আবার যারা অবিবাহিত বা সঙ্গীহীন, তাদের প্রত্যেকের গল্পও এক নয়। কারও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, কারও পেশাগত ব্যস্ততা, কারও সম্পর্কের অভিজ্ঞতা সবকিছুই আলাদা। তবু তাদের জীবনকে কেন্দ্র করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ভাবা যায়।
১. সবাই ভালোবাসতে চান, কিন্তু সবাইকে বিশ্বাস করতে পারেন না
খ্যাতিমান একজন নারীর জীবনে অনেক মানুষ আসতে পারেন। কিন্তু কে তাকে সত্যিই ভালোবাসেন, আর কে তার পরিচিতি, অর্থ কিংবা জনপ্রিয়তার প্রতি আকৃষ্ট এই পার্থক্য বোঝা সহজ নয়। যখন কেউ বারবার ভাবেন, মানুষটি আমাকে ভালোবাসে, নাকি আমার পরিচয়কে? তখন সম্পর্কের প্রতি আস্থা তৈরি হতে সময় লাগতেই পারে।
২. অতীতের সম্পর্ক নতুন ভালোবাসার পথে দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে পারে
একটি ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক শুধু দুজন মানুষের বিচ্ছেদ নয়। কখনো তা নিজের প্রতি বিশ্বাস,ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন এবং ভালোবাসার ওপর আস্থাকেও নড়বড়ে করে দেয়। কেউ সেই অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে নতুন করে ভালোবাসতে শেখেন। কেউ আবার নিজেকে রক্ষা করতে দূরত্ব বজায় রাখেন। তবে অতীতের কষ্টই যে প্রতিটি একাকিত্বের কারণ, তা নয়। কখনো একা থাকাটা কেবল সচেতন পছন্দও হতে পারে।
৩. সফল নারীর পাশে দাঁড়ানোর মতো মানসিকতা সবার থাকে না
একজন নারী যখন নিজের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত, আর্থিকভাবে স্বাধীন এবং নিজের সিদ্ধান্তে আত্মবিশ্বাসী হন, তখন তার সঙ্গীর প্রয়োজন হয়তো তাকে নিয়ন্ত্রণ করার নয়, বরং তার পাশে সমান মর্যাদায় দাঁড়ানোর। কিছু সম্পর্কে সঙ্গীর সাফল্যকে অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখা হয়, আবার কিছু সম্পর্কে সেটিই অস্বস্তি কিংবা প্রতিযোগিতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে সফল নারীদের জন্য উপযুক্ত সঙ্গী পাওয়া অসম্ভব নয়।বরং সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মান ও সামঞ্জস্য গুরুত্বপূর্ণ সেটিই এখানে মূল কথা।
৪. সম্পর্কের চেয়ে নিজের শান্তিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া
একসময় অনেক নারী বুঝতে শেখেন, শুধু সামাজিক স্বীকৃতির জন্য বিয়ে করা কিংবা একাকিত্বের ভয় থেকে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া জরুরি নয়। একটি সম্পর্ক যদি প্রতিনিয়ত আত্মসম্মান ক্ষুণ্ন করে, স্বাধীনতা কেড়ে নেয় কিংবা মানসিক অশান্তি বাড়ায়, তাহলে একা থাকাকে বেছে নেওয়া তাদের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কারও স্ত্রী হওয়ার চেয়ে নিজের কাছে সম্মানিত মানুষ হয়ে থাকা কখনো কখনো এই উপলব্ধিটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
৫. সঠিক মানুষ খুজতে গিয়ে সময় লেগে যাওয়া
আমরা প্রায়ই প্রশ্ন করি, এত বয়স হলো, এখনো বিয়ে করেননি কেন? কিন্তু খুব কম মানুষ প্রশ্ন করি, আপনি কেমন জীবন চান? কেমন মানুষ আপনার পাশে থাকলে ভালো থাকবেন?” বিয়ে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, কিন্তু এটি কোনো দৌড় প্রতিযোগিতা নয়। অন্যের সময়ের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ারও প্রয়োজন নেই। কেউ তাড়াতাড়ি সঙ্গী খুঁজে পান, কেউ সময় নেন, কেউ আবার বিয়ে না করার সিদ্ধান্তেই সুখ খুঁজে পান। প্রতিটি জীবন আলাদা। প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনের গল্পও আলাদা।
চলুন একটা উদাহরণ দেই। বিশ্ব সুন্দরী খ্যাত, সফল তবুও একা। কেন বিয়ে করেননি সুস্মিতা সেন? বলিউডের একসময়কার বিশ্বসুন্দরী, সফল অভিনেত্রী সুস্মিতা সেন। সৌন্দর্য, খ্যাতি, অর্থ কোনো কিছুরই অভাব নেই তার জীবনে। তবুও প্রচলিত সামাজিক নিয়মে বিয়েকে জীবনের অপরিহার্য অংশ করে নেননি তিনি।
মাত্র ২৪ বছর বয়সে প্রথম কন্যা রেনেকে দত্তক নিয়ে একক মাতৃত্বের পথ বেছে নেন। পরে দ্বিতীয় কন্যা আলিশাকেও দত্তক নেন। দুই মেয়েকে নিয়েই তার পরিপূর্ণ পৃথিবী। জীবনে একাধিক প্রেম এসেছে, বিয়ের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো সম্পর্কই বিয়েতে গড়ায়নি। সুস্মিতা বুঝিয়ে দিয়েছেন, ভালোবাসা মানেই বিয়ে নয়, আর বিয়ে না করলেই জীবন অসম্পূর্ণ নয়। তার গল্প যেন বলে একজন নারী সুন্দরী হতে পারেন, সফল হতে পারেন, মা হতে পারেন, ভালোবাসতেও পারেন তবুও নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারেন।
হয়তো তাই সুস্মিতা সেনের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন “Why am I still single?” নয়।তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হল আমি আমার নিজের শর্তে ভাল আছি।
Why am I still single?প্রশ্নটা কি শুধু সুন্দরীদের?
