পোশাকের স্বাধীনতা ও সম্মতির প্রশ্নে সরব রাধিকা আপ্তে

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

শুটিং সেটে অভিনেত্রীদের স্বস্তি, সম্মতি ও পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন বলিউড অভিনেত্রী রাধিকা আপ্তে।


চলচ্চিত্রের পর্দায় একটি চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে অভিনয়শিল্পীদের নানা রকম প্রস্তুতি নিতে হয়। কখনো বদলাতে হয় শারীরিক গড়ন, কখনো আয়ত্ত করতে হয় কঠিন কোনো দক্ষতা। চরিত্রের প্রয়োজনে পোশাকেও আসে পরিবর্তন।



কিন্তু সেই পরিবর্তনের সীমা কোথায়? অভিনয়ের প্রয়োজনে একজন অভিনেত্রীকে কি যেকোনো ধরনের পোশাক পরতে চাপ দেওয়া যায়? আর এমন নির্দেশনায় আপত্তি জানালে তাঁর পেশাগত অবস্থান কতটা নিরাপদ থাকে?


এই প্রশ্নগুলোই সামনে নিয়ে এসেছেন বলিউড অভিনেত্রী রাধিকা আপ্তে। একটি অ্যাকশন সিনেমার শুটিংয়ে পোশাক নিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, দৃশ্যের প্রয়োজনে দেওয়া নির্দেশনার পেছনে যুক্তি কতটা থাকা প্রয়োজন।


সম্প্রতি নিজের নতুন সিরিজ ‘আক্কা’র প্রচারে এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে এ অভিজ্ঞতার কথা বলেন অভিনেত্রী। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে চলচ্চিত্রের সেটে নারীদের শরীর ও পোশাক নিয়ে নির্মাতাদের একাংশের প্রত্যাশা, অভিনয়শিল্পীদের ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য এবং কাজের পরিবেশে সম্মতির গুরুত্ব।


পোশাক নিয়ে অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা


রাধিকা জানান, একটি অ্যাকশন সিনেমায় তাঁকে অন্তর্বাস পরে কয়েকটি দৃশ্যে অভিনয় করতে বলা হয়েছিল। পাশাপাশি অন্তর্বাস ছাড়া শার্ট পরা এবং শার্টের বোতাম খোলা রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়। এমন নির্দেশনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।


অভিনেত্রীর ভাষ্য, তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি অন্তর্বাস ছাড়া শার্ট পরে বোতাম খোলা রাখতে পারবেন কি না। এর উত্তরে অ্যাকশন দৃশ্যের বাস্তবতা ও শারীরিক নড়াচড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলেন তিনি।


রাধিকার এই অভিজ্ঞতা কেবল একটি পোশাকসংক্রান্ত আপত্তির গল্প নয়। বরং এটি এমন একটি কর্মপরিবেশের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে একজন অভিনয়শিল্পীর শরীর, ব্যক্তিগত সীমারেখা এবং পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।


সিনেমায় পোশাক চ‘না’ বলার অধিকারও পেশার অংশ‘না’ বলার অধিকারও পেশার অংশরিত্র নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো দৃশ্যের আবহ, সময়কাল কিংবা চরিত্রের ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলতে পোশাকের বিশেষ ভূমিকা থাকতে পারে। কিন্তু সেই প্রয়োজনের ব্যাখ্যা থাকা এবং সংশ্লিষ্ট অভিনয়শিল্পীর সঙ্গে আলোচনা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পর্দায় দৃশ্যটি কেমন দেখাবে, সেই ভাবনার পাশাপাশি শুটিংয়ের সময় শিল্পী কতটা স্বস্তিতে থাকছেন, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।


সম্মতি কি শুধু কথার বিষয়?


অন্তরঙ্গ দৃশ্যের শুটিংয়ে অভিনয়শিল্পীদের স্বস্তি ও সম্মতি নিশ্চিত করতে চলচ্চিত্রশিল্পে কাজ করেন ইন্টিমেসি কোঅর্ডিনেটররা। তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে থাকতে পারে দৃশ্যের সীমারেখা নিয়ে আলোচনা, অভিনয়শিল্পীদের সম্মতি নিশ্চিত করতে সহায়তা এবং শুটিংয়ের সময় পেশাগত নিরাপত্তা বজায় রাখার ব্যবস্থা করা।


রাধিকা জানিয়েছেন, অনুচিত দাবি বা নির্দেশনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে ইন্টিমেসি কোঅর্ডিনেটরদের চাকরি হারানোর ঘটনাও তিনি দেখেছেন। তাঁর এই বক্তব্য শিল্পটির কর্মপরিবেশ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে। যাঁদের কাজই অভিনয়শিল্পীদের স্বস্তি ও সম্মতির বিষয়টি নিশ্চিত করতে সহায়তা করা, তাঁদের পেশাগত অবস্থানই যদি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে সেই দায়িত্ব কতটা স্বাধীনভাবে পালন করা সম্ভব?


