স্বামী, সন্তান থাকার পরেও একজন নারীর কী বন্ধুর প্রয়োজন আছে?

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬

স্বামী, সন্তান থাকার পরেও একজন নারীর কী বন্ধুর প্রয়োজন আছে?

স্বামী আছে, সন্তান আছে; তবুও একজন নারীর কেন একজন নারী বন্ধুর প্রয়োজন? একজন নারীর জীবনে স্বামী থাকতে পারে, সন্তান থাকতে পারে, পরিবার থাকতে পারে, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত পরিচিত মানুষও থাকতে পারে। তবুও দিনের শেষে এমন একটি শূন্যতা থেকে যেতে পারে, যা পূরণ করতে পারে না কোনো পারিবারিক সম্পর্ক। সেই শূন্যতা পূরণ করে একজন সত্যিকারের নারী বন্ধু।


আন্তর্জাতিক গবেষণা, মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা আজ একটি বিষয়ে ক্রমশ একমত হচ্ছেন—নারীদের মানসিক সুস্থতা, আত্মবিশ্বাস, সুখ এবং দীর্ঘমেয়াদি জীবনমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নারী বন্ধুত্বের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পরিবার একজন মানুষের জীবনের ভিত্তি হতে পারে, কিন্তু বন্ধুত্ব এমন একটি সম্পর্ক, যা একজন মানুষ নিজেই নির্বাচন করেন। আর সেই কারণেই বন্ধুত্বের শক্তি অনেক সময় রক্তের সম্পর্কের চেয়েও গভীর হয়ে ওঠে।


আমাদের সমাজে নারীর পরিচয় সাধারণত বিভিন্ন সম্পর্কের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়—কারও মেয়ে, কারও স্ত্রী, কারও মা। কিন্তু একজন নারী হিসেবে তার নিজস্ব পরিচয়, অনুভূতি, ভয়, স্বপ্ন এবং অপূর্ণতার কথা শোনার জন্য একজন সহমর্মী বন্ধুর প্রয়োজন হয়। এমন একজন মানুষ, যিনি বিচার করবেন না, তুলনা করবেন না; বরং বুঝবেন।


অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন—যদি একজন নারীর স্বামীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকে, তাহলে আলাদা করে নারী বন্ধুর প্রয়োজন কেন?


কারণ স্বামী এবং বন্ধু একই ভূমিকা পালন করেন না। একজন স্বামী জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী হলেও তিনি সব অভিজ্ঞতা, অনুভূতি কিংবা সামাজিক বাস্তবতাকে একইভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন না, যেভাবে আরেকজন নারী পারেন। কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য, মাতৃত্বের চাপ, শারীরিক পরিবর্তন, বয়সজনিত উদ্বেগ, পারিবারিক প্রত্যাশা কিংবা নিজের পরিচয় হারানোর ভয়—এসব বিষয়ে একজন নারী আরেকজন নারীর অভিজ্ঞতার সঙ্গে সহজেই সংযোগ স্থাপন করতে পারেন।


বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারী বন্ধুত্ব নিয়ে পরিচালিত গবেষণাগুলো দেখিয়েছে, যেসব নারীর অন্তত একজন ঘনিষ্ঠ নারী বন্ধু রয়েছে, তারা সাধারণত মানসিক চাপ আরও ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পারেন। তাঁদের মধ্যে হতাশা ও একাকীত্বের প্রবণতাও তুলনামূলক কম দেখা যায়। কারণ তারা জানেন, প্রয়োজনের মুহূর্তে ফোন করার মতো, মনের কথা বলার মতো এবং নির্ভর করার মতো একজন মানুষ আছেন।


আধুনিক জীবনে নারীদের ওপর দায়িত্বও বেড়েছে। অনেক নারী একসঙ্গে কর্মজীবন, পরিবার, সন্তান ও সামাজিক সম্পর্ক—সবকিছু সামলাচ্ছেন। বাইরে থেকে তাদের জীবন যতই সফল মনে হোক না কেন, ভেতরে ভেতরে তারা প্রায়ই মানসিক ক্লান্তি অনুভব করেন। এই ক্লান্তির কথা অনেক সময় পরিবারের কাছেও বলা যায় না। কারণ পরিবার অনেক সময় সমাধান খোঁজে, কিন্তু একজন বন্ধু প্রথমে শোনেন। আর অনেক সময় একজন মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় এমন কাউকে, যিনি শুধু শুনবেন।


বাংলাদেশের বাস্তবতায় নারী বন্ধুত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। বিয়ের পর অনেক নারীর সামাজিক পরিসর ছোট হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়, কর্মজীবনে না থাকলে নতুন বন্ধু তৈরির সুযোগও সীমিত হয়। ধীরে ধীরে একজন নারী নিজের পৃথিবীকে শুধু পরিবারকেন্দ্রিক করে ফেলেন। কিন্তু পরিবার যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, একজন মানুষের সম্পূর্ণ সামাজিক জীবন কখনোই একটি সম্পর্ক বা একটি পরিবারের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়।


