বিছানাময় ছড়িয়ে আছে প্লাস্টিকের হাড়ি পাতিল, বার্বি ডল আর রঙ্গিন সব খেলনা। ঘরের সবচেয়ে ছোট্ট সদস্যটির আধো আধো বোল আর খিলখিল হাসিতে ভরে যাচ্ছে পুরো ঘর। মা বাবার কোল ঘেঁষে রুপকথার কাহিনী শুনতে শুনতে কেটে যায় তার অবুঝ দিনগুলো। আরেকটু বড় হতেই শুরু হয় নতুন স্কুল যাত্রা। চুলে বিনুনি কেটে, পিঠে স্কুলব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলের আঙ্গিনায় পা রাখে। মা বাবার চোখে থাকে একরাশ স্বপ্ন। ছোটবেলার দিন পেরিয়ে সে ডানা মেলতে শুরু করে কৈশোরের নীল আকাশে। পরিবারের পরম যত্ন, ভালোবাসা আর আগলে রাখার চাদরে জড়িয়ে এভাবে একটু একটু করে পূর্ণতা পায় একটি নিষ্পাপ শৈশব। কিন্তু সবকিছুতেই কি এভাবে পূর্ণতা আসে? সমাজের কিছু কীটের লালসার কাছে হেরে যায় অবুঝ শিশুর শৈশব। দেশে মেয়েশিশুদের উপর সহিংসতার এক একটি খবর বুঝিয়ে দেয় এখন নিরাপত্তা শুধু বইয়ের মলাটেই সীমাবদ্ধ। মেয়ে হয়ে জন্মানোটাই যেনো এখন এক বড় পাপ।
“মাগুরায় পাশবিক নির্যাতনের শিকার হওয়া আট বছরের শিশুটির মৃত্যু হয়েছে ঢাকার হাসপাতালে। একাধিকবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়ে, সিপিআর দেয়ার পর প্রথমবার হৃৎস্পন্দন ফিরলেও দ্বিতীয়বার আর তা ফেরানো যায়নি।’’ “যশোরের চৌগাছা উপজেলায় ছয় বছরের এক শিশু শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অবস্থার অবনতি হলে তাকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।’’ “মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে পাশবিক নির্যাতনের পর গলা কেটে হত্যা করা হয়।’’ উল্লেখ করা এই অল্প কয়েকটি ঘটনা মেয়েশিশুর উপর সহিংসতার এক নির্মম চিত্র এঁকে দেয়। আজকাল খবরের কাগজ খুললে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নিউজফিডে স্ক্রল করলে বুকটা কেঁপে উঠে। এই ধরনের এক একটা ঘটনা শুধু সেই পরিবারের নয় বরং পুরো সমাজের জন্য একটি অস্বস্তিকর বার্তা বহন করে।
শিশুদের উপর যৌন নিপীড়ন ক্ষয়ে যাওয়া সামাজিক অবস্থার নির্মম বাস্তবচিত্র তুলে ধরে। এটা একটা শিশুকে শুধু শারীরিক ভাবে নয়, মানসিকভাবেও ট্রমাটাইজড করে। কেনোই বা বারবার এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে? একটু খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে, এই ধরনের বিপদ অনেক সময় অচেনা কোথাও থেকে আসেনা। অনেক ক্ষেত্রে পরিচিত পরিবেশ, পরিচিত মুখ, নিরাপদ মনে হওয়া জায়গাগুলো থেকে আসে। শিশুরা সাধারণত শারীরিকভাবে দূর্বল এবং বিশ্বাসপ্রবণ হয়ে থাকে। আর এই সরলতার সুযোগেই কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই এই ধরনের বড় বিপদ হয়ে যেতে পারে। তাদের ভয়ভীতি বা প্রলোভন দেখিয়ে দমন করে রাখা যায়। তাই শুধু বাইরের পরিবেশে নয়, দরজার ভেতরেও কি নিরাপদ আমাদের মেয়েরা?
