‘মা হয়েছি বলে অভিনয় ছাড়ব কেন?’

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

মাতৃত্ব জীবনের নতুন অধ্যায়, কিন্তু তা যে নারীর পেশাগত পরিচয়ের ইতি নয়—নিজের জীবন ও কাজের অভিজ্ঞতা দিয়ে সেই কথাই যেন আবারও মনে করিয়ে দিলেন বলিউড অভিনেত্রী পরিণীতি চোপড়া। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় শুটিং, সন্তান জন্মের পর অভিনয়ে ফেরার ভাবনা, স্বামী রাঘব চাড্ডার সহযোগিতা—সব মিলিয়ে মাতৃত্ব ও কর্মজীবনের ভারসাম্য নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন অভিনেত্রী।


মাতৃত্ব একজন নারীর জীবনে অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসে। বদলে যায় প্রতিদিনের রুটিন, দায়িত্বের ধরন, এমনকি নিজের জন্য সময় বের করার হিসাবও। তবে মা হওয়ার অর্থ নিজের স্বপ্ন কিংবা পেশাগত পরিচয় থেকে সরে দাঁড়ানো নয়। এই বিশ্বাসেই এগিয়ে যেতে চান পরিণীতি চোপড়া। তাঁর কাছে অভিনয় যেমন ভালোবাসার জায়গা, তেমনি পরিবার ও সন্তানও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।


সম্প্রতি নিজের অভিনীত ওয়েব সিরিজ ‘ট্রাস্ট নো ওয়ান’ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ব্যক্তিজীবন ও পেশাগত জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন অভিনেত্রী। জানান, সিরিজটির চিত্রনাট্য হাতে পাওয়ার পর থেকেই কাজটি নিয়ে তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে, শুটিংয়ের সময় অন্তঃসত্ত্বা থাকা এবং পরিবার থেকে পাওয়া সহযোগিতা তাঁর কাছে এই কাজকে আরও স্মরণীয় করে তুলেছে।


চিত্রনাট্য পড়েই সিদ্ধান্ত


বই পড়তে ভালোবাসেন পরিণীতি। তবে চিত্রনাট্য পড়ার সময় মাঝেমধ্যে মনোযোগ অন্যদিকে চলে যায় বলে সাধারণত কাউকে পড়ে শোনাতে বলেন। কিন্তু ‘ট্রাস্ট নো ওয়ান’-এর চিত্রনাট্য ছিল ব্যতিক্রম। শহরের বাইরে থাকার সময় সিদ্ধার্থ পি মালহোত্রা ও রেনসিল ডি’সিলভা তাঁকে চিত্রনাট্যটি পাঠান। ভেবেছিলেন, পুরোটা পড়তে দুই-তিন দিন সময় লাগবে। অথচ আড়াই ঘণ্টার মধ্যেই এক বসায় শেষ করে ফেলেন।


চিত্রনাট্যের শেষ পাতা পড়ার পরই তাঁর মনে হয়েছিল, এই সিরিজে অভিনয় করতেই হবে। গল্পের আকর্ষণের পাশাপাশি নেটফ্লিক্সের সঙ্গে কাজের সুযোগ, প্রযোজক সিদ্ধার্থ পি মালহোত্রা এবং পরিচালক রেনসিল ডি’সিলভার সঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনাও তাঁকে উৎসাহিত করেছিল।


তবে কাজটির বিশেষত্ব শুধু চিত্রনাট্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শুটিংয়ের সময়কার অভিজ্ঞতাও সিরিজটির প্রতি তাঁর ভালো লাগা বাড়িয়ে দিয়েছে।



অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় শুটিং, পাশে ছিল পরিবার


অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় কাজ চালিয়ে যাওয়া যে সহজ নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শারীরিক পরিবর্তন, ক্লান্তি এবং নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি বাড়তি মনোযোগ—সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয় একজন নারীকে। পরিণীতির ক্ষেত্রেও বিষয়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো শুটিং ইউনিটের সহযোগিতা কাজটিকে অনেক সহজ করে দিয়েছিল।


সহকর্মীরা তাঁর প্রতি যত্নশীল ছিলেন। কাজের পরিবেশেও ছিল সহযোগিতা, ছিল না বাড়তি চাপ। ফলে শুটিংয়ের সময়সূচি সামলাতে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হয়নি তাঁকে।


