মাতৃতন্ত্র, মাতৃবংশীয় সমাজ নাকি পুরুষতন্ত্র? ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান ও বাস্তবতার আলোকে পুনর্বিবেচনা

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬

মাতৃতন্ত্র, মাতৃবংশীয় সমাজ নাকি পুরুষতন্ত্র? ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান ও বাস্তবতার আলোকে পুনর্বিবেচনা

‘মানবসভ্যতার শুরুতে পৃথিবী ছিল মাতৃতান্ত্রিক, পরে তা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে রূপ নেয়।’—এই বক্তব্যটি আমরা প্রায়ই শুনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন আলোচনা, এমনকি অনেক জনপ্রিয় বইয়েও এটি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলা হয়। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব ও প্রত্নতত্ত্বের দীর্ঘ গবেষণা কি সত্যিই এই দাবিকে সমর্থন করে?


আশ্চর্যের বিষয় হলো, আধুনিক গবেষণার আলোকে এই প্রশ্নের উত্তর সরল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নয়। বরং সমস্যাটি শুরু হয় একটি মৌলিক বিভ্রান্তি থেকে—আমরা প্রায়ই মাতৃতন্ত্র (Matriarchy), মাতৃবংশীয় সমাজ (Matrilineal Society) এবং মাতৃস্থানীয় সমাজ (Matrilocal Society)—এই তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণাকে এক করে দেখি। ফলে ইতিহাস সম্পর্কে একটি সরলীকৃত ধারণা তৈরি হয়, যা গবেষণার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।


মাতৃতন্ত্র: একটি ধারণা, নাকি ঐতিহাসিক বাস্তবতা?


মাতৃতন্ত্র বলতে এমন একটি সমাজকে বোঝায়, যেখানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নারীরা থাকেন। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্বের প্রধান অধিকার নারীদের হাতে থাকে।


ঊনবিংশ শতকে সুইস গবেষক জোহান ইয়াকব বাখোফেন প্রস্তাব করেছিলেন যে মানবসভ্যতার প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ছিল। পরে লুইস হেনরি মরগান ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসও বিভিন্নভাবে এই ধারণাকে জনপ্রিয় করেন। বিশেষ করে এঙ্গেলস ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের বিকাশের সঙ্গে পুরুষতন্ত্রের উত্থানকে যুক্ত করেছিলেন।


কিন্তু বিংশ ও একবিংশ শতকের প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণা এই তত্ত্বের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ খুঁজে পায়নি। আজ পর্যন্ত এমন কোনো শক্তিশালী প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা দেখায় যে সমগ্র মানবসভ্যতা একসময় মাতৃতান্ত্রিক ছিল।


অর্থাৎ মাতৃতন্ত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ধারণা হলেও একে সর্বজনীন ঐতিহাসিক সত্য বলা যায় না।


মাতৃবংশীয় সমাজ: যেখানে বংশ চলে মায়ের মাধ্যমে


এখানেই সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি তৈরি হয়।


মাতৃবংশীয় সমাজে সন্তানের পরিচয়, বংশধারা বা সম্পত্তির উত্তরাধিকার মায়ের দিক দিয়ে নির্ধারিত হয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সমাজের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা নারীদের হাতেই থাকে।


ভারতের মেঘালয়ের খাসি সমাজে কনিষ্ঠ কন্যা পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন। ইন্দোনেশিয়ার মিনাংকাবাউ সমাজ পৃথিবীর বৃহত্তম মাতৃবংশীয় সমাজগুলোর একটি। সেখানে জমি ও পারিবারিক সম্পদ নারীদের নামে থাকে।


তবে এই সমাজগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই গ্রামের প্রশাসন, ধর্মীয় নেতৃত্ব বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পুরুষেরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।


অর্থাৎ মাতৃবংশীয় সমাজ মানেই মাতৃতন্ত্র নয়। এটি উত্তরাধিকার ও বংশপরিচয়ের একটি সামাজিক কাঠামো, ক্ষমতার সম্পূর্ণ রূপান্তর নয়।


মাতৃস্থানীয় সমাজ: বসবাসের নিয়ম, ক্ষমতার নয়


তৃতীয় ধারণাটি হলো মাতৃস্থানীয় সমাজ


এ ধরনের সমাজে বিয়ের পর স্বামী স্ত্রীর পরিবারের কাছে বা তাঁর গ্রামে বসবাস করেন। এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য পরিবার ও আত্মীয়তার সম্পর্ককে সুসংহত রাখা।


কিন্তু এখানেও নারীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাজের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যান না।


অর্থাৎ মাতৃস্থানীয় সমাজ মূলত বসবাসের একটি সাংস্কৃতিক রীতি; এটি রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোকে সংজ্ঞায়িত করে না।


তাহলে পুরুষতন্ত্র কেন এত বিস্তৃত হলো?