আরেকটি বড় যে নিয়ামক এর পেছনে জড়িত তা হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং আইনের দীর্ঘসূত্রতা। এই ধরনের সেনসেটিভ ইস্যুগুলোর বিচার বাস্তবায়নে দেরি হওয়া আর বিচার শেষ পর্যন্ত না হওয়া একই কথা। বছরের পর বছর চলতে থাকা বিচারকার্য, একসময় আর আট দশটা সংগঠিত ঘটনার আড়ালে চলে যায়। অপরাধীরা এই সুযোগে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে ঠিকই বের হয়ে আসে। অপরাধীদের পার পাওয়ার এই সংস্কৃতি নতুন নতুন অপরাধীর জন্ম দিচ্ছে।
দেশে সংঘটিত যে কোন ঘটনা ঘটলে আমরা সকলেই কিছুদিন অনেক তৎপর থাকি। প্রতিবাদস্বরুপ মোমবাতি জ্বালাই, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জ্বালাময়ী লেখনী দিই। কিন্তু কিছুদিন পর আবার নতুন কিছু হলে সকলেই আগেরটি ভূলে যাই। আমাদের এই সাময়িক ক্ষোভ ও নীরবতাই পরবর্তীতে আরেকটি অপকর্ম সংঘটনের লাইসেন্স প্রদান করে। লোকলজ্জা বা সামাজিক মর্যাদার ভয়ে ভুক্তভোগী পরিবার একটা সময় সবকিছুই চেপে যেতে বাধ্য হয়।
প্রতিকার কোন পথে?
এই সংকট উত্তরণে পরিবারের অভিভাবকরা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারি। নিজেরা নিজেদের জায়গা থেকে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি। অনেক বাবা-মা এখনো ভাবেন, ছোট শিশুদের এইসব ব্যাপারে সচেতনের দরকার নেই। কিন্তু এটা সঠিক নয়। যখন থেকে আপনার সন্তান কথা বলতে শিখবে, কিছুটা বুঝতে শিখবে তাকে “গুড টাচ’’ ও “ব্যাড টাচ’’ সম্পর্কে তার বয়স উপযোগী ভাষায় বুঝিয়ে দিবেন। বাচ্চার সাথে সহজ ও বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক রাখবেন, যাতে সে যেকোন পরিস্থিতিতে আপনার উপর ভরসা রাখতে পারে। কে কিভাবে স্পর্শ করলে সে অস্বস্তি বোধ করছে তা যেনো সে আপনার কাছে না লুকিয়ে প্রকাশ করতে পারে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত করুন।
বাচ্চা কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে খেলছে সে ব্যাপারে ভালোভাবে খবর নিন। “ও তো ঘরেরই মানুষ, এমন কিছু করতে পারে না”, “ওই বাসায় অন্য বাচ্চা আছে” এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসুন। বাচ্চার প্রশ্নে কোন কিছুর সাথে আপোষ করা উচিৎ নয়।
বাচ্চাকে দেখাশোনা করার জন্য কোন আয়া থাকলে তা নির্বাচনের জন্য সতর্কতা অবলম্বন করুন। শুধু তাই নয় তাকে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দিলে সে ব্যাপারেও ভালোভাবে খবর নিন। বাচ্চার আচরণ পর্যবেক্ষণ করুন। হঠাৎ করেই সে চুপ হয়ে গেলে কিংবা ভয় পেলে সেগুলোকে গুরুত্ব দিন।
সর্বোপরি, আমাদের সমাজকে বুঝতে হবে নিরাপত্তার দায়িত্ব এককভাবে শুধু পরিবারের উপর বর্তায় না। এটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্র সবার দায়িত্ব। এই ধরনের জঘন্য অপরাধীদের শাস্তি শুধুমাত্র নথিপত্রে লিপিবদ্ধ না রেখে তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। জনমত নির্বিশেষে সকলকেই আইনি ব্যবস্থার প্রতি চাপ সৃষ্টি করতে হবে যাতে বিচারকার্য কোনভাবেই থমকে না যায়। একমাত্র কঠোরতম শাস্তি করতে পারে অপরাধীদের মনে ভয় ধরাতে।
আমরা এমন সমাজ চাইনা যেখানে, প্রতিটা কন্যাসন্তানের বাবা মাকে মেয়ে চোখের আড়াল হলে অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠতে হয়, পায়ে রিনিঝিনি নুপূরের পরিবর্তে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে শিকল পড়িয়ে রাখতে হয়, লোকলজ্জা ও মানসম্মানের ভয়ে ভুক্তভোগীকে চুপ করে যেতে হয় আর অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে হেঁটে যায়। একটা সমাজ কতটা উন্নত তা বড় বড় নির্মিত ভবন, অর্থনৈতিক উন্নয়নে বোঝা যায়না। বোঝা যায় একটা শিশুর কোমল হাসি সেখানে কতটা নিরাপদ।