একেবারেই নয়।এই প্রশ্নটি করেন সেই মেয়েটিও, যিনি প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে একা ঘরে বসে থাকেন। সেই নারীও, যিনি সংসার সামলাতে সামলাতে নিজের স্বপ্নগুলো ভুলে গেছেন। এমনকি এমন মানুষও, যার চারপাশে পরিবার, বন্ধু ও পরিচিত মানুষের অভাব নেই তবুও মনের কথা বলার মতো একজন মানুষ নেই।
আবার কেউ কেউ একা থেকেও পরিপূর্ণ। তাঁরা নিজের কাজ, স্বপ্ন, পরিবার, বন্ধুত্ব এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে ভালো আছেন।অতএব, সিঙ্গেল থাকা মানেই একাকী হওয়া নয় আর সম্পর্কে থাকা মানেই ভালো থাকা নয়। একইভাবে, বিয়ে না করা মানেই কেউ ভালোবাসা পাননি, কিংবা তাঁর মধ্যে কোনো সমস্যা আছে এমন ধারণাও অন্যায়।
সৌন্দর্যের আড়ালে মানুষটিকে দেখতে শিখুন
আমরা যখন কোনো সুন্দরী অভিনেত্রী বা মডেলকে দেখি, তখন তার সাজানো ছবি, হাসিমুখ,সাফল্য আর জনপ্রিয়তা দেখি। কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবনের সবকিছু জানি না।তিনি কী চান,কী নিয়ে ভয় পান, কাকে বিশ্বাস করেন, কোন অভিজ্ঞতা তাকে বদলে দিয়েছে এসব না জেনেই তার একাকিত্বের কারণ নির্ধারণ করা যায় না। তাই কোনো তারকার “Why am I still single?” প্রশ্ন শুনে তাঁকে নিয়ে অনুমান করার চেয়ে, প্রশ্নটির মধ্য দিয়ে নিজেদের সমাজকেও একবার দেখা প্রয়োজন।
একজন পুরুষ অবিবাহিত থাকলে তাকে বলা হয়, তিনি নিজের ক্যারিয়ারে মনোযোগী। অথচ একজন নারী অবিবাহিত থাকলে তাকে নিয়ে শুরু হয় নানা জল্পনা-কল্পনা। এই দ্বৈত মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে।
একা থাকার ভয় নয়, ভুল মানুষের সঙ্গে থাকার ভয়টাও বুঝুন জীবনে একজন ভালো সঙ্গী পাওয়া নিঃসন্দেহে সুন্দর অভিজ্ঞতা। এমন একজন মানুষ, যার কাছে দিনের শেষে ফিরে এসে নিজের ক্লান্তি, আনন্দ, ব্যর্থতা ও স্বপ্নের কথা বলা যায় এমন সম্পর্কের মূল্য অনেক।
কিন্তু সেই মানুষটিকে পাওয়ার জন্য নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দেয়ার কোন মানেই হয় না।
ভালোবাসা মানে শুধু কাউকে পাওয়া নয় ভালোবাসা মানে এমন একটি সম্পর্ক পাওয়া, যেখানে দুজন মানুষই নিজেদের মতো করে বাঁচতে পারেন, পরস্পরকে সম্মান করেন এবং একে অপরের জীবনে শান্তি যোগ করেন। তাই কোনো নারী সিঙ্গেল হলে তাকে করুণার চোখে দেখার প্রয়োজন নেই। আর কোনো নারী বিবাহিত হলেই তার জীবন সুখের এমনটাও ধরে নেওয়া উচিত নয়। জীবনের আসল সাফল্য বৈবাহিক অবস্থানে নয়, বরং নিজের জীবনকে কতটা অর্থপূর্ণ, সম্মানজনক ও শান্তিময় করে তুলতে পারলাম, সেখানে।
এবার আপনার মতামত জানতে চাই, আপনার কী মনে হয়, একজন নারীর জীবনে সুখী হওয়ার জন্য কি বিয়ে অপরিহার্য? নাকি সুস্মিতা সেনের মতো নিজের শর্তে বাঁচাটাই আসল স্বাধীনতা?
আমরা জানতে চাই আপনার মনের কথা। আমরা প্রতিনিয়ত লিখি আপনারই জীবনের নিত্য দিনের সমস্যা ও তার সমাধান।