এটি সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।


গবেষকদের মতে, শিকার ও সংগ্রহনির্ভর সমাজে নারী ও পুরুষের ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রে পরিপূরক ছিল। কিন্তু কৃষির বিকাশের পর জমির মালিকানা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি, উদ্বৃত্ত উৎপাদন, উত্তরাধিকার ও স্থায়ী বসতির সঙ্গে সঙ্গে সম্পদের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন সামনে আসে।


একই সময়ে যুদ্ধ, ভূখণ্ড রক্ষা, সামরিক সংগঠন ও কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ায় বহু সমাজে পুরুষেরা সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্রে চলে আসেন।


তবে এটিও মনে রাখা জরুরি যে পুরুষতন্ত্র কোনো একদিনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, আবার পৃথিবীর সব সমাজে একইভাবে গড়েও ওঠেনি। অঞ্চলভেদে এর রূপ ও মাত্রা ভিন্ন।


নারীর উচ্চ মর্যাদা মানেই কি মাতৃতন্ত্র?


না।


এটিও একটি সাধারণ ভুল ধারণা।


অনেক সমাজে নারীরা অত্যন্ত সম্মানিত, শিক্ষিত ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও সেই সমাজকে মাতৃতান্ত্রিক বলা যায় না।


আবার এমন সমাজও আছে, যেখানে উত্তরাধিকার নারীর মাধ্যমে চললেও রাজনৈতিক ক্ষমতা পুরুষদের হাতে।


অর্থাৎ নারীর সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও মাতৃতন্ত্র—এই তিনটি এক বিষয় নয়।


আধুনিক সমাজ আমাদের কী শেখায়?


একবিংশ শতাব্দীতে উন্নত সমাজগুলো ধীরে ধীরে একটি নতুন ধারণার দিকে এগিয়েছে—ক্ষমতার ভারসাম্য।


আজকের সমাজবিজ্ঞান নারীশাসিত সমাজ কিংবা পুরুষশাসিত সমাজ—কোনোটিকেই আদর্শ বলে না। বরং গবেষণাগুলো দেখায়, যে সমাজে নারী ও পুরুষ উভয়েই শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি ও পরিবারে সমান সুযোগ পান, সেই সমাজ দীর্ঘমেয়াদে বেশি স্থিতিশীল, উদ্ভাবনী ও মানবিক হয়।


অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিশুর স্বাস্থ্য, শিক্ষার মান ও সামাজিক আস্থার সঙ্গে লিঙ্গসমতার ইতিবাচক সম্পর্ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে।


ইতিহাসকে স্লোগানে নয়, গবেষণায় পড়া দরকার


সামাজিক বিতর্কে আমরা প্রায়ই দুটি চরম অবস্থান দেখি। কেউ বলেন, ‘আগে সবই নারীদের ছিল।’ আবার কেউ বলেন, ‘সভ্যতা সব সময় পুরুষই তৈরি করেছে।’


বাস্তবতা এর কোনোটিই নয়


মানবসভ্যতার ইতিহাস প্রতিযোগিতার নয়; এটি সহযোগিতার ইতিহাস। পরিবার, কৃষি, সংস্কৃতি, ভাষা, শিক্ষা ও রাষ্ট্র—এসবের বিকাশে নারী ও পুরুষ উভয়েরই অবদান রয়েছে।


ইতিহাসকে যদি বর্তমানের রাজনৈতিক অবস্থান প্রমাণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে সত্য হারিয়ে যায়। কিন্তু গবেষণার আলোকে ইতিহাসকে পড়লে আমরা দেখতে পাই, মানবসমাজের বিবর্তন ছিল বহুস্তরীয়, বৈচিত্র্যময় ও অঞ্চলভেদে ভিন্ন।


পরিশেষে


মাতৃতন্ত্র, মাতৃবংশীয় সমাজ ও মাতৃস্থানীয় সমাজ—এই তিনটি ধারণা আলাদা। এগুলোকে এক করে দেখলে ইতিহাসের জটিল বাস্তবতাকে আমরা সরল করে ফেলি।


বর্তমান গবেষণা বলছে, পৃথিবী একসময় সর্বত্র মাতৃতান্ত্রিক ছিল—এমন দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। তবে বিভিন্ন অঞ্চলে মাতৃবংশীয় ও মাতৃস্থানীয় সমাজ ছিল এবং এখনো রয়েছে। একইভাবে পুরুষতন্ত্রও কোনো একক বা চিরন্তন বাস্তবতা নয়; এটি অর্থনীতি, সম্পত্তি, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের দীর্ঘ বিবর্তনের ফল।


আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই—কে শাসন করবে, নারী না পুরুষ?—এটি নয়।


বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—কী ধরনের সমাজে মানুষ সবচেয়ে বেশি মর্যাদা, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও সমান সুযোগ পায়?


কারণ সভ্যতার পরিমাপ ক্ষমতার মালিকানায় নয়; বরং ক্ষমতার ন্যায্য বণ্টনে। আর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—একটি সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নয়, সহযোগিতায়।


*সাবিনা ইয়াসমীন

সম্পাদক ও প্রকাশক, রোদসী

sidebar ad