পরিবারের সমর্থনও ছিল উল্লেখ করার মতো। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর শুনেই স্বামী রাঘব চাড্ডা শিমলায় ছুটে গিয়েছিলেন। অভিনেত্রীর মা, শাশুড়ি ও ভাইয়েরাও তাঁকে দেখতে সেখানে উপস্থিত হন। পরিবারের সদস্যদের এমন উপস্থিতি নিয়ে মজার স্মৃতিও রয়েছে তাঁর।


পরিণীতি হাসতে হাসতে জানিয়েছেন, একসময় তাঁদের মনে হচ্ছিল, তাঁর পুরো পরিবারই বুঝি শুটিংয়ে চলে এসেছে!


সন্তানের আগমন এবং ওয়েব সিরিজে নিজের অভিষেক—দুটি ঘটনাই তাঁর কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তাই মজা করে বলতেন, এটি যেমন তাঁর ছেলে নীরের অভিষেকের সময়, তেমনি ওয়েব দুনিয়ায় তাঁর নিজের অভিষেকও।



‘মা হয়েছি বলে অভিনয় ছাড়ব কেন?’


মাতৃত্বের পর কর্মজীবনে ফিরতে গিয়ে অনেক নারীকে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। কেউ সন্তানকে সময় দিতে গিয়ে কাজের গতি কমিয়ে দেন, কেউ আবার কর্মক্ষেত্রে নতুন করে নিজেকে প্রমাণ করার চাপে পড়েন। বিনোদন অঙ্গনেও এর ব্যতিক্রম নেই। সন্তান জন্মের পর অভিনেত্রীদের কাজের সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিণীতি।


তাঁর বক্তব্য, মা হয়েছেন বলে অভিনয় বন্ধ করে দিতে চান না। তবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য সুযোগও পাওয়া প্রয়োজন। সন্তান জন্ম দেওয়া জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর কেবল মা হয়েছেন বলে যদি কোনো অভিনেত্রীকে কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হয়, তা হবে হতাশাজনক।


এখানেই পরিণীতির বক্তব্যের গুরুত্ব। মাতৃত্ব তাঁর জীবনে নতুন পরিচয় যোগ করেছে, কিন্তু অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর দক্ষতা, অভিজ্ঞতা কিংবা কাজের প্রতি ভালোবাসা মুছে দেয়নি।


বলিউডে মা হওয়ার পরও নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন আলিয়া ভাট, দীপিকা পাড়ুকোন ও প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার মতো অভিনেত্রীরা। তাঁদের উদাহরণকে ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখেন পরিণীতি। তাঁর মতে, এই প্রজন্মের অভিনেত্রীরা মাতৃত্বের পরও ভালো কাজ করছেন, বরং অভিজ্ঞতার নতুন মাত্রা তাঁদের কাজে যুক্ত হচ্ছে।



সংসার ও কাজের মধ্যে ভারসাম্যের নতুন হিসাব


কর্মজীবী নারীর কাছে কাজের পাশাপাশি পরিবার, বন্ধু, ঘোরাঘুরি, ছুটি কাটানো এবং নিজের জন্য সময় বের করাও গুরুত্বপূর্ণ। পরিণীতিও বরাবরই জীবনের এই ভারসাম্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে মা হওয়ার পর সেই ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্ব আরও বেড়েছে।


শিশুর যত্ন, কাজের ব্যস্ততা এবং ব্যক্তিগত সময়—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে প্রয়োজন পরিকল্পনা ও পারস্পরিক সহযোগিতা। এখানে কেবল মায়ের দায়িত্বের কথা বললে চলবে না; সন্তানের যত্নে বাবার অংশগ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।


পরিণীতি ও রাঘব চাড্ডা সেই দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন। অভিনেত্রীর ভাষায়, তাঁরা সন্তানের দায়িত্ব ৫০-৫০ ভাগ করে নিয়েছেন। দুজনেই মা-বাবা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাই সন্তানের দেখাশোনাও দুজনের দায়িত্ব।


পরিণীতি কাজে থাকলে রাঘব ছেলের সঙ্গে সময় কাটান। আবার রাঘব ব্যস্ত থাকলে সন্তানের দায়িত্ব নেন পরিণীতি। এই ভাগাভাগি শুধু দৈনন্দিন কাজ সহজ করে না, বরং দুজনের পেশাগত জীবন চালিয়ে যাওয়ার সুযোগও তৈরি করে।


