১৩৪৭-৫২ পর্যন্ত ইউরোপ প্লেগে আক্রান্ত ছিল। প্লেগ এবং ব্ল্যাক ডেথ রোগ থেকে মুক্তির জন্য গির্জায় গির্জায় প্রার্থনা চলতে থাকল। কিন্তু যত দিন গেল, প্লেগের বিস্তৃতি বাড়তেই থাকল। ইউরোপের তিন ভাগের এক ভাগ জনসংখ্যা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লে সম্রাটের ডিক্রি করা সামাজিক প্রার্থনার বিরুদ্ধে তরুণরা একত্র হলো। তারা গির্জা এবং পাদ্রিদের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে উপাসনালয়গুলোতে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিল। এরপর সম্রাট এই রোগের কারণ আবিষ্কারে একদল গবেষককে নিয়োগ দিলেন। রোগের কারণ বের হলো। তারপর রোগটি নিয়ন্ত্রণেও এলো। তরুণদের নিয়ে লিখতে গিয়ে কেন এই প্রসঙ্গের অবতারণা?
পারিবারিক এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষা শুধু প্রজন্ম গড়ে তোলে না। একটি প্রজন্মের আদল বা প্রকৃতি গড়ে ওঠে সামাজিক-রাজনৈতিক, ভৌগোলিক, প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক নিষ্পেষণের মাধ্যমেও। প্লেগের সময়ে ইউরোপের তরুণ প্রজন্মের মননে যে স্থায়ী বিশ্বাসের জন্ম হয়েছিল, তার আদল ধরেই ইউরোপ গত চারশ বছর একই ধারায় এগিয়েছে। অর্থনৈতিক প্রয়োজনে পরবর্তী ইউরোপের সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সভ্যতা যতই বাঁক নিক, চতুর্দশ শতকের তরুণ প্রজন্মের প্রচলিত ধারা ভাঙার ইতিহাসটুকু ইউরোপকে একটি স্থায়ী সভ্যতার রূপক হিসেবে আজও ধনুর্বাণের মতো শক্তি জুগিয়েছে।
কিন্তু আমাদের দেশে তরুণদের নিয়ে তাঁদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের অনেকেই নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। কারণ, তাঁদের কথায় কথায় আন্দোলন করাটা বড়রা পছন্দ করেন না। অথচ তাঁদের আন্দোলন ছাড়া সামাজিক ব্যাধিগুলো বড় বড় রাজনৈতিক দলও সারাতে পারছে না। তরুণ ছাত্রছাত্রীদের এই আন্দোলনমনস্কতা আবার কখনো কখনো সামাজিক ভোগান্তির কারণও হচ্ছে। আসলে দোষটা কি তাঁদের?
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে তাঁরা একবার একাত্ম হয়েছিল। এরপর বৈষম্যের বিরুদ্ধে কোটা আন্দোলন, যার পরবর্তী ঘটনাসমূহ আমরা জানি। তাঁদের জীবনের প্রারম্ভ থেকে যে সময় অতিবাহিত হয়েছে, তার বেশির ভাগ সময়ই তাঁরা বিগত স্বৈরাচারের বিভিন্ন অনাচার, দুর্নীতি ও লাগামহীন মিথ্যা বলার নির্লজ্জতা দেখে বড় হয়েছেন। তাঁরা উন্নয়নের নামে সীমাহীন লুটপাট দেখেছেন। দেখেছেন ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে জনজীবনে কী সীমাহীন দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। বিচারহীনতা এবং প্রশাসনের দলদাসত্বের কারণে মানুষের জীবনে যে আর্তি, তাও তাঁরা জানেন। ব্যবসায়িক মনোভাবের রাজনীতিবিদদের সাংসদ হিসেবে সম্পৃক্ততা, বিনা ভোটের সরকারের দেশ শাসনের ফলে অসীম দুর্নীতি এবং এক শ্রেণির মানুষের বিলাসী জীবনযাপন—তাঁদের কাছে নুন আনতে পান্তা ফুরানো জীবনের বিপরীতে এমন সব দৃশ্যকল্প হয়ে উঠেছে যে তাঁদের মন-হৃদয় ভেতরে ভেতরে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে উঠেছে।
মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন তার স্বাধীনতা। সেই ক্ষোভ কথাবলার স্বাধীনতাহীনতার কারণে তাঁরা প্রকাশও করতে পারেননি। ফলে ভেতরে ভেতরে তাঁরা যেন ‘অ্যাভাটার’ সিনেমার এক একজন জ্যাক স্যালিতে পরিণত হয়েছেন।
কিন্তু নতুন প্রজন্মের এই জ্যাক স্যালিরা যখন ভয়ংকরভাবে বেড়ে ওঠা নিষ্ঠুর সমাজকে মোকাবিলা করতে চায়, তখন তা প্রজ্ঞা দিয়ে নয়—কারণ প্রজ্ঞা অর্জনের বয়স এখনো তাঁদের হয়নি—বরং ভেতরের আবেগ ও ক্ষোভ দিয়েই তারা সেই সমাজের মোকাবিলা করতে চায় অথবা নতুন একটি জগৎ গড়ে তুলতে চায়। ফলে ভুল সেখানে অনিবার্য। আমরা কি তাঁদের মাথায় কোমল হাত বুলিয়ে, মমতা ও স্নেহ নিয়ে পাশে গিয়ে বলেছি, ‘বাচ্চারা, এভাবে নয়, ওভাবে’? নাকি সেটি বলার মতো সাহস ও আত্মমর্যাদা আমাদের আছে?
আমাদের অনেকের কাছেই মনে হয়, এই তরুণরা অসংযত, উদ্ধত, বেপরোয়া এবং বেয়াদব। কিন্তু একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের শিশুরা যখন বড়দের মতো এলোমেলো আচরণ করে, তখন বুঝতে হবে—সমস্যাটি শিশুদের নয়; তাঁদের ভেতরে বড় বড় ক্ষত তৈরি করে দিয়েছে সমাজ, রাষ্ট্র এবং স্বয়ং পরিবার।
যে শিশুদের শৈশব নেই, তাদের কৈশোর ও যৌবন কেমন হবে, তা নিশ্চিত নয়। তারা হুজুরদের ওয়াজ শুনবে, নাকি সলিমুল্লাহ সাহেবদের বয়ান বিশ্বাস করবে—তা নিয়েও তারা বিভ্রান্ত। তারা ব্যাংক লুটেরা বড় বড় বাড়ি-গাড়িওয়ালাদের আদর্শ ভাববে, নাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গোয়ালঘরে রূপান্তর করার কুশীলবদের আদর্শ বুকে ধারণ করবে—তা নিয়েও তারা বিভ্রান্ত। পেট ভরে ঘুষ খাও, তারপর নামাজ পড়ে কপাল ছিদ্র করে ফেলো—এমন ভণ্ডামিও তাঁদের বিভ্রান্ত করে। কোন পথে যাবে তারা? যেখানেই যাক, তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছে অন্ধকার এক ভয়ংকর গলি।
বড় বড় কোম্পানির মালিকেরা শিক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থাকেও নারীর শরীরের মতো ব্যবসার নারকীয় খোরাকে পরিণত করেছে। অথচ পৃথিবীর বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালগুলোতে ধনীদের অনুদানের কারণে সেবা পাওয়াটা অনেক সহজ। একটি দেশে বিচিত্রমুখী শিক্ষাব্যবস্থা এই তরুণদের এক কাতারে দাঁড়াতে দিচ্ছে না। পরিবারের প্রবীণ প্রজন্মের কাছ থেকেও কি তারা সঠিক আচরণ ও শিক্ষা পায়? নাকি তাঁদের কাছ থেকে ঘৃণা, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের সম্পর্কে অস্বস্তি এবং বিষোদ্গারের বর্ণনা শুনতে শুনতে তারা অভ্যস্ত হয়ে উঠছে?