এখানে সম্মতির বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য সম্মতি দেওয়া মানেই সব ধরনের পরিবর্তন বা নতুন নির্দেশনায় সম্মতি দেওয়া নয়। দৃশ্যের ধরন, পোশাক কিংবা শুটিংয়ের পরিকল্পনায় পরিবর্তন এলে তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা করা প্রয়োজন হতে পারে। অভিনয়শিল্পীর সম্মতি ও ব্যক্তিগত সীমারেখাকে সম্মান জানানো একটি দায়িত্বশীল কর্মপরিবেশের অংশ।


‘না’ বলার অধিকারও পেশার অংশ


বিনোদনজগতে তারকাদের জীবন বাইরে থেকে ঝলমলে মনে হলেও ক্যামেরার পেছনের বাস্তবতা সব সময় তেমন নয়। দীর্ঘ সময় ধরে শুটিং, কঠিন শারীরিক প্রস্তুতি, চরিত্রের প্রয়োজনে নানা পরিবর্তন এবং নির্মাতাদের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে অভিনয়শিল্পীদের পেশাগত জীবনে তৈরি হতে পারে নানা চাপ।


বিশেষ করে নারী অভিনয়শিল্পীদের পোশাক ও শরীর নিয়ে প্রত্যাশা কখনো কখনো তাঁদের অভিনয়দক্ষতার বাইরেও আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। ফলে চরিত্রের প্রয়োজনে কী করা হচ্ছে আর অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যক্তিগত সীমারেখা অতিক্রম করা হচ্ছে কি না, সেই পার্থক্য বোঝা জরুরি।


একজন অভিনেত্রীর আপত্তি মানেই তিনি চরিত্রের প্রতি দায়িত্বশীল নন, এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং নিজের কাজের শর্ত, পোশাক এবং শুটিংয়ের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তোলাও পেশাগত অধিকার চর্চার অংশ। একইভাবে পরিচালকেরও দায়িত্ব রয়েছে দৃশ্যের প্রয়োজন ব্যাখ্যা করা এবং শিল্পীর সঙ্গে পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে কাজ করা।


রাধিকা আপ্তের বক্তব্য তাই কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিবরণে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি চলচ্চিত্রের সেটে ক্ষমতার ভারসাম্য, সম্মতি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।


‘আক্কা’য় ক্ষমতার অন্য সমীকরণ


নিজের এই অভিজ্ঞতার কথা জানানোর পাশাপাশি নতুন সিরিজ ‘আক্কা’ নিয়েও আলোচনায় রয়েছেন রাধিকা। সিরিজটিতে তিনি অভিনয় করেছেন রুদ্র চরিত্রে। তাঁর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ভবানী হিসেবে রয়েছেন কীর্তি সুরেশ।


১৯৮০-এর দশকের দক্ষিণ ভারতের কাল্পনিক শহর পেরুনুরকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে ‘আক্কা’র গল্প। সেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ক্ষমতা ধরে রেখেছে নারীদের একটি শক্তিশালী গ্যাংস্টার গোষ্ঠী। তাদের রাজত্বে এক বহিরাগতের আগমন বদলে দিতে পারে ক্ষমতার সমীকরণ। আনুগত্য, প্রতিশোধ, পারিবারিক উত্তরাধিকার এবং রক্তক্ষয়ী সংঘাত ঘিরে এগিয়েছে সিরিজটির কাহিনি।


গল্পের কেন্দ্রে থাকা নারীরা নিজেদের ক্ষমতা ও অবস্থান রক্ষায় নানা সিদ্ধান্ত নেন। পর্দার এই ক্ষমতার লড়াইয়ের বাইরে বাস্তব জীবনেও রাধিকার বক্তব্য নারীর নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার এবং কর্মক্ষেত্রে মর্যাদার প্রশ্ন সামনে এনেছে।


ক্যামেরার বাইরেও নিরাপত্তা জরুরি


একটি চলচ্চিত্র বা সিরিজের সাফল্য নির্ভর করে অভিনয়, নির্মাণশৈলী, চিত্রনাট্যসহ অনেক কিছুর ওপর। তবে সেই সৃষ্টিশীল কাজের পেছনে যাঁরা যুক্ত থাকেন, তাঁদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।


রাধিকা আপ্তের অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, অভিনয়শিল্পীর শরীর বা পোশাক নিয়ে সিদ্ধান্ত কেবল ক্যামেরার সামনে দৃশ্যটি কেমন দেখাবে, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সেখানে থাকতে হবে যুক্তি, পারস্পরিক আলোচনা এবং সম্মতির প্রতি শ্রদ্ধা। একই সঙ্গে যাঁরা এই প্রক্রিয়ায় শিল্পীদের পাশে দাঁড়ান, তাঁদের পেশাগত নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।


পর্দায় চরিত্রের প্রয়োজনে নানা রূপ ধারণ করেন অভিনেত্রীরা। কিন্তু চরিত্রের আড়ালে তাঁদের ব্যক্তিগত স্বস্তি ও মর্যাদা যেন হারিয়ে না যায়, সেটিও মনে রাখা জরুরি। কারণ, অভিনয়ের জন্য নিজেকে বদলে নেওয়া আর চাপের মুখে নিজের সীমারেখা বিসর্জন দেওয়া এক বিষয় নয়।


রাধিকার বক্তব্য সেই পার্থক্যটিই নতুন করে সামনে এনেছে। চলচ্চিত্রের গল্পে যেমন ক্ষমতা ও সম্মতির নানা সমীকরণ উঠে আসে, তেমনি ক্যামেরার পেছনের বাস্তবতাতেও একজন শিল্পীর নিজের কথা বলার অধিকার থাকা প্রয়োজন।

sidebar ad