বিশেষজ্ঞরা বলেন, একজন সুস্থ মানুষের জীবনে বিভিন্ন ধরনের সম্পর্কের প্রয়োজন হয়। পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী ও প্রতিবেশী—সব সম্পর্ক মিলেই একটি সামাজিক নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে। যখন কোনো একটি সম্পর্ক সংকটে পড়ে, তখন অন্য সম্পর্কগুলো মানুষকে মানসিকভাবে স্থিতিশীল থাকতে সাহায্য করে।


নারী বন্ধুত্বের আরেকটি বড় শক্তি হলো পারস্পরিক অনুপ্রেরণা। একজন বন্ধু অনেক সময় আমাদের এমন সম্ভাবনা দেখিয়ে দেন, যা আমরা নিজেরাই দেখতে পাই না। নতুন ব্যবসা শুরু করা, উচ্চশিক্ষায় ফেরা, নতুন দক্ষতা শেখা, সামাজিক কাজে যুক্ত হওয়া কিংবা ব্যক্তিগত সংকট থেকে বেরিয়ে আসা—এসব ক্ষেত্রে বন্ধুদের উৎসাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সমাজে নারী বন্ধুত্বকে সবসময় গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অনেক সময় মনে করা হয়, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো অপ্রয়োজনীয় বা বিলাসিতা। অথচ বাস্তবতা হলো, একজন নারীর নিজের জন্য সময় প্রয়োজন। নিজের পছন্দের মানুষদের সঙ্গে কথা বলা, হাসাহাসি করা, অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া কোনো অপচয় নয়; এটি মানসিক স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।


প্রযুক্তির যুগে বন্ধুত্বের সংজ্ঞাও বদলেছে। আজ আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত মানুষের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সংযুক্ত থাকা আর সংযোগ থাকা এক বিষয় নয়। একটি ‘লাইক’, একটি ‘রিঅ্যাক্ট’ কিংবা একটি মন্তব্য কখনোই গভীর মানবিক সম্পর্কের বিকল্প হতে পারে না। অনেক নারী আজ এমন এক বাস্তবতার মধ্যে বাস করছেন, যেখানে তাদের অনলাইন উপস্থিতি দৃশ্যমান, কিন্তু আবেগগত সংযোগ সীমিত। ফলে একাকীত্বের অনুভূতি বাড়ছে।


একজন সত্যিকারের নারী বন্ধু সেই মানুষ, যার কাছে সফলতার গল্প যেমন বলা যায়, তেমনি ব্যর্থতার গল্পও বলা যায়। যার সামনে নিজেকে নিখুঁত প্রমাণ করতে হয় না। যিনি জানেন আপনার শক্তির জায়গাগুলো, আবার দুর্বলতাগুলোও বোঝেন। যিনি আপনার জীবনের সাক্ষী।


বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারী বন্ধুত্বের গুরুত্ব আরও বাড়ে। সন্তান বড় হয়ে নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে যায়। অনেক নারী অবসরজীবনে প্রবেশ করেন। জীবনের এই পরিবর্তনের সময়ে বন্ধুত্ব নতুন অর্থ পায়। তখন একজন বন্ধু হয়ে ওঠেন হাঁটার সঙ্গী, ভ্রমণের সঙ্গী, গল্পের সঙ্গী এবং অনেক সময় মানসিক আশ্রয়।


একটি সুখী জীবন শুধু ভালো দাম্পত্য বা সফল সন্তান দিয়ে গড়ে ওঠে না। একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনের জন্য প্রয়োজন অর্থবহ মানবিক সম্পর্ক। আর সেই সম্পর্কগুলোর মধ্যে নারী বন্ধুত্ব একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে।


তাই একজন নারীর জীবনে স্বামী থাকলেও, সন্তান থাকলেও, পরিবারের ভালোবাসা থাকলেও একজন নারী বন্ধুর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না। কারণ বন্ধু কোনো সম্পর্কের বিকল্প নয়; বন্ধু হলো জীবনের আরেকটি অপরিহার্য স্তম্ভ।


জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে যে মানুষটি পাশে দাঁড়িয়ে বলে, “আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি”—সেই মানুষটি অনেক সময় একজন নারী বন্ধুই হন। এবং হয়তো সেই কারণেই, একজন নারীর জীবনে সত্যিকারের একজন নারী বন্ধু থাকা শুধু সৌভাগ্যের বিষয় নয়; এটি তাঁর মানসিক সুস্থতা, আত্মমর্যাদা এবং সুখী জীবনের জন্য এক অমূল্য সম্পদ।


লেখক: সাবিনা ইয়াসমীন

সম্পাদক ও প্রকাশক, রোদসী

sidebar ad