তারা কীভাবে অন্যদের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা-সম্মানের সম্পর্ক গড়ে তুলবে? মানবজীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন একটি আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা। কিন্তু তা থেকে তাঁদের তো আমরাই দূরে সরিয়ে রাখছি অথবা রাখতে বাধ্য হচ্ছি। প্রতিবেশীর সঙ্গে যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক শিশুকাল থেকেই একজন মানুষকে পরিমিতিবোধ, সৌজন্য ও বিপদে মানুষের পাশে থাকার শিক্ষা দেয়, তা কি তারা শিখছে?
শিশুরা পৃথিবীতে আসে নিষ্পাপ নরম কাদামাটির মতো। তাঁদের ভবিষ্যৎ আমরা কীভাবে গড়েছি, গড়ছি? নিষ্পাপ এই শিশুরা যখন কিশোর বয়সেই সরলতার বিনিময়ে নিষ্পেষণ চিনে যায়, তখন তাঁদের আচরণ কেমন হবে?
তাঁদের জলে কীভাবে সাঁতার কাটতে হবে, তা না শিখিয়েই আমরা একটি শহরকে নুহ আমলের বন্যার মতো অবস্থায় নিয়ে গেছি। তারপর একটি খেলার মাঠ পর্যন্ত না বানিয়ে তাঁদের অপদার্থ বলছি!
কী ভালো উদাহরণ আমরা অবশিষ্ট রেখেছি আমাদের সন্তানদের জন্য? আত্মমর্যাদার কোনো উদাহরণ? বরং আমরা তাঁদের কাছে আপসকামী হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছি। একটি বিশ্বমানের ভালো বিশ্ববিদ্যালয়? চিকিৎসার নিশ্চয়তা? নিরাপদ সড়ক?
তাঁরা বছরের পর বছর সারারাত জেগে বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা শেষে একজন ড্রাইভারের চেয়েও কম বেতনের—মাত্র ২৫-৩৫ হাজার টাকার—চাকরির প্রস্তাব পেয়ে নিজেকে ধন্য ভাববে, এই তো! কেন আমাদের সন্তানদের জন্য বাংলাদেশ আর কোনো ঠিকানা নয়? একটি অস্থির, অস্বাভাবিক, অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীন ও বন্ধনহীন সমাজ আমরাই নির্মাণ করেছি।
আমাদের তরুণদের সামনে ঝুলছে বিভাজনের বিভ্রান্তি এবং শোষণের ভয়। ফলে কেউ কেউ শোষক হয়ে ওঠার পথও আবিষ্কার করবে। যাদের অনেক কিছু আছে, আমাদের সন্তানরা তাঁদের চিনেছে আত্মমর্যাদাহীন লুটেরাদের সন্তান হিসেবে। বিভাজনের সূত্র এখানেও লুকানো।
আমাদের সন্তানদের ঘিরে রেখেছে পচা নর্দমার মতো জীবনের দুর্গন্ধ আর হেরেমখানায় শরীরে শরীর ঘেঁষাঘেঁষির ঘামের কটু স্বাদযুক্ত কোনো এক অদৃশ্য অট্টহাসি।
এই প্রজন্মের উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীদের কথা ভাবলে আমার নিজেরই অস্থির লাগে। মন ভীষণ বেদনার যন্ত্রণায় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।
যেন কোথাও একটি রংধনু নেই! একটি স্বপ্নময় শাড়ির আঁচলের বাঁকে, কুয়াশার আস্তরণের ফাঁকে ফাঁকে একরত্তি স্বপ্ন জেগেও কোথায় যেন হাহাকার হয়ে হারিয়ে যায়।
আই ফিল স্যাড ফর ইউ, অ্যান্ড এক্সট্রিমলি ফিল রিগ্রেটেড, স্যরি ফর ইউ, বেবিস...
*কাজী রাফি
কথাসাহিত্যিক