হিমালয়ান পিংক সল্ট একধরনের গোলাপি রঙের লবণ। এই লবণ পাকিস্তানের হিমালয়ের কাছাকাছি পাঞ্জাবের সল্ট রেঞ্জ ও খেওড়া লবণখনি থেকে উত্তোলন করা হয়। ধারণা করা হয়, লাখ লাখ বছর আগে প্রাচীন জলাধারের পানি শুকিয়ে তৈরি হয়েছিল এই লবণ। এটি হাতে সংগ্রহ করা হয় এবং খুব কম প্রক্রিয়াজাত করা হয়। তাই এতে সাধারণত কোনো সংযোজিত উপাদান থাকে না।
সাধারণ লবণের মতো গোলাপি লবণেরও প্রধান উপাদান সোডিয়াম ক্লোরাইড। তবে এতে আরও কিছু খনিজ ও অন্যান্য উপাদান অল্প পরিমাণে রয়েছে। কিছু ধারণা অনুযায়ী, এতে মোট ৮৪ ধরনের খনিজ ও অন্যান্য উপাদান থাকতে পারে। আরেকটি মজার বিষয় হলো, এর মধ্যে আয়রন থাকায় এই লবণের রং হয় গোলাপি।
লবণ মূলত সোডিয়াম ক্লোরাইড দিয়ে তৈরি একটি খনিজ। সাধারণ টেবিল লবণের প্রায় ৯৮ শতাংশই ওজনের হিসাবে সোডিয়াম ক্লোরাইড।
ভূগর্ভস্থ লবণখনি থেকে লবণ উত্তোলন অথবা লবণাক্ত পানি বাষ্পীভূত করে লবণ তৈরি করা হয়। বাজারে পৌঁছানোর আগে টেবিল লবণ পরিশোধনের মাধ্যমে অমেধ্য ও সোডিয়াম ক্লোরাইড ছাড়া অন্যান্য খনিজ সরিয়ে ফেলা হয়। আর্দ্রতা রোধে এতে কিছু অ্যান্টিকেকিং উপাদান এবং আয়োডিনের ঘাটতি প্রতিরোধে আয়োডিনও যোগ করা হয়।
একটি গবেষণায় বিভিন্ন ধরনের লবণের খনিজ উপাদান তুলনা করা হয়েছিল। সেখানে প্রতি গ্রাম হিমালয়ান পিংক সল্টে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায় ১.৬ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ২.৮ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেশিয়াম ১.০৬ মিলিগ্রাম এবং আয়রন ০.০৩৬৯ মিলিগ্রাম। একই পরিমাণ সাধারণ টেবিল লবণে এসব উপাদানের পরিমাণ যথাক্রমে ০.৪, ০.৯, ০.০১৩৯ ও ০.০১০১ মিলিগ্রাম। তবে সোডিয়ামের পরিমাণ পিংক সল্টে প্রতি গ্রামে ৩৬৮ মিলিগ্রাম এবং টেবিল লবণে ৩৮১ মিলিগ্রাম।
অর্থাৎ হিমালয়ান পিংক সল্টে কিছু অতিরিক্ত খনিজ থাকলেও সেগুলোর পরিমাণ অত্যন্ত সামান্য। উদাহরণ হিসেবে, শুধু পিংক সল্ট খেয়ে দৈনিক প্রয়োজনীয় পটাশিয়াম পেতে হলে প্রায় ১.৭ কেজি বা ৩.৭ পাউন্ড লবণ খেতে হবে, যা স্বাভাবিকভাবেই বাস্তবসম্মত নয়। ফলে এই অতিরিক্ত খনিজগুলো থেকে উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্য উপকার পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
হিমালয়ান পিংক সল্ট নিয়ে বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত দাবি প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে শ্বাসকষ্টজনিত রোগের উন্নতি, শরীরের পিএইচ ভারসাম্য বজায় রাখা, বার্ধক্যের লক্ষণ কমানো, ঘুমের মান উন্নত করা, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ এবং যৌন আকাঙ্ক্ষা বাড়ানোর মতো দাবিও রয়েছে। কিন্তু এসব দাবির বেশির ভাগের পক্ষে বৈজ্ঞানিক গবেষণার পর্যাপ্ত সমর্থন নেই।
পিংক সল্ট দিয়ে তৈরি লবণগুহায় সময় কাটানোর মতো কিছু ব্যবহার নিয়ে ফুসফুসের রোগের চিকিৎসায় গবেষণা হয়েছে। কিছু গবেষণায় সম্ভাব্য উপকারের ইঙ্গিত মিললেও এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও শক্তিশালী গবেষণা প্রয়োজন।
আবার পর্যাপ্ত লবণ খাওয়ার সঙ্গে ঘুমের সম্পর্ক নিয়ে কিছু গবেষণা রয়েছে। তবে সেখানে হিমালয়ান পিংক সল্ট পরীক্ষা করা হয়নি। ফলে ঘুমের ক্ষেত্রে কোনো সম্ভাব্য উপকার থাকলেও সেটি পিংক সল্টের বিশেষ বৈশিষ্ট্য নয়; বরং লবণে থাকা সোডিয়ামের স্বাভাবিক ভূমিকার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
শরীরের পিএইচ ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও পিংক সল্টের বিশেষ কোনো ভূমিকা নেই। মানুষের ফুসফুস ও কিডনি নিজস্ব প্রক্রিয়ায় শরীরের পিএইচ নিয়ন্ত্রণ করে। একইভাবে রক্তে শর্করার মাত্রা, বার্ধক্য ও যৌন আকাঙ্ক্ষা মূলত খাবারের লবণের পরিবর্তে অন্যান্য বিভিন্ন শারীরিক ও জীবনযাপন-সম্পর্কিত কারণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হিমালয়ান পিংক সল্ট ও সাধারণ টেবিল লবণের স্বাস্থ্যগত প্রভাব সরাসরি তুলনা করে পর্যাপ্ত গবেষণা এখনো হয়নি। তাই পিংক সল্ট সাধারণ লবণের চেয়ে স্বাস্থ্যকর—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
তবে সাধারণ টেবিল লবণে থাকা অতিরিক্ত উপাদান এড়িয়ে চলতে চাইলে হিমালয়ান পিংক সল্ট একটি প্রাকৃতিক বিকল্প হতে পারে। কিন্তু এটি খেলে বড় ধরনের স্বাস্থ্য উপকার পাওয়া যাবে, এমন প্রত্যাশা না রাখাই ভালো।
আরেকটি বিষয় হলো, টেবিল লবণ আয়োডিনের গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উৎস। কেউ যদি আয়োডিনযুক্ত টেবিল লবণের পরিবর্তে হিমালয়ান পিংক সল্ট ব্যবহার করেন, তাহলে আয়োডিনের ঘাটতি এড়াতে সামুদ্রিক শৈবাল, দুধজাত খাবার ও মাছের মতো অন্যান্য খাদ্য থেকে পর্যাপ্ত আয়োডিন গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
সূত্র: হেলথলাইন