স্বামীর সহযোগিতাই ভরসা


রাজনীতির ব্যস্ততায় রাঘব চাড্ডারও সময় কাটে নানা দায়িত্বের মধ্যে। অন্যদিকে, শুটিং, প্রচার ও বিভিন্ন পেশাগত আয়োজনে ব্যস্ত থাকতে হয় পরিণীতিকে। এমন পরিস্থিতিতে সংসার ও সন্তানের দায়িত্ব সামলানো সহজ নয়। তবে ক্লান্তিকর দিনের শেষে স্বামীর সহযোগিতাই তাঁকে নতুন করে শক্তি জোগায়।


পরিণীতি জানিয়েছেন, অনেক দিন কাজের চাপে তিনি একেবারে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তখন রাঘব তাঁকে আশ্বস্ত করেন, তিনি যেন নিজের কাজ চালিয়ে যান, বাকি দায়িত্ব তিনি সামলে নেবেন। এই ভরসা অভিনেত্রীর কাছে অনেক বড় পাওয়া।


একজন নারীর কর্মজীবন এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের সমর্থন যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, পরিণীতির অভিজ্ঞতা তারই উদাহরণ। সব দায়িত্ব একা সামলানোর প্রত্যাশা না রেখে পরিবারের সদস্যরা পাশে দাঁড়ালে একজন নারী নিজের কাজ ও স্বপ্নের প্রতি মনোযোগী হতে পারেন।


এ ক্ষেত্রে রাঘবের সহযোগিতা শুধু স্বামী হিসেবে পাশে থাকা নয়, বরং একজন বাবা হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করারও দৃষ্টান্ত।


পেশা আলাদা, বোঝাপড়া অটুট


পরিণীতি চোপড়া ও রাঘব চাড্ডার পেশাগত জগৎ একেবারেই আলাদা। একজন অভিনয় করেন, অন্যজন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাই একে অপরের কাজের প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে তাঁদের সমান ধারণা থাকবে, এমন নয়।


পরিণীতি মজা করে জানিয়েছেন, রাঘবের সংসদীয় বক্তৃতা কিংবা নির্বাচন নিয়ে তাঁর খুব বেশি জ্ঞান নেই। একইভাবে সিনেমার চিত্রনাট্য নিয়েও রাঘবের পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না তিনি। এমনকি কোথাও নিজের গান বাজলেও কখনো কখনো স্বামীকে মনে করিয়ে দিতে হয়, সেটি তাঁরই গান!


তাঁদের এই স্বীকারোক্তিতে যেমন হাস্যরস আছে, তেমনি রয়েছে সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। একসঙ্গে জীবন কাটানোর অর্থ সব বিষয়ে একমত হওয়া কিংবা একে অপরের পেশাগত জগতে হস্তক্ষেপ করা নয়। বরং নিজ নিজ কাজের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ব্যক্তিগত জীবনে সহযোগী হয়ে ওঠাও সম্পর্কের সুস্থতার অংশ।



মাতৃত্ব পরিচয়ের শেষ নয়, নতুন অধ্যায়


পরিণীতির অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, মাতৃত্ব ও কর্মজীবনকে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেখার প্রয়োজন নেই। একজন নারী মা হওয়ার পরও নিজের পেশাগত স্বপ্নকে গুরুত্ব দিতে পারেন। একইভাবে সন্তানের দায়িত্বও কেবল মায়ের একার নয়; বাবার সমান অংশগ্রহণ এবং পরিবারের সহযোগিতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


অবশ্য প্রত্যেক নারীর পরিস্থিতি আলাদা। কারও পক্ষে দ্রুত কাজে ফেরা সম্ভব, কারও প্রয়োজন হয় বেশি সময়। কেউ কাজের ধরন বদলান, কেউ কিছুদিন বিরতি নেন। এসব সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত প্রয়োজন, স্বাস্থ্য, পারিবারিক পরিস্থিতি ও সুযোগের ওপর নির্ভর করে। তাই মাতৃত্বের পর কাজে ফেরা কিংবা বিরতি নেওয়া—কোনোটিকেই নারীর সাফল্য বা ব্যর্থতার মাপকাঠি হিসেবে দেখা উচিত নয়।


